খেতে রসােগােল্লার মত লাগছে। তাহের বিরক্তমুখে বলল, ভাজা মাছ খেয়াে না লিলিয়ান। মাছটা পচা বলে ভেজে ফেলেছে।

খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে পানটাই আরাম করে খাওয়া গেল। মৌরী দিয়ে সুন্দর করে বানানাে। লিলিয়ান দুটা পান মুখে দিল। সে বিস্মিত হয়ে বলল, খাওয়া–দাওয়া শেষ হলে তােমরা ভেজিটেবল খাও কেন তাতাে বুঝলাম না।
তাহের বলল, এটা ভেজিটেবল না। এর নাম পান। খাবার পর খেতে হয়। কুৎ করে গিলে ফেললে হবে না। ক্রমাগত চিবিয়ে যাবে। গিলতে পারবে না।।
‘কতক্ষণ চিবাবাে?” ‘আধঘন্টা তাে বটেই।
তাতে লাভ কি?” ‘মুখের একটা একসারসাইজ হয়। এইটুকুই লাভ।
ঠাট্টা করছ?” ‘মােটেই ঠাট্টা করছি না। তুমি কি ভেবেছ? আমার কাজ শুধু ঠাট্টা করা ?” ‘জিনিসটা খেতে আমার ভাল লাগছে।”
‘ভাল লাগলে খাও। আমাদের গ্রামের নতুন বউদের অবশ্যপালনীয় কর্তব্যের একটি হচ্ছে পান খেয়ে ঠোট লাল করা।
আয়নাঘর-পর্ব-(১৭)-হুমায়ূন আহমেদ
‘আমি তাে নতুন বউ না।
‘অবশ্যই নতুন বৌ। ছেলেমেয়ে না হওয়া পর্যন্ত আমাদের দেশের বউদের নতুন বউ ধরা হয়।
‘কোন মহিলার দশ বছরেও যদি ছেলেমেয়ে না হয় তাহলে কি তাকে নতুন বউ ধরা হবে?
‘না। তখন তাকে বলা হবে বাজ–মেয়েমানুষ। অমঙ্গলজনক একটি ব্যাপার। সেই মেয়েকে কোন উৎসবে ডাকা হবে না। সকাল বেলা কেউ তার মুখ দেখতে চাইবে না।
“তােমাদের নিয়ম–কানুন ভারী অদ্ভুত।
‘অদ্ভুত তাে বটেই। আরাে অদ্ভুত কথা শুনবে? আমাদের দেশে স্বামী–স্ত্রী একসঙ্গে পাশাপাশি বসে পূর্ণিমার চাঁদের দিকে তাকাবে না।
‘তাকালে কি হয়? ‘তাকালে তাদের যে সন্তান হবে সে হবে চরিত্রহীন।
‘আবার তুমি তামাশা করছ। কি জন্যে করছ তাও বুঝতে পারছি। তুমি আমার সঙ্গে জোছনা দেখতে চাচ্ছ না।
‘জোছনা দেখতে অসুবিধা নেই। চঁাদের দিকে না তাকালেই হল। ‘ছাদে সত্যি সত্যি বসবে আমার সঙ্গে? | ‘হুঁ বসব। তবে ছাদে না। বারান্দায়। তােমার বিখ্যাত চঁাদ বারান্দা থেকেও দেখা যায়। চাদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমি যদি মুগ্ধ হয়ে ঘুমিয়ে পড়ি কিছু মনে করাে না। ঘুমিয়ে পড়ার সম্ভাবনা নিরানব্বই দশমিক নয় ভাগ।
ইস্কান্দর আলির মেজো ছেলে বারান্দা ঝাট দিচ্ছে। তাহের তাকে বারান্দায় চাদর পাততে বলেছে। এই ছেলেই খাবার নিয়ে এসেছে। বাজার থেকে জিনিসপত্র কিনে এনেছে। তার বুদ্ধি কোন পর্যায়ের তাহের এখনাে ধরতে পারছে না। সে টর্চ কিনে এনেছে, কিন্তু ব্যাটারি আনে নি।
আয়নাঘর-পর্ব-(১৭)-হুমায়ূন আহমেদ
“তােমার নাম কি ? ‘ছালাম। ‘ছালাম না সালাম?” ‘ছালাম। ছালাম আলি। ‘ছালাম তােমাকে টর্চের ব্যাটারি আনতে যেতে হবে, পারবে না ?
‘দোকান কি অনেক দূর ?”
দূর হলে থাক, সকালে এনে দিও। ‘ছাইকেল আছে। ‘সাইকেল থাকলে সাইকেলে করে নিয়ে এস।
তারা ঘুমুতে গেল রাত দুটায়। তাহের বলল, হারিকেন জ্বালানাে থাকুক। লিলিয়ান বলল, হারিকেন জ্বালানাে থাকলে ঘরে চঁাদের আলাে আসবে না। তাহের বলল, তােমার ভেতর এত কাব্যভাব আছে তা কিন্তু আমার জানা ছিল না।
‘জানা থাকলে কি করতে, আমাকে বিয়ে করতে না?” . তাহের হাসল। হাসতে হাসতে বলল, চা খেতে ইচ্ছা করছে। আমার সমস্যা হচ্ছে ঘুমের প্রথম ধাক্কাটা কেটে গেলে ঘুম আসে না। আমি পরিষ্কার বুঝতে পারছি, বাকি রাতটা তুমি আরাম করে ঘুমুবে, আর আমাকে জেগে থেকে তােমার বিখ্যাত জোছনা দেখতে হবে।
‘চা সত্যি খেতে চাও? আমার কাছে টি–ব্যাগ আছে, সুগার কিউব আছে। শুধু দুধ নেই।
‘পানি গরম করবে কিভাবে?” ‘কাগজ জ্বালিয়ে পানি গরম করব।” ‘কাগজ পাবে কোথায়? ‘তুমি ডার্টি জোকস–এর যে বইটি এনেছ, সেটা পুড়িয়ে ফেলব। বানাব চা?” ‘মন্দ না। পারলে বানাও।। ‘তুমি চুপচাপ বিছানায় বসে থাক। আমি চা বানিয়ে আনছি।” ‘আমি তােমার পাশে বসি।
আয়নাঘর-পর্ব-(১৭)-হুমায়ূন আহমেদ
লিলিয়ান চায়ের পানি গরম করছে। পাশে বসে আছে তাহের। তার ঘুম কেটে গেছে বলে মনে হচ্ছে না। সে খানিকক্ষণ পরপর হাই তুলছে। লিলিয়ান বলল, তুমি ঐ মহিলা সম্পর্কে আরাে কিছু বল।
কোন মহিলা ?” ‘আয়নাঘরে যিনি মারা গিয়েছিলেন।
‘আমি কিছুই জানি না। খুব রূপবতী ছিলেন, এইটুক জানি। জাঙ্গির মুনশি বেনারস থেকে একজন আর্টিস্ট এনে তার কিছু ছবি আঁকিয়েছিলেন। সেইসব ছবি দেখলে তার সম্পর্কে আন্দাজ পেতে। তবে ছবিও নেই। উনার মৃত্যুর পর জাঙ্গির মুনশি তার স্ত্রীর সব ছবি পুড়িয়ে ফেলেন।
লিলিয়ান কোমল গলায় বলল, উনাকে খুব দেখতে ইচ্ছা করছে।
তাহের চা খাচ্ছে। কাচের গ্লাসে চা দেয়া হয়েছে। গ্লাস গরম হয়ে গেছে – চা খাওয়া যাচ্ছে না। তাহের চায়ের গ্লাসে ফু দিতে দিতে বলল, আমার মার ধারণা উনি একবার তিতলী বেগমকে দেখেছিলেন।
“উনি দেখবেন কিভাবে?” মা’র ধারণা, দেখেছেন। গভীর রাতে আয়নাঘরের পাশ দিয়ে যাচ্ছেন হঠাৎ
আয়নাঘর-পর্ব-(১৭)-হুমায়ূন আহমেদ
শুনেন আয়নাঘরের ভেতর থেকে ঝুনঝুন চুড়ির শব্দ। আয়নাঘর তালাবন্ধ। চুড়ির শব্দ কিভাবে আসবে? মা খুব অবাক হলেন। উনার সাহসের সীমা ছিল না। চাবি নিয়ে আয়নাঘর খুললেন। মােমবাতি হাতে একা একা আয়নাঘরে ঢুকলেন।
‘তারপর ?
‘তারপরের ব্যাপার পরিষ্কার জানা যায় না। মা কিছু একটা দেখেছিলেন। কি দেখেছিলেন কিছুই ভেঙে বলেন নি।
Read more
