আজ হিমুর বিয়ে পর্ব – ৪ হুমায়ূন আহমেদ

আজ হিমুর বিয়ে

গরিবের বিয়ের আবার বাজার! সুযোগ যখন পাওয়া গেছে বধ্যভূমিটা দেখে যাই।স্মৃতিসৌধ দেখে মুগ্ধ হওয়া ঠিক না। মুগ্ধ হবার মানে যাদের স্মৃতিতে সৌধ তারা গৌণ, সৌধটা মুখ্য। তারপরেও মুগ্ধ হতে হলো। বড় একটা দেয়াল। দেয়ালের এক অংশে জানালার মতো কাটা। সেই জানালায় আকাশ দেখা যাচ্ছে।সৌধ ধূলামলিন, চারদিকে আবর্জনা, কিন্তু জানালার বাইরের আকাশ ঝকঝক করছে।

এই আকাশ স্মৃতিসৌধেরই অংশ।সৌধের ভেতরই হিরুচির দেখা পাওয়া গেল। তাদের নোংরা, কাপড়-চোপড় নোংরা, কিন্তু তাদের চোখ স্মৃতিসৌধের জানালার মতো ঝকঝক করছে।আপনারা ভালো আছে?—বলে তাদের দিকে এগিয়ে গেলাম। দু’জনই নড়েচড়ে বসল, প্রশ্নের জবাব দিল না। মকবুল আমার সঙ্গে সঙ্গে আসছে। সে বলল, স্যার এরার সাথে কথা বইল্যা কোনো ফায়দা নাই। চলেন মিরপুরের দিকে যাই।মিরপুরে কী?

বেনারসী শাড়ির কারখানা। বউ-এর জন্যে একটা শাড়ি কিনবেন না? আমার এক ভাই আছে কারিগর। সস্তায় কিনায়া দেব।দুই হিরুচির সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করে তারপর যাই। শাড়ি কী ধরনের হবে এই বিষয়ে এদের সঙ্গে কথা বলি।বাদ দেন তো স্যা। এরার সাথে ছুরি চাক্কু থাকে। কখন কী করে নাই ঠিক।হিরুচি দু’জনকে তেমন ভয়ঙ্কর মনে হলো না। একজন তার পরিচয় দিল—সামছু। ঠেলাগাড়ি চালায়। অন্যজন পরিচয় দিল না। সারাক্ষণই মাথা নিচু করে রাখল।

সামছু ভাই, এই জায়গাটা কি জান্নে? জানব না কেন? শহীদ বুদ্ধিজীবীর মাজার শরীফ।বুদ্ধিজীবী কি জানেন? সামছু উদাস গলায় বলল, জানি। আপনাদের মতো ভদ্দরলোক। ভালো কাপড় পরে। চোখে চশমা দেয়, গাড়িতে কইরা ঘুরে। সুন্দর সুন্দর কথা বলে।আমি বললাম, আজ আমার বিয়ে। শাড়ি কিনতে যাচ্ছি। কী রঙের সাড়ি কিনব বলুন তো? মেয়ের গায়ের রঙ কী?

শঙ্খের মত শাদা।হিরুচি সামছু অনেক ভেবে চিন্তে বলল, হইলদা শাড়ি কিনেন। শাদার সাথে হইলদা। অপর হিরুচিও সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল। নেশাখোররা কোনো ইস্যুতে সহজে দ্বিমত পোষণ করে না।ড্রাইভার মকবুল বলল, অনেক ঘুরা ফিরা করছেন, চলেন শাড়িটা কিনি। মিরপুরে যাই।শাড়ি কেনার টাকা তো নাই। পাঁচশ’ টাকা পেয়েছিলাম। দেড়শ’ খরচ হয়ে গেছে। তিনশ’ আছে। এতে কি চলবে? বললাম না আমার ভাই আছে। বাকিতে কিনায়া দেব।আমি বললাম, আগে থানায় চল। থানা! থানায় যাবেন কেন? জরুরি কাজ আছে।কোন থানা?

মকবুলের কথায় চিন্তায় পড়ে গেলাম। রেনুর প্রেমিক কোন থানায় আছে তা জানা নেই। মাজেদা খালার বাড়ি যে থানায় সেখানকার হাজতেই তার থাকার কথা। অনেক সময় উলটপালটও হয়। পুলিশের উপরের লেভেলের নির্দেশে যখন কাউকে ধরা হয় তখন আর এলাকার ভাগ থাকে না।চল ধানমণ্ডি থানায়। তারপর অন্য থানাগুলিতে যাব। আজ ধারাবাহিক ধানা পরিক্রমা।থানায় আপনের ঘটনা কী? ওসি সাহেবকে বিয়ের দাওয়াত দেব। সত্যই দাওয়াত দিবেন?

হুঁ। অনেকবার থানা হাজতে কাটিয়েছি। বেশিরভাগ ওসি সাহেবের সাথে পরিচয় আছে। তারা আমার দুঃখ দিনের সাথী।মকবুল নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আপনার কাজ কাম বড়ই জটিল। আত্মীয়স্বজনের খোঁজ নাই—ওসি সাবেহরা দাওয়াতি।গাড়ি ট্রাফিক জ্যামে আটকা পড়েছে। জ্যামের বাজার শুরু হয়েছে। ফেরিওয়ালারা এক গাড়ির জানালা থেকে আরেক গাড়ির জানালায় যাচ্ছে। তাদের কারণে ভিক্ষুকরা সুযোগ পাচ্ছে না। কনুইয়ে গুঁতো দিয়ে তারা ভিক্ষুক সরাচ্ছে।

কেউ হাতে দু’টা পাকা পেঁপে নিয়ে ঘুরছে, কেউ কানকোয় দড়ি বাঁধা কাতল মাছ নিয়ে ঘুরছে। পপকর্নের প্যাকেট নিয়ে বেশ কয়েকজন আছে, এই আইটেমটা মনে হয় চালু। এতকিছু থাকতে হঠাৎ পপকর্ন চালু আইটেম হয়ে গেল কেন কে বলবে! ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরিও আছে। দশ-বারোটা পেপারব্যাক বই নিয়ে কয়েকজন ঘরছে। হ্যারি পটার, জেনারেল মোশারফের আত্মজীবনী। বিক্রিও হচ্ছে।

গাড়ির ভেতর আরামদায়ক শীতলতা। বাইরে তেজি রোদ। সেই রোদ আমাকে স্পর্শ করছে না। রোদের দিকে তাকিয়ে ঘুমিয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে। সারা শরীরে আরাম আরাম ভাব। আরাম ব্যাপারটা কী—ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন। বটগাছের নিচে শান্তিনিকেতনি কায়দায় ক্লাস হচ্ছে। ক্লাসে নিচ্ছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। একজন তাঁর মাথায় ছাতা ধরে আছে।

ছত্রধর খুব পরিচিত, কিন্তু কে ধরতে পারছি না। রবীন্দ্রনাথের হাতে এক ঠোঙা পপকর্ন। তিনি পপকর্ন চিবুতে চিবুতে ‘আরাম কী?’ ত্র ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। তিনি বলছেন—আরাম দুই প্রকার—শারীরিক এবং মানসিক। এই যে আমি পপকর্ন খেয়ে মজা পাচ্ছি এটা শারীরিক আরাম। আবার পপকর্নগুলি দেখতে বোঁটাহীন শিউলীফুলের মতো। এক ঠোঙা ফুল দেকেহ যে আরামটা পাচ্ছি এটা মানসিক।

শরীরের প্রয়োজন মেটার ফলে যে আরাম হয় সেটা শারীতরিক আরাম, আবার মনের প্রয়োজন মেটার ফলে যে আরাম হয় তা মানসিক আরাম।আরামের যে অন্য অর্থ আছে তা কি তোমরা জানো? আরামের অর্থ বাগান। আবার উপবনও হতে পারে। আমার কথা বিশ্বাস না করলে তোমরা ডিকশনারি দেখতে পার।এখন তোমরা বলো, সংঘারাম মানে কী? সংঘারাম একটি সমাসবদ্ধ পদ। ব্যাস বাক্য কী? ছত্রধারী বললেন, গুরুদেব, আপনি তো ব্যাকরণের ক্লাস নিচ্ছেন না। আপনার কাছ থেকে ছাত্ররা অন্যকিছু জানতে চায়।

রবীন্দ্রনাথ সঙ্গে সঙ্গে বললেন, তাই তো! তাই তো! আচ্ছা আরামের সঙ্গে মিল দিয়ে শব্দ লিখতে থাক। এতে অন্তমিলের বিষয়টা সড়গড় হবে।আরাম হারাম আমি এই দুটা বললাম, বাকিগুলি তোমরা বের কর। তাড়াতাড়ি।এই সময় ঘুম ভাঙল। গাড়ি থানা কম্পাউণ্ডে ঢুকেছে। থানার সেণ্ট্রি সরু চোখে তাকাচ্ছে। এত বড় গাড়িতে কে এসেছে আঁচ করার চেষ্টা। সেই অনুযায়ী ঠিক করবে স্যালুট দেবে কি দেবে না।

সিভিলিয়ানদের নিয়ে এই সমস্যা। কে বিশিষ্টজন কে বিশিষ্টজন না এইসব গায়ে লেখা থাকে না। তাদের কোনো আলাদা পোশাকও নেই। ভবিষ্যতের মানুষদের এরকম ব্যবস্থা থাকবে বলে মনে হয়। সবাইকে শরীরে ব্যাজ পরতে হবে। সেই ব্যাজ বলে দেবে লোকটির পেশা কী, ব্যাংকে তার কত টাকা আছে, বিবাহিত কি-না, রক্তের গ্রুপ, বয়স ইত্যাদি।

ওসি সাহেব আআর পরিচিত। নাম সুলেমান। তাঁর সময়ে আমি একবার দু’রাত হাজতে ছিলাম। শেষটায় ভালো খাতির হয়ে গিয়েছিল। তাঁর স্ত্রীর রান্না হাঁসের মাংস এবং ভুনাখিচুড়ি টিফিন কেরিয়ারে রান্না করে খাইয়েছিলেন। ভদ্রমহিলার নাম পারুল। তিনি আমাকে দেখেই ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর হয়ে গেলেন। আমি অতি বিনয়ের সঙ্গে বললাম, স্যার, কেমন আছেন? ওসি সাহেব বললেন, কী চাও? একটা বিশেষ প্রয়োজনে এসেছিলাম স্যার।কী প্রয়োজন বলে বিদায় হও। নানান ঝামেলায় আছি। তোমার সঙ্গে কথার খেলা খেলতে পারব না। কী বলতে এসেছ স্ট্রেইট বলো। নো হাংকি পাংকি।

আমি বললাম, আরামের সঙ্গে মিল হয়ে এরকম কয়েকটা শব্দ দরকার। আমি একটা পেয়েছি—হারাম। আর পাচ্ছি না।ওসি সাহেবের চেহারা থেকে বিরক্ত ভাব দূর হয়ে চিন্তিত ভাব চলে এলো। তাঁর মস্তিষ্ক এখন আরামের সঙ্গে মিল আছে এমন শব্দ খুঁজে বেড়াচ্ছে। ওসি সাহেব চাচ্ছেন না, কিন্তু মস্তিষ্ক তার কাজ করেই যাচ্ছে। নিজের মস্তিষ্কের উপর মানুষের যে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই তা মানুষ জানে, কিন্তু স্বীকার করে না।ওসি সাহেব বললেন, হিমু বোস। চা খাবে?

খাব।ওসি সাহেব চোখের ইশারায় চা দিতে বললেন। চোখের ইশারায় এমন ব্যবহার আগে দেখি নি।ওসি সাহেব বললেন, আরামের সঙ্গে হারাম ছাড়া তো আর কিছু পাচ্ছি না।আরো অনেক আছে। বাংলা ভাষা সহজ জিনিস না। বিশাল সমুদ্র।তুমি থানায় এসেছ কেন সেটা বলো। আরাম হারাম নিয়ে যে আস নি এটা জানি।আপনারা কি কোনো অল্পবয়সি ছেলেকে আজ ধরে এনেছেন?

অল্পবয়সি ছেলেপুলে তো আমরা সবসময় ধরে আনি।যে ছেলের কথা বলছি সে তেমন কোনো অপরাধ করে নি। তার অপরাধ সে তার প্রেমিকার বাড়ির সামনে বসে ছিল।বুঝেছি। তূর্য। তোমার কে হয়? আমার কেউ হয় না।কেউ না হওয়াই ভালো। মেরে হাড্ডি গুঁড়া করা হয়েছে।উপরের নির্দেশ ছিল?

হ্যাঁ ছিল। উপরের নির্দেশে এক দফা মারা হয়েছে, তারপর নিজের দোষে আরেক দফা মার খেয়েছে হাজতে। হাজতে কী করছে? হিরোইন নেয়ার টাইম হয়ে গেছে। সঙ্গে নাই জিনিস। আধাপাগল হয়ে গেছে। পুরিয়ার জন্যে সবার হাতেপায়ে ধরছে। কী যে অবস্থা! শরীর গেছে ফুলে। পেশাব করে কাপড় নষ্ট করেছে। দুর্গন্ধে কাছে যাওয়া যায় না।সে কার ছেলে জানেন? কার ছেলে?

বাবার আইডেনটিটি ডিসক্লোজ করা যাবে না। সমস্যা আছে। শুনলে আপনি খাবি খাবেন।তুমি ধানাইপানাই গল্প ছাড়। তোমার ধানাইপানাই স্টোরির সঙ্গে আমি পরিচিত। ছেলের বিষয়ে খোঁজ নিয়েছি। স্কুল মাস্টারের ছেলে। বাবা-মা অল্প বয়সে মারা গেছেন, চাচার কাছে মানুষ হয়েছে। মানুষ তো না, অমানুষ হয়েছে। তুমি তার সঙ্গে দেখা করতে চাচ্ছ দেখা করো। হাংকি পাংকি করার দরকার নেই। তোমাকে থানায় ঢুকতে দেয়াই উচিত হয় নি। তুমি আমার মাথার ভেতর আরাম হারাম ঢুকিয়েছ। এখন সব ফেলে মিলের শব্দ চিন্তা করছি। আমার তো ধারণা এই দু’টা ছাড়া নেই।

অবশ্যই আছে।

থাকলে বলো, মাথার ভনভানানি দূর হোক।

আমি বললাম, আরাম

হারাম

গেরাম

ব্যারাম

ক্যারাম

ওসি সাহেব বললেন, আর কি আছে? অবশ্যই আছে। আপনি চিন্তা করতে থাকুন, আমি এই ফাঁকে তূর্যের সঙ্গে কথা বলে আসি।তূর্যের চেহারা সুন্দর হবে এটা আমি ধরেই নিয়েছিলাম। এতটা সুন্দর হবে কল্পনাও করি নি। একজন দেবদূত হাজতের শিক ধরে বসে আছে। বড় বড় স্বচ্ছ অভিমানী চোখ। চোখের দিকে তাকালেই মনে হয়, কিছুক্ষণ আগে এই চোখ অশ্রুবর্ষণ করেছে। প্রাচীন গ্রীক ভাস্কররা এই ছেলেকে দেখলে মডেল হিসেবে অবশ্যই ব্যবহার করতেন। এই ছেলের গায়ে কেউ হাত তুলতে পারে ভাবাই যায় না। রেবুর পাশে এই ছেলেকে দাঁড় করিয়ে ভোটাভুটি করলে তূর্যের ভোট বেশি পাবার সম্ভাবনা আছে।

হ্যালো তূর্য।তূর্য চমকে তাকাল। কিছু বলল না।আমি তোমার জন্যে দুই পুরিয়া জিনিস নিয়ে এসেছি। পচা বাবার কাছ থেকে এনেছি। পচা বাবার নাম শুনেছ? তূর্যের দৃষ্টি তীক্ষ্ম হলো। তার পাতলা ঠোঁট কাঁপছে। সে ঘনঘন নিঃশ্বাস ফেলছে। তূর্য বলল, আপনি কে? আমার নাম হিমু।আমাকে চেনেন কীভাবে? রেনুর মাধ্যমে চিনি। রেনুর কথা মনে আছে তো? তূর্য বলল, পুরিয়া দিন।এখনই খাবে? তূর্য জবাব দিল না। আমি দেখলাম তার হাতের আঙুল কাঁপছে। ঠোঁট কাঁপছে, চোখের পাতাও কাঁপছে। আসন্ন নেশার উত্তেজনাতেই এমন হচ্ছে।

রেনুর বিয়ে হচ্ছে, এই খবর পেয়েছ? না। কার সঙ্গে বিয়ে হচ্ছে? আমার সঙ্গে। আজ রাত ন’টা সাড়ে ন’টার দিকে বিয়ে হবে। তুমি কি বরযাত্রী হিসেবে যেতে চাও? তূর্য জবাব না দিয়ে বলল, আমাকে পুরিয়া দিন।এত তাড়াহুড়া কেন? আগে কথা বলি।কথা বলতে ভালো লাগছে না।রেনুর সঙ্গে কথা বলবে? না।না কেন? রেবুর সঙ্গে তোমার ভাব আছে না? জানি না।জানবে না কেন? আমি বুঝতে পারি না।

যাই হোক, তোমাকে আমি ছোট্ট একটা কাজ দেব। জটিল কোনো কাজ না। সহজ কাজ। কাজটা করা মাত্রই পুরিয়া হাতে পাবে। ওয়ার্ড অব অনার।কাজটা কী? রেনুকে বলবে সে যেন তার হাতের রগ না কাটে। টেলিফোনে বলবে। আমি লাইন করে দেব, তুমি বলবে।হাতের রগ কাটা মানে কী? রেনু বলেছে, আমার সঙ্গে যদি তার বিয়ে হয় তাহলে সে তার হাতের রগ এটে মারা যাবে। সে সেভেন ও ক্লক ব্লেড নিয়ে তৈরি।

তূর্যের ঠোঁটে সামান্য হাসির আভাস দেখা গেল। সে সঙ্গে সঙ্গে সেই হাসি মুছে ফেলে বলল, আমি টেলিফোন করব।থ্যাংক য়্যু। আমি লাইন করে দিচ্ছি। টেলিফোনে কথা শেষ হওয়া মাত্র পুরিয়া।রেনু কি ভালো আছে? তাকে তালাবন্ধ করে রাখা হয়েছে, তবে সে ভালো আছে। তুমি একটু অপেক্ষা কর, আমি লাইন করে দিচ্ছি, তুমি রেনুকে বুঝিয়ে বলো।

নানান ঝামেলা করে খালার মাধ্যমে রেনুকে ধরা গেল। আমি মোবাইল টেলিফোন তূর্যের হাতে দিয়ে দিলাম। তূর্য কথা বলছে। ওপাশ থেকে রেনু কী বলছে শোনা যাচ্ছে না। তূর্যও কথা বলছে অতি নিচু গলায়। কী বলছে আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। হয়তো এরকম নিচু গলাতেই সে কথা বলায় অভ্যস্ত।তূর্য টেলিফোন শেষ করল। আমি বললাম, তুমি কি আমার কথাটা বলেছ? না।বলো নি কেন?

তূর্য চুপ করে রইল। আমি বললাম, মোবাইল টেলিফোনটা তোমার কাছে দিয়ে যাচ্ছি। একটা পুরিয়াও দিয়ে যাচ্ছে। আমার বিষয়ে রেনুর কাছে সুপারিশের পরপরই পুরিয়া ব্যবহার করতে পারবে। তবে সুপারিশ না করে জিনিস খাবে না।তূর্য তাকিয়ে আছে একদৃষ্টিতে। কিছু একটা বলতে গিয়েও বলল না। আমি বললাম, তোমাকে যা বলেছি মনে আছে তো? আমার বিষয়ে সুপারিশ করার পরে পুরিয়া খাবে, তার আগে না।

তূর্য ঘাড় কাত করল।আমি বললাম, রেনুকে বিয়ে করার ব্যাপারে আমার আগ্রহের কারণ জানো? আমি মেয়েটার প্রেমে পড়ে গেছি। ঐ বিখ্যাত লাইন মনে আছে?— ‘রমণীর মন সহস্র বৎসরের সখা সাধনার ধন।’ রেনুর মন আমি এখনো পাই নি। সাধনা সেইভাবে শুরু করি নি বলে পাই নি। কয়েকঘণ্টা মাত্র সাধনা করেছি।আপনার নাম কী?

একবার কিন্তু তোমাকে নাম বলেছি। তারপরেও আরেকবার বলছি—আমার নাম হিমু।পুরিয়া দিন।আমি পুরিয়া দিলাম। মোবাইল টেলিফোন দিয়ে বললাম, টেলিফোন এবং পুরিয়া দু’টাই লুকিয়ে রাখবে। থানাওয়ালাদের চোখে পড়লে তারা নিয়ে নিতে পারে।চলে আসার আগে ওসি সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। তিনি খুবই বিরক্ত ভঙ্গিতে বললেন, এখনো যাও নি?

আমি বিনয়ে গলে গিয়ে বললাম, স্যার, এখনি যাচ্ছি। একটা ছোট্ট জিজ্ঞাসা ছিল। অতি ছোট জিজ্ঞাসা। ধূলিকণার মতো ছোট।ওসি সাহেব ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। আমি বললাম, আপনার আসামি তূর্য বিষয়ে একটা কথা।ভনিতা রাখ। কী বলবে বলো।আমি বললাম, তূর্যের সঙ্গে মিল দিয়ে হয় সূর্য। স্যার, আর কিছু কি হয়?

ওসি সাহেবের মুখে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই হতাশার ছায়া পড়ল। বোঝা যাচ্ছে তাঁর মস্তিষ্ক মিল খুঁজতে শুরু করেছে। অন্তমিলযুক্ত আরেকটা শব্দ মনে না আসা পর্যন্ত অনুসন্ধান চলতেই থাকবে। এই বিষয়টা সবার ক্ষেত্রে ঘটে না। কাজেকর্মে এবং চিন্তাভাবনায় জর্জরিত মানুষের ক্ষেত্রে ঘটে। প্রবল চাপে পর্যুদস্ত মানুষের ক্ষেত্রে ঘটে। মস্তিষ্ক চাপ থেকে মুক্তি পাআব্র জন্যে সহজ পথ খোঁজে। অন্তমিলের অনুসন্ধান মস্তিষ্কের জন্যে সহজ মুক্তির পথ।স্যার, আপনার অফিসের টেলিফোনটা একটু ব্যবহার করতে পারি?

ওসি সাহেব থমথমে মুখে টেলিফোন এগিয়ে দিলেন। আমি খালু সাহেবকে টেলিফোন করলাম।আমি বললাম, হ্যালো, ধানমণ্ডি থানা থেকে বলছি।খালু সাহেব হড়বড় করে বললেন, গাড়ি কি পাওয়া গেছে? খালু সাহেব, আমি হিমু। তুমি! তুমি থানায় কী করছ? ওসি সাহেবকে দাওয়াত দিতে এসেছি। বিয়ের দাওয়াত। খালু সাহেব, গাড়ির কোনো খোঁজ পাওয়া যায় নি? ইয়ারকি বন্ধ করো। ইডিয়ট।

খালু সাহেব টেলিফোন রেখে দিলেন। ওসি সাহেব শূন্যদৃষ্টিতে তাঁর সামনে দেয়ালে ঝুলানো ক্যালেণ্ডারের দিকে তাকিয়ে আছেন। আমি বললাম, স্যার যাই?ওসি সাহেব বললেন, তূর্য এবং সূর্য ছাড়া আর কিছু তো পাচ্ছি না।চেষ্টা করতে থাকুন। পেয়ে যাবেন।‘কর্জ’ কি চলবে? কর্জ চলবে না। উকার লাগবে। কুর্জ চলত। কুর্জ বলে শব্দ নেই।হিমু শোন, আর কোনোদিন যেন তোমাকে থানায় না দেখি।পারুল আপা কেমন আছে স্যার?

সে ভালো আছে।উনার রান্না করা হাঁসের মাংস এবং খিচুড়ির স্বাদ এখনো মুখে লেগে আছে।ওসি সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন, তোমার মতলব আমার কাছে পরিষ্কার। পারুলের কথা বলে আমার মন ভুলাবার চেষ্টা করছ। কাজ হবে না।পারুল আপাকে বিয়ের দাওয়াত দেয়ার শখ ছিল।সে ঢাকায় নেই। সে মুন্সিগঞ্জে তার মায়ের বাড়িতে গেছে।

আমার কাছে গাড়ি আছে। আপনি ঠিকানাটা দিন। একটানে চলে যাব।তুমি বিদেয় হও। বিদায়।বিয়ের শাড়ি কিনতে যাব। পারুল আপার মতামতটা পেলে ভালো হতো। এইসব বিষয় মেয়েরা ভালো বোঝে। শুনেছি এখনকার ফ্যাশন বিয়েতে লালশাড়ি না পরা। বিধবা হলে কিংবা স্বামী তালাক দিলেই শুধু লাল শাড়ি।তুমি যাবে, না বকবক করতেই থাকবে? বিয়ের শাড়ি হিসেবে সবুজ রঙটা কি আপনার পছন্দ?

আমার ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙেছে, এখন কিন্তু থাপ্পর খাবে।থাপ্পর খাবার আগেই গাড়িতে উঠলাম। গাড়ি চলছে মিরপুরের দিকে। বিয়ের শাড়ি কেনা হবে। মকবুলের ভাইকে পাওয়া গেলে হয়। আমার হাতে আছে একশ’ পঁচিশ টাকা। এই টাকায় কাদের সিদ্দিকীর গামছা হবে, শাড়ি হবে না।গাড়ির সিটে মাথা দিয়ে চোখ বন্ধ করতেই গুরুদেবের দেখা পেলাম। তিনি বললেন, বিয়ের শাড়ি সবুজ না হওয়া বাঞ্ছনীয়।আমি বললাম, সবুজ না কেন? সবুজ রঙটার বিষয়ে আমার আপত্তি আছে।সবুজ নিয়ে আপনার এত মাতামাতি, আবার সবুজ রঙ নিয়েই আপত্তি। কারণটা কি বলবেন?

রবীন্দ্রনাথ বিরক্ত গলায় বললেন, আমি যে কালার ব্লাইন্ড এই তথ্য তো জানো। এই নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে, না জানার কথা না। সবুজ রঙ আমি চোখেই কোনোদিন দেখি নি।খাইছে আমারে।আমার সামনে এ ধরনের অশালীন ভাষা প্রয়োগ করবে না।‘খাইছে আমারে’র বললে ‘আমাকে ভক্ষণ করেছে’ কি বলা যাবে? তুমি কথ্য ভাষায় কথা বলছ, এর মধ্যে হঠাৎ ‘ভক্ষণের’ মতো একটা তৎসম শব্দ ব্যবহার কেন করবে? ভাষার জগাখিচুড়ি আমার পছন্দ না।জগাখিচুড়ি জিনিসটা কি স্যা? খিচুড়ি জানি। কিন্তু জগাখিচুড়ি?

রবীন্দ্রনাথ চশমা ঠিক করতে করতে বললেন, জগন্নাথের মন্দিরে রোজ নানান পদ মিলিয়ে খিচুড়ি রান্না হতো। সেখান থেকে এসেছে জগাখিচুড়ি।স্যার, আপনাকে কিন্তু আমার বিয়েতে বরযাত্রী হিসেবে যেতে হবে। এবং উপহার হিসেবে চার লাইনের কবিতা। মেয়ের নাম রেনু। রেনুর সঙ্গে মিলিয়ে চারটা লাইন।

রবীন্দ্রনাথ বিড়বিড় করে বললেন—

ওরে রেনু, ওরে আমার রেনু

একা বসে বাজাস কেন বেবু?

ওরে আমার রেনুতে কিছু আপত্তি আছে। শুনলে মনে হয়, সে আপনার রেনু। আপনি যদি বলতেন— ওরে রেনু, ওরে হিমুর রেনু

কা একা কেন চরাস ধেনু? তাহলে কেমন হয়? রবীন্দ্রনাথ ভুরু কুঁচকে বললেন, মেয়েমানুষ ধেনু চরাবে কেন?

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *