টোপ নাম্বার চার
যদিও তিনটা টোপ ব্যবহার করার কথা ছিল, তারপরেও আমি চতুর্থ টোপটি ব্যবহার করছি। অনেকের ব্যাপারে এই টোপ কাজ করলেও আপনার ব্যাপারে করবে বলে মনে হচ্ছে না। এটা হল লিলির রান্না। রান্নার উপর নােবেল পুরস্কার দেবার ব্যাপার থাকলে প্রতি বছরই সে একটা করে নােবেল পুরস্কার পেত। সামান্য আলু ভাজাও যে অমৃতসম খাদ্য হতে পারে লিলির আলু ভাজা না খেলে বুঝতে পারবেন না।
টোপ নাম্বার পাঁচ
ক্ষমা প্রার্থনা পূর্বক আরাে একটি টোপ। এটি আপনাকে কাবু করে ফেলবে বলে আমার ধারণা। আমার ব্যক্তিগত লাইব্রেরীর কথা বলছি। বইয়ের মােট সংখ্যা আঠারাে হাজারের বেশি। আপনার পছন্দের বিষয়ে (সাইকোলজি, বিহেভিয়ারেল সায়েন্স)
প্রচুর বই আছে। শুধু একটি নাম উল্লেখ করছি Asmond–এর The Other Mind.
মিসির আলি সাহেব, কয়েকটা দিনের জন্যে আপনি কি আসতে পারেন না ? আমার শরীর পঙ্গু কিন্তু মনটা পঙ্গু না। আপনি নিজে একজন সতেজ মনের মানুষ। আপনার সঙ্গে। মানসিক যােগাযােগের জন্যে গভীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি।
আমিই মিসির আলি-পর্ব-(৫)-হুমায়ূন আহমেদ
বিনীত
এস. সুলতান হক পুনশ্চ: আকাশ দেখার জন্যে এই সময়টা খুব ভালাে। কুয়াশা থাকে না। এবং চারদিন পরই অমাবস্যা। আকাশ ভর্তি হয়ে যাবে তারায়। শুক্লপক্ষ তারা দেখার জন্যে ভালাে না। চাঁদের আলােয় – তারাদের ঔজ্জ্বল্য কমে যায়। কাজেই এখনি সময়।
মিসির আলি যে–কোনাে চিঠি তিনবার পড়েন। চিঠির ভেতরে কিছু কথা থাকে যা একবার পড়ে ধরা যায় না। দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয়বারে ধরা পড়ে। এটিও তিনবার পড়লেন। সুন্দর চিঠি। সুন্দর হাতের লেখা। প্রতিটি অক্ষর স্পষ্ট। কাটাকুটি যে নেই তা না। তবে কাটা অংশগুলি হােয়াইট ইঙ্ক দিয়ে মুছে দেয়া। ভদ্রলােকের বাগানবাড়িতে যেতে ইচ্ছা করছে।
কিন্তু সম্ভব না। মিসির আলি তার ছাত্রকে কুরিয়ারে চিঠি দিয়েছেন। সে সব কাজ ফেলে টেকনাফে এসে বসে থাকবে। তিনি না পৌছলে খুব অস্থির বােধ করবে। দুশ্চিন্তা করবে। তিনি কাউকে অকারণ দুশ্চিন্তায় ফেলতে চান না।
লিলিকে দেখে মিসির আলি চিনতে পারলেন না। চিনতে পারার কথাও না— দরজা ধরে যে দাড়িয়ে আছে সে আগের দিনের লিলি না, অন্য কেউ । মাথার চুল নীল রঙের স্কার্ফ দিয়ে ঢাকা। চোখে কালাে চশমা। ঠোটে গাঢ় লাল লিপস্টিক। জাপানি কিমাননার মতাে একটা পােশাক পরেছে। তার রঙ দেখে চোখ ধাধিয়ে যায়। উঁচু হীলের জুতা পরেছে বলে তাকে দেখাচ্ছেও অনেক লম্বা।
আমিই মিসির আলি-পর্ব-(৫)-হুমায়ূন আহমেদ
চাচাজি আমাকে চিনতে পারছেন না, আমি লিলি। মাহাবা বেগম। মিসির আলি বিড়বিড় করে বললেন, ও আচ্ছা আচ্ছা। সত্যি করে বলুন তাে আমাকে চিনতে পেরেছিলেন ?
চিনতে পারি নি। মানুষের চেহারা মনে রাখা কত কঠিন দেখলেন ? দেখলাম।
আমি কী করেছি জানেন ? লম্বা করে লিপস্টিক দিয়ে ঠোঁট লম্বা করেছি। মানুষকে চেনা যায় ঠোঁট দিয়ে আর চোখ দিয়ে। যে দু’টা জিনিস দিয়ে চেনা যায়, সে দু’টা জিনিস আমি বদলে দিয়েছি। চশমা দিয়ে চোখ ঢেকেছি আর ঠোট বদলে দিয়েছি।
মিসির আলি বললেন, লিলি বােস। তােমাকে সুন্দর লাগছে।
সুন্দর দেখাবার জন্যে আমি সাজ করি নি। নিজেকে বদলে দেবার জন্যে করেছি। ভালাে কথা চাচাজি, আপনি কি কেরােসিনের চুলা এইসব কিনে ফেলেছেন ? না কেনা হয় নি।
লিলি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলল, বাচলাম। কারণ আমি সব কিনে ফেলেছি। এমন অনেক কিছু কিনেছি যা লিস্টে ছিল না, যেমন হারিকেন, টর্চ, ব্যাটারি। হাফ কেজি সুতলি কিনেছি।
আমিই মিসির আলি-পর্ব-(৫)-হুমায়ূন আহমেদ
সুতলি কেন ? এখন আপনার কাছে মনে হচ্ছে সুতলি কী জন্যে? কিন্তু একা থাকতে গিয়ে
দেখুন সুতলি কত কাজে লাগবে। মশারি খাটাবার জন্যে লাগবে। ভেজা জামা কাপড় শুকুতে দেবেন তার জন্যে দড়ি টানাতে হবে। আরাে অনেক কিছুর জন্যে লাগবে । শলার ঝাড়ও কিনেছি।
কত টাকা খরচ হয়েছে ? আপনার বাজেটের চেয়ে কম লেগেছে। তুমি তাে জান না আমার বাজেট কত? বাজেট যতই হােক, তারচে‘ কম। কারণ বাংলাদেশে আমার চেয়ে দরাদরি আর কেউ করতে পারে না। চাচাজি শুনুন এই যে বাজার টাজার করে ফেলেছি তার জন্যে রাগ করেন নি তাে?
। প্লীজ রাগ করবেন না। আরেকটা কথা জিনিসগুলির দাম দেবারও চেষ্টা করবেন না। কোনাে লাভ হবে না। কারণ কিছুতেই দাম দিতে পারবেন না । আমার হাসবেন্ডের চিঠিটা পড়েছেন ?
হ্যা।
আপনি টোপ গেলেন নি। তাই না ? আপনি নিশ্চয় সমুদ্র ফেলে তারা দেখতে যাচ্ছেন না ? সমুদ্র হাত দিয়ে ছোঁয়া যায়। আকাশের তারা যত সুন্দরই হােক হাত দিয়ে ছোঁয়া যায় না। | তারা দেখার ইচ্ছা থাকলেও যেতে পারছি না। আমার এক ছাত্রের সঙ্গে সবকিছু ঠিক করা । সে আবার আমাকে অতিরিক্ত রকমের শ্রদ্ধাভক্তি করে। সে টেকনাফে এসে বসে থাকবে।
আমিই মিসির আলি-পর্ব-(৫)-হুমায়ূন আহমেদ
লিলি হাসিমুখে বলল, আপনাকে টেকনাফে না দেখলে তার মাথা খারাপের মতাে হয়ে যাবে। সে ভাববে আমাদের স্যার ভুলা টাইপ মানুষ, না জানি তার কী হয়েছে।
ঠিক বলেছ লিলি।
আমার কোনাে ইএসপি ক্ষমতা নেই, কিন্তু আমি জানতাম আপনি আমাদের এখানে আসবেন না। আমি আমার হাসবেন্ডকে সেটা বলেছি। সে বিশ্বাস করে নি। তার ধারণা সে এমন গুছিয়ে চিঠিটা লিখেছে যে চিঠি পড়েই আপনি হােল্ডঅল বেঁধে রওনা দিয়ে দেবেন। উত্তর দক্ষিণে তাকাবেন না।
মিসির আলি বললেন, চিঠিটা খুবই গুছিয়ে লেখা।
লিলি বলল, আপনার জন্যে চিঠিটা গুছিয়ে লেখা না। আবেগ আছে এমন সব মানুষদের জন্যে চিঠিটা গুছিয়ে লেখা। আপনি তাদের দলে পড়েন না।
তােমার ধারণা আমার আবেগ নেই ?
Read more
