আঙুল কাটা জগলু পর্ব -০১ হুমায়ূন আহমেদ

আঙুল কাটা জগলু

স্থান : ফুলবাড়িয়া বাস টাৰ্মিনালের নর্দমার ডান পাশ।

সময় : সন্ধ্যা হবে-হবে করছে।

মাস : আষাঢ়ের শেষ কিংবা শ্রাবণের শুরু।

তারিখ : জানা নেই।

আমি হিমু, তাকিয়ে আছি আকাশের দিকে। কবিরা আকাশের মেঘ দেখে আপ্লুত হন। তবে তারা বাস টার্মিনালের নর্দমার পাশে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখেন না।নর্দমার বিকট গন্ধ নাকে লাগছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি বলে মনে হচ্ছে, গন্ধটা আকাশ থেকে আসছে।

আকাশ মেঘে মেঘে অন্ধকার। মেঘের ভাব দেখে মনে হচ্ছে ঢাকা শহরে ঝাপিয়ে পড়ার ব্যাপারে সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, তবে ঠিক কখন ঝাঁপিয়ে পড়বে এই ব্যাপারে হিসাবনিকাশ করছে। বুঝতে চেষ্টা করছে সে কখন নামলে শহরের মানুষ সবচেয়ে বেশ ঝামেলায় পড়বে। মেঘেদের মন-মেজাজ আছে। তারা রহস্য করতে পছন্দ করে।ভাইজান, কী দেখেন?

কেউ-একজন? আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। মোটামুটি বিস্মিত ভঙ্গিতে প্রশ্ন করেছে। আমি আকাশ থেকে দৃষ্টি ফেরালাম না।ভাইজান কিন্তু অখনো আমার প্রশ্নের জবাব দেন নাই। আসমানের দিকে চাইয়া কী দেখেন?

আমি আকাশ থেকে দৃষ্টি নামিয়ে আমার সামনে যে-মানুষটা দাঁড়িয়ে আছে তার দিকে তাকালাম।আমার সামনে ছোটখাটো একজন মানুষ। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি হবার কথা। গরমের সময়ও তার গায়ে ফ্লানেলের ফুলশার্ট। জিনসের প্যান্ট। প্যান্টের পা অনেকখানি গোটানো। পায়ে স্পঞ্জের স্যান্ডেল। জিনসের প্যান্টের সঙ্গে স্পঞ্জের স্যান্ডেলের কম্বিনেশন গ্রহণযোগ্য। বৃষ্টিবাদলায় স্পঞ্জের স্যান্ডেল খুব কাজে দেয়। যেটা গ্রহণযোগ্য না সেটা হলো স্পঞ্জের স্যান্ডেলের ফিতা দুটা দু রঙের। একটা সবুজ, একটা লাল।

একসময় স্পঞ্জের স্যান্ডেলের ফিতা আলাদা। কিনতে পাওয়া যেত। ফিতা ছিড়ে গেলে বাজার থেকে নতুন ফিতা কিনে লাগানো হতো। এখন এই কাজ কেউ করে না। ফিতা ছিড়ে গেলে স্যান্ডেল ফেলে দিয়ে নতুন স্যান্ডেল কেনে। ওয়ানটাইম ইউজ। আমরা দ্রুত ওয়ানটাইমের দিকে এগুচ্ছি। এই অভ্যাস কি আমরা প্রকৃতির কাছ থেকে পেয়েছি? প্রকৃতিও এরকমই করে। একটা মেঘ একবার ব্যবহার করে ফেলে দেয়। আবার নতুন মেঘ তৈরি করে।

লোকটার গালে খোচা-খোচা পাকা দাড়ি। জর্দা দিয়ে পান খাওয়া অভ্যাস আছে। মুখ থেকে ভুরিভুর করে জর্দার গন্ধ আসছে। অভাবী মানুষদের মতো গাল ভাঙা, চোখ চকচক করছে। অভাবী মানুষদের চোখ কেন জানি পশুদের চোখের মতো চকচক করে।ভাইজান, আমার নাম মতি। মতি মিয়া।

লোকটা এখন হ্যান্ডশেকের জন্যে হাত বাড়াল। এরকম রুগণ হাত আমি আগে দেখেছি বলে মনে পড়ল না। মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আলাদা আলাদাভাবে মৃত্যু হবার ব্যবস্থা থাকলে বলতে পারতাম, মতি নামের লোকটার ডান হাতের মৃত্যু হয়েছে।আমার নাম তো বলেছি, মতি মিয়া। এখন আপনার নাম কী, জানতে পারি? আমি বললাম, জানতে পারেন। আমার নাম হি।মতি মিয়া অবাক হয়ে বলল, হি? হুদামুদা হি?

ঠিকই ধরেছেন। হুদামুদা হি। হিমু থেকে সংক্ষেপ করে হি। ভালো নাম ছিল হিমালয়। হিমালয় থেকে হিমু। হিমু থেকে হি। এরপর হবে ি। সংক্ষেপ করেই যাব।সংক্ষেপ করবেন কীজন্যে?

বাংলাদেশ বিমানের বিজ্ঞাপন দেখেন না? পৃথিবী ছোট হয়ে আসছে। আমাদের নামও ছোট হয়ে আসছে। আপনার নাম তো মতি? সংক্ষেপ করে ফেলুন। এখন থেকে আপনার নাম ম। ম? জি ম। হুদামুদা ম।

মতি মিয়ার মুখের চামড়া শক্ত হয়ে গিয়েছে। ভুরু গেছে। কুচকে। মনে হচ্ছে সে রাগ সামলানোর চেষ্টা করছে। চেষ্টা পুরাপুরি সফল হলো না। রাগ থেকেই গেল। সে চাপা–গলায় প্রায় ফিসফিস করে বলল, আমার সাথে বাইচলামি করেন? এখন আমি আপনেরে যে-কথাটা বলব সেটা শুনলে বাইচলামি বন হইয়া যাইব। পাতলা পায়খানাও ছুটতে পারে।আমিও মতি মিয়ার মতো গলা নিচু করে বললাম, কথাটা কী? আপনের ডাক পড়ছে।কে ডাকছে?

আঙুল-কাটা জগলু ভাই ডাকছে। আমি আপনেরে উনার কাছে নিয়া যাব। দৌড় দেওনের চিন্তা মাথা থাইক্যা দূর করেন। চাইরদিকে আমরার লোক আছে। আমার পিছে পিছে হাঁটেন। ডাইনে-বামে চাউখ দিবেন না।চউখ বন্ধ করে ফেলি, হাত ধরে ধরে নিয়ে যান। বাইচলামি অনেক করছেন। আর না। আঙুল-কাটা জগলু ভাইরে চিনছেন তো? নাকি চিনেন নাই। পরিচয় দিব? পরিচয়ের প্রয়োজন আছে?

আমি না-সূচক মাথা নাড়লাম। জগলু ভাইয়ের পরিচয় লাগে না। উনি অতি পরিচিত ব্যক্তি। পত্রিকার ভাষায় শীর্ষ সন্ত্রাসী। বাংলাদেশ সরকার তাকে ধরিয়ে দিতে পারলে পঞ্চাশ হাজার টাকা পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছে। সন্ত্রাসী হলেও উনি শিক্ষিত। ইউনিভার্সিটি থেকে ডিগ্রি-পাওয়া মানুষ। তাঁর পড়াশোনার বিষয় ইংরেজি সাহিত্য। আঙুল-কাটা জগলু ভাইজান থাকেন কোথায়? কথা না বইল্যা চুপেচাপে হাঁটেন। নো টিক। আমি বললাম, বেশি দূর হলে একটা রিকশা নিয়ে নেই। যে-কোনো সময় বৃষ্টি নামতে পারে।

মতি মিয়া কঠিন চোখে আমার দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টি যে-কোনো মানুষকে ভড়কে দেয়ার জন্যে যথেষ্ট। দৃষ্টির কারণে এখন মতি মিয়ার চেহারাই পালটে গেছে। সরল বোকা-বোকা চেহারার বাইরেও যে তার অন্য একটা চেহারা আছে, এটা দেখে ভালো লাগছে। মতি মিয়া হাঁটছেও দ্রুত। লম্বা লম্বা পা ফেলছে। মানুষ ছোট-খাট হলেও তার পা বেশ লম্বা।

ইজিচেয়ারে যিনি শুয়ে আছেন তিনিই কি আঙুল-কাটা জগলু ভাইজান? প্রথমেই চোখ গেল আঙুলের দিকে। আঙুল ঠিক আছে। শুধু ঠিক না, বেশ ভালোরকম ঠিক। লম্বা লম্বা সুন্দর আঙুল। হাতের সঙ্গে মানানসই। পামিস্টরা এই ধরনের হাতকে বলেন কনিকেল হ্যান্ড। কৌণিক হস্ত। এধরনের হাতের মানুষেরা শিল্প-সাহিত্যের অনুরাগী হয়। তারা হয় কোমল অন্তঃকরণবিশিষ্ট ভাবুক মানুষ।

উনার বাঁ হাতের মধ্যমায় সবুজ পাথরের আংটি। গায়ে কাজ-করা পাঞ্জাবি। পরনে সবুজ রঙের এক কালারের লুঙ্গি। তার টাইপের লোকজন লুঙ্গি পরে আয়েশি ভঙ্গিতে ইজিচেয়ারে শুয়ে আছে ভাবতে কেমন যেন লাগে। এদের তো টেনশনে অস্থির হয়ে থাকার কথা। দুয়ারে প্রস্তুত গাড়ি টাইপ ব্যাপার। পালাতে হবে কিংবা এক্ষুনি অ্যাকশনে যেতে হবে।মতি ধাক্কা দিয়ে আমাকে কয়েক হাত এগিয়ে দিয়ে চাপাগলায় বলল, ওস্তাদ মাল আনছি।

জগলু ভাই চোখ তুলে একবার আমাকে দেখেই চোখ বন্ধ করে ফেললেন। মানুষটার চোখ সুন্দর, চেহারা সুন্দর। মাথাভরতি চুল। প্যাকেজ নাটকে নায়কের বড় ভাই চরিত্র দেওয়া যায় ধরনের চেহরা। যে বড় ভাই হয় ব্যাংকে কাজ করেন। কিংবা কলেজের প্রফেসর। দুই মেয়ে এবং স্ত্রী নিয়ে সংসার। একটা বড় খাটে স্বামী-স্ত্রী ঘুমান, বাচ্চা দুটো তাদের মাঝখানে থাকে। আমি জগলু ভাইয়ের বয়স আঁচ করার চেষ্টা করছি। কত হতে পারে? চল্লিশ?

মতি মিয়া বলল, নাম জিজ্ঞাস করলাম। বলতেছে নাম হি। বাইচলামি করে।জগলু ভাই একপলকের জন্যে চোখ মেলেই বন্ধ করে ফেললেন। ঠাণ্ডা গলায় বললেন, তোকে নাম জিজ্ঞাস করতে বলি নাই। ধরে আনতে বলেছি। তুই সামনে থেকে যা।

মতি মিয়া সামান্য ধমকেই ভয়ে কঁকড়ে গেল। দ্রুত ঘর থেকে বের হতে গিয়ে দরজায় বাড়ি খেল। উফ বলে চাপা আওয়াজ করল। জগলু ভাই চোখ খুললেন না। চোখ বন্ধ অবস্থাতেই পাঞ্জাবির পকেট থেকে সিগারেট বের করলেন। ঠোঁটে সিগারেট দিলেন। দেয়াশলাইয়ের কাঠি দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে সিগারেট ধরালেন। চোখ বন্ধ অবস্থায় দেয়াশলাই জুলানো বেশ কঠিন কাজ। দুই হাতে ভালো সিনক্রোনাইজেশনের প্রয়োজন হয়। শুধুমাত্র অন্ধরাই এই কাজটা পারে।

জগলু ভাই আমার দিকে হাত দিয়ে ইশারা করলেন। ইশরার অর্থ বসো কিংবা বসুন। মুখের কথায় আপনি-তুমি হয়। ইশারায় হয় না। আমি জগলু ভাইয়ের সামনে রাখা কাঠের চেয়ারে বসলাম। চেয়ারে বসা ঠিক হচ্ছে কি না বুঝতে পারছি না। জগলু ভাই হয়তো আমাকে মেঝেতে বসতে বলেছেন। এখন এই ঘরে শুধু আমি এবং জগলু ভাই।

মাঝারি ধরনের ঘর। আসবাবপত্র বলতে কয়েকটা কাঠের চেয়ার। একটা নিচু টেবিল। পুরনো আমলের হাতলওয়ালা ইজিচেয়ার। ঘরটার মধ্যে মধ্যবিত্ত মধ্যবিত্ত ভাব আছে, তবে বেশ বড় ফ্ল্যাটস্ক্রিন টিভি আছে। টিভির সঙ্গে ডিভিডি প্লেয়ার লাগানো। জগলু ভাই সম্ভবত টিভি দেখতে পছন্দ করেন। এমন হতে পারে, কোনো-একটা বিশেষ সিরিয়াল তিনি খুব মন দিয়ে দেখেন। একটাও মিস করেন না।তার একটা ইন্টারভিউ নিতে পারলে ভালো হতো। শীর্ষ সন্ত্রাসী আঙুল-কাটা জগলু ভাই বিষয়ে মানুষজন জানতে পারত।

প্রশ্ন : জনাব আপনার প্রিয় টিভি প্রোগ্রাম কোনটি?

উত্তর : কৌন বনেগা ক্রোড়পতি।

প্রশ্ন : আপনার প্রিয় রঙ?

উত্তর : সবুজ।

প্রশ্ন : আপনার প্রিয় লেখক?

উত্তর : শেক্সপিয়ার।

জগলু ভাই চোখ মেলেছেন। আধশোয়া অবস্থা থেকে তিনি এখন বসা অবস্থানে এসেছেন। আগের সিগারেট শেষ হয়ে গেছে, এখন তিনি দ্বিতীয় সিগারেট ধরাচ্ছেন। চোখ খোলা অবস্থায় দেয়াশলাইয়ের কাঠি জ্বালাতে তার বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। এই কাজটা তিনি মনে হয় চোখ বন্ধ অবস্থাতেই ভালো পারেন।তিনি বললেন (আমার দিকে না তাকিয়ে), তোমার নাম হি? আমি বললাম, সংক্ষেপে হি। হিমু থেকে হি।সংক্ষেপ কে করেছে? আমিই করেছি।কেন?

এখন সংক্ষেপের জমানা। সবকিছু সংক্ষেপ হয়ে যাচ্ছে। এইজন্যে নামটাও সংক্ষেপ করলাম।সবকিছু সংক্ষেপ হয়ে যাচ্ছে মানে কী? কী সংক্ষেপ হচ্ছে?মানুষের জীবন। যে-ছেলের বাঁচার কথা আশি বছর সে বিশ বছর বয়সে বোমা খেয়ে রাস্তায় পড়ে গেল।তোমার ঝোলার ভেতর কী?

তেমন কিছু না।ঝোলা উপুড় করে মেঝেতে ধরো। দেখি কী আছে।জগলু ভাই বেশ আগ্রহ নিয়ে ঝুঁকে এসেছেন। তিনি মনে হয় ভাবছেন, ইন্টারেস্টিং কিছু বের হবে। ইন্টারেস্টিং কিছু বের হবার কথা না। ঝোলাতে কী আছে আমি নিজেও অবিশ্যি ভুলে গেছি। আমি নিজেও আগ্ৰহ নিয়ে তাকিয়ে আছি।

আমি ঝোলা উপুড় করলাম। দুটা বলপয়েন্ট বের হলো। একটা খাতা বের হলো। আর বের হলো গ্রাকোজ বিস্কিটের প্যাকেট। প্যাকেট খোলা। আমি কয়েকটা খেয়েছি, বাকি সব প্যাকেটে আছে। জগনু খুব সাবধানে বিস্কিটের প্যাকেট হাতে নিলেন। একটা একটা করে বিস্কিট বের করছেন, শুঁকে দেখছেন মেঝেতে ফেলছেন। প্রতিটি বিস্কিট দেখা শেষ হবার পর খাতাটা হাতে নিলেন। সেটিও শুঁকে দেখে রেখে দিলেন। উনার বোধহয় কুকুর–স্বভাব। সব জিনিস শুঁকে দেখতে হয়।তুমি পুলিশের ইনফরমার?

জি না।পুলিশের ইনফরমার না হলে আমার পিছনে পিছনে ঘুরছ কেন? গত এক সপ্তাহে আমি পাঁচবার তোমাকে আমার আশপাশে দেখেছি। তোমাকে লোকেট করা সহজ। হলুদ পাঞ্জাবি দেখেই তোমাকে আমি চিনি।আমি বিনয়ের সঙ্গে বললাম, জগলু ভাই, আমি পুলিশের ইনফরমার হলে প্রতিদিন হলুদ পাঞ্জাবি পরে আপনাকে খুঁজতাম না। একেক দিন একেক পোশাক পারতাম।

তুমি কি মজিদের লোক? কোন মজিদ বলুন তো! এক মজিদকে চিনি, ঠেলাওয়ালা। ঠেলা চালায়।আর কোনো মজিদকে চেন না? জি না।বোমা মজিদের নাম শুনেছ? জি না। উনি নিশ্চয়ই আপনার মতো বিখ্যাত না। আপনার মতো বিখ্যাত হলে নাম শুনতাম।তুমি পুলিশের ইনফরমারও না, আবার মজিদের লোকও না?

জি না।জগলু ভাই আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। একজন অতি ভয়ঙ্কর ক্রিমিনাল; তার চোখের দৃষ্টি কঠিন হবার কথা। দৃষ্টি সেরকম না। চোখের দৃষ্টিতে প্রশ্ৰয়-প্রশ্রয় ভাব আছে।তার চোখের দৃষ্টির ওপর ভরসা করেই বললাম, জনাব, আপনাকে একটা প্রশ্ন কি করব? ব্যক্তিগত কৌতুহল।কী প্রশ্ন? আপনার আঙুল তো ঠিক আছে। আপনার নাম আঙুল-কাটা জগলু কেন?

আমি অন্যের আঙুল কাটি।সব আঙুল কেটে দেন, না একটা-দুটা কাটেন? তিনি আমার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে ঠাণ্ডা গলায় ডাকলেন, মতি! মতি মিয়া ঝড়ের বেগে ছুটে এল। ঘরে ঢুকতে গিয়ে আবার দরজার সঙ্গে কিলিসান। এই ব্যাচারার মনে হয় ধাক্কা রাশি। জগলু ভাই বললেন, চৌবাচ্চায় পানি আছে?

মতি বলল, অল্প আছে।চৌবাচ্চা পানি দিয়ে ভরতি কর। একে নিয়ে যা, এক মিনিট করে মাথা পানিতে ড়ুবায়ে রাখবি। তারপর জিজ্ঞেস করবি সে কার লোক, কী সমাচার। তখন মুখে বুলি ফুটবে। আমার ধারণা মজিদের লোক।জলচিকিৎসাতে যদি কাজ না হয় সকালে বাঁ হাতের কানি আঙুলটা কেটে দিস।আমি বললাম, জগলু ভাই, এক মিনিট করে চুবায়ে রাখলে জলচিকিৎসায় কাজ হবে না। আমি ড়ুব দিয়ে দেড় মিনিট থাকতে পারি।

আমার রসিকতা করার চেষ্টায় জগলু ভাই বিভ্রান্ত হলেন না। হাত দিয়ে মাছি তাড়ানোর মতো ভঙ্গি করলেন। ভাবটা এরকম যেন আমার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া শেষ।মতি মিয়া আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। তার মুখভরতি হাসি। মনে হয় পানিতে মাথা চোবানো এবং আঙুল কাটা এই দুটি কাজেই সে আনন্দ পায়। বর্তমান সময়ে মানুষের প্রধান সমস্যা কাজ করে আনন্দ না-পাওয়া। মতি মিয়া পাচ্ছে। তার জব স্যাটিসফেকশন আছে। এটা খারাপ কী?

আমি এখন আছি চৌবাচ্চাঘরে। মোগল আমল হলে বলতে পারতাম হাম্মামখানা। জানালাবিহীন ঘর। একটাই দরজা। ঘরের এক কোণে চৌবাচ্চা। ট্যাপ খোলা হয়েছে। চৌবাচ্চায় পানি দেওয়া হচ্ছে। আমার সঙ্গে এক প্রৌঢ়ও আছেন। তার হাত বাধা। প্রথম যখন ধাক্কা দিয়ে আমাকে এই ঘরে ঢোকানো হয়, তখন অন্ধকারের কারণে প্রৌঢ়ের মুখ দেখতে পাইনি। এখন চোখে অন্ধকার সয়ে এসেছে। প্রৌঢ়কে দেখতে পাচ্ছি।

দীর্ঘদিন ব্যালান্সড্‌ ডায়েট খাওয়া চেহারা। চব্বিশ ঘণ্টা এসি রুমে থাকলে চামড়ায় তেলতোলা যে ভাব আসে, তা এসেছে। পরনে ফতুয়া ধরনের পোশাক। জিনিসটিতে জটিল সুচের কাজ করা হয়েছে, অর্থাৎ দামি পোশাক। তবে ভদ্রলোক চুপসে গেছেন। তাঁর দামি ফুতুয়া ঘামে ভেজা। তিনি ক্রমাগত নড়াচড়া করছেন। ঘরে আমরা দুইজন। দরজা বাইরে থেকে তালাবদ্ধ। দরজার ফাঁক দিয়ে কিছু আলো আসছে।

আলোর একটা রেখা প্রৌঢ়ের মাথার ঠিক মাঝখানে পড়েছে। নাক এবং ঠোঁটের মাঝখান আলো হয়ে আছে। বাকিটা অন্ধকার। ফেলিনি কিংবা বাৰ্গম্যানের মতো পরিচালক থাকলে এই লাইটিং দেখে মজা পেতেন।তালাবন্ধ দরকার বাইরে লোকজন হাঁটাহাঁটি করছে বোঝা যাচ্ছে। একবার ঘড়ঘড় শব্দ হলো। মনে হচ্ছে কেউ ভারী কিছু টেনে আনছে।

ঘড়ঘড় শব্দে প্রৌঢ় ভদ্রলোক এমনভাবে কেঁপে উঠলেন যেন ট্যাঙ্ক আসছে। এক্ষুনি তার দিকে কামান তাক করে গুলি করা হবে। তিনি রাজহাঁস টাইপ ফ্যাসফ্যাসে গলায় বললেন, কী ব্যাপার? শব্দ কিসের? প্রশ্নটা তিনি আমার দিকে তাকিয়ে করলেন।আমি বললাম, মনে হয় ট্যাঙ্ক। ছোট ছোট রাশিয়ান ট্যাঙ্ক যখন চলে এরকম শব্দ হয়। ব্যালাড অব এ সোলাজার ছবিতে এরকম শব্দ শুনেছি।ভদ্রলোক মোটামুটি কঠিন গলায় বললেন, তুমি কে?

প্রথম আলাপেই সরাসরি তুমি। বোঝা যাচ্ছে, এই লোক তুমি বলেই অভ্যস্ত। শিক্ষকরা যেমন যাকে দেখে তাকেই ছাত্ৰ মনে করে, এই লোকও যাকে দেখে তাকেই মনে হয় কর্মচারী মনে করে। আমি ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে বিনীত গলায় বললাম, স্যার আমার নাম জানতে চাচ্ছেন? আমার নাম হিমু। ইদানীং সংক্ষেপ করে বলছি হি।তোমাকে এরা ধরেছে কীজন্যে?

আঙুল কাটার জন্যে ধরে নিয়ে এসেছে স্যার। ওস্তাদ জগলু ভাই মানুষের আঙুল কাটতে পছন্দ করেন শুনেছেন বোধহয়। আপনার আঙুল যেমন কাটবে। আমারটাও কাটবে। জগলু ভাইয়ের কাছে গরিব-ধনী সমান। স্যার, আপনার পরিচয়টা কি জানতে পারি? আপনার কিসের ব্যবসা?

আমি মনসুর গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক। আমার নাম মনসুর খান।শুনে ভালো লাগল স্যার। আমার হাত বাধা। হাত খোলা থাকলে আপনার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করতাম। আপনাদের মতো লোকদের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করতে পারা ভাগ্যের ব্যাপার। আপনাকে ধরেছে কীজন্যে?

টাকা চায়। বিশ লাখ টাকা চায়।দিয়ে দেন। বিশ লাখ টাকা তো আপনার হাতের ময়লা। আপনার একটা আঙুলের দাম নিশ্চয়ই বিশ লাখের বেশি।টাকা দিয়ে দিতে বলেছি। সম্ভবত এর মধ্যে দিয়েও দিয়েছে।তা হলে তো স্যার আপনি রিলিজ নিয়ে চলে যাচ্ছেন।আই হোপ সো। এরা চৌবাচ্চায় পানি দিচ্ছে কেন?

আমার জন্যে জলচিকিৎসার ব্যবস্থা করবে। জগলু ভাই অর্ডার দিয়েছেন চৌবাচ্চা ভরতি হলে এক মিনিট করে যেন আমার মাথা চৌবাচ্চায় ড়ুবানো হয়। পেট থেকে কথা বের করার পদ্ধতি।বলে কী! তোমার কথাবার্তা শুনে তো মনে হচ্ছে না। তুমি ভয় পাচ্ছি।আমি বললাম, ভয় পেলে যদি কোনো লাভ হতো তা হলে ভয় পেতাম। লাভ যখন হবে না, শুধু শুধু ভয় পাওয়ার দরকার কী? স্যার, আপনি পানিতে ড়ুব দিয়ে কতক্ষণ থাকতে পারেন? কেন?

কিছুই তো বলা যায় না, ধরেন আমাকে বাদ দিয়ে আপনাকে পানিতে চুবানো শুরু করল।আমি তো তোমাকে বলেছি তারা যা চেয়েছে সেটা দিতে বলেছি। আমি এখন রিলিজ নিয়ে চলে যাব। আমি আর দেশেই থাকিব না। কানাডায় ইমিগ্রেশন নেওয়া আছে, মেয়েকে নিয়ে চলে যাব। কানাডা।আপনার মেয়ের নাম কী? স্যার, আপনি রেগে যাচ্ছেন কেন? তুমি ফালতু কথা বলছি কেন?

ঠিক আছে স্যার, আর কথা বলব না, একটা ছোট্ট উপদেশ দেই? বিপদে উপদেশ কাজে লাগতে পারে।ফাজিল! চুপ, উপদেশ দিতে হবে না।গালাগালি করছেন কেন স্যার? আমার উপদেশটা শুনে রাখুন— পানিতে যখন মাথাটা চুবাবে নিশ্বাস নিবেন না, হাঁ করবেন না, নড়াচড়া করবেন না। ভয়ে যদি নিশ্বাস নিয়ে ফেললেন, বিরাট বিপদ হবে। নাক দিয়ে পানি ঢুকলে সমস্যা। পানি ঢুকে যাবে ফুসফুসে। জীবন-সংশয় হবে। দেড়-দুই মিনিট নিশ্বাস বন্ধ করে থাকা খুবই কষ্টকর, তবে অসম্ভব না। গিনেস বুক অব রেকর্ডসে তিন মিনিট পানিতে ড়ুব দেবার কথা আছে।

ভদ্রলোক ক্ষিপ্ত গলায় বললেন, চুপ বললাম, চুপ।।আমি মধুর ভঙ্গিতে বললাম, চেষ্টা করবেন। শান্ত থাকতে। শান্ত থাকলে শরীরের অক্সিজেনের প্রয়োজন কিছুটা কমে।তুই শান্ত থাক। তুই অক্সিজেনের পরিমাণ কমা।তুইতোকারি করছেন কেন স্যার? আমরা দুইজন একই পথের পথিক। জলচিকিৎসার রোগী। আমাদের মধ্যে পারস্পরিক সহমর্মিতা… চুপ।

ভদ্রলোক হয়তো আরো হইচই করতেন। সুযোগ পেলেন না, দরজা খুলে গেল। মতি মিয়া ঢুকল। চৌবাচ্চার পানি পরীক্ষা করল। চৌবাচ্চা এখনো ভরতি হয়নি। আমি প্রৌঢ়ের দিকে তাকিয়ে বললাম, চৌবাচ্চাটা ৬রতি হতে এতক্ষণ লাগছে কেন বুঝলাম না। মনে হয় কোনো ফুটো আছে। স্যার, আপনি কি চৌবাচ্চার অঙ্ক জানেন-একটা নল দিয়ে পানি ঢুকে আরেকটা দিয়ে চলে যায়?

প্রৌঢ় আগের মতো গলাতেই ধমক দিলেন, চুপ! আমি চুপ করলাম। মতি মিয়া এখন প্রৌঢ়ের দড়ির বাঁধন খুলছে। খুলতে খুলতেই বলল, আপনার জন্যে সুসংবাদ। এখন চলে যাবেন। ওস্তাদ আপনাকে ছেড়ে দিতে বলেছে। চাউখ বান্দা অবস্থায় মাইক্রোবাসে তুলব। দূরে নিয়ে ছেড়ে দিব। রিকশা নিয়ে চলে যাবেন।প্রৌঢ় বললেন, থ্যাঙ্ক য়ু।

মতি মিয়া বলল, আপনার তকলিফ হয়েছে, কিছু মনে নিবেন না।কোনো অসুবিধা নেই, ঠিক আছে।আপনার ভাগ্য ভালো, আপনে অল্পের ওপর পার পাইছেন।প্রৌঢ় আমার দিকে শেষ তাকানো তাকিয়ে ঘর থেকে বের হলেন। একে অবিশ্যি তাকানো বলা যাবে না। তিনি তীরনিক্ষেপের মতো দৃষ্টিনিক্ষেপ করলেন বলা চলে।

আকাশে মেঘ ডাকছে। যে-মেঘের নামার কথা ছিল সেই মেঘ তা হলে এখনো নামেনি। বৃষ্টি নামার আগের মেঘের ডাকের সঙ্গে বৃষ্টি নামার পরের মেঘের ডাকের সামান্য পার্থক্য আছে। রূপা নামের এক তরুণী আমাকে ৷ ই পার্থক্য শিখিয়েছিল। আমি শিখিয়েছি আমার খালাতো ভাই বাদলকে। মেV|বিদ্যা পুরোপুরি নষ্ট হতে দেওয়া ঠিক না।

বাদল এই বিদ্যার চর্চা করছে কি না জানি না। অনেক দিন তার সাথে দেখা হয় না। ইদানীং সে কিছু ঝামেলার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। কী-একটা গান তার মাথায় ঢুকে (গছে। সে যেখানে যায়, যা-ই করে তার মাথায় একটা গানের লাইন লাজে। বড়ই অদ্ভুত গানের কথা। প্রথম লাইনটা হচ্ছে, নে দি লদ বা রয়াওহালা গপা। সমস্যা হচ্ছে এই গান নাকি সে আগে কখনো শোনেনি। যে গান সে কোনোদিন শোনেনি সেই গান কী করে তার মাথায় ঢুকল কে জানে!, তার মাথা থেকে কি গান দূর হয়েছে?

একটা টেলিফোন হাতের কাছে থাকলে বাদলকে জিজ্ঞেস করতে পারতাম। থানাওয়ালাদের হাতে যখন ধরা খেয়েছি তখন তারা মাঝেমধ্যে টেলিফোন করতে চাইলে দিত। বেশির ভাগ সময়ই অবিশ্যি দেখা যেত তাদের টেলিফোন কাজ করে না। ডায়ালটোন আসে না, আর যদিও আসে শোশো আওয়াজ হয়। বাংলাদেশে বেশির ভাগ সময় দুই জায়গার টেলিফোন নষ্ট থাকে—পুলিশের টেলিফোন এবং হাসপাতালের টেলিফোন। এদেরকে কি জিজ্ঞেস করে দেখব। একটা টেলিফোন করতে দিবে কি-না।

বন্ধ দরজা ধড়াম করে খুলে গেল। চার-পাঁচজনের একটা দল প্রবেশ করল। দলের পুরোভাগে জগলু ভাই আছেন। এবং আমাদের প্রৌঢ়—মনসুর গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক মনসুর খাঁ সাহেবও আছেন। তার মুখ ঝুলে পড়েছে। এবং তিনি হাঁপানি রোগীদের মতো টেনে টেনে শ্বাস নিচেছন।

ঘটনা আঁচ করতে পারছি। বিশ লক্ষ টাকা জায়গামতো পৌঁছেনি। মনসুর সাহেবের মেয়ে হয়তো পুলিশে খবর দিয়েছে। সাদা পোশাকের পুলিশ একটা বেড়াছেড়া বাধিয়েছে। কিংবা টাকার বদলে সুটকেসভরতি পুরনো খবরের কাগজ পাঠিয়ে দিয়েছে। তার বাবা যে কত বড় বিপদে আছে সে বোধহয় আঁচ করতে পারছে না।

জগলু ভাইয়ের হাতে সিগারেট। তিনি ঘনঘন সিগারেট টানছেন। যতবারই টানছেন ততবারই আড়াচোখে তার রিস্টওয়াচের দিকে তাকাচ্ছেন। এই প্রথম তার মধ্যে উত্তেজনা লক্ষ করলাম। উত্তেজনায় তার নাক ঘামছে। সমুদ্রবিদ্যা বইয়ে আছে, মানসিক উত্তেজনাকালে যে-পুরুষের নাক ঘামে সে স্ত্রী-সোহাগী হয়। জগলু ভাই কি স্ত্রী-সোহাগী?

জগলু ভাই বললেন, বুড়ার মাথা পানিতে চুবাও। তার আগে বদমাইশের মেয়েটাকে মোবাইল টেলিফোনে ধরো। বুড়ার মাথা পানি থেকে তোলার পর টেলিফোনটা বুড়ার হাতে দাও। বুড়া মেয়ের সঙ্গে কথা বলুক। ঘুঘু দেখেছে, ফাঁদ দেখেনি। আমার সঙ্গে টালটুবাজি?

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *