আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১৪)

প্রিয় মুখ এই সংসারে তাঁর নেই। বাবার মুখ আবছাভাবে মনে পড়লেও মা’র মুখ। 

মনে পড়ে না। বাবার মুখও অস্পষ্ট, তাঁর মুখে বসন্তের দাগ ছিল। মাথায় চুলগুলি ছিল লালচে ধরনের কোঁকড়ানাে। স্মৃতি বলতে এই। অবশ্যি এ নিয়ে তাঁর মাথাব্যথা কোনােকালেই ছিল না। যা চলে গিয়েছে, তা নিয়ে বুক চাপড়ানাে এক ধরনের বিলাসিতা। এই বিলাসিতা কবি এবং শিল্পীর জন্যে ঠিক আছে। তার জন্যে ঠিক নয়। 

আকাশ জোড়া মেঘতাঁর চোখ পিছনের দিকে নয়, সামনের দিকে। তিনি রুম-সার্ভিসের বােম টিপলেন। লাল বাতি জ্বলে জ্বলে উঠছে। কেউ আসছে অসম্ভব ক্ষমতাবান লােকেরা প্রায় সময়ই নিঃসঙ্গ অবস্থায় মারা যায়। 

দরজায় নক হচ্ছে। কেউ বােধহয় এসেছে। ফখরুদ্দিন সাহেব বহু কষ্ট্রে বললেন, ‘কাম ইন। | লালচুলের বেঁটেখাটো এক জন মহিলা উকি দিল। ভয়-পাওয়া গলায় বলল, তােমার কী হয়েছে? 

ফখরুদ্দিন সাহেব জবাব দিতে পারলেন না। শূন্যদৃষ্টিতে তাকালেন। 

মনে হচ্ছে ফিরােজের বৃহস্পতি এখন তুঙ্গে। | বি. করিম সহেবের বন্ধু তাঁকে সহকারী ডিজাইনার হিসেবে নিয়েছেন। ভদ্রলােক ছােটখাটো। মাগুর মাছের মতাে কালােরও। ফিটফাট বা ধূ সেজে থাকেন। প্রীর কাছে গেলেই আফটার শেভ লােশনের কড়া গন্ধে মাথা ধরে যায়। তাঁর নাম মন্তাজ মিয়া। ছবির লাইনে পনের বছর ধরে আছেন। এখন পর্যন্ত কোনাে ছবি হিট করে নি। তার ধারণা, এবারের ছবিটি করবে। ছবির নাম ‘নয়া জিন্দেগি’—ইংরেজিতে ফ্রেশ লাইফ, নিউ লাইফ নয়। 

এই ছবি হিট করবে, এ-রকম আশা করার সঙ্গত কারণ আছে। ছবিতে তিন জন হিরােইন। দু’ জন মারা যায়। শেষ পর্যন্ত এক জন টিকে থাকে। হিরাে এবং হিরােইন নয়া জিন্দেগি শুরু করে। ছটা গান আছে। প্রতিটি গানই কোলকাতার আর্টিস্টদের দিয়ে গাওয়ানাে। ব্যালে ড্যান্স আছে, যা রেকর্ড করা হয়েছে কোলকাতার এক ক্যাবারেতে। প্রিন্সেস সুরাইয়া এমন এক ড্যান্স দিয়েছে, যা দেখে এই বুড়াে বয়সেও মন্তাজ মিয়ার বুক ধরফড় করে।

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ 

সেন্সর এই জিনিস কেটে দিলে সর্বনাশ হবে। ছবির অর্ধেক কাজ বিদেশে হয়েছে, বাকি অর্ধেক দেশে হবে। বেশির ভাগই আউটডােরে। ইনডােরে হিরাের বসার ঘর এবং বারান্দা। এমন সেট করতে হবে, যাতে রিকশাওয়ালা শ্রেণীর দর্শকদের চোখ কোটর থেকে ঠেলে বের হয়ে আসে। ক্রমাগত সিটি বাজাতে থাকে। 

মন্তাজ মিয়ার সঙ্গে ফিরােজের নিম্নলিখিত কথাবার্তা হল ; “তুমি করে বললে আপত্তি আছে?” ‘জ্বি-না। 

‘গুড। সবাইকে আমি তুমি করে বলি। এ-দেশের যে টপ নায়িকা, যার সাইনিং মানি পচিশ হাজার টাকা, তাকেও তুমি করে বলি। 

ফিরােজ তাকিয়ে রইল, কিছু বলল না। 

‘তুমি কাজে লেগে পড়। কীভাবে কী করতে হয়, আগে শেখ। আমি যা চাই সেটা হচ্ছে গ্ল্যামার। জি এল এ এম ও ইউ আর। বুঝলে? 

‘জি, বুঝলাম। ‘বােম্বের ছবিগুলি দেখ। দেখে কাজ শেখ। ‘হ্যা, তাই করব।’ ‘বি করিম সাহেব বলেছেন, তুমি প্রতিভাবান লােক। সত্যি নাকি? ‘জি-না, সত্যি না। 

‘গুড। ভেরি গুড। জি ও ও ডি। প্রতিভাবান লােকদের দিয়ে কিছু হয় না। আমি চাই কাজ। ওয়ার্ক। ডাবলিউ ও আর কে। বুঝলে? 

‘জ্বি, বুঝলাম। ‘মদ্যপানের অভ্যাস আছে?

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ 

‘অল্পসল্প খেতে পার। এতে দোষ নেই। অল্প খেলে মেডিসিনের মতাে কাজ করে। ব্রেইন শার্প হয়। ওয়েস্টার্ন কান্ট্রিগুলি যে এতদুর এগিয়ে গেছে জ্ঞানে, বিজ্ঞানে, শিল্পে, সংস্কৃতিতে—এর পিছনে অ্যালকোহলের একটা ভূমিকা আছে বলে আমার ধারণা। 

‘আপনার ধারণা সত্যি হবারই সম্ভাবনা। ‘নায়িকাদের সঙ্গে খাতির জমাবার চেষ্ট করবে না। দূর থেকে ম্যাডাম বলে স্নামালিকুম দেবে। তারপর ভ্যানিশ হয়ে যাবে। ফিল্ম লাইনে তােমার হবে বলে আমার ধারণা।’ 

‘তাই নাকি? 

‘হা। আমার ই এম পি ক্ষমতা আছে। আগেভাগে বলে ফেলতে পারি। মন্দিরা যখন প্রথম ফিল্ম লাইনে আসে, তাকে দেখেই আমি বললাম, তােমার হবে‘ 

হয়েছে? 

হয়েছে মানে! দু’ লক্ষ টাকার আর্টিস্ট এখন। শিডিউল নিতে হয় এক বছর আগে। আমাকে এখনাে খুব মানে। সেদিন এক পত্রিকার ইন্টারভুতে আমার নাম বলেছে। 

‘মন্দিরা কাজ করছে নাকি আপনার ছবিতে ? 

 

Read more

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১৫)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *