আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১৩)

অপালা খিলখিল করে হেসে উঠল। এ-রকম শব্দ করে সে কখনাে হাসে না। নিশানাথবাবু এই মেয়েটির হঠাৎ এই উচ্ছ্বাসের কারণ বুঝতে পারলেন না।। 

‘ম্যানেজারকাকু। ‘বল মা। 

আকাশ জোড়া মেঘ‘আপনি ফিরােজ সাবেহকে জানিয়ে দেবেন যে তাঁর সাজানাে ঘর আমার খুব পছন্দ হয়েছে। তাঁকে আন্তরিক ধন্যবাদ এবং অভিনন্দন জানাবেন। 

‘দরকার কী? কাজ করেছে পয়সা নিয়েছে। 

‘না, আপনি লিখবেন। আজই লিখবেন। কী লিখলেন, সেটা আমাকে দেখিয়ে নেবেন। 

‘আচ্ছা, ঠিক আছে। 

‘ম্যানেজারকাকু, ঐ ছবিটার দিকে দেখুন। একটা ছােট্ট মেয়ে পানিতে ভাসছে। আচ্ছা, মেয়েটা কি সাঁতার কাটছে, না পানিতে ডুবে মারা গেছে? 

হবে একটা কিছু। ‘ছবিটার মধ্যে একটা গল্প আছে। ভালাে করে তাকিয়ে দেখুন, আপনার মধ্যে একটা কষ্টের ভাব হবে।’ 

নিশানাথবাবু অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে অবাক হয়ে বললেন, ‘কই, আমার তাে কিছু হচ্ছে না! 

অপালা আবার খিলখিল করে হেসে ফেলল। 

ফখরুদ্দিন সাহেবের মেজাজ অল্পতেই খারাপ হয়। দেশের মাটিতে সেই মেজাজ প্রকাশের যথেষ্ট পথ থাকলেও বিদেশে সম্ভব হয় না। আজ একের পর এক যে-সব কাণ্ড ঘটেছে, তাতে তাঁর মাথা খারাপ হয়ে গেলেও দোষের ছিল না। কিন্তু তিনি মাথা ঠাণ্ডা রেখেছেন। প্লেনে তাঁর পাশের সহযাত্রিণী অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণে হড়-হড় করে বমি করল, তার খানিকটা এসে পড়ল তাঁর গায়ে। তিনি মুখ বিকৃত করে বললেন, ‘ইটস অলরাইট।’ এয়ার হােস্টেস সাবান-পানি দিয়ে তাঁর কোট কয়েকবার মুছে দিল। তবু বমির উৎকট গন্ধ গেল না। টয়লেটে গিয়ে কাপড় বদলানাে যেত। কিন্তু তাঁর সঙ্গে একটিমাত্র ব্রিফকেস। বড় স্যুটকেস দু’টি লাগেজ-কেবিনে।। 

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ

প্লেন থেকে নামার সময়ও ছােট্ট দুর্ঘটনা ঘটল। সিঁড়িতে বেকায়দায় পা পড়ে পা মচকে গেল। 

ইমিগ্রেশন অফিসারের সঙ্গেও কিছু কথা-কাটাকাটি হল। অফিসারটি বলল, তুমি লণ্ডনে কী জন্যে যাচ্ছ।? 

তিনি বললেন, ‘তা দিয়ে তােমার কী দরকার? আমার পাসপাের্টে ভিসা দেয়া আছে। সেই ভিসায় আমি ঢুকব। 

‘তুমি আমার প্রশ্নের জবাব দাও। কেন যাচ্ছ, বিজনেস ট্রিপ, না প্লেজার ট্রিপ? 

ফখরুদ্দিন সাহেব বিরস গলায় বললেন, ‘সর্দি ঝাড়ার জন্যে যাচ্ছিতােমার এই দেশ নাকের সর্দি ফেলার জন্যে অতি উত্তম। 

‘তুমি কি আমার সঙ্গে রসিকতা করবার চেষ্টা করছ? ‘হা, করছি।’ 

তােমার ব্রিফকেস খােল, ত্যাণ্ডব্যাগ খােল। চেকিং হবে।’ এক বার হয়েছে। ‘আরাে দশ বার হবে। তােমার সঙ্গে টাকাপয়সা কী পরিমাণ আছে? 

যথেষ্টই আছে।’ ‘পরিমাণটা বল। 

‘পরিমাণ তােমাকে বলার প্রয়ােজন দেখছি না। লিখিতভাবে আগেই এক বার বলা হয়েছে। 

‘সুবােধ বালকের মতাে আরাে এক বার বল।’ ‘যদি বলতে না চাই? ‘তুমি এস আমার সঙ্গে। ‘কোথায়? ‘তােমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’ ‘অতি উত্তম প্রস্তাব। চল, যাওয়া যাক। 

ফখরুদ্দিন সাহেবকে তিন ঘন্টা বসিয়ে রাখা হল। যখন ছাড়া পেলেন, তখন তাঁর শরীর অবসন্ন। একটু পর পর বমি আসছে। বমির বেগ সামলাতে হচ্ছে। মাথায় তীব্র যন্ত্রণা। 

হােটেলে পৌছেই বাংলাদেশে কল বুক করতে চাইলেন। বলা হল—স্যাটেলাইটে ডিসটারবেন্স আছে, ওভারসিজ কল ছ’ ঘন্টার আগে করা যাবে না। 

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ

হেলেনার খোঁজে তাঁর নার্সিং হােমে টেলিফোন করলেন। এ্যাটেনডেন্ট নার্স বলল, ‘পেসেন্ট ঘুমুচ্ছে। 

ফখরুদ্দিন সাহেব বললেন, আমি ওর স্বামী। 

নার্স মধুর হেসে বলল, তুমি পেসেন্টের স্বামীই হও বা প্রেমিকই হও, হার্টের রুগীকে ঘুম থেকে ডেকে তােলা যাবে না। সকাল আটটায় টেলিফোন করাে, কেমন? এখন শান্ত হয়ে ঘুমাও। রাত কত হয়েছে সেটা বােধহয় তুমি জান না। গুড নাইট। 

রুম-সার্ভিসকে কফি দিতে বলেছিলেন। সেই কফি এল এক ঘন্টা পর। চুমুক দিয়ে তাঁর মনে হল, তিনি কুইনাইন-গােলা গরম পানি খাচ্ছেন। | সারা রাত তাঁর ঘুম হল না। ছটফট করতে লাগলেন। শেষরাতের দিকে প্রবল জ্বরে সমস্ত চেতনা আচ্ছন্ন হয়ে এল। তাঁর মনে হল এই হােটেলে তাঁকে মরতে হবে। আত্মীয়-পরিজনহীন নির্জন একটি ঘরে। শেষ মুহুর্তে পানি-পানি করে চেচাবেন কেউ শুনবে না। কোনাে প্রিয় মানুষের মুখ দেখতে চাইবেন, দেখতে পারবেন না। 

 

Read more

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১৪)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *