আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-২৮)

 তুমি কি আজ তার কাছে গিয়েছিলে? – 

হা, গিয়েছিলাম। সে কি এমন কিছু বলেছে, যাতে তােমার মন-খারাপ হয়েছে? ‘না।’ 

‘এই ছেলেটিকে তােমার কি পছন্দ হয়? যদি হয় আমাকে বল। তুমি যা চাইবে তাই হবে। যা হওয়ার নয়, তাও আমি হওয়াব। আমার প্রচুর ক্ষমতা।  ফখরুদ্দিন সাহেবের মনে হল, অপালা আবার কাঁদতে শুরু করেছে। তিনি বললেন, ‘ঐ ছেলে যদি তােমাকে কষ্ট দিয়ে থাকে, আমি টেনে তার জিভ ছিড়ে

আকাশ জোড়া মেঘ 

ফেলব।’ 

ঐ-সব কিছু না বাবা, এমনিতেই আমার মন-খারাপ। তুমি তাে জান, মাঝে মাঝে আমার মন-খারাপ হয়। 

‘এটা তাে ভালাে কথা না। এটা একটা অসুখ, এর নাম মেলাংকলি। আমি ঢাকায় এসেই বড়-বড় ডাক্তার দেখাব। 

কবে আসবে ঢাকায়? 

তােমার সঙ্গে কথা বলা শেষ হলেই আমি ট্রাভেল এজেন্টকে ফোন করব। এখানে আমার অনেক ঝামেলা, তবুও আমি ফার্স্ট এ্যাভেইলেবল ফ্লাইটে চলে আসব। তােমার মাকেও নিয়ে আসব। 

‘আচ্ছা।’ ‘তুমি কি আর কিছু বলবে? 

না। তুমি কি জেগে ছিলে নাকি মা? ‘হ্যা। ‘এত রাত পর্যন্ত জেগে-জেগে কী করছিলে? ‘ছবি দেখছিলাম।’ 

কী ছবি দেখছিলে? ‘আমার ছবি। কত ছবি যে তােমরা আমার তুলেছ। 

‘দ্যাটস রাইট। ফটোগ্রাফির হবিটা একসময় বেশ জোরালই ছিল। এখন নেই। ভাবছি, আবার শুরু করব। একটা ডার্ক রুম বানিয়ে নিজেই ছবি ডেভেলপ করব। কেমন হবে?’ 

‘ভালােই হবে। বাবা। 

বল মা। ‘আমার এত ছবি, কিন্তু খুব ছােটবেলার ছবি নেই কেন? 

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ 

তােমার কথা বুঝতে পারছি না। ‘জন্মের পরপর তােলা ছবি। এক বছর-দু বছর বয়সের ছবি। 

ফখরুদ্দিন সাহেব বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তাঁর নিঃশ্বাস ফেলার শব্দ ছাড়া আর কিছু শােনা গেল না। অপালা যখন দ্বিতীয় বার প্রশ্নটি করতে যাবে তখন তিনি বললেন, তােমার ছােটবেলার ছবিও আছে। না-থাকার তাে কোনাে কারণ নেই। আমি এসে তােমাকে খুঁজে দেব।” 

‘আচ্ছা। | ‘তােমার ছােটবেলায় আমি একটা ঝামেলায় পড়েছিলাম। ব্যবসা-সংক্রান্ত ঝামেলা। মন-মেজাজ ভালাে ছিল না। প্রচুর ছােটাছুটি করতে হত, ছবি তােলার তেমন মুড ছিল না। ছবি তােলা, কবিতা এবং গল্প লেখার মতােই একটা মুডের ব্যাপার। 

‘তা ঠিক। 

‘একেবারেই যে তুলি নি তা নয়। কিছু-কিছু নিশ্চয়ই তােলা হয়েছে। তবে আরাে বেশি তােলার প্রয়ােজন ছিল। আমি ফিরে আসি, তারপর দেখবে প্রতিদিন এক রােল করে স্ন্যাপ নেব।’ 

‘বাবা। ‘বল মা। ‘আগামী কাল আমার একটা পরীক্ষা আছে।’ ‘ও, আই অ্যাম সরি। এতক্ষণ তােমাকে ডিস্টার্ব করা খুবই অনুচিত হয়েছে। 

অপালা ক্ষীণ স্বরে বলল, ‘কাল যদি পরীক্ষাটা না দিই, তাহলে কি তুমি রাগ করবে? 

‘মা, আমি তােমার কথা বুঝতে পারছি না।’ 

‘কাল আমার পরীক্ষা দিতে ইচ্ছা করছে না। যদি পরীক্ষার হলে যাই, তাতেও লাভ হবে না। একটা লাইনও লিখতে পারব না। 

‘আমার শরীর খুব খারাপ লাগছে। 

‘শরীর খারাপ লাগলে তাে পরীক্ষা দেয়ার প্রশ্নই ওঠে না। , তুমি শুয়ে থাক। আমি আসছি, এসেই সব ঠিক করে দেব। 

অপালা টেলিফোন রেখে খাবার ঘরে গেল। এত রাত হয়েছে, তবু কেউ ঘুমায় নি। সবাই জেগে আছে। সে আজ সারা দিন কিছু খায় নি, রাতেও খায় নি—এই জন্যেই। জেগে আছে হয়তাে। 

‘রমিলা। ‘জি আফা। ‘আমি এক কাপ কফি খাব। খুব কড়া করে এক কাপ কফি দাও। ‘সাথে আর কিছু দি আফা?’ 

এক টুকরাে পনির কেটে দিও। আমার ঘরে নিয়ে এসাে। আর শােন, তােমরা সবাই জেগে আছ কেন? শুয়ে পড়। 

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ 

অনেক দিন পর অপালা তার খাতা নিয়ে বসেছে। ঘুম-ঘুম একটা ভাব ছিল, কফি খাওয়ায় সেই ভাব কেটে গেছে। খুব ক্লান্তি লাগছে, আবার ইচ্ছেও করছে কিছু একটা লিখতে। অপালা লিখতে শুরু করল। 

আমার বাবা যখন ক্লাস নাইনে পড়ি তখন বাংলার স্যার একটা রচনা লিখতে দিলেন তােমার প্রিয় মানুষ। কেউ লিখল রবীন্দ্রনাথ, কেউ শরশ্চন্দ্র। কিছু-কিছু স্মার্ট মেয়েরা বিদেশের নামকরা লােকদের প্রিয় মানুষ বানিয়ে রচনা লিখল, লেনিন, আইনষ্টাইল মাদার তেরেসা। আমি লিখলাম, আমার প্রিয় মানুষ আমার বাবা। কেন তিনি আমার প্রিয় মানুষ তাও লিবলম। ছােট-ছােট কিছু ঘটনার কথা লিখলাম—যেমন, আমার এক বার টনসিল অপারেশন হল। সলিড কিছু খেতে পারি না। বাবার তা দেখে খুব কষ্ট হল। তিনি বললেন, আমার মা যত দিন সুস্থ না হয়েছে, তত দিন আমিও সলিড কিছু খাব না। সত্যি-সত্যি তিন দিন তাই করলেন। দুধ, মুরগির সুপ এইসব খেয়ে কাটালেন।

আরেক বার আমার প্রচণ্ড দাঁতে ব্যথা। মাটীর হাড়ে কী যেন হয়েছে। কত ওষুধ কত ডাক্তার, ব্যথা কমে না। আমার কষ্ট দেখে বাবা যেন কীরকম হয়ে গেলেন। বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছােট বাচ্চাদের মতাে শব্দ করে কাঁদতে লাগলেন। কী অদ্ভুত ব্যাপার। বাবার কান্না শুনে আমার ব্যথা কমে গেল। আমি বললাম, বাবা তুমি কাঁদবে না, আমার ব্যথা কমে গেছে। বাবা মনে করলেন আমি তাঁকে সান্তনা দেবার জন্যে বলছি। তিনি আরাে শব্দ করে কাঁদতে লাগলেন। এই 

মানুষটি যদি আমার প্রিয় না-হয়, তাহলে কে হবে? রবীন্দ্রনাথ, আইনস্টাইন, মাদার তেরেসা—এঁরা মহাপুরুষ পর্যায়ের মানুষ, পৃথিবীর সবার প্রিয়। কিন্তু আমি সামান্য মানুষ, আমার 

প্রিয় মানুষটিও সামান্য। এই রচনা নিয়ে কত কাণ্ড! আমাদের বাংলার স্যার কবিরউদ্দিন খুব খুশি। ক্লাসে সবাইকে পড়ে 

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ 

শশানালেন। শুধু তাই না, লেখাটা কপি করে তিনি দৈনিক বাংলার শিশুদের পাতায় ছাপতে দিলেন। এবং আশ্চর্যের ব্যাপার, লেখাটা সেখানে ছাপাও হল। এটাই আমার প্রথম স্থাপা লেখা এবং এটাই 

শেষ। বাবা এই লেখা পড়লেন না। কারণ তিনি জানেনই না যে তাঁর মেয়ের একটা লেখা ছাপা হয়েছে। আমার 

খুব ইচ্ছা করছিল বাবাকে লেখাটা পড়াই, আবার লজ্জাও লাগছিল। নিজের গােপন ভালবাসার 

কথা জানাতে লজ্জা করে……।। আমার মনে হয় লজ্জা একটু বেশি। মা এত অসুস্থ হয়ে পড়ে আছে, আমার এত খারাপ লাগে, কিন্তু 

নিজের খারাপ লাগার কথা মা’কে কখনাে জানাই না। জানাতে ইচ্ছা করে না। সবসময় মনে হয় নিজের মনের কথা থাকুক না মনে! কী হবে বাইকে জানিয়ে? 

ভােরবেলা খুব সহজভাবে অপালা নিচে নেমে এল। নাশতার টেবিলে বসল। নিশানাথবাবুর স্ত্রী প্রায় ছুটে এলেন। চায়ের কাপে চুমুক দিতে-দিতে অপালা বলল, 

একটা হাসির গল্প বলুন তাে কাকিমা। 

 

Read more

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-২৯)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *