‘তুমি এখন ফিল্ম লাইনের লােক। নায়িকাদের নাম ধরে কথা বলবে না। এখন থেকে প্রাকটিস কর। বল—মন্দিরা ম্যাডাম।’
ফিরােজ হেসে বলল, মন্দিরা ম্যাডাম।’
‘হাসবে না। ফিল্ম লাইনে দাঁত বের করতে নেই। আচ্ছা, এখন যাও। কাল দু’ নম্বর স্টুডিওতে চলে আসবে।
ফিরােজ সেট তৈরি করে দিল। মন্তাজ মিয়া চোখ-মুখ কুঁচকে দীর্ঘ সময় সেই সেটের সামনে দাঁড়িয়ে রইলেন।
ফিরােজ বলল, মনে হচ্ছে আপনার মনমতাে হয় নি? মন্তাজ মিয়া তারও জবাব দিলেন না। ‘পছন্দ না হলে অদলবদল করে দেব। হাতে তাে সময় আছে। ‘পছন্দ হয়েছে। ছােকরা, তােমার হবে।
সেই সপ্তাহেই মধুমিতা মুভিজ-এর ব্যানারে নতুন যে-ছবিটি হবে, তার চীফ ডিজাইনার পদের অফার ফিরােজের কাছে চলে এল। ফিরােজ বলল, ‘ভেবে দেখি।”
মধুমিতা মুভিজ-এর মালিক বললেন, ‘ক’দিন লাগবে ভাবতে? ‘সপ্তাহখানেক লাগবে।’
‘বেশ, ভাবুন। সপ্তাহখানেক পর আবার যােগাযােগ করব। আপনার টেলিফোন আছে?
একটা টেলিফোন নিয়ে নিন। ছবির লাইনে টেলিফোনটা খুবই দরকারি। | ‘নিয়ে নেব। শিগগিরই নিয়ে নেব। তারপর একটা গাড়ি কিনব। লাল রঙের। টু ডাের। গাড়ি সম্পর্কে আপনার কোনাে ধারণা আছে? মানে কোনটা ভালাে, কোনটা মন্দ?
আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ
পর-পর দু’ দিন ফিরােজ ঘুমিয়ে কাটাল।
এ-রকম সে করে। তার ভাষায়, দুঃসময়ের জন্যে ঘুম স্টক করে রাখা। সেই স্টক-করা ঘুমের কারণে ভবিষ্যতে কোনাে রকম আলস্য ছাড়াই নাঘুমিয়ে থাকতে পারে। উট যেমন দুঃসময়ের জন্যে পানি জমা করে রাখে, অনেকটা সে-রকম। শুধু দুপুরে খাবার সময় পাশের ‘ইরাবতী’ হােটেলে খেতে গেছে। বাংলাদেশ হওয়ায় এই একটি লাভ ; সুন্দর-সুন্দর নামের ছড়াছড়ি। পানের দোকানের নাম ‘ময়ূরাক্ষী; জুতাের দোকানের নাম সােহাগ পাদুকা’।।
ইরাবতী রেস্টুরেন্টের নাম হওয়া উচিত ছিল- ‘নালাবতী’। পাশ দিয়ে কর্পোরেশনের নর্দমা গিয়েছে। নর্দমাগুলি বানানাের কায়দা এমন যে, পানি চলে যায়, কিন্তু ময়লা জমা হয়ে থাকে। সেই পূতিগন্ধময় নরকের পাশে খাবার ব্যবস্থা। তবে রান্না ভালাে। পচা মাছও এমন করে বেঁধে দেয় যে দ্বিতীয় বার যেতে ইচ্ছে করে। ইরাবতী রেস্টুরেন্টে ফিরােজের তিন শ’ টাকার মতাে বাকি ছিল। সে বাকি মিটিয়ে আরাে দু’ শ’ টাকা অ্যাডভান্স ধরে দিল। দিনকাল পাল্টে গেছে। অ্যাডভান্স পেয়েও লােকজন খুশি হয় না। ম্যানেজার এমনভাবে তাকাচ্ছে যেন কিছুক্ষণ আগে একটি জ্যান্ত ইদুর গিলে ফেলেছে। সেই ইদুর হজম হয় নি, পেটে নড়াচড়া করছে।
ফিরােজ বলল, ‘আছেন কেমন ভাইসাব ? ‘ভালােই। আপনারে তাে দেখি না। ‘সিনেমা নিয়ে ব্যস্ত। সিনেমায় নেমে পড়েছি, বুঝলেন? ম্যানেজার ফুস করে বলল, “ভালােই।
‘আপাতত হিরােইনের বড় ভাইয়ের রােল করছি। মােটামুটি একটা সেন্ট্রাল ক্যারেক্টার। বই রিলিজ হলে দেখবেন। পাস দিয়ে দেব।’
‘নাম কী বইয়ের?
আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ
নয়া জিন্দেগি। হিট বই হবে।’ ফিরােজ রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে মিষ্টি পান কিনল। রাতে আর খেতে আসবে । ঘরেই যা হােক কিছু খেয়ে নেবে, কাজেই পাউরুটি, কলা এবং এক কৌটা মাখন কিনল। বাজারে নতুন বরই উঠেছে, খেতে ইচ্ছা করছে। ভাংতি টাকা সব শেষ। একটা
পাঁচ শ টাকার নোেট আছে, সেটা ভাঙাতে ইচ্ছা করছে না। বরই না-কিনেই সে ফিরে এল। ছেলেমানুষি একটা আফসােস মনে জেগে রইল।
হাজি সাহেব বারান্দার ইজি চেয়ারে বসে আছেন। ফিরােজ হাসিমুখে এগিয়ে গেল।
‘স্লমালিকুম। ‘ওয়ালাইকুম সালাম। কেমন আছেন ফিরােজ সাহেব? ‘জ্বি, ভালাে। ‘ক’দিন ধরে দেখি না আপনাকে?
‘দারুণ ব্যস্ত। আজ একটু ফাকা পেয়েছি, ভাবলাম আপনাকে জরুরি কথাটা বলে যাই।’
কী জরুরি কথা? ‘ঐ যে আপনার মেয়ের ছবি নিয়ে গেলাম যে ‘ও, আচ্ছা। বসেন, চা খাবেন? ‘তা খাওয়া যায়।
হাজি সাহেব ভেতরে গিয়ে চায়ের কথা বলে এলেন। ফিরে এসে আগ্রহী চোখে তাকিয়ে রইলেন।
‘ঐ যে আপনার কাছ থেকে ছবি নিয়ে গিয়েছিলাম, ছবি দেখে সবার এক কথা—মেয়ে কি ছবির মত সুন্দর? ফটোজেনিক ফেস ভালাে থাকলে অনেক সময় এলেবেলে মেয়েকেও রাজকন্যার মতাে লাগে।
হাজি সাহেব ছােট্ট একটি নিঃশ্বাস ফেললেন।
‘মেয়ে যদি ছবির কাছাকাছিও হয়, তাহলেও ওদের কোনাে আপত্তি নেই। যেদিন বলবেন, সেদিনই বিয়ে।
আপনি কি মেয়ের অসুবিধার কথাটা বলেছেন?
‘পাগল হয়েছেন। এখন আমি এইসব বলব? কথাবার্তা মােটামুটি পাকা হয়ে যাবার পর খুব কায়দা করে…….
‘না, যা বলবার এখনই বলবেন। মেয়েকে আমি একটা বাড়ি লিখে দেব, এটাও বলবেন। ৪৩ কাঁঠাল বাগান। একতলা বাড়ি। ইচ্ছা করলে বাড়ি দেখে আসতে পারেন
মেয়েই দেখলাম না, আর বাড়ি। ‘বাড়িটাই লােকে আগে দেখে, মেয়ে দেখে পরে। তবে মেয়েকে আপনি দেখবেন। আসতে বলেছি। আসুন, ভেতরে গিয়ে বসি।
আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ
তারা বসার ঘরে পা দেয়ামাত্র হাজি সাহেবের ছােট মেয়েটি ঘরে ঢুকল। কী শান্ত, স্নিগ্ধ মুখ। গভীর কালাে চোখে ডুবে আছে চাপা কষ্ট। সেই কষ্টের জন্যেই বুঝি এমন টলটলে চোখ।
ফিরােজ বলল, ‘দাঁড়িয়ে আছ কেন, বস।”
মেয়েটি সঙ্গে-সঙ্গে বসল। তার আচার-আচরণে কিছুমাত্র জড়তা লক্ষ করা গেল । সে সরাসরি তাকিয়ে আছে, চোখ নামিয়ে নিচ্ছে না।
‘কি নাম তােমার?
লতিফা।
‘প্রায় চার বছর তােমাদের এদিকে আছি। নামটা পর্যন্ত জানি না। খুবই অন্যায়। তুমি কি আমার নাম জান?
‘জানি। হাজি সাহেব বললেন, লতিফা, তুই এখন ভেতরে যা। চা দিতে বল।”
Read more