আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৩১)

নিশানাথবাবু ছুটে এলেন, কোথায় ছিলে এতক্ষণ? 

অপালা তার জবাব দিল না। নিশানাথবাবু বললেন, “তুমি একটু বসার ঘরে এস। পুলিশের কয়েকজন অফিসার এসেছেন। 

আমার সঙ্গে তাে তাঁদের কোনাে দরকার নেই। ‘আমরা বলেছি। তবু তাঁরা কথা বলতে চান। অনেকক্ষণ বসে আছেন। ‘আমি তাঁদের সঙ্গে কোনাে কথা বলব না। ‘মা, তুমি বুঝতে পারছ না।’ 

আকাশ জোড়া মেঘআমার কিছু বোেঝার দরকার নেই। প্রচণ্ড মাথা ধরেছে। আমি এখন ঘর অন্ধকার করে শুয়ে থাকব। 

‘দু’-এক মিনিটের ব্যাপার।’ ‘ম্যানেজারকাকু, আপনি আমাকে বিরক্ত করবেন না। 

অপালা দোতলায় উঠে গেল। এক বারও ফিরে তাকাল না। নিশানাথবাবুর চিন্তিত মুখ আরাে ঝুলে পড়ল। 

নার্সদের মুখশ্রী ভালাে থাকা উচিত। 

ফিরােজের তাই ধারণা। যেন মুখের দিকে তাকিয়েই মন প্রফুল্ল হয়। ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল মােমবাতি হাতে হেঁটে যাচ্ছেন—এই দৃশ্য দেখে রুগীরা নতুন আশায় বুক বেঁধেছে। কারণ ঐ মহিলা ছিলেন অসম্ভব রূপবতী। ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল যদি তাড়কা রাক্ষসীর মতাে হতেন, তাহলে রুগীরা নিশ্চয়ই রাতের বেলা এই দৃশ্য দেখ ভিরমি 

এই হাসপাতালে যে-ক’টি নার্স ফিরােজ দেখেছে সবাই হয় তাড়কা রাক্ষসী, নয়তো তাড়কা রাক্ষসী হবার প্রাণপণ চেষ্টা করছে। ডাক্তার এবং নার্সদের প্রেম নিয়ে অনেক সুন্দর-সুন্দর গল্প-উপন্যাস আছে। সে-সব নিশ্চয়ই বানানাে। এই ওয়ার্ডে যে গত দুদিন ধরে আসছে তার চেহারা মন্দ নয়, তবে কথাবার্তা অসহ্য। 

ধমক না-দিয়ে কোনাে কথা বলে না। আজ সকালেই ফিরােজের সঙ্গে বড় রকমের কথা কাটাকাটি হয়ে গেল। মেয়েটি ওয়ার্ডে ঢুকেই কড়া গলায় বলল, ‘এই যে লােক, বসে আছেন কেন? 

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ

এই যে লোেক বলে কেউ সম্বােধন করতে পারে, এটাই ফিরােজের ধারণা ছিল। । সে বহু কষ্টে রাগ সামলে বলল, ‘বসে থাকা নিষেধ আছে নাকি? | ‘হ্যা, আছে। শুয়ে-শুয়ে রেস্ট নিন। ডন-বৈঠকের জন্যে হাসপাতাল না। | ফিরােজ শুয়ে পড়ল। কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। রাত-দুপুরে আজেবাজে কোনাে ওষুধ খাইয়ে দিতে পারে। একটা থ্রিলারে এ-রকম একটা ঘটনা ছিল। নার্স রাত দুপুরে ঘুমের ওষুধ বলে আফিমের ঢেলা গিলিয়ে দিত। অবশ্যি সেই নার্স ছিল রূপবতী এবং সে বেছে বেছে এই কাণ্ডগুলাে করত রূপবান তরুণ রুগীদের সঙ্গে। 

ফিরােজ গলা পর্যন্ত চাদর টেনে কৌতূহলী চোখে নার্সটাকে দেখছে। এই মহিলা এক-একটা বেডের কাছে যাচ্ছে এবং বিনা কারণে রুগীদের ধমকাচ্ছে। গরিব রুগীদের তুমি-তুমি করে বলছে। সে ঘুরে-ঘুরে আবার ফিরােজের কাছে ফিরে এল। 

‘আপনার জ্বর রেমিশন হয়েছে।’ 

ফিরােজ জবাব দিল না। নার্স তার এ্যাপ্রনের পকেটে হাত দিয়ে বলল, ‘আপনার একটা চিঠি এসেছে। গত কাল দিতে ভুলে গেছি। এই নিন।’ 

ফিরােজ থমথমে গলায় বলল, ‘আপনি চিঠি পড়েছেন কেন? খামের মুখ খােলা। 

‘আপনার চিঠি পড়ার আমার দরকারটা কী? মুখখােলা অবস্থাতেই এসেছে। চিঠি পড়ুন, বালিশের নিচে রেখে দিচ্ছেন কেন? 

‘আপনি এখান থেকে যান, তারপর পড়ব। 

নার্স চলে যাবার পরও সে চিঠি পড়ল না। হাসপাতালে বসে চিঠি পাওয়ার বিস্ময়টা তারিয়ে তারিয়ে উপভােগ করা যাক। নার্স যে চিঠিটা পড়েছে, তাতে তাকে ঠিক দোষ দেয়া যায় না। হাসপাতালের রুগীদের কেউ চিঠি লেখে না, দেখতে আসে। গত দশ বছরে এটাই হয়তাে প্রথম চিঠি এবং ফিরােজের ধারণা, হাসপাতালের জমাদারনী, মালী, ওয়ার্ডবয়সবাই এই চিঠি পড়েছে। 

কে লিখতে পারে এই চিঠি? তাজিন? হতে পারে। পরিচিতদের মধ্যে একমাত্র সে ই তাকে দেখতে আসে নি। দুলাভাই বলেছেনরাগ করে আসে নি। ফিরােজ অবাক হয়ে বলেছে, “রাগ কী জন্যে? 

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ

নিজের দিকে তুমি তাকাবে না। অসুখ-বিসুখ বাঁধিয়ে খবর পাঠাবে, সে রাগ করবে না? শােন ফিরােজ, তুমি কথা দাও, রিলিজ হলে আমার বাসায় গিয়ে উঠবে। 

কথা দিলাম। ‘আমরা যে-মেয়ে ঠিক করব, চোখ বন্ধ করে তাকে বিয়ে করবে।’ ‘কথা দিলাম। 

তােমাকে কেবিনে ট্রান্সফারের ব্যবস্থা করছি। সব ধরাধরির ব্যাপার। এক জন মেজর জেনারেলকে আজ ধরব। আমার ভাবির ফুপাত ভাই।’ 

‘কাউকে ধরতে হবে না দুলাভাই। ওয়ার্ডে আমি ভালােই আছি। আশেপাশের রুগীদের সঙ্গে খাতির হয়েছে। গল্পগুজব করে সময় কেটে যাচ্ছে।” 

‘কার সঙ্গে খাতির হল? 

‘বাঁ পাশের বেডের রুগীর সঙ্গে। খাতিরটা আরাে জমত, বেচারা হঠাৎ মরে যাওয়ায় খাতিরটা জমতে পারল না। 

‘সবসময় এমন ঠাট্টা-তামাশা করাে না। মৃত্যু নিয়ে রসিকতা করবে না। 

‘আর করব না। আপনি দুলাভাই, বড় আপাকে পাঠিয়ে দেবেন। আপাকে দেখতে ইচ্ছা করছে। 

‘বাজে কথা বলবে না। তােমার কাউকেই দেখতে ইচ্ছা করে না। | তাজিনই নিশ্চয় এই পত্ৰলেখক। চিঠিপত্র লেখার অভ্যেস তার আছে। জন্মদিন, নববর্ষ—এইসব বিশেষ দিনগুলােতে তার একটা সুন্দর কার্ড আসবেই। 

এটাও বােধহয় একটা কার্ড। গেট ওয়েল’ কার্ড। বড় আপার কাছে নানান ধরনের কার্ডের বিরাট সংগ্রহ। 

ফিরােজ ভেবেছিল গভীর রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে সে চিঠি পড়বে। এতক্ষণ ধৈর্য ধরতে পারল না। তার কেবলই মনে হতে লাগল, চিঠির রচয়িতা হয়তােবা অপালা। এ-রকম মনে হবার কোনাে কারণ নেই, কিন্তু তবু মনে হচ্ছে। 

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ

খাম খুলে ফিরােজের নিঃশ্বাস প্রায় বন্ধ হয়ে গেল। অপালাই লিখেছে। আহ্, এত গভীর আনন্দের ব্যাপারও ঘটতে পারে। চিঠিটি পড়তে ইচ্ছে করছে না। পড়া মানেই তো ফুরিয়ে যাওয়া। বরং গুটি গুটি লেখার তিনটি পৃষ্ঠা নিয়ে সে সারা রাত জেগে বসে থাকবে। মাঝে-মাঝে ঘ্রাণ নেবে। এই কাগজ কোনাে ফুলের গুচ্ছনয়। তবু নেশা ধরানাে সৌরভ নিশ্চয়ই লুকানাে আছে। সবাই সে সৌরভ পাবে না। যার পাবার শুধু সে ই পাবে। 

ফিরােজ সাহেব। আপনার হাসপাতালের ঠিকানা কোথায় পেয়েছি বলুন তাে? না, এখন বলব না, আপনি ভাবতে থাকুন। এটা একটা ধাঁধা। দেখি আপনি কেমন বুদ্ধিমান। ধাধার জবাব দিতে পাব্রেন কি না। 

আমি হাসপাতালে আপনাকে দেখতে আসি নি, যদিও খুব আসার ইচ্ছা ছিল। কেন আসি নি জানেন? ছােটবেলায় আমাদের এক জন কাজের মেয়ে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে আসে। তাকে 

হবার জন্যে এক দিন হাসপাতালে এসে কী দেবি জানেন ? দেখি দু’-তিন মাস বয়সী একটা বাচ্চাকে বড় একটা গামলায় শুইয়ে রাখা হয়েছে। বাচ্চাটা মরা বাচ্চার নাতি ও নাকে লাল-লাল পিপড়া। এই কুৎসিত দৃশ্যটি দুঃস্বপ্ন হয়ে বারবার আমার কাছে ফিরে আসে। হাসপাতালে যেতে আমার এই কারণেই ইচ্ছা করে না। এখন বলি আপনার ঠিকানা কোথায় পেলাম। আপনার বান্ধবীর বাবার কাছ থেকে।

 

Read more

আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৩২)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *