আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-২০)

‘অপা, এই অপা। 

অপালা বিরক্ত মুখে তাকাল। দোতলার গেট থেকে নিশানাথকাকুর স্ত্রী তাকে ডাকছেন। অপালা জবাব দিল না। এই মহিলা গত তিন দিন ধরে এ-বাড়িতে আছেন। প্রথম দিন থেকেই অপালাকে আদর করে অপা ডাকছেন। এই আদর তার সহ্য হচ্ছে 

আকাশ জোড়া মেঘএক বার ভেবেছির বলবে—আপনি আমাকে অপা ডাকবেন না। বলতে পারে নি। বয়স্ক এক জন মহিলাকে মুখের ওপর এমন কঠিন কথা বলা যায় না। তা ছাড়া ভদ্রমহিলা প্রাণপণ চেষ্টা করছেন অপালাকে খুশি রাখতে। প্রথম রাতে অপালার ঘরে ঘুমুতে এলেন। অপালা বলল, ‘এই ঘরে আপনার ঘুমানাের দরকার নেই। 

কেন, দু’টা খাট তাে আছে।’ থাকুক। আমার একা-একা থাকতে ভালাে লাগে।’ 

‘ও-মা, কেমন কথা! ঘুমুবার আগে খানিকক্ষণ গল্পগুজব করলে তােমার ভালােই লাগবে মা। আমি খুব মজার-মজার গল্প জানি মা।’ 

মজার মজার গল্প আমার শুনতে ভালাে লাগে না। না-শুনেই কী করে বলছ, শুনতে ভালাে লাগে না। আচ্ছা, এইটা শােন, তারপর 

দেখি না-হেসে থাকতে পার কি না। একটা মেয়েকে জিজ্ঞেস করা হল কোনটা বেশি দরকারি–চেহারা না ব্রেইন। মেয়েটি বলল, চেহারা। কারণ চেহারা দেখা যায়, ব্রেইন দেখা যায় না। কী, গল্পটা মজার না? 

‘হ্যা, মজার। 

এ-রকম গল্প আমি লক্ষ-লক্ষ জানি। 

অপালা অস্থির হয়ে পড়ল। উঠতে-বসতে একটা হাসির গল্প। কখনাে বীরবলের, কখনাে গােপাল ভাঁড়ের, কখনাে-বা নাসিরুদ্দিন হােজ্জার। 

এই যে ভদ্রমহিলা দোতলার বারান্দা থেকে অপালা-অপালা ডাকছেন, এক্ষুণি তিনি নেমে এসে একটা হাসির গল্প বলবেন, যা শুনে মােটেও হাসি আসবে না। 

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ

ভদ্রমহিলা নিশ্চয়ই ম্যানেজারকাকুর মাথা খারাপ করে দিয়েছেন। 

‘এই যে অপা। ‘বলুন। ‘কখন থেকে ডাকছি, কথা বলছ না কেন? ‘আমি কথা কম বলি, কাকিমা। 

এটা ভালাে কথা না, মা। কথা বেশি বলবে। হাসবে, খেলবে, গান গাইবে। তুমি দিনরাত এমন গম্ভীর থাক, আমারই ভয় লাগে। ঐ লােকটা কে?’ 

কোন লােকটা? ‘ঐ যে, তুমি এগিয়ে দিলে? ‘আমি চিনি না। অচেনা একজন মানুষ। 

কী সর্বনাশ। তুমি অচেনা মানুষের সঙ্গে কথা বলছ কেন?” ‘কথা বলা কি নিষেধ? এইসব আপনি কী বলছেন! হাসির গল্প বলতে চান বলুন, এ-রকম অদ্ভুত কথা বলবেন না। আপনিও তাে এক জন অচেনা মানুষ। আমি কি আপনার সঙ্গে কথা বলছি না? 

‘তুমি শুধু-শুধু আমার উপর রাগ কছ মা। সব জান না, তাই রাগ করছ। কারখানায় বিরাট গণ্ডগােল। দু জন শ্রমিক মারা গেছে। সবার ধারণা, মালিকপক্ষ মারিয়েছে। এখন প্রতিশােধ নেয়ার জন্যে ওরা কিছু করেও বসতে পারে। পারে না? 

অপালা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। সে এসবের কিছুই জানে না। ‘আমি যে মা এখানে আছি, এজন্যেই তাে আছি। ‘আমাকে তাে কেউ কিছু বলে নি। 

‘তােমাকে শুধু-শুধু বলবে কেন? আমিও বলতাম না। তুমি রাগ করছ দেখে বললাম। 

‘বাবা এ-সব জানেন। 

‘জানেন। বড়সাহেবের সঙ্গে গতকাল কথা হয়েছে। বড়সাহেবের শরীর খারাপ, তাই আসতে পারছেন না। শরীর ভালাে থাকলে এসে পড়তেন। 

‘শরীর খারাপ? কই, আমি তো এই খবরও জানি না। 

‘তুমি তাে মা কোনাে খবরই জান না। কোন দুনিয়ায় তুমি বাস কর বল তাে? উদাসীর মতাে শুধু ঘুরে বেড়ালে তাে হয় না, পৃথিবীর খোঁজখবর রাখতে হয়। 

অপালা একটি কথাও বলল না—তাকিয়ে রইল। ভদ্রমহিলা ঠাণ্ডা গলায় বললেন, 

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ

‘তােমাকে আরেকটা কথা বলি মা, মন দিয়ে শােন—আমি তােমার মায়ের বয়সী, তােমার মতাে মেয়ে আমার ঘরে আছেআর তুমি এ-রকম কর, যেন আমি রাস্তার একটা মেয়ে। – ভদ্রমহিলার চেচামেচিতে বাসার অন্য সবাই বের হয়ে এল। কী লজ্জার কথা। অপালার কান ঝাঁঝাঁ করতে লাগল। ইচ্ছে করছে ছুটে বেরিয়ে যেতে। পৃথিবীতে বাস করার এত যন্ত্রণা! আজ সারা দিনে এক পাতাও পড়া হবে না। কী যে হবে পরীক্ষায়, 

কে জানে! অপালা তার নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। দুপুরে ভাত খাবার সময় কাজের মেয়েটি ডাকতে এল। অপালা বলল, ‘বিরক্ত করবে না। আমি কিছু খাব না।’ বিকেলে চা খাওয়ার জন্যেও নামল না। সন্ধ্যাবেলা নিশানাথবাবু এসে দরজায় টোকা দিলেন। সে খুব স্বাভাবিকভাবে দরজা খুলল। সহজ স্বরে বলল, কেমন আছেন ম্যানেজারকাকু। 

‘ভালাে আছি মা। 

কারখানায় কী—সব নাকি ঝামেলা? ‘ঝামেলা ভাে আছেই মা। বিষয়-সম্পত্তি মানেই হচ্ছে ঝামেলা। একমাত্র সাধু সন্ন্যাসীরাই ঝামেলামুক্ত। 

‘দু’ জন নাকি মারা গেছে? 

‘ই। নিজেদের মধ্যে কামড়াকামড়ি করে মরেছে, দোষ পড়েছে মালিকপক্ষের। তুমি এই নিয়ে কোনাে চিন্তা করবে না। আসগর সাহেব চলে এসেছেন, উনি দেখছেন। খুবই কাজের লােক। 

আসগর সাহেব কে? 

‘আমাদের চিটাগাং ব্রাঞ্চের জি, এম.,উনি একতলায় বসে আছেন। তােমার সঙ্গে কথা বলতে চান। 

‘আমার সঙ্গে কিসের কথা? 

‘স্যারের সঙ্গে যােগাযােগ করা যাচ্ছে না। বড় রকমের ডিসিশনের ব্যাপার। তুমি একটু নিচে এস মা। 

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ

আসগর সাহেব মানুষটি সুপুরুষ। বয়স প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি। গােলগাল ভালমানুষের মতাে মুখ। কথা থেমে-থেমে বলেন। মনে হয় প্রতিটি শব্দ বলার আগে খানিকক্ষণ ভাবেন। অপালা ঘরে ঢুকতেই উঠে দাঁড়ালেন, এবং অপালা না-বসা পর্যন্ত নিজে বসলেন না। 

‘খুবই দুঃখিত যে আপনাকে ডিসটার্ব করতে হচ্ছে। মাই অ্যাপােলজি। এদিকে স্যার অসুস্থ, স্যারের সঙ্গে যােগাযোগ করা যাচ্ছে না। 

কী বলবেন, বলুন।  ‘দু’ লাখ টাকার মতাে খরচ করলে ঝামেলা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এক লাখ দিতে হবে ইউনিয়নকে। ওদের ঠাণ্ডা করতে হবে। পুলিশকে দিতে হবে বড় এ্যামাউন্ট। তা ছাড়া……।

 

Read more

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-২১)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *