আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-২)

অপালার টেলিফোন পেয়েই বললেন, এক্ষুণি চলে আসছি মা। এই ধর পাঁচ 

মিনিট। এর সঙ্গে আরাে দু’মিনিট যােগ করে নাও, রাস্তাঘাটের অবস্থা তাে বলা যায় 

না! ঠিক না মা? 

‘তা তাে ঠিকই।’ 

আকাশ জোড়া মেঘ‘এক মাইল চওড়া রাস্তা; এর মধ্যেও ট্রাফিক জ্যাম। দেশটার কী হচ্ছে, তুমি বল? একটা অনেস্ট অপিনিয়ন তুমি দাও …  নিশানাথবাবু বকবক করতে লাগলেন। তিনি দশ মিনিটের আগে টেলিফোন ছাড়বেন না। কথার বিষয় একটিই-দেশ রসাতলে যাচ্ছে। মুক্তির কোনাে পথ নেই। দেশের সব কটা মানুষকে বঙ্গোপসাগরে চুবিয়ে আনতে পারলে একটা কাজের কাজ হত ইত্যাদি। 

অপালা রিসিভার কানে নিয়ে সুযােগের অপেক্ষা করতে লাগল কখন বলা যাবে, কাকা, টেলিফোন রাখলাম। 

ফিরােজ ভেবেছিল একটি খুব সুদৃশ্য কাপে এক কাপ চা-ই শুধু আসবে। অন্য কিছুই থাকবে না। অসম্ভব বড়লােকরা এককথার মানুষ—যখন চায়ের কথা বলেন তখন শুধু চা-ই আসে, অন্য কিছু আসে না। অথচ প্রচণ্ড খিদে লেগেছে। ভাের সাতটায় পরােটা-ভাজি খাওয়া হয়েছিল, এখন বারটা দশ। খিদেয় নাড়ি পাক দিয়ে উঠছে। মেয়েটিকে দেখে মনে হচ্ছে সে এতটা হৃদয়হীন হবে না। সঙ্গে কিছু-না-কিছু থাকবে। এদের ফ্রীজ খাবারদাবারে সবসময় ভর্তি থাকে। চট করে মৎকার একটা স্যাণ্ডউইচ বানিয়ে দেয়া এদের কাছে ছেলেখেলা। দু’টি রুটির মাঝখানে কয়েক টুকরাে পনির, শসার কুচি, এক চাকা টমেটো। ফ্রেঞ্চ ড্রেসিং-এর আধচামচ। গােলমরিচের গুড়। চমৎকার! 

কাজের মেয়েটি ট্রে নিয়ে ঢুকল। যা ভাবা গিয়েছে তাই। সুদৃশ্য কাপে চা এবং রুপপার একটা গ্লাসে এক গ্লাস হিমশীতল পানি। খিদে নষ্ট করার জন্যে ফিরােজ সিগারেট ধরাল। সেন্ট্রাল টেবিলে চমৎকার একটি অ্যাশটে। নিশ্চয়ই অনেক টাকা খরচ করে কেনা। একটি পরী নিচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পরীটির গা থেকে কাপড় খুলে যাচ্ছে। সে কাপড় সামলাতে ব্যস্ত। অগােছালাে কাপড়ের কারণে লজ্জায় তার গাল রক্তিম। এ জাতীয় অ্যাশট্রেগুলিতে কেউ ছাই ফেলে না। এতটা দুঃসাহস কারাে নেই। ফিরােজ ছাই দিয়ে সেটা মাখামাখি করে ফেলল। তার খুব ইচ্ছা করছে উঠে যাবার সময় এদের কোনাে একটা ক্ষতি করতে। কার্পেটের খানিকটা সিগারেটের আগুনে পুড়িয়ে দেয়া, কাপটা ভেঙে ফেলা। এ-রকম ইচ্ছা তার প্রায়ই হয়। 

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ 

ম্যানেজার নামক জীবটির এখনাে কোনাে দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। মেয়েটি খবর দিয়েছে কি না কে জানে। নিজের ঘরে গিয়ে হয়তাে গান শুনছে কিংবা ভিসিআর-এ ‘আকালের সন্ধানে’ চালু করে সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্টের চিন্তায় মগ্ন। 

ফিরােজ কাপ হাতে নিয়ে জানালার পাশে এসে দাঁড়াল। ছাগল-দাড়ির এক লােক দু’টি অ্যালসেশিয়ানকে গােসল দিচ্ছে। সাবান দিয়ে হেভি ডলাডলি। কুকুর দু’টি বেশ আরাম পাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। নড়াচড়া করছে না। লােকটি কুকুর দু’টির সঙ্গে ইংরেজি ভাষায় কথা বলছে। কাম কাম, সিট ডাউন, নটি বয়, বি কোয়ায়েট জাতীয় শব্দ শােনা যাচ্ছে। কুকুররা বিদেশি ভাষা এত ভালাে বােঝে কেন কে জানে। দেশি ঘিয়ে ভাজা কুত্তাকেও ‘কাম হিয়ার’ বললে কুঁই-কুঁই করে এগিয়ে আসে। ফিরােজের বাথরুম 

পেয়ে গেল। কোনাে বাড়িতে গিয়ে ফট করে বলা যায় না—ভাই, আপনাদের বাথরুম কোথায় ? মালদার পার্টিদের ড্রইং রুমের পাশেই ব্যবস্থা থাকে। এখানে নেই। ড্রইং রুম নাম দিয়ে কুৎসিত একটা জিনিস বানিয়ে রেখেছে। ছাদ পর্যন্ত উচু শাে-কেসে রাজ্যের জিনিস। যেন একটা মিউজিয়াম। পয়সার সঙ্গে-সঙ্গে রুচি বলে একটা বস্তু নাকি চলে আসে। ডাহা মিথ্যে কথা। এই জিনিসটি সঙ্গে নিয়ে জন্মাতে হয়। | একটা পাঁচ বাজে। ম্যানেজারবাবুর দেখা নেই। ফিরােজের উচিত স্নামালিকম বলে উঠে যাওয়া। স্নামালিকুম বলারও কেউ নেই। অহঙ্কারী মেয়েটি এ-ঘরে আর ঢােকে নি। হয়তাে ভেবেছে এ-ঘরে ঢুকলেই থার্ড রেট একটি ছেলের সঙ্গে প্রেম হয়ে যাবে। আরে বাবা, প্রেম এত সস্তা নয়।

 

Read more

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৩)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *