অতি উন্নত প্রাণীরা পৃথিবীর কাছে মানুষদের একটা স্যাম্পল চেয়েছিল। তাকে তারা রেখে দেবে। হয়তো কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করবে। পৃথিবীর আইনে তা নিষিদ্ধ, তবে পৃথিবীর মানুষদের বৃহত্তর কল্যাণের কথা বিবেচনা করা হয়েছে। বিজ্ঞান কাউন্সিল একজনকে পাঠানোর অনুমতি দিয়েছে। অতি সাহস এবং মানবদরদী একজন স্বেচ্ছায় রাজি হয়েছেন। আপনি বলছেন আপনি সেই একজন নন।জি না স্যার। আমার এত সাহস নেই। এবং আমি মানবদরদীও নই।তা হলে আপনি কে?
স্যার আমার নাম মানুষ।ও হ্যাঁ আপনি মানুষ। আপনি কি কিছুক্ষণ বসবেন আমার পাশে, আমি আপনার ব্যাপারটা সিডিসিকে জিজ্ঞেস করে জেনে নেই। কারণ আমার সামান্য কৌতূহল হচ্ছে।আপনার মতো মহান পদার্থবিদের কৌতূহলের কারণ হতে পেরেছি, আমার যে স্যার কী ভাল লাগছে! এ আমার এক পরম সৌভাগ্য।
আমি সুরার পাশের সোফায় বসলাম। এই প্রথম সুরাকে সামান্য চিন্তিত মনে হল। তার ভুরু কুঁচকে গেছে, গলার স্বরও আগের চেয়ে গম্ভীর। এতক্ষণ সোফায় পা তুলে বসেছিলেন এখন পা নামিয়ে নিলেন। সুরা ডাকলেন– সিডিসি।অবজারভেশন ডেকের পেছনের দেয়ালের নীল বাতি জ্বলে উঠল। সিডিসির বিষাদমাখা গলা শোনা গেল।
মহামান্য সুরা। আমার সশ্রদ্ধ অভিবাদন গ্রহণ করুন।আমার পাশে যে বসে আছে আমি তাকে তোমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি।আপনাকে অতি বিনয়ের সঙ্গে জানাচ্ছি, এই মহাকাশযানের সবার সঙ্গেই আমার পরিচয় আছে।ও হ্যাঁ, তা তো থাকবেই। এই ছেলেটির কোন নাম ছিল না। আমি তার নাম দিয়েছি—মানুষ। নামটা ভাল হয়েছে না?
ইমা পর্ব:০৪
আবারো আপনাকে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে জানাচ্ছি যে আপনি নাম দেন নি। সে নিজেই তার এই নাম দিয়েছে, এবং আপনার ভেতর এমন ধারণা তৈরি করেছে যে নামটা আপনার দেয়া।ও আচ্ছা তুমি ঠিকই বলেছ। মানুষ নামটার কথা সেই আমাকে প্রথম বলেছে। আমি তার নাম রাখতে চেয়েছিলাম ল্যাঝিম। ভাল কথা ল্যাঝিম নামটা কি খুব প্রচলিত?
ল্যাঝিম মোটামুটি প্রচলিত একটা নাম। বৃহস্পতি গ্রহের চাঁদে খনিজ আহরণকারী যেসব মানুষ বসতি স্থাপন করেছে তাদের মধ্যে এই নামটি প্রিয়। ল্যাঝিম শব্দের অর্থ শেষ সূর্যের আলো। মানুষদের মধ্যে কত জনের নাম ল্যাঝিম এবং তাদের পরিচয় কী, তা জানতে চান? না-তা জানতে চাচ্ছি না। আমি এই ছেলেটি সম্পর্কে জানতে চাচ্ছি। সে আমাদের সঙ্গে কেন যাচ্ছে?
সে আমাদের সঙ্গে যাচ্ছে কারণ সে হল এমন একজন ভলেন্টিয়ার যে পৃথিবীর কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করেছে। মানবজাতির জন্যে তার ত্যাগের প্রতিদানও মানবজাতি দিয়েছে। আপনি শুনে অত্যন্ত আনন্দিত হবেন যে তার নামে পৃথিবীতে একটা ব্যস্ততম সড়কের নামকরণ করা হয়েছে।সিডিসি আমি কিন্তু একটা ব্যাপার বুঝতে পারছি না। এই ছেলের তো নামই নেই। আমি তার নাম দিয়েছি মানুষ।
মহান সুরা অবশ্যই তার নাম আছে। তার নাম ইয়ায়ু। মহাকাশযান ছাড়ার পর থেকে তার কিছু সমস্যা হচ্ছে। মানসিক কিছু সমস্যা। সে হয় তার পূর্ব ইতিহাস ভুলে গেছে কিংবা সে ভান করছে যে ভুলে গেছে। আমরা তাকে আলাদা করে রেখেছি সেই কারণেই।ও আচ্ছা।
ইমা পর্ব:০৪
দীর্ঘ সময় ছোট্ট ঘরে আটকে রাখলে তার কেবিন-ফিবার হতে পারে বিবেচনাতেই আজ তাকে ছাড়া হয়েছে। তবে তার উপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে, আপনি হয়ত লক্ষ করছেন অবজারভেশন ডেকের বাইরে একজন শান্তিরোবট আছে। যাতে সে কারোর কোন ক্ষতি করতে না পারে।এই ছেলেটিকে আমার মোটেই বিপজ্জনক বলে মনে হচ্ছে না।
আমারো মনে হচ্ছে না, তারপরও বাড়তি সাবধানতা।আমি ঘাড় ঘুরিয়ে শান্তি-রোবটকে দেখলাম। কিছুক্ষণ আগেও এ ছিল না, এখন কোত্থেকে উদয় হয়েছে? শান্তি-রোবট নাম শুনে বিভ্রান্ত হবার কারণ নেই। শান্তির সঙ্গে এদের কোন সম্পর্ক নেই। এরা দেখতে ভালমানুষের মতো কিন্তু আসলে ভয়াবহ। টানেলে কাজ করার সময় এদের দেখেছি। এদের কর্মকাণ্ডও দেখেছি। না দেখাই ভাল ছিল।
সিডিসির কথাবার্তা শুনে হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে যাবার উপক্রম হয়েছে। ব্যাপার কিছুই বুঝতে পারছি না। সিডিসি মিথ্যা কথা বলছে এটা বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু কেন বলছে? আমি সুরার দিকে তাকিয়ে বললাম, স্যার কিছু মনে করবেন না, সিডিসি কম্পিউটার হয় মিথ্যা কথা বলছে নয় রসিকতা করছে।স্রুরা বললেন, কম্পিউটারের মিথ্যা বলার ক্ষমতা নেই।
মিথ্যা বলা মানে কম্পিউটার লজিকে উল্টোদিকে চলা। সেই ক্ষমতা কম্পিউটারের নেই। একটা কম্পিউটার কখনো কোন অবস্থাতেই মিথ্যা বলতে পারে না। কম্পিউটার প্রসেসরের বিদ্যুপ্রবাহের একটা বিশেষ দিক আছে, মিথ্যা বললে সেই দিক উল্টে যায়। দুটি বিপরতিমুখী মাইক্রো কারেন্ট তখন একে অন্যকে নষ্ট করে ফেলে বলে কম্পিউটারের মূল প্রবাহ অকেজো হয়ে যায়।
ইমা পর্ব:০৪
ইন্টারফেসে জেটা পটেনশিয়ালের সৃষ্টি হয়। কপোট্রন অকেজো হয়ে যায়। বুঝতে পারছ? আমি দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললাম। সুরার কথাবার্তা কিছুই বুঝতে পারছি না। যা বুঝতে পারছি তা হল আমি গভীর জলে পড়েছি এবং কম্পিউটার সিডিসি মিথ্যা কথা বলছে। এতে তার কোন ক্ষতি হচ্ছে না।ইয়ায়ু আপনি আপনার কেবিনে যান এবং বিশ্রাম করুন।
সিডিসি যে কথাগুলো আমাকেই বলছে তা বুঝতে পারলাম না। আমি তাকিয়ে রইলাম সুরার দিকে। সিডিসি আবারো বলল, ইয়ায়ু আপনি ঘরে যান এবং বিশ্রাম করুন। তখন বুঝলাম আমারই নাম ইয়ায়ু এবং আমাকেই ঘরে যেতে বলা হচ্ছে। আমি বললাম, মিথ্যাবাদী সিডিসি আমি কোথাও যাচ্ছি না। তোমার সাধ্য নেই আমাকে এখান থেকে সরাবে।ইয়ায়ু আপনি উত্তেজিত হবেন না।
আমি মোটেই উত্তেজিত হচ্ছি না। অধিক শোকে পাথর হয় বলে একটা কথা প্রচলিত আছে। আমি অধিক শোকে লোহা হয়ে গেছি।স্রুরা কেমন অদ্ভুত চোখে আমার দিকে তাকাচ্ছেন। যেন ভয় পাচ্ছেন। অপ্রকৃতস্থ একজন মানুষ পাশে থাকলে ভয় পাবারই কথা। আমি তার দিকে তাকিয়ে অভয়দানের মতো করে হাসলাম। এতে মনে হয় তিনি আরো ভয় পেয়ে গেলেন।
আমি মনে মনে আবারো দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললাম। এখন আমি যে আচরণই করব তাঁর কাছে সেই আচরণ অপ্রকৃতস্থ বলে মনে হবে। আমি চুপ করে থাকলে তিনি ভাববেন আমি অতিরিক্ত চুপচাপ। আমি আসলে ভাববেন–পাগলের হাসি হাসছি। এই ধারণা যখন বদলানো যাবে না তখন পুরোপুরো পাগলের অভিনয় করাই ভাল।
ইমা পর্ব:০৪
সবচে ভাল হয় যদি বদ্ধ উন্মাদের অভিনয় করে সিডিসিকে বিভ্রান্ত করতে পারি। উন্মাদের অভিনয় খুব কঠিন হবার কথা না।আমি স্রুরার দিকে কিছুটা ঝুঁকে এসে বললাম, আপনি দয়া করে আমাকে তুমি করে বলবেন। আপনি মহাজ্ঞানী আর আমি জ্ঞানহীন মূর্খ। কে জানে হয়তবা পাগল।স্রুরা বললেন, আপনি কেবিনে চলে যান।তুমি করে বলুন স্যার।
তুমি তোমার কেবিনে যাও বিশ্রাম কর।আমি বরং এখানেই বিশ্রাম করি। আপনার পাশের সোফাটায় শুয়ে থাকি। জ্ঞানী মানুষদের পাশে শুয়ে থাকলেও জ্ঞান হয়। স্যার আপনার যদি কোন আপত্তি না থাকে।না আমার কোন আপত্তি নেই। এখানে শুয়ে থাকলে তোমার যদি ভাল লাগে তুমি এখানেই শুয়ে থাক।এবং স্যার ডিটেকটিভ বই যেটা আপনি পড়ছেন সেই বইটা যদি শব্দ করে পড়েন তাহলে ভাল হয়। শুয়ে-শুয়ে শুনতে পারি।
কাহিনীটা আমাকে খুবই আকর্ষণ করেছে। ল্যাঝিমের সঙ্গে পদার্থবিদের সম্পর্কটা আসলে কেমন? অর্থাৎ স্যার আমি বলতে চাচ্ছি ল্যাঝিম কি পদার্থবিদকে পছন্দ করে? পদার্থবিদের নামও তো স্যার জানা হল না। সেও কি আপনার মতো মহান টাইটেল পেয়েছেন নাকি সে সিডিসির মতো গাধা-টাইপ? বলতে বলতে পারে সোফায় আমি শুয়ে পড়লাম এবং লক্ষ করলাম শান্তি-রোবটটা এগিয়ে আসছে।
সে আমার দিকে আসছে বলাই বাহুল্য। আমি অসহায় বোধ করছি। আমার আসলে এখন কিছুই করার নেই। শান্তি-রোবট অতি নিম্নশ্রেণীর রোবট, তবে বোবটের নিয়ম মেনে চলে। মানুষকে কখনোই আহত করে না। সে আমাকে আহত করবে না, তবে অতি নিশ্চিত যে ধরে নিয়ে কেবিনে শুইয়ে দেবে। তার আগে সে তার একটি হাতে খুব আলতো করে আমার হাত চেপে ধরবে।
ইমা পর্ব:০৪
সেই ধাতব-হাতের ভেতর থেকে হাইপোরমিক সিরিজের সুচের মতো একটা সুচ বের হয়ে আমার চামড়া ভেদ করে রক্তে চলে যাবে। সেই সুচ দিয়ে কড়া ঘুমের ওষুধ আমার রক্তে মিশতে থাকবে। আমি প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়ব। যখন ঘুম ভাঙবে আমি দেখব আমি আমার কেবিনে শুয়ে আছি। আমার ক্ষুধাবোধ হচ্ছে এবং আমার শরীর অসম্ভব ক্লান্ত। শান্তি-রোবটদের এই আচরণের সঙ্গে আমার পরিচয় আছে।
রোবটটা এগিয়ে আসছে। আমি তার দিকে তাকিয়ে বললাম, তুমি কেমন আছ, ভাল? সে সামান্য থমকে দাঁড়াল।আমি বললাম, মহান পদার্থবিদ সুরার সঙ্গে কি তোমার পরিচয় আছে। ইনি মহান পদার্থবিদ সুরা। অতি নিরহংকারী মানুষ।রোবট আমার কথায় বিভ্রান্ত হচ্ছে না। তার চোখ জ্বলছে। নীল আলো বের হচ্ছে।সিডিসি বলল, ইয়ায়ু আপনি ঝামেলা করবেন না। আপনার হাত বাড়িয়ে দিন। শান্তি রোবট আপনাকে স্পর্শ করতে চায়।আমি বললাম, কেন?
আপনার মঙ্গলের জন্যে। ইয়ায়ু আমি আপনার মঙ্গল চাই।আমি খানিকটা বিভ্রান্ত হলাম। এমনকি হতে পারে যে সিডিসি আসলে সত্যি কথা বলছে। না তা হতে পারে না।রোবটটা তার ডান হাতটা বাড়িয়ে দিল। আমার মনে হল ঝামেলা করে কী হবে, দিক ঘুম পাড়িয়ে। আমিও হাত বাড়িয়ে দিলাম।
বুঝতে পারছি সুচটা চামড়া ভেদ করে ভেতরে ঢুকছে। তীব্র ঘুমের ওষুধ সে রক্তে মিশিয়ে দিচ্ছে। গভীর ক্লান্তি, গভীর অবসাদে চোখের পাতা ভারি হয়ে আসছে। আমার চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা হচ্ছে। কাউকে ডাকতে ইচ্ছা করছে যে আমাকে রক্ষা করবে, যে আমাকে দুঃস্বপ্ন থেকে মুক্তি দেবে। আমার আশেপাশে এমন কেউ নেই।
ইমা পর্ব:০৪
নেই বলছি কেন? একজন তো অবশ্যই আছে। তার নাম ইমা। বাস্তবে তার কোন অস্তিত্ব নেই সে আছে কল্পনায়। কল্পনায় থাকলেও তার অনেক ক্ষমতা। সে আমার সমস্ত দুঃখ সমস্ত কষ্ট নিমেষে ভুলিয়ে দিতে পারে। আমি বিড়বিড় করে বললাম, ইমা ইমা। আমি গভীর ঘুমে তলিয়ে যাচ্ছি তারপরেও আমি তার মমতাময়ী মুখ দেখতে পারছি।
সেই মুখ ঝুঁকে এসেছে আমার দিকে। আহ কী সুন্দর সেই মুখ! ইমার পরনে সবুজ একটা পোশক। সবুজ মানে হচ্ছে নিরাপদ ভ্ৰমণ। এই মহাকাশযান যখন বিপজ্জনক পথে যাবে তখন ইমার পোশাকের রঙ লাল হয়ে যাবে। এই তো লাল হতে শুরু করেছে। আমি তাকিয়ে আছি, ইমা যেন কিছু বলতে চেষ্টা করছে। তার ঠোট নড়ছে।আমি বিড়বিড় করে বললাম, ইমা তুমি কি বলতে পার আমি কে?
আমার ঘুম ভেঙেছে। চোখ মেলতে ইচ্ছা করছে না। কেন জানি মনে হচ্ছে চোখ মেললেই দেখব শান্তি-রোবটটা পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। সে তার ঘন নীল চোখে আমাকে দেখছে। সেই দৃষ্টিতে আর যা-ই থাকুক ভালবাসা নেই। অবশ্যি ঘৃণাও থাকবে না। রোবটবাহিনী ঘৃণা-ভালবাসার ঊর্ধ্বে।
আমার কপালে একের পর এক যা ঘটছে তাতে মনে হয় সিডিসি তাকে রেখে দিয়েছে আমার সার্বক্ষণিক সঙ্গী হিসেবে। আমি চোখ মেললেই সে আমার দিকে তাকিয়ে হাসবে। এই পৃথিবীর সবচে কুৎসিত দৃশ্য সম্ভবত রোবটদের হাসি বা তাদের হাসির ভঙ্গি। বিজ্ঞান কাউন্সিল থেকে আইন পাস করিয়ে এদের হাসি বন্ধ করার ব্যবস্থা করা যায় না?
ইমা পর্ব:০৪
ঘুম ভাঙার পর বেশিক্ষণ চোখ বন্ধ করে থাকা যায় না। ভেতর থেকে কে যেন বলতে থাকে, চোখ মেল। চোখ মেল।আমি চোখ মেললাম। এবং হতাশ হয়ে দেখলাম সত্যি সত্যি আমার পাশে শান্তি-রোবটটা দাঁড়িয়ে আছে এবং হাসার মতো ভঙ্গি করছে। রোবটটার গালে প্ৰচণ্ড একটা চড় কলে কেমন হয়? সে তার উত্তরে কী করবে? আমার গালে প্ৰচণ্ড একটা চড় বসাবে? মনে হয় না। কারণ তাদের রাগ নেই। চড় খাবার পরেও আমার ধারণা সে বেশ স্বাভাবিকভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে। তার ঠোটের ফাকে আগের মতোই হাসির আভাস থাকবে।
আমি বিছানায় উঠে বসতে বসতে বললাম, তারপর তোমার খবর কি? সব ভাল তো? রোবট কিছু বলল না। মানুষের মতো হ্যাঁ-সূচক মাথাও নাড়ল না। শুধু তার নীল চোখ একটু যেন বেশি জ্বলে উঠল।তোমাকে কি আমার সঙ্গে সার্বক্ষণিকভাবে জুড়ে দেয়া হয়েছে? আমাকে বলা হয়েছে আপনার দিকে লক্ষ রাখতে।আমি ঘর থেকে বের হতে পারব না?
তা তো আমি বলতে পারব না। সিডিসি যদি অনুগ্রহ করে দরজা খুলে দেন তাহলে আপনি বের হতে পারবেন। তবে আপনি যেখানেই যান আমি আপনার দুমিটার দূরত্বে থাকব।শুনে খুবই আনন্দিত হলাম। একমিটারের ভেতর থাকলে আরো ভাল হত। কী আর করা। দেখি হাতটা বাড়াও তো হ্যান্ডশেক করি।
আমি হাত বাড়িয়ে আছি। শান্তি-রোবটটা সেই হাতের দিকে তাকিয়ে আছে। নিজের হাত বের করছে না। মনে হচ্ছে সে ধাঁধায় পড়ে গেছে।আমি বললাম, মানবসমাজের অতি প্রাচীন নিয়মের একটি হচ্ছে দুজন যখন বন্ধুভাবাপন্ন হয়ে কাছে আসে তখন তারা একজন আরেকজনের হাত ধরে। এবং কিছুক্ষণ ঝাঁকাঝাঁকি বা নড়াচাড়া করে।
ইমা পর্ব:০৪
আমি বিছানায় শুয়ে আছি। ঘরের ভেতরটা আরামদায়ক। সামান্য শীত-শীত লাগছে। হালকা একটা চাদরে শীত কাটবে। আবার না হলেও চলবে। এই অবস্থাটাই আসলে আরামদায়ক। শুয়ে-শুয়ে গরম কফি খেতে ইচ্ছে হচ্ছে। এই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাটা কোন বিজ্ঞানী এখন পর্যন্ত করেন নি কেন বুঝতে পারছি না। তারা কত কিছুই পারেন, এটা পারেন না কেন?
মহাকাশযানে কোন মধ্যাকৰ্ষণ শক্তি থাকার কথা না, তারপরেও কিভাবে যেন ঠিক পৃথিবীর মতো lg মধ্যাকৰ্ষণ তৈরি করা হয়েছে। যারা এটা পারেন তারা আরাম করে বিছানায় শুয়ে-শুয়ে গরম কফি খাবার ব্যবস্থাও করতে পারেন।প্রক্সিমা সেনচুরির নবম গ্রহের মহা-মহা জ্ঞানী প্রাণীরা নিশ্চয়ই এই সমস্যার সমাধান করে ফেলেছেন। আচ্ছা এই প্রাণীরা দেখতে কেমন?
মানুষের মতো নিশ্চয়ই না। মাকড়সার মতো না হলেই আমি খুশি। যদি দেখা যায় ওরা মাকড়সার মতো তাহলে ভাল সমস্যা। হাজার হাজার মাকড়সা চারদিকে কিলবিল করছে। কেউ গায়ে উঠছে, কেউ গা থেকে নামছে, খুব কৌতূহলী একজন আমার কানের ফুটো দিয়ে তার একটা ঠ্যাং ঢুকিয়ে দিল। কী সর্বনাশ! উন্নত প্রাণীদের বিষয়ে মানুষের কাছে কোন তথ্য নেই, তা ঠিক বিশ্বাসযোগ্য নয়। কিছু তথ্য অবশ্যই আছে।
এবং এই তথ্য জানার অধিকার আর কারোর থাকুক বা না থাকুক আমার আছে। অবস্থাগতিকে মনে হচ্ছে আমার বাকি জীবনটা ওদের সঙ্গেই কাটাতে হবে। যাদের সঙ্গে কাটাব তাদের বিষয়ে আগে কিছুই জানব না তা হয় না।শান্তি-রোবটটা আমরা দুমিটার দূরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। একেবারই নড়ছে না। এখন তাকে লাগছে ঘরের আসবাবের মতো। তাকে কাপড় রাখার স্ট্যান্ড হিসেবে ব্যবহার করলে কেমন হয়?
ইমা পর্ব:০৪
কাউন্সিলের সভায় কী সিদ্ধান্ত হয়েছে বুঝতে পারছি না। প্রথম সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত শান্তি-রোবটের হাত থেকে আমার মুক্তি। রোবটটা যখন যাচ্ছে না তখন ধরে নিতে হবে কাউন্সিলের সভা এখনো চলছে। জ্ঞানীদের সভা এত দ্রুত শেষ হয় না। সবাই সবাইকে জ্ঞান দিতে থাকবেন। জ্ঞানের পিচকিরি খেলা চলতে থাকবে। শেষ পর্যন্ত সভা শেষ হবে সিদ্ধান্ত ছাড়া।
সিডিসিকে জিজ্ঞেস করে জেনে নিতে পারি সভা শেষ হল কি না। তাছাড়া সিডিসির সঙ্গে কিছুক্ষণ পোশগল্প করা যেতে পারে। অতি উন্নত প্রাণীরা মাকড়সার মতো কি না তাও জানা দরকার।সিডিসি।জ্বি।কাউন্সিলের সভা কি চলছে না চলছে না? সভা শেষ হয়েছে! সভার সিদ্ধান্ত কী?
আপনার উপর থেকে শান্তি-রোবটের খবরদারি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এবং চার ঘণ্টা পর আবার সভা ডাকা হয়েছে। সেই সভায় আমার উপস্থিতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।মনে হচ্ছে তারা তোমার বিরুদ্ধে ঘোঁট পাকাচ্ছে।হ্যাঁ সেরকমই মনে হচ্ছে। এবং এটাই স্বাভাবিক।স্বভাবিক কেন?
স্বাভাবিক কারণ তাদের ধারণা আমি মিথ্যা বলেছি। এবং ওদের প্রথম সিদ্ধান্ত –তোমার উপর থেকে শান্তিবাহিনীর খবরদারি উঠিয়ে নিতে হবে, তা মানি নি।ও আচ্ছা।আগে তোমাকে দেখেশুনে রাখার জন্যে একজন শান্তি-রোবট ছিল—এখন চারজন। একজন ভেতরে তিনজন বাইরে।ভাল তো। নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে।আপনি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ।
ইমা পর্ব:০৪
আমি চুপ করে রইলাম। নতুন পরিস্থিতি সম্পর্কে ঠাণ্ডামাথায় একটু কি চিন্তা করে নেব? বা তার দরকার আছে কি? ঘুম-ঘুম পাচ্ছে। বরং ঘুমিয়ে পড়া যেতে পারে। ঘুম থেকে উঠে কথা বলা যাবে। আরো নতুন সিদ্ধান্ত কিছু এর মধ্যেই হয়ত হতে পারে।সিডিসি! জ্বি বলুন।আমি ঠিক করেছি লম্বা ঘুম দেব। ঘণ্টা তিনেক আরাম করে ঘুমুব। আমি চাই না, এই সময় কেউ আমাকে বিরক্ত করে।কেউ যাতে আপনাকে বিরক্ত না করে তা দেখব।
যে শান্তি-রোবটটা আমার দুমিটার দূরে দাঁড়িয়ে আছে তাকে সরে যেতে বল।সেটা সম্ভব না।তাহলে দয়া করে ওর চোখের আলো নিভিয়ে দাও। ও জ্বলজ্বলে চোখে তাকিয়ে থাকলে আমি ঘুমুতে পারব না।সে ব্যবস্থা করছি।তোমার সঙ্গে আমি কিছু অন্তরঙ্গ আলাপ করতে চাই, তা কি সম্ভব? মোটেই অসম্ভব না।যে উন্নত গ্রহের দিকে আমরা যাচ্ছি তাদের অতি উন্নত প্রাণীদের বিষয়ে কি তোমার কাছে কোন তথ্য আছে?
খুব সামান্য তথ্যই আছে।যা আছে তা আমাকে জানাতে পারবে? পারব। আপনি ঘুম থেকে জেগে উঠেই যাবতীয় তথ্য রিপোর্ট-আকারে পাবেন।তোমার এই শান্তি-রোবট কি পা টিপতে পারে? আপনার কথা বুঝতে পারছি না।দীর্ঘ সময় দুপায়ে দাড়িয়ে ছিলাম বলে পায়ের মাসল ব্যথা করছে। ও পা টিপে দিলে আরাম হত।আচ্ছা আমি ব্যবস্থা করছি।এতে শান্তি-রোবটের সম্মানের কোন হানি হবে না তো?
সিডিসি জবাব দিল না। আমি মনে মনে হাসলাম। শান্তি-রোবট কাছে এগিয়ে আসছে। আমি পা মেলে চোখ বন্ধ করলাম। ঘুম চলে আসছে। কেন জানি মনে হচ্ছে আজ আমি ঘুমের ভেতর মাকড়সা স্বপ্নে দেখব। মাথা থেকে মাকড়সার ব্যাপারটা দূর করতে পারছি না।
সিডিসি।জ্বি।ঘুম পাড়িয়ে দেবার তোমার যে-সব কৌশল আছে তা চালু কর। আমি ঘুমুতে চাই আপনি এক্ষুণি ঘুমিয়ে পড়বেন।হ্যাঁ ঘুম আসছে। ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছে। ঘুম-ঘুম অবস্থায় আমার মনে হল—পাশের দান উল্টে গেছে। এখন থেকে আমি যা বলব সিডিসি তাই শুনবে। এরকম মনে হবার যদিও কোনই কারণ নেই।ঘুম ভেঙেছে।
Read more
