বিজ্ঞান কাউন্সিলের নীতিমালায় তো আছে। মানুষের যে কোন প্রশ্নের উত্তর দিতে কম্পিউটার বাধ্য। মানুষের কাছ থেকে সে কিছু লুকাতে পারবে না। আমি আইনকানুন ভাল জানি না। তবে এই আইনটি জানি। এই আইনের নাম বিশেষ অধিকার আইন।কম্পিউটার সিডিসি সব প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য না। বিজ্ঞান কাউন্সিলের নীতিমালা উড়ন্ত মহাকাশযানগুলির জন্যে প্রযোজ্য নয়।আচ্ছা শোন এই যে আমি তোমার সঙ্গে কথাবার্তা বলছি কম্পিউটার সিডিসি কি তা শুনছে?
অবশ্যই শুনছে। মহাকাশযানে যেখানে যা ঘটছে তার প্রতিটি সংবাদ সিডিসির মেমোরি সেলে চলে যাচ্ছে।তাহলে আমি যদি সিডিসিকে এখন গালাগালি করি তা সে শুনবে? অবশ্যই শুনবে।আমার ধারণা তোমাদের সিডিসি মোটামুটি গাধা-টাইপ একটা কম্পিউটার। সে নিজেকে খুব বুদ্ধিমান। আমি বর্তমানে যে মানসিক কষ্টের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি তা সে বুঝতে পারত, এবং কষ্ট কমাবার চেষ্টা করত।
আমি যদি জানতে পারতাম কেন আমাকে মহাকাশযানে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তাহলেই হত। আমি কিছুই জানি না।স্যার আপনাকে কি একটা মিক্সড ড্রিংক দেব, ড্রিংকটা এমন যে আপনার মানসিক উত্তেজনা দূর করতে সাহায্য করবে।আচ্ছা দাও।একটা ড্রিংকের জায়গায় আমি পর-পর চারটা ড্রিংক খেয়ে ফেললাম। ড্রিংকটা ঝাঁঝালো টক-টক স্বাদ।
ইমা পর্ব:০১
টকের ভেতর সামান্য মিষ্টি ভাবও আছে। খাবার পর-পর মাথা এলোমেলো লাগছে। কে জানে নেশা হয়েছে কি না। কারণ রোবট-মেয়েটাকেও দেখতে এখন খারাপ লাগছে না। তার নীল আলোর চোখেও মনে হয় একটু মায়া-মায়া ভাব চলে এসেছে। এমনকি মহাকাশযানটাকেও আমার খারাপ লাগছে না। নিজেকে হালকা ফুরফুরে লাগছে। মনে হচ্ছে ভালই তো নিরুদ্দেশের দিকে যাত্রা।
ভবিষ্যতে কিছু একটা হবে। সেটা আনন্দময় হতে পারে আবার নিরানন্দময়ও হতে পারে। আনন্দময় হলে তো ভালই। নিরানন্দময় হলেও-বা ক্ষতি কি? আনন্দ ও নিরানন্দ নিয়েই তো জগৎ।আমার হঠাৎ করেই গান গাইতে ইচ্ছা করছে। সমস্যা একটাই আমার, গানের গলা নেই। তাতে কি? সব মানুষকে তো আর গানের গলা দিয়ে পৃথিবীতে পাঠানো হয় না। আমি আমার হেড়েগলাতেই গান গাইব। কম্পিউটার সিডিসিকে বিরক্ত করে মারব। আমি আরেকটা ড্রিংকের কথা বললাম।
রোবট বলল, আমার মনে হয় আপনার এই ড্রিংকটা আর খাওয়া ঠিক হবে না।আমি কঠিন গলায় বললাম, তোমার কী মনে হয় তা দিয়ে আমার জগৎ চলবে না। আমার জগৎ চলবে আমার নিয়মে। আমি আরেকটা ড্রিংক খাব। এবং খেতে খেতে গান করব। তুমি শুনবে। ভাল না লাগলেও শুনবে।জি আচ্ছা।
পঞ্চম গ্লাসে চুমুক দিয়ে গান ধরলাম। এমিতে আমার সুর ভাল না, আজ দেখি সুন্দর সুর বের হচ্ছে। নোটগুলি গলায় বসে যাচ্ছে। আমি বেশ গলা খেলিয়ে গাইতে পারছি। আমি বিষাদময় একটা চন্দ্ৰগীতির অনেকখানি গেয়ে ফেললাম। মঙ্গলগ্রহে যে-সব মানুষ বসতি স্থাপন করেছে—এই চন্দ্রগীতি তাদের অত্যন্ত প্রিয়। মঙ্গলগ্রহের দুটি চাঁদ ডিমোস এবং ফিববাসে যখন একসঙ্গে জোছনা লাগে তখন তারা এই চন্দ্রগীতি গায়,
ইমা পর্ব:০১
আমার মতো অভাজনের জন্যে
একটি চাদই তো যথেষ্ট ছিল,
তাহলে দুটি চাঁদ কেন?
মাঝপথে গান থামিয়ে রোবটকে জিজ্ঞেস করলাম, গান কেমন লাগছে?
স্যার আমি বলতে পারছি না। সংগীত বোঝার ক্ষমতা আমাকে দেয়া হয় নি। আমি সাধারণমানের কর্মী রোবট। তবে আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনি গান গেয়ে আনন্দ পাচ্ছেন। আপনার আনন্দটাই প্রধান।গাধা সিডিসিও তো নিশ্চয়ই আমার গান শুনতে পাচ্ছে।
তা পাচ্ছে।গাধাটার কান যে ঝালাপালা করতে পারছি সেটাই আমার আনন্দ।স্যার আপনি কি আরো ড্রিংক্স নেবেন? না আমার মাথা ঘুরছে।তাহলে ঘুমুতে যান।আমি কী করব না করব তা নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। আমি ঘুমাব না কি হাত পা ছুড়ে চন্দ্রনৃত্য করব তা আমার ব্যাপার।অবশ্যই আপনার ব্যাপার।
খুবই ক্লান্ত লাগছে। চন্দ্রনৃত্য করতে ইচ্ছা করছে না। আমি বিছানায় শুয়ে পড়লাম। মহাকাশযানের বিছানাগুলিতে কোন রহস্য আছে, শোবার কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমে চোখের পাতা ভারি হয়ে আসে। চোখ খুলে রাখা যায় না এমন অবস্থা। একবার পত্রিকায় পড়েছিলাম বিশেষ ফ্রিকোয়েন্সি কম্পন দ্রুত মানুষকে ঘুম পাড়িয়ে দেয় এবং এই বিশেষ ফ্রিকোয়েন্সি একেক মানুষের জন্যে একেকরকম।
এরা নিশ্চয়ই আমার ফ্রিকোয়েন্সি বের করে রেখেছে। আমি বিছানায় শোয়ামাত্র সেই ফ্রিকোয়েন্সির শব্দ আমাকে শোনায়। ভাল কথা শোনাক। তাদের যা ইচ্ছা করুক।আমার ঘুম পাচ্ছে। চোখের পাতা ভারি হয়ে আসছে। কিছুক্ষণ আগেও মনে একটা ফুর্তি-ফুর্তি ভাব ছিল। এখন তা নেই। মন খারাপ লাগছে।
ইমা পর্ব:০১
মহাকাশযানের কোন জানালা থাকলে জানালা খুলে লাফিয়ে বাইরে চলে যেতাম। ঘরের ভেতর দমবন্ধ লাগছে। দমবন্ধ লাগা একবার শুরু হলে খুব সমস্যা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দমবন্ধ ভাব বাড়তেই থাকে।দমবন্ধের এই ব্যাপারটা আমি ভাল জানি। সাইকোলজির পরিভাষায় একে বলে কেবিন-ফিভার। প্রতি দুমাসে একবার আমাকে কেবিন-ফিভারের পরীক্ষা দিতে হত। শুধু আমাকে না আমার মতো যারা টানেলে কাজ করে তাদের সবাইকে।
দিনের পর দিন টানেলে কাজ করলে একসময় না এক-সময় কেবিন-ফিভার হয়। হঠাৎ করে একজন ভাল মানুষ পাগলের মতো হয়ে যায়, চিকার করতে থাকে। আকাশ ফাটিয়ে চিকার করতে করতে বলে, আমার দমবন্ধ হয়ে আসছে, নিশ্বাস নিতে পারছি না। আমাকে বাইরে নিয়ে চল। এক্ষুণি বাইরে নিয়ে চল।বাইরে নিয়ে চল বললেই তো আর বাইরে নিয়ে যাওয়া যায় না।
খুব দ্রুত ব্যবস্থা করলেও টানেল থেকে বের হতে দুঘণ্টার মতো সময় লাগে। এই দুঘণ্টা সময় কেবিন-ফিভারের রোগীর জন্যে অনন্তকাল। ভয়ংকর সব কাণ্ড এই দুঘণ্টার মধ্যে তারা করে ফেলে। একজনকে দেখেছি টানেলের দেয়ালে শরীরের সব শক্তি দিয়ে মাথা ঠুকে দিল। সঙ্গে সঙ্গে মাথা ফেটে ছিটকে ঘিলু বের হয়ে এল। টানেল-কর্মীদের সুপারভাইজারদের সঙ্গে সবসময় কড়া সিটেটিভ থাকে। একবার সিটেটিভ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিতে পারলে নিশ্চিন্ত।
ইমা পর্ব:০১
তবে বেশিরভাগ সময়ই সুপারভাইজাররা এই সময় পায় না। দেখা যায় একজন নিতান্ত ভাল মানুষের মতো টানেলে কাজ করছে। শিস বাজাচ্ছে। চন্দ্বগীতি গাইছে, হঠাৎ সে ঘুরে তাকাল। মুহূর্তের মধ্যে তার চোখ হয়ে গেল রক্তবর্ণ। সুপারভাইজার তার কাছে ছুটে আসার আগেই সে একটা কাণ্ড করে বসল।আমরা টানেল-কর্মীরা দুমাসে একবার সাত দিনের ছুটি পাই। সেই সাত দিন আমরা নানান ফুর্তি করি। সে এক কাণ্ড। নাচানাচি। মদ খাওয়াখাওয়ি।
নেংটো হয়ে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে পড়া—হি হি হি। এখন তো ভাবতেই মজা লাগছে। ছুটি কাটাবার পর সাইকোলজিস্টের কাছে যেতে হয়। তিনি নানান ধরনের পরীক্ষাটরীক্ষা করেন। উদ্ভট-উদ্ভট প্রশ্ন করেন, যেমন একবার তিনি বললেন, তিনজন মানুষ নদী পার হবে। তুমি, তোমার এক বাল্যবন্ধু এবং বন্ধুপত্নী। বন্ধুপত্নীর বয়স বাইশ থেকে পঁচিশের মধ্যে। নৌকায় একসঙ্গে দুজন পার হতে হবে। তুমি আগে পার হতে চাইবে না কি বন্ধু-বন্ধুপত্নীকে পার হতে দেবে?
আমি বললাম, আমি আগে পার হব।ঠিক আছে তুমি আগে পার হতে চাচ্ছ, তুমি সঙ্গে কাকে নিতে চাও বন্ধু। না বন্ধুপত্নীকে? আমি বিড়বিড় করে বললাম, বন্ধুপত্নীকে। বলতে খুব লজ্জা লাগল। তারপরেও বললাম।তুমি নিশ্চয়ই বন্ধুপত্নীর একটা ছবি মনেমনে দাঁড় করিয়েছ। সেই ছবিতে তিনি যে কাপড় পরে আছেন সেই কাপড়ের রং কী?
নীল।
তোমার বন্ধুর গায়ের কাপড়ের রং কী?
খয়েরি।
তুমি বললে তোমার বন্ধুপত্নী নীল রঙের কাপড় পরেছেন। আচ্ছা তিনি যে অন্তর্বাস পরেছেন তার রঙ কী বলে তোমার ধারণা? আমার কোন ধারণা নেই স্যার।তোমার মাথায় কোন রঙটা আসছে?
ইমা পর্ব:০১
লাল।
গাঢ় লাল?
না খুব গাঢ় না।
ঠিক করে বল তো লাল না গোলাপি।
স্যার গোলাপি।
সাইকোলজিস্টের প্রশ্নের উল্টোপাল্টা জবাব দিয়ে লাভ নেই। কারণ প্রশ্নোত্তরের সময় সারা শরীরে নানান সেনসর লাগানো থাকে। প্রশ্নের ঠিক জবাব দেয়া হচ্ছে, না বানানো জবাব দেয়া হচ্ছে সেনসর তা বলে দেয়। বানানো জবাব দিলে মহা-সমস্যা।
সাইকোলজিস্ট তার দীর্ঘ পরীক্ষার পর যদি বলেন, হ্যাঁ ঠিক আছে। তাহলেই আমরা আমাদের পুরনো কাজে ফিরে যেতে পারি। আর তিনি যদি ফাইলের উপর সবুজ কালি দিয়ে প্রশ্নবোধক চিহ্ন লিখে দেন তাহলে সব শেষ। টানেলে ফিরে যাওয়া হবে না।আমরা টানেল-কর্মীরা টানেলে ফিরে যেতে চাই। আমরা যখন টানেলে নামি তখন শান্তি-শান্তি লাগে, মনে হয় মায়ের পেটে ঢুকে যাচ্ছি। অতি নিরাপদ আশ্রয়ে যাচ্ছি। আর আমাদের কোন সমস্যা নেই।
টানেলে কাজ করার অনেক মজাও আছে। আমরা সূর্য-ভাতা পাই। যে। কদিন সূর্য দেখতে পাচ্ছি না সে কদিনের সূর্য-ভাতা। প্রতি চব্বিশ ঘণ্টায় ২ ইউনিট। অনেক বড় ব্যাপার। পাঁচ বছর কাজ করতে পারলে আমরা থাকার কোয়ার্টারের জন্যে আবেদন করতে পারি। কোয়ার্টার পাবার সম্ভাবনা প্রায় আশি ভাগ। তবে সমস্যা হচ্ছে টানেল-কর্মীরা বেশিদিন তাদের কোয়ার্টারে থাকতে পারে না।
সূর্যের আলো তাদের অসহ্য বোধ হয়। খোলা বাতাসে তারা নিশ্বাস পর্যন্ত নিতে পারে না। তাদের জীবন কাটে টানেলে টানেলে। অনেকের কাছে সেই জীবনটা হয়ত আনন্দময় নয় তবে আমাদের জন্যে ঠিকই আছে। টানেলেই আমাদের ঘর। আমাদের জীবন।মহাকাশযানে আমি বর্তমানে যে ঘরে বাস করছি তার সঙ্গে টানেলের কিছু মিল আছে। আমি ঘর থেকে বের হতে পারি না। টানেল থেকেও বের হওয়া সম্ভব না।
ইমা পর্ব:০১
টানেলে কথা বলার কেউ থাকে না আশেপাশে কিছু কর্মী রোবট থাকে তারা কথা বলতে পারে না। শুধু কাজ করতে পারে। এখানেও তাই, কথা বলার জন্যে রোবট ছাড়া আর কেউ নেই। তবে এখানে খাবারদাবারের ব্যবস্থা ভাল, অবশ্যই ভাল। এই যে আমি এখানে শুয়ে আছি, আমার ঘুম আসছে না। এখন আমি যদি খাবারঘরে যাই সঙ্গে সঙ্গে মেয়ে-রোবটটা চলে আসবে। আমি তাকে যদি বলি, কফি খাওয়াতে পার? সে কফি বানিয়ে আনবে। সেই কফি সিনথেটিক কফি, কিন্তু কারোর বোঝার সাধ্য নেই।
কফির যেমন গন্ধ তেমন স্বাদ। খাবার বানানোর এরকম একটা যন্ত্ৰ কিনতে কত ইউনিট লাগে? আমার সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে এরকম একটা যন্ত্ৰ কিনে ফেলতে পারলে কাজের কাজ হত। ফ্লেটিশ মাছের ডিম-ফিম খেয়ে জীবন পার করে দিতে পারতাম।আমার মাথার কাছে সবুজ একটা বাতি কিছুক্ষণ ধরেই জ্বলছে-নিভছে। বাতিটা এতক্ষণ নেভা ছিল। হঠাৎ বাতিটা পাগল হয়ে গেল কেন? এই সব বাতির মানে কী আমি জানি না। শুধু জানি খিদে পেলে কী করতে হয়।
টানেলে আমি সুখে ছিলাম। না না সুখে ছিলাম বলা ঠিক হবে না মহাসুখে ছিলাম। সারাদিন কাজ করি, সন্ধেবেলা ঘুমুতে আসি। দিনে প্রচুর পরিশ্রম হয় বলে রাতে ঘুম ভাল হয়। শোয়ামাত্র চোখে ঘুম জড়িয়ে আসে। তারমধ্যেও মনে মনে হিসেব করি ঠিক কত ইউনিট জমল।
ইমা পর্ব:০১
পাঁচ হাজার ইউনিট জমলে বিয়ের লাইসেন্স করতে পারি। টানেল কর্পোরেশনকে সেই লাইসেন্স দেখালে কোন একজন মহিলা টানেল-কর্মীকে তারা খুঁজে বের করবে। আমার নামে বরাদ্দ দিয়ে দেবে। ডিএনএ ম্যাচিং করে মেয়ে খোঁজা হবে, কাজেই ধরে নেয়া যায় যে আমাদের জীবনটা সুখেরই হবে। দুজন দুজনকে পছন্দ করব। সন্ধ্যার পর যখন কাজ থাকবে না তখন দুজন নানান গল্প করব।
তেমন ইউনিট যদি জমাতে পারি তাহলে কয়েকদিনের জন্যে কোন একটা রিসোর্টে বেড়াতেও যেতে পারি। কোথায় যাব সেটা ঐ মেয়েটাকেই ঠিক করতে দেব। তার যদি সমুদ্রের কাছে যেতে ইচ্ছা করে তাহলে যাব সমুদ্রের কাছে। যদিও সমুদ্র আমার ভাল লাগে না। সারাক্ষণ একঘেয়ে শব্দ। সমুদ্রের কাছে আলোও বেশি, খুব চোখে লাগে। তারপরেও মেয়েটির আনন্দকে আমি গুরুত্ব দেব। আমি যদি তার আনন্দকে গুরুত্ব না দেই সে আমার আনন্দকে গুরুত্ব দেবে না।
আমি ঠিক করে রেখেছি বিয়ের পরে আমি একটা নিষিদ্ধ কাজও করব। মেয়েটার একটা নাম দেব। টানেল-কর্মীদের কোন নাম থাকে না। তাদের থাকে নাম্বার। নাম্বারটা খুব প্রয়োজনীয় ব্যাপার। নাম্বার থেকে সঙ্গে সঙ্গে বলা যায় টানেল-কর্মী কোথায় কাজ করছে, কী ধরনের কাজ করছে, কত দিন হল কাজ করছে, সে থাকে কোথায়। নাম্বারই টানেল কর্মীর নাম ঠিকানা, পরিচয়। যেমন আমার নাম হল T5023G00/LOR420/S000129, এটা হল আমার পুরো নাম। ঘোট নাম হল T5LASO.
নাম ব্যবহার আমাদের জন্যে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তারপরেও কাউকে না জানিয়ে মেয়েটার আমি যদি সুন্দর একটা নাম দেই তাতে ক্ষতি তো কিছু নেই। যখন আমাদের কোন কাজকর্ম থাকবে না। দুজন একাকী বসে থাকব তখন এই নামে তাকে ডাকব।
ইমা পর্ব:০১
আমি প্রতিরাতেই একটা না একটা নাম নিয়ে ভাবি। এখন আমাদের সবচে পছন্দের নাম হল ইমা। ইমা নামের মেয়েটার কথা ভাবতে-ভাবতেই আমি প্রতিরাতে ঘুমুতে যাই। ঘুমের মধ্যে ইমাকে মাঝে-মধ্যে আমি স্বপ্নে দেখি লাজুক-টাইপ রোগামতো একটা মেয়ে, লম্বা চুল, বড়-বড় চোখ।
চোখের পল্লব এত দীর্ঘ এবং ঘন যে মেয়েটির দিকে তাকালে মনে হবে গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে আমি মেয়েটির চোখ দেখছি। মেয়েটা কোন প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলে উত্তর দেয় না, শুধু হাসে।আমার মতো সাধারণ এবং নিরীহ একটা মানুষ কী করে মহাকাশযান সংক্রান্ত জটিলতায় জড়িয়ে পড়ে তা আমার মাথায় আসে না।
মাঝে মাঝে চেয়ারে বসে-বসে ভাবি, পুরো ব্যাপারটা স্বপ্ন বলে মনে হয়, মনে হয় আসলেই হয়ত স্বপ্ন। একসময় স্বপ্ন ভেঙে যাবে এবং মোটামুটি অবাক হয়েই দেখব আমি ঠিক আগের জায়গাতেই আছি, টানেল-হোস্টেলের ৩২৩ নাম্বার বিছানায়। আমি বিছানা থেকে নামব, পানি খাব, বাথরুমে যাব তারপর আবার আগের জায়গায় এসে ঘুমুতে শুরু করব। ঘুম না এলে মাথার কাছের রিডিং-লাইট জ্বালিয়ে বইটই পড়ার চেষ্টা করব। ও হ্যাঁ আমার বই পড়ার বদঅভ্যাস আছে। রাজ্যের বই পড়ি।
সে রকম কিছু ঘটে না। তখন আমি মনে করতে চেষ্টা করি মহাকাশযানে ঢোকার আগে আমার কার কার সঙ্গে কথা হয়েছে এবং কী কথা হয়েছে। সেখান থেকে কিছু আঁচ করা যায় কি না।প্রথম কথা হল টানেল-ম্যানেজারের সঙ্গে। ধবধবে শাদা চুলের একজন রোগা মানুষ। মুখে হাসি-হাসি কিন্তু কথায় কোনরকম আন্তরিকতা নেই। পাথরের মতো আবেগশূন্য চোখ। শুকনো মুখে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, নাম্বার কত?
আমি অত্যন্ত বিনীত ভাবে বললাম, TSLASO.
পুরো নাম্বার বল।আমি আগের চেয়েও বিনীতভাবে বললাম, T5023G001/ LOR420/ s000127.
তিনি রাগী গলায় বললেন, সেভেন না নাইন? আমি বললাম, স্যার ভুল হয়েছে, নাইন। অনেকগুলি নাম্বার তো, বলার সময় এলোমেলো হয়ে যায়। দয়া করে আমার অপরাধ ক্ষমা করে দেবেন।
Read more
