আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৩০)

মা, তােমার নাম কি? ‘অপালা। ‘ও-মা, কী অদ্ভুত নাম। তুমি আমার কথায় কিছু মনে করলে না তাে? “জ্বি-না। 

‘তুমি আসায় খুব খুশি হয়েছি। একটা ঝামেলা মিটে গেল। ছেলের মনে কী ছিল তা তাে আর আমরা জানি না। জানলে এত দিনে শুভ কাজ সমাধা হয়ে যেত ইনশাআল্লাহ্। 

আকাশ জোড়া মেঘ

হাজি সাহেব বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘এসেই কী বকবক শুরু করলে? চুপ কর 

‘চুপ করব কেন? আমরা মেয়েতে-মেয়েতে কথা বলছি, তুমি এর মধ্যে থাকবে না। বারান্দায় গিয়ে বস। 

মেয়েটি চায়ের ট্রে নিয়ে ঢুকেছে। একটা প্লেটে পাঁপর ভাজা, অন্য একটা প্লেটে সুজির হালুয়া। সে খুব সাবধানে ট্রে নামিয়ে রাখল। এক বারও চোখ তুলে তাকাল না। ভয়ে-সঙ্কোচে সে এতটুকু হয়ে গেছে। এখন ভালাে লাগছে মেয়েটিকে দেখতে। 

হাজি সাহেবের বাড়ি থেকে বেরুতে-বেরুতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। সন্ধ্যাবেলা কারাে বাড়িতে যেতে ইচ্ছে করে না। সন্ধ্যাবেলা শুধু পশু এবং পাখিরাই ঘরে ফিরবার জন্যে ব্যাকুল হয়। মানুষ হয় না। উষা এবং গােধূলি হচ্ছে গৃহত্যাগের লগ্ন। 

ড্রাইভার বলল, “ৰাসায় যাব আপা?” না, এমনি একটু রাস্তায় চালান। ‘মীরপুর রােড ধরে যাব? 

যান। 

শ্যামলীতে বড় খালার বাড়ি। তাঁর সঙ্গে এক বার দেখা করে এলে কেমন হয়? কত দিন ও-বাড়িতে যাওয়া হয় না। খালাও আসেন না। মা মাঝে-মাঝে এ-বাড়িতে আসেন, কিন্তু অপালাকে সঙ্গে আনেন না। কেন আনেন না এ নিয়ে সে কখনাে মাথা ঘামায় নি। আজ তার মাথায় ঝমঝম করে বাজতে লাগল—মা আমাকে এ-বাড়িতে আনেন না, মা আমাকে এ-বাড়িতে আনেন না। যেন রেকর্ডে পিন আটকে গেছে, তুলে না-দেয়া পর্যন্ত বাজতেই থাকবে। 

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ

‘ড্রাইভার সাহেব। ‘জি আপা।’ 

শ্যামলী চলুন। বড় খালার বাসায়। বড় খালার বাসা চেনেন না? ‘জি, চিনি। চিনব না কেন?’ 

বড় খালা অপ্রসন্ন মুখে বললেন, ‘তারপর রাজকন্যা, কেমন আছ? 

অপালা হেসে ফেলল। ‘আমি ভালাে আছি বড় খালা। 

‘সন্ধ্যাবেলা কী মনে করে? আমাদের বাড়িঘর তাে তােমার জন্যে নিষিদ্ধ এলাকা। ফরবিডেন জোন। 

‘ফরবিডেন জোন হবে কেন? 

‘আমি তাে জানি না, আছে নিশ্চয়ই কোনাে কারণ। রাজকন্যারা কি সব জায়গায় যেতে পারে, না যেতে পারা উচিত? বস, দাঁড়িয়ে আছ কেন? 

‘বসব না খালা। আমি এখন যাব।’ 

এখন যাবে মানে! তাহলে এসেছ কেন?” 

অপালা বসল। বড় খালা গম্ভীর মুখে বললেন, ‘এমনিতে তাে তােমাদের খবর পাওয়ার উপায় নেই। পত্রিকায় অবশ্যি ইদানীং পাচ্ছি। 

অপালা বিস্মিত হয়ে বলল, ‘পত্রিকায় খবর মানে! পত্রিকায় আবার কী খবর? 

‘সে কী! তুমি পত্রিকা পড় না? ‘জ্বি-না। ‘দেশি পত্রিকা তােমার বাবা পড়তে দেন না বােধহয়। ‘তা নয় খালা, ইচ্ছা করে না। কী খবর বেরিয়েছে? 

‘দু’টা খুন হয়েছে তােমাদের টঙ্গির কারখানায়। খুনী ধরা পড়েছে। তার ছবিটবি দিয়ে নিউজ হয়েছে। সে বলছে, তােমার বাবার নির্দেশেই এই কাণ্ড সে করেছে। সব 

পত্রিকাতেই তাে আছে, তুমি কিছুই জান না? 

‘জ্বি-না।’ ‘না- জানাই ভালাে।’ 

খুব চিন্তা লাগছে খালা। 

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ

‘চিন্তা লাগার কী আছে? টাকাওয়ালা মানুষদের এইসব সামান্য জিনিস নিয়ে চিন্তা করতে হয় না। তােমার বাবা আসুক। দেখবে, সব ঠিক হয়ে গেছে। ঐ খুনীই তখন উল্টো কথা বলবে। বস তুমি, আমি দেখি, চা-টার ব্যবস্থা করি। তােমার ঠিকমতাে যত্ব হয় নি—এই খবর তােমার বাবার কানে উঠলে উনি রেগে যাবেন। জগৎ শেঠদের রাগাতে নেই।’ 

অপালা একা-একা বসে রইল। এক বার বড় খালার মেয়ে বিনু এসে বলল, ছবি দেখবে আপা? “বালিকা বধূ” আছে। খুব ভালাে প্রিন্ট। 

‘তুমি দেখ। আমার ইচ্ছা করছে না। ‘আমি চার বার দেখেছি আপা। তুমি দেখলে তােমার সঙ্গে আবার দেখব।’ ‘আমার আজ একটুও ইচ্ছা করছে না। ভীষণ মাথা ধরেছে।’ 

মাথা ধরার ব্যাপারটা মিথ্যা নয়। আসলেই প্রচণ্ড মাথা ধরেছে। ইচ্ছে করছে ছুটে বেরিয়ে যেতে। তা সম্ভব নয়। বড় খালা তার সামনে প্রচুর খাবারদাবার সাজিয়ে রাখছেন। তাঁর মুখে কী অদ্ভুত এক ধরনের কাঠিন্য! 

‘বড় খালা।’ 

বল।’ ‘আমার জন্ম কি হাসপাতালে হয়েছিল ? ‘তা দিয়ে তােমার কী দরকার? 

এমনি জিজ্ঞেস করছি। আপনি নিশ্চয়ই জানেন, জানেন না ? ‘জানব না কেন? নাও, চা খাও। তুমি কি এই কথা জিজ্ঞেস করবার জন্যে এসেছিলে?’ 

‘জ্বি-না। হঠাৎ মনে হল। 

তােমার বাবা-মা ফিরবেন কবে? টিকিট নিয়ে কী—সব ঝামেলা হচ্ছে, ঝামেলা মিটলেই ফিরবেন। 

একা-একা থাক—আমাদের খোঁজখবর নেয়া উচিত, কিন্তু নিতে পারি না। কেন জান?* 

‘জ্বি-না।’ ‘তােমাদের বাড়ির সঙ্গে যােগাযােগ করা মানেই আগ বাড়িয়ে গালে চড় খাওয়া। পত্রিকায় খবর দেখার পর তােমাকে টেলিফোন করেছিলাম। কী বলল, জান?” 

‘কী বলল ?” ‘বলল, তুমি পড়াশােনা করছ, তােমাকে ডাকা যাবে না।’ 

গুদের দোষ নেই খালা আমিই বলে দিয়েছিলাম। ‘ভালাে, খুব ভালাে। 

প্রচণ্ড মাথার যন্ত্রণা নিয়ে অপালা বাসায় ফিরল। বাসায় অনেক মানুষ। ড্রয়িং রুমে আলাে জ্বলছে। কিছু লােকজন বসে আছে সেখানে। বারান্দায় চিন্তিত মুখে ম্যানেজারবাবু এবং চিটাগাং ব্রাঞ্চের জি এম হাঁটাহাঁটি করছেন।

 

Read more

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৩১)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *