ইস্টিশন পর্ব-০৪ হুমায়ূন আহমেদ

ইস্টিশন পর্ব-০৪

আমি কুসুম আপুর চোখের দিকে তাকিয়ে না বলতে যাব তার আগেই রহিমা ফুপুর কাশির শব্দ শোনা গেল। এই কাশির অর্থ তিনি জেগে আছেন। মেয়ে কোথায় যাচ্ছে কী করছে খেয়াল রাখছেন। কেশে কেশে তিনি মেয়েকে অনুসরণ করেন।কুসুম আপু দরজার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, কাশছ কেন মা? ফুপু ক্ষীণ গলায় বললেন, কাশ হয়েছে।

কুসুম আপু বলল, তোমার সর্দি কাশি কিছুই হয় নি। তুমি আশে পাশেই আছ এটা জানান দেবার জন্যে তুমি কাশছ। পাহারা দেবে না মা। খবর্দার পাহারা দেবে না। যাও ঘুমাতে যাও। যাও বললাম।চিৎকার করিস না। তোর ফুপুর ঘুম ভেঙ্গে যাবে।তুমি যদি দরজার পাশ থেকে না যাও আমি এমন চিঙ্কার দেব যে বাজার থেকে লোক ছুটে আসবে।যাচ্ছি, তুই সব সময় এরকম করিস কেন?

কুসুম আপু বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। খপ করে আমার হাত ধরে বলল, এই টগর আমার সঙ্গে আয় তো।আমি ভীত গলায় বললাম, কোথায় যাব? আমি যেখানে নিয়ে যাব সেখানে যাবি।ভাইয়া আমার