ইমা পর্ব:০২ হুমায়ূন আহমেদ

ইমা পর্ব:০২

এরা যখন নাম্বার জিজ্ঞেস করে তখন আমি একটা সংখ্যা ইচ্ছা করে ভুল বলি। দেখার জন্যে যে এরা ভুলটা ধরতে পারে কি না। সবসময়ই ধরতে পারে। অর্থাৎ এরা নাম্বার জানে। জেনেও জিজ্ঞেস করে। কেন? তুমি স্টেশন ফাইভে চলে যাও।জ্বি আচ্ছা স্যার। কবে যাব? কবে যাবে মানে?

এক্ষুণি যাবে। তোমার জন্যে পাস দেয়া আছে। পাস নিয়ে চলে যাবে।জ্বি আচ্ছা।জ্বি আচ্ছা বলে দাঁড়িয়ে আছ কেন, চলে যাও।স্টেশন ফাইভে কার কাছে যাব? ইনফরমেশনে পাসটা জমা দেবার পর যা করার ওরা করবে।জ্বি আচ্ছা।এখনো দাঁড়ায়ে আছ কেন?

স্টেশন ফাইভটা কোথায় আমি জানি না স্যার।মনোরেলে করে চলে যাও সাবওয়ে সেন্ট্রালে। সেখান থেকে সুপার ট্রেনে করে স্টেশন ফাইভ। আঠারো ঘণ্টার মতো লাগবে।অল্পকিছু ইউনিট নিয়ে ঘর থেকে বের হয়েছি। সঙ্গে কাপড়চোপড়ও আনি নি।কিছুই লাগবে না।স্টেশন ফাইভে কী জন্যে যাচ্ছি সেটা কি স্যার আমি জানতে পারি?

তুমি কী জন্যে স্টেশন ফাইভে যাচ্ছ আমি জানি না। স্টেশন ফাইভের লোজন হয়ত জানতে পারে। আমাকে বলা হয়েছে তোমার জন্যে একটা রেডপাস ইস্যু করতে, আমি তা করেছি। আমার দায়িত্ব শেষ। এখন দয়া করে পাস নিয়ে বিদেয় হও। এমিতেই তুমি আমার যথেষ্ট সময় নষ্ট করেছ।

আমি ঘর থেকে বের হলাম। আমাকে একটা রেড-পাস দেয়া হল। এরকম পাস আমি আমার জন্মে দেখি নি। নাম রেড-কার্ড কিন্তু রং নীল। কার্ডে আমার নাম্বার লেখা। নাম্বারের নিচে কোড ল্যাংগুয়েজে কিছু লেখা। নিশ্চয়ই ভয়ংকর কিছু লেখা। যাকে এই কার্ড দেখাই সে অদ্ভুতভাবে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। যেন আমি অদ্ভুত কোন প্রাণী।

ইমা পর্ব:০২

ভিনগ্রহ থেকে পৃথিবী দেখতে এসেছি। তারপর কার্ডটাকে সে ডিকোডারে ঢুকায়। এবং আগের চেয়েও আরো বেশিক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। আমি কোন রহস্যই ভেদ করতে পারি না। কোড ল্যাংগুয়েজে কি লেখা? আমি একজন ভয়ংকর ব্যক্তি। সিরিয়েগ কিলার। আমার কাছ থেকে একশ হাত দূরে থাকতে হবে এই জাতীয় কিছু?

স্টেশন ফাইভের এক লোক আমার রেড-কাৰ্ড রেখে একটা রূপালি কার্ড দিয়ে দিল। (এবারের রূপালি কার্ডের রং আসলেই রূপালি) এবং খুবই দ্রভাবে বলল, দয়া করে সামনে এগিয়ে যান। তিনটা লিফট আছে, মাঝখানেরটা রূপালি। কার্ড পাঞ্চ করলেই লিফটের দরজা খুলে যাবে। লিফট আপনাকে নিয়ে যাবে দশ নাম্বার ঘরে।সেখানে আমি কার সঙ্গে কথা বলব?

কার সঙ্গে কথা বলবেন তা তো আমরা বলতে পারছি না। আমাদের দায়িত্ব আপনাকে রূপালি কার্ড দেয়া, আমরা তা দিলাম। আমাদের দায়িত্ব শেষ।দশ নাম্বার ঘরে যার সঙ্গে আমার কথা হল সে সুন্দর একটা মেয়ে। তার গায়ে রূপালি পোশাক। গায়ে রূপালি পোক মানে এই মহিলা বিজ্ঞান কাউন্সিলের। তাঁর অবস্থান সাধারণের চেয়ে অনেক উপরে। অপ্রয়োজনে এদের সঙ্গে কথা বলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

এই প্রথম আমি বিজ্ঞান কাউন্সিলের কাউকে মুখোমুখি দেখলাম। এদের কথা বলার ভঙ্গি তাকানোর ভঙ্গি সবই আলাদা। যেন এরা ঠিক মানুষ না, এরা দেবদেবীর কাছাকাছি।আমি খুব ভয়ে-ভয়ে বললাম, ম্যাডাম আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। আমাকে কেন এখানে আসতে বলা হয়েছে আমি কিছুই জানি না। মেয়েটি শীতল গলায় বলল, এত ব্যস্ত হবার কিছু নেই। যা জানার যথাসময়ে জানতে পারবে।

ইমা পর্ব:০২

আমি তাঁর জবাব শুনে আনন্দিত হয়েছি এমন ভঙ্গিতে বললাম, জ্বি আচ্ছা তোমার শরীর জীবাণু ও ভাইরাস-মুক্ত করা হবে। তুমি সরাসরি ল্যাবোরেটরিতে চলে যাও।একবার ভাবলাম বলি, ম্যাডাম আমার শরীর জীবাণু এবং ভাইরাসমুক্ত করার প্রয়োজনটা কেন হল? জীবাণু এবং ভাইরাস নিয়ে আমি তো ভালই আছি। তা না বলে আগের চেয়েও আনন্দিত গলায় বললাম, জি আচ্ছা।

আমাদের মহাকাশযান এমিডা এফ এলের কাউন্ট ডাউন শুরু হয়েছে, তারপরেও তোমার হাতে যথেষ্ট সময় আছে। ল্যাবোরেটরিতে ঢোকার আগে তুমি যদি তোমার কোন বন্ধু বা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে কথা বলতে চাও কথা বলতে পার।ম্যাডাম আমার কোন বন্ধু বা আত্মীয়স্বজন নেই। জন্মের পর-পর আমার বাবা-মা আমাকে কোন অজ্ঞাত কারণে পরিত্যাগ করেন। আমি বড় হই বিজ্ঞান কাউন্সিল নিয়ন্ত্রিত হোমে। হোমের নিয়ম-অনুযায়ী আমি আমার বাবা বা মার কোন পরিচয় জানি না।

আমাকে এত কথা বলার কোন প্রয়োজন নেই।

জ্বি আচ্ছা ম্যাডাম। আপনাকে বিরক্ত করে থাকলে দুঃখিত।

সময় নষ্ট না করে ল্যাবোরেটরিতে ঢুকে পড়।

ম্যাডাম ল্যাবোরেটরিটা কোন্ দিকে?

তুমি এখানেই অপেক্ষা কর তোমাকে নিয়ে যাওয়া হবে।

ম্যাডাম আমি কোথায় যাচ্ছি?

আপাতত মহাকাশযান এড্রোমিডায় উঠছ। মহাকাশযানে করে কোথায় যাবে তা তারা তোমাকে বলে দেবে। যাত্রা শুভ হোক।ম্যাডাম আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।সায়েন্স কাউন্সিলের এই মহিলা আমার ধন্যবাদের উত্তরে কিছু বললেন না। পাশের ঘরে চলে গেলেন। পরের বারো ঘণ্টা কিছু রোবট আমাকে নিয়ে নাড়াচাড়া করল। শরীরে ইনজেকশন দিল।

ইমা পর্ব:০২

আমাকে কয়েক গ্যালন লবণাক্ত কিছু তরল খাওয়ানো হল। রেডিয়েশন চেম্বারে চেয়ারে বসিয়ে রাখল। তারপর মনে হল অনন্তকাল একটা অন্ধকার ঘরে শুইয়ে রাখল, সেই ঘরের বাতাস অসম্ভব ভারি। যখন নিশ্বাস নেই তখন মনে হয় বাতাস না, আমার নাকের ফুটোর ভেতর দিয়ে তরল কোন বস্তু ঢুকে যাচ্ছে। আমি অপেক্ষা করতে-করতে ক্লান্ত হয়ে একসময় ঘুমিয়ে পড়লাম।

