আপনার মেয়ে তাে খুবই রূপবতী।’

হাজি সাহেব কিছুই বললেন না। ফিরােজ বলল, ‘এই রকম একটা মেয়ের বিয়ে নিয়ে কেউ চিন্তা করে? আশ্চর্য!
হাজি সাহেব ক্লান্ত গলায় বললেন, ‘অন্য সমস্যা আছে।
কী সমস্যা? ‘ওর পায়ে একটু দোষ আছে।” ‘কী দোষ? ‘পােলিও হয়েছিল।
বলেন কী। ‘হাঁটা-চলায় কোনাে অসুবিধা নাই কিন্তু।
ফিরােজের অসম্ভব মন খারাপ হয়ে গেল। তার প্রচণ্ড ইচ্ছে হতে লাগল বলে ফেলে—আমি এই মেয়েকে বিয়ে করতে চাই। শেষ পর্যন্ত বলল না। তার আবেগ দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
‘আমি টাকাপয়সা যথেষ্ট খরচ করব। এই মেয়েটা আমার খুব আদরের। যদি একটা ভালাে ছেলে দিতে পারেন।’
‘আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।
ফিরােজ লম্বা-লম্বা পা ফেলে বেরিয়ে গেল। যদিও তার খুব মন-খারাপ ছিল, রাস্তায় নেমে মন ভালাে হয়ে গেল। কী সুন্দর ঝকঝকে রােদ। ঘন নীল আকাশ। বাতাস কত মধুর। বেঁচে থাকার মতাে আনন্দ আর কী হতে পারে?
ফিরােজ হাঁটছে ফুর্তির ভঙ্গিতে। কোনাে কাজকর্ম নেই, চিন্তা করতেই ভালাে লাগছে। যদিও উল্টোটাই হওয়া উচিত ছিল। তার ফুতির মূল কারণ হচ্ছে পকেট একেবারে ফাঁকা নয়। আট শ’ ত্রিশ টাকা আছে। এতগুলাে টাকা পকেটে নিয়ে শুধু শুধু দুশ্চিন্তা করার কোনাে মানে হয় না। দুশ্চিন্তা মানেই পেপটিক আলসার, ক্ষুধামান্দ্য, অনিদ্রা। তারচেয়ে হাসিমুখে ঢাকার রাস্তায় হাঁটা অনেক ভালাে।
আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ
ঢাকার রাস্তাগুলি এখন বেশ সুন্দর। হেঁটে বেড়ানাের জন্যে এবং ভিক্ষা করবার জন্যে আদর্শ। ফুটপাতে ভিক্ষুকরা কী সুন্দর ঘর-সংসার সাজিয়ে ভিক্ষা করছে।
ফিরােজ এই মুহূর্তে কৌতূহলী হয়ে একটি ভিক্ষুক-পরিবারকে দেখছে। এক বুড়াে তার দু পাশে দুটি ছােট-ছােট বাচ্চাকে নিয়ে ভিক্ষা করছে। তাদের একটু পিছনেই ইটের চুলায় রান্না হচ্ছে। ঘােমটা-দেয়া গৃহস্থ প্যাটার্নের একটি মেয়ে মাটির
হাঁড়িতে চাল দিচ্ছে। এই পরিবারটির চোখে-মুখে দুঃখ-বেদনার কোনাে ছাপ নেই। বরং বুড়াের মুখে একটা প্রশান্তির ভাব আছে। বাচ্চা দুটি একটু পর-পর দাত বের করে হাসছে। ফিরােজ কী মনে করে একটা চকচকে পাঁচ টাকার নােট বুড়াের থালায় ফেলে দিল। ভিখিরিরা এই জাতীয় ঘটনায় আবেগে উদ্বেলিত হয়। এই বুড়াে নিস্পৃহ ভঙ্গিতে নােটটা নিজের বুকপকেটে রেখে দিল। খুবই বুদ্ধিমানের কাজ। থালায় একটি নােট থাকলে পয়সাকড়ি পড়বে না। ফিরােজের আফসােসের সীমা রইল না। টাকাটা জুলে গেল। দাতা সাজবার কোনাে প্রয়ােজন ছিল না। অদূর ভবিষ্যতে তাকে যদি এ রকম টিনের থালা নিয়ে বসতে হয় এবং কেউ যদি একটা পাঁচ টাকার নােট ফেলে দেয়, তাহলে সে আনন্দের এমন প্রকাশ দেখাবে যে চারদিকে লােক জমে যাবে। দর্শকদের আনন্দের জন্যে সে বাঁদর-লাফ দিতেও রাজি আছে।
বাচ্চা দুটির মধ্যে কী-কারণে যেন মারামারি লেগে গেছে। দু জনই এলােপাতাড়ি কিল-ঘুষি মারছে। এক জন মনে হচ্ছে খামচিবিশারদ। একেক বার খামচি দিয়ে ছাল চামড়া নিয়ে আসছে। জমাট দৃশ্য। কিন্তু বুড়াের এই দৃশ্যেও কোনাে ভাবান্তর হচ্ছে না! সন্ন্যাসীর নির্লিপ্ততা নিয়ে সে বসে আছে, রন্ধনরতা ঘােমটা দেয়া মেয়েটিও কিছু বলছে ফিরােজের ইচ্ছে করছে একটু দূরে দাঁড়িয়ে এই পরিবারটিকে দেখে-দেখে দুপুরটা কাটিয়ে দেয়।
আকাশ জোড়া মেঘ -হুমায়ূন আহমেদ
সেটা করা ঠিক হবে না। লােকে অন্য অর্থ করবে। যে-মেয়েটি রাঁধছে তার বয়স অল্প। মুখে লাবণ্য এখনাে খানিকটা আছে। এই মেয়ের আশেপাশে দীর্ঘ সময় থাকার একটি মানেই হয়। বুড়াে যে পাঁচটি টাকা পেয়েও বিরস মুখে বসে রইল তার মানেও এই। বুড়াে অন্য কিছু ভেবে বসেছে। ফিরােজ মগবাজারের দিকে লম্বা-লম্বা পা ফেলতে লাগল। এখন সে যাবে তাজিনদের বাসায়। তাজিন তার বড় বােন। মগবাজার ওয়ারলেস কলােনিতে থাকে। ফিরােজের যখন টাকাপয়সার টানাটানি হয় তখন দুপুরে এই বাড়িতে খেতে আসে। | ‘কেমন আছিস রে আপা? তাের পুত্র-কন্যারা কোথায়? বাসা একেবারে খালি মনে হচ্ছে।
তাজিন মুখ অন্ধকার করে রাখল। হয়েছে কী? কথা বলছিস না কেন? কর্তার সঙ্গে আবার ফাইটিং? তাজিন থমথমে গলায় বলল, ‘তুই কি একটা মানুষ, না অন্য কিছু?
কেন? ‘রুমি এত করে বলে দিল তার জন্মদিনে আসার জন্যে, তুই আসতে পারলি না? মেয়ে কাঁদতে-কাঁদতে অস্থির। বাচ্চাগুলি তােকে এত পছন্দ করে, আর তুই এ-রকম করিস? ভালবাসার দাম দিতে হয় না?
“খুব কেদেছিল?
‘জিনিসপত্র ফেলে-ছড়িয়ে একাকার করেছে, শেষে তাের দুলাভাইকে পাঠালাম তাের খোঁজে।
‘আপা, হয়েছে কি জান…… আমাদের এক কলিগ…… ‘চুপ কর, আর মিথ্যা কথা বলতে হবে না। ভাত খেতে এসেছিস, খেয়ে বিদায়
‘আজ তােদের রান্না কী? তাজিন জবাব না দিয়ে টেবিলে ভাত বাড়তে লাগল। ‘তােদের টেলিফোন ঠিক আছে আপা? ‘আছে।’
‘তুই রেডি কর সবকিছু, আমি টেলিফোন করে আসছি। দারুণ একটা খবর আছে। আগামী সপ্তাহে বিয়ে করছি।”
এই দারুণ খবরেও তাজিনকে বিচলিত মনে হল না। ‘বিশ্বাস হচ্ছে না? এই নে, মেয়ের ছবি দেখ। কি, এখন বিশ্বাস হচ্ছে?”
ফিরােজ টেলিফোন করতে গেল। বি: করিম সাহেবকে জিজ্ঞেস করবে, মতিন কাজটা করেছে কি না। বি করিম সাহেবকে পাওয়া গেল। তিনি অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে বললেন, ‘কে, ফিরােজ সাহেব নাকি?
‘আমার কি সৌভাগ্য। গলা চিনে ফেলেছেন। ‘ঠাট্টা করছেন নাকি ভাই? ‘পাগল হয়েছেন। আপনার সঙ্গে কি আমার ঠাট্টার সম্পর্ক? ‘আমার চিঠিটা নিয়ে গিয়েছিলেন? ‘হা, গিয়েছিলাম। বহু কষ্টে ব্যাটার ঠিকানা বের করতে হয়েছে। ‘কী বলেছেন উনি?
‘আপনার পারসােনাল টাচওয়ালা পেনসিলের চিঠিটা পড়ে মুখ বিকৃত করে বলল, বি. করিম—এই শালা আবার কে? আমার কাছে পেনসিলে চিঠি লেখে, আস্পর্ধা তাে কম নয়।
Read more