‘তােমাদের আপার কাছে। উনিই আসতে বলেছেন। ‘দাঁড়ান, খবর দেই।
দারােয়ান গেট খুলল না। খবর দেবার জন্যে রওনা হল। গদাইলস্করি চাল বােধহয় একেই বলে। দশ মিনিট পর-পর একেকটা পা ফেলছে। এভাবে হাঁটলে বারান্দা পর্যন্ত পৌছতে-পৌছতে রাত এগারটা বাজবে।

ফিরােজ অতি দ্রুত এ-বাড়িতে উপস্থিত হবার অজুহাত মনে-মনে সাজিয়ে ফেলতে চেষ্টা করল। সেই সঙ্গে কী কথাবার্তা হবে, তা নিয়ে একটা স্টেজ রিহার্সল। “মেয়েটি এসেছে। মুখ হাসি-হাসি। ফিরােজ বলছেহঠাৎ এসে বিরক্ত করলাম। মেয়েটি বললনা না, বিরক্ত কিসের, এসেছেন খুশিই হয়েছি। আসুন, একসঙ্গে চা খাওয়া যাবে। খুব লােনলি ফিল করছিলাম। আজ এ ম্যাটার অব ফ্যাক্ট, মনে হচ্ছিল আপনি আসবেন।।
আমার বিয়েটা ভেঙে গেল, ঐ খবরটা দিতে এসেছিলাম’ ‘বিয়ে ভেঙে গেল নাকি? ‘হ্যা। মেয়ের আমেরিকা প্রবাসী চাচা আমাকে পছন্দ করলেন না। ‘মেয়ের চাচার পছন্দে কী যায়-আসে? মেয়ে তাে আপনাকে পছন্দ করেছে।’
‘আমিও তাই ভেবেছিলাম। এখন দেখছি সেটা ঠিক না। ভীষণ মন-খারাপ হয়ে গেছে। সারা দুপুর শুয়ে-শুয়ে সুইসাইড করার কথা ভাবলাম। এখন যে ভাবছি না, তা নয়। এখনাে ভাবছি।
‘ছিঃ, এ-সব ভাবনা মনেও আনবেন না। আমার এখানে এসেছেন ভালাে করেছেন, গল্প করে মন হালকা করুন।……”
চিন্তা এই পর্যন্ত এসে কেটে গেল। দারােয়ান গদাইলস্করি চালে ফেরত আসছে। ব্যাটার মুখ অন্ধকার। নিশ্চয়ই এতক্ষণ বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখার জন্যে দাবড়ানি খেয়েছে।
‘আপা কী বলল? ‘আফনেরে চইল্যা যাইতে কইছে।
চলে যেতে বলেছে?
আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ
‘আমার কথা বলেছিলে ঠিকমতাে? ‘জি, বলছি। ‘কী বলেছ?” ‘বলছি, ঐ যে ভদ্রলােক ঘর সাজাইয়া দিছে হে আসছে ……’
আর তােমার আপা কী বলল?’ এক কথা কয়বার কমু, কন। চইল্যা যাইতে কইছে। ফিরােজ খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সিগারেট ধরাবার চেষ্টা করছে। পারছে না। হাত কেঁপে যাচ্ছে। পাশে দাঁড়ানাে পুলিশটি সহানুভূতির চোখে তাকাচ্ছে। খাকি পােশাক পরা কেউ সহানুভূতি দেখাতে পারে, এটা ফিরােজের কল্পনায় ছিল না। সে কেমন যেন অপ্রস্তুত বােধ করতে লাগল। ছুটে পালিয়ে যেতে পারলে সবচেয়ে ভালাে হত। তা করা যাচ্ছে না। তাকে হেঁটে-হেঁটে সদর রাস্তা পর্যন্ত যেতে হবে, এবং যতক্ষণ তাকে
দেখা যাবে ততক্ষণ পুলিশ এবং দারােয়ান তার দিকে তাকিয়ে থাকবে। তাদের চোখে থাকবে সহানুভূতি ও করুণা।
ফিরােজ মাথা নিচু করে পা বাড়াল। হাতের সিগারেটটি নিভে গেছে। আবার ধরাতে ইচ্ছে করছে না। কোথায় এখন যাওয়া যায়? যাবার তেমন কোনাে জায়গা নেই। তাজিন আপার কাছে যাওয়া যেতে পারে। অনেক দিন যাওয়া হয় না। মনসুরের বাসায় গিয়ে কিছুক্ষণ ওকে বিরক্ত করা যেতে পারে। নতুন বিয়ে করেছে। সন্ধ্যার পর কেউ বেড়াতে গেলে অসম্ভব বিরক্ত হয়। মুখ হাঁড়ির মতাে করে রাখে, একটু পরপর ঘড়ির দিকে তাকায়, রাত আটটা বাজতেই লােক-দেখানাে হাই তুলতে শুরু করে।
মনসুরের ওখানেও যেতে ইচ্ছে করছে না। আজ সারারাত পথে-পথে হাঁটলে কেমন হয়? এই পাগলামির বয়স কি তার আছে?
ফিরােজের ঠাণ্ডা লাগছে। ইচ্ছে করেই আজও পাতলা একটা শার্ট গায়ে দিয়ে এসেছিল। যদি অপালা পাতলা শার্ট নিয়ে ঐ দিনের মতাে কিছু বলে।
ফিরােজ অনেক রাত পর্যন্ত পাতলা জামা গায়ে দিয়ে শহরে ঘুরে বেড়াল। এক সময় তার মাথা ভারি হয়ে এল। বােঝাই যাচ্ছে, প্রচণ্ড ঠাণ্ডা লেগে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আকাশপাতাল জ্বর আসবে। আসুক। পেতেছি সমুদ্রে শয্যা শিশিরে কি ভয়?
আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ
রান্নাঘরে নিশানাথবাবুর স্ত্রী। চারদিকে বাসনপত্র ছড়িয়ে কী-সব যেন করছেন। বাবুর্চি গােমেজ, চোখমুখ কুঁচকে তার পাশে দাঁড়িয়ে। গােমেজ এই মহিলাটিকে পছন্দ করছে
এই মহিলা সরাসরি তার সাম্রাজ্যে হস্তক্ষেপ করছে। যখন-তখন রান্নাঘরে ঢুকে জিনিসপত্র এলােমেলাে করে দিচ্ছে। এখন আর কোনাে কিছুই হাতের কাছে পাওয়া যায় না। গতকাল লবণের কৌটা খুঁজতে তার দশ মিনিট লেগেছে। অথচ লবণের কৌটা থাকে দ্বিতীয় তাকের সবচেয়ে প্রথমে। আগে চোখ বন্ধ করে বের করতে পারত।
‘গােমেজ।
দেখছ কী তুমি? ব্যাটাছেলের রান্নাঘরে হাঁ করে দাঁড়িয়ে থাকা বড় খারাপ লাগে।
‘আমার কাজই তাে রান্নাঘরে! ‘ও, আচ্ছা। তাই তাে, মনে থাকে না। তুমি রান্না শিখেছ কার কাছে?
গােমেজ জবাব দিল না। ভদ্রমহিলা চালের গুড়ােয় পানি ছিটাতে-ছিটাতে বললেন, ‘বাঙালি রান্না কিছু জান, না শুধু সাহেবি রান্না?’
এই প্রশ্নেরও সে জবাব দিল না। কঠিন মুখ করে দাঁড়িয়ে রইল। উড়ে এসে জুড়ে বসা এই মহিলাটি বড় যন্ত্রণা দিচ্ছে।
‘গােমেজ, তুমি যাও তাে, অপালাকে ডেকে নিয়ে এস। বল, ভাপা পিঠা বানাচ্ছি, সে যেন দেখে যায়। তাকে শিখিয়ে দেব।
‘আমি রান্না ছাড়া অন্য কাজ করি না।
এটা কেমন কথা! তুমি ডেকে আনতে পারবে না? ‘দ্বি-না। তা ছাড়া আমাদের দোতলায় যাওয়া নিষেধ আছে। শুধু রমিলা দোতলায় যেতে পারে।’
এইসব নিয়ম-কানুন কে করেছে ? ‘বড়সাহেব।
‘বড়সাহেব তাে এখন নেই, তুমি যাও ডেকে নিয়ে এস। এ-রকম হাবার মতাে দাঁড়িয়ে থেকো না।’
আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ
গােমেজ বের হয়ে এল, কিন্তু দোতলায় উঠল না। নিজের ঘরে ঢুকে দরজা ভিড়িয়ে দিল। গােমেজের ঘর মূল বাড়ির দক্ষিণে আলাদা দু’টি কামরা। একটিতে শােবার ব্যবস্থা, অন্যটিতে রান্নার। এ-বাড়ির মােট আট জন কাজের লােকের জন্যে আলাদা রান্না হয়। সেই রান্নাও গােমেজ করে। গােমেজ ঠিক করল আজ সে কোনাে রান্নাবান্না করবে না। তার এ-রকম অভ্যেস আছে। মাঝে-মাঝে মেজাজ বিগড়ে গেলে এ-রকম করে। রান্না তাে শুধু হাঁড়িতে কিছু জিনিস ফেলে নাড়াচাড়া করা নয়। এটা খুব কঠিন ব্যাপার। মন বসাতে হয়। তা সবসময় সম্ভব হয় না। আজ যেমন হবে না। আজ সে দরজা বন্ধ করে বসে থাকবে। গােপনে কিঞ্চিৎ মদ্যপান করবে। এই অভ্যেসও তার পুরনাে।
নিশানাথবাবুর স্ত্রী অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে নিজেই অপালার খোঁজে গেলেন। মেয়েটি তাঁকে পছন্দ করে না, কিন্তু তাঁর প্রচণ্ড মায়া পড়ে গেছে। পাগলা-পাগলা ধরনের মেয়ে। একা-একা থেকে কেমন যেন হয়ে গেছে।
Read more