যখন ঘুম ভাঙল তখন দেখি আমি মহাকাশযান এড্রোমিডা এফ এল এতে বসে আছি। একসঙ্গে লক্ষ লক্ষ বুদবুদ ফাটার শব্দ হচ্ছে। মহাকাশযান অকল্পনীয় বেগে ছুটে চলেছে। কোথায় যাচ্ছে। জানি না। একসময় হয়ত জানব। সেই একসময়টা কবে আসবে?

আমার খুব অস্থির লাগছে। অন্যসময় বিছানায় মাথা ছোয়ানো মাত্র ঘুমিয়ে পড়ি—আজ একি অবস্থা! ঐ পানীয়টা এত খাওয়া ঠিক হয় নি। আমি বিছানা থেকে নামলাম। আমার ঘরের দরজা ধরে কিছুক্ষণ ধাক্কাধাক্তি করলাম। দরজা খুলছে না। খুলবে না জানি। তারপরেও চেষ্টা করা। চিড়িয়াখানার জন্তুরা জানে তাদের খাচার দরজা খুলবে না, তারপরেও তারা প্রতিদিন বেশ কয়েকবার খাচার দরজায় ধাক্কা দেয়।

আমি তো এখন একজন জন্তুই। জন্তুকে যথাসময়ে খাবার দেয়া হয়, আমাকেও দেয়া হচ্ছে। চিড়িয়াখানার জন্তুর সঙ্গে আমার একটাই তফাত। তাদেরকে অনেকে দেখতে আসে। আমাকে কেউ দেখতে আসে না।এমন যদি হত রাতে ঘুমুচ্ছি হঠাৎ দরজায় নক হল। ঘুম ভেঙে আমি দরজা খুললাম এবং ঘরে হাসিমুখে ঢুকল ইমা।

ইমা পর্ব:০২

সে বলবে, একি তুমি এখানে কেন?

আমি বলব, জানি না কেন?

মহাকাশযানে করে তুমি কোথায় যাচ্ছ?

তাও জানি না। ইমা, কি হচ্ছে বল তো?

কিছুই হচ্ছে না। তুমি আসলে দুঃস্বপ্ন দেখছ।

না, তা হবে না। আমার জন্যে ইমা আসবে না। আমার জন্যে আসবে ভয়ংকর কেউ।কারোর জন্যে অপেক্ষা না করে আমার উচিত ঘুমিয়ে পড়া। আমি আবার বিছানায় গেলাম এবং মনে মনে বার-বার বলতে লাগলাম, আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দাও। আমি তোমাদের কাছে কিছুই চাই না। আমি চাই শান্তি ও আনন্দময় ঘুম।

সুপ্রভাত।আমি চমকে উঠলাম। কে কথা বলে? গম্ভীর গলা। গম্ভীর কিন্তু সুরেলা। স্বরের ভেতর কোথায় যেন সামান্য বিষাদ মাখা। শুনতে শুধু যে ভাল লাগে তাই না আরো শুনতে ইচ্ছা করে। আমি বিছানা থেকে নামলাম, চারদিকে তাকাচ্ছি। কোথাও কেউ নেই। কে কথা বলল? T5LASO, আপনাকে সুপ্ৰভাত। আশা করছি আপনার সুদ্ৰিা হয়েছে।কে কথা বলছেন?

মহাকাশযানের মূল কম্পিউটার, সবাই আমাকে সিডিসি নামে ডাকে।ও আচ্ছা তুমি।বলেই আমি একটু অস্বস্তিতে পড়লাম, সিডিসির মতো কম্পিউটারকে কি তুমি বলা উচিত হচ্ছে? সে রাগ করছে না তো? অন্যরা তাকে কিভাবে সম্বোধন করে? নিশ্চয়ই অনেক সম্মানের সঙ্গে। এতদিন পর সে আমার সঙ্গে কথা বলছেইবা কেন? আর আমিই-বা কী করে এত বড় বোকামি করলাম।

ইমা পর্ব:০২

প্রথমেই তুমি বলে তাকে রাগিয়ে দিলাম। আমার উচিত ছিল স্যার-স্যার করা।আমি ব্ৰিত-ভঙ্গিতে বললাম, আপনাকে তুমি করে বলায় আপনি কি রাগ করলেন।না রাগ করি নি। রাগ, বিস্ময়, ভয়, ভালবাসা-জাতীয় মানবিক আবেগ থেকে আমি মুক্ত।অন্যরা আপনাকে কি বলে? আপনি বলে না তুমি বলে?

যারা আমার ক্ষমতা সম্পর্কে জানে তারা আপনি বলে। অনেকে জানে না, তারা আপনার মতো তুমি বললেও পরে নিজেকে শুধরে নেয়।কিছু মনে করবেন না, আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে আপনি খুব অহংকারী।অহংকার একটি মানবিক ব্যাপার। আমার কথার ধরনে অহংকার প্রকাশ পেলেও আমি তা থেকে মুক্ত।আপনি যে শেষপর্যন্ত আমার সঙ্গে কথা বলছেন আমি এতেই আনন্দিত। আমি ভেবেছিলাম… থামলেন কেন কী ভেবেছিলেন বলুন।এখন আর বলতে চাচ্ছি না।ইচ্ছা না হলে বলতে হবে না।

আচ্ছা বলেই ফেলি, আমি ভেবেছিলাম কেউ আমার সঙ্গে কথা বলবে না। এই ছোট্ট গোলকঘরে বন্দি অবস্থায় আমার জীবন কাটবে। নিজেকে চিড়িয়াখানার জন্তু বলে মনে হচ্ছিল। যা-ই হোক আমি কি আপনাকে কিছু প্রশ্ন করতে পারি? অবশ্যই পারেন।আমি কি আশা করতে পারি যে আপনি আমার প্রশ্নগুলির জবাব দেবেন।না আশা করতে পারেন না। সব প্রশ্নের জবাব দিতে আমি বাধ্য নই। তাছাড়া সব প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই।

ইমা পর্ব:০২

আমার ধারণা ছিল আপনি সব প্রশ্নের উত্তর জানেন।অসংখ্য প্রশ্ন আছে যার উত্তর আমার জানা নেই। যেমন ধরুন আপনি যদি জিজ্ঞেস করেন, বিগ বেং-এর আগে কী ছিল? আমি জবাব দিতে পারব না।বিগ বেং-এর আগে কি ছিল এই জাতীয় প্রশ্ন আমি আপনাকে করব না। কারণ এইসব জটিল বিষয় নিয়ে আমার মাথা ব্যথা নেই। আমি খুব সাধারণ কিছু বিষয় জানতে চাই।

জিজ্ঞেস করুন।আপনারা আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন এবং কেন নিয়ে যাচ্ছেন।আপনাকে কেন নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তা এই মুহূর্তে বলা সম্ভব হচ্ছে না। তবে কোথায় নিয়ে যাচ্ছি সেটা বলতে পারি। আপনাকে নিয়ে যাচ্ছি সূর্যের সবচে কাছের নক্ষত্র প্রক্সিমা সেনচুরির একটি গ্রহের দিকে। গ্রহটির নাম রারা।আমাকে কেন নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সেটা বলা সম্ভব হচ্ছে না কেন?

আগেই বলা হয়েছে আমি সব প্রশ্নের জবাব দিতে বাধ্য নই।এই মহাকাশযানে আমি ছাড়া আর কে কে আছেন? বত্রিশ জনের একটা দল আছে। আপনি জেনে অত্যন্ত আনন্দিত হবেন যে আমাদের সঙ্গে মহান পদার্থবিদ সুরা এবং লিলিয়ান যাচ্ছেন। অংকশাস্ত্রের মহান দিকপাল ফেমর যাচ্ছেন। চারজন মাইক্রোবায়োলজিস্ট যাচ্ছেন। যাদের পৃথিবীর মানুষ চেনে। তিনজন রেডিওলজিস্ট আছেন।

এরা পৃথিবীর মানুষের কাছে তেমন পরিচিত না হলেও এদের মেধা তুলনাহীন। ছয়জন কম্পিউটার বিজ্ঞানী যাচ্ছেন। যাদের ভেতর আছেন মহামান্য কার। আরো যাচ্ছেন… থাক আর শুনতে চাচ্ছি না। আমি এদের কাউকেই চিনি না। চিনতে চাচ্ছিও না। আমি যেখানে যাচ্ছি তারাও কি সেখানে যাচ্ছেন? হ্যাঁ। যেখানে আমাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সে জায়গাটা পৃথিবী থেকে কত দূর?

ইমা পর্ব:০২

প্রায় চার আলোকবর্ষ দূর। আলো চার বছরে যতদূর যাবে ততদূর। আলোর গতিবেগ আশা করি জানা আছে।জ্বি না জানা নেই। আমি মোটামুটি মূখ বলতে পারেন।আলোর গতিবেগ হল সেকেন্ডে ২৯৯,৭৯২,৪৫৮ কিলোমিটার। প্রক্সিমা সেনচুরির দূরত্ব ৪ x ১০ কিলোমিটার। কাজেই আলোর গতিতে যাত্রা শুরু করলে আমরা গন্তব্যে পৌঁছব… আমি তাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, আমরা কি আলোর গতিতে যাচ্ছি?

পদার্থবিদ্যার সূত্র অনুযায়ী আমরা আলোর গতিতে যেতে পারি না। যে বস্তু আলোর গতিতে যাবে তার ভর হবে অসীম। যা সম্ভব না। আমরা আলোর গতির চেয়ে অনেক কম, আলোর গতির তুলনায় প্রায় হাস্যকর গতিতে যাচ্ছি। এই মুহূর্তে আমাদের গতিবেগ ঘন্টায় মাত্র ৪০০,০০০কিলোমিটার। এই গতিবেগ বেড়ে হবে ঘণ্টায় ২০,০০০,০০০ কিলোমিটার। এই হল আমাদের সর্বশেষ গতিবেগ। এরচে বেশি গতিতে যাওয়া সম্ভব না।আমার তো মনে হচ্ছে আমরা কোন কালেই প্রক্সিমা সেনচুরিতে পৌঁছতে পারব না?

পারব। হাইপার ডাইভ বলে একটি রহস্যময় ব্যাপার আছে। সর্বশেষ গতিসীমায় যাবার পর আমরা হাইপার ডাইভের সাহায্য নেব।হাইপার ডাইভটা কী? আগেই বলেছি হাইপার ডাইভ একটা রহস্যময় ব্যাপার। প্রক্সিমা সেনচুরির নিকটবর্তী গ্রহের অতি উন্নত কিছু প্রাণী হাইপার ডাইভ পদ্ধতি জানে। তারাই সাহায্য করে। আমরা অকল্পনীয় দূরত্ব অতিক্ৰম করি তাদের সাহায্যে।

ইমা পর্ব:০২

এখন তারাই আমাদের সাহায্য করবে প্রক্সিমা সেনচুরির কাছে যেতে? আশা করা যায় করবে। কারণ অতীতে সবসময় করেছে।অতি উন্নত সেইসব প্রাণীরা দেখতে কেমন? আমরা জানি না তারা দেখতে কেমন? তাদেরকে আমরা কখনো দেখি নি। তারা যে গ্রহে বাস করে সেই গ্রহে আমরা কখনো নামার অধিকার পাই নি। সম্ভবত এই প্রথম আমরা নামার অধিকার পাব। বিজ্ঞানীদের বিশাল দল সেই কারণেই যাচ্ছে।আমি কোন বিজ্ঞানীও না, কিছুই না। আমি কেন যাচ্ছি?

আমি আগেই বলেছি, এই প্রশ্নের জবাব আমি দিতে পারছি না।আপনি কি জবাবটা জানেন? হ্যাঁ জানি।আমার সঙ্গে যারা যাচ্ছেন তারা কি আমার কথা জানেন? হ্যাঁ জানেন।তারাও কি আমার মতো একটা ছোট্ট ঘরে বন্দি, না তারা একে অন্যের সঙ্গে কথা বলতে পারছেন? তারা কথা বলতে পারছেন।আমাকে বন্দি করে রাখা হয়েছে কেন? আপনার এই প্রশ্নের জবাব আমি দিচ্ছি না।যারা আমার সঙ্গে যাচ্ছেন তাদের যে কোন একজনের সঙ্গে আমি কথা বলতে চাই।সেটা সম্ভব নয়।

আচ্ছা ঠিক আছে। আমিও আর আপনার সঙ্গে কথা বলতে আগ্রহী না। আপনি যেতে পারেন।আমার কোথাও যাবার উপায় নেই। আমাকে কারোর পছন্দ হোক বা না হোক আমি এই মহাকাশযানের সবারই সার্বক্ষণিক সঙ্গী।আমার আরো কিছু প্রশ্ন করার ইচ্ছা ছিল। করতে ইচ্ছা করছে না। সিডিসির ওপর রাগ লাগছে। সিডিসি একটা যন্ত্র ছাড়া কিছুই না।

ইমা পর্ব:০২

যন্ত্রের উপর রাগ করার কোন অর্থ হয় না। কিন্তু আমার রাগ হচ্ছে এবং রাগটা ক্রমেই বাড়ছে। এটা আমার একটা সমস্যা। আমার রাগ আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে। একসময় মাথায় যন্ত্রণা শুরু হয়। তখন ঘর অন্ধকার করে শুয়ে থাকতে হয়। মহাকাশযানের আমার এই ঘর অন্ধকার করা যায় না। আর গেলেও আমি তা জানি না। সম্ভবত সিডিসি জানে, তাকে বললে সে হয়ত বাতিটাতি নিভিয়ে ঘর পুরোপুরি অন্ধকার করতে পারবে।সিডিসি আপনি কি আছেন?

হ্যাঁ আমি আছি।আমি ঠিক করেছি আপনাকে তুমি করে বলব।ইচ্ছা করলে বলবেন। সম্ভোধন কোন জরুরি বিষয় নয়।অবশ্যই জরুরি বিষয়। সম্বোধন থেকে বোঝা যায় যাকে সম্বোধন করা হচ্ছে তার অবস্থানটা কী? তুমি মহাজ্ঞানী হলেও আমার কাছে তোমার অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ না। কারণ তুমি আমার কোন কাজে আসছ না।তুমি রেগে যাচ্ছ।আমাকে তুমি করে বলবে না। আমি কোন কম্পিউটার নই। আমি মানুষ। তুমি অবশ্যই আমাকে সম্মান করে কথা বলবে। এবং আরেকটা কথা শুনে যাও, আমার ধারণা তুমি জ্ঞান-গাধা।ভাল কথা।

ভাল কথা কি মন্দ কথা তা জানি না। তবে তুমি অবশ্যই জ্ঞান-গাধা। আরেকটা কথা শোন, জ্ঞান-গাধাদের গাধামি কিন্তু বাড়তে থাকে। যত দিন যায় তত সে আরো বড় গাধা হতে থাকে। একটা সময় আসে যখন তার একমাত্র কাজ হয় জ্ঞানের বোঝা বয়ে বেড়াননা। জ্ঞানকে কাজে লাগানোর কোন ক্ষমতাই তার থাকে না। তুমি সেরকম হয়ে গেছ। তোমার গা থেকে গাধাদের মতো গন্ধও বের হচ্ছে। কেউ টের পাচ্ছে না, কিন্তু আমি পাচ্ছি।তুমি গন্ধ পাচ্ছ?

খবৰ্দার তুমি করে বলবে না। খবর্দার।আমার মাথায় যন্ত্রণা হতে শুরু করেছে। যন্ত্রণাটা বড়তে থাকবে। ঘরটা পুরোপুরি অন্ধকার করা দরকার।জ্ঞান-গাধা তুমি কি এখনো আছ? অবশ্যই আছি। আমার ঘরটা অন্ধকার করে দাও।মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছে? হ্যাঁ হচ্ছে।তোমার যখন মাথায় যন্ত্রণা হয় তখন কি তুমি খারাপ ধরনের কোন গন্ধ পাও? হ্যাঁ পাই। এখন পাচ্ছি গাধার বোটকা গন্ধ। এবং আবারো বলছি আমাকে তুমি করে বলবে না।

 

Read more

ইমা পর্ব:০৩ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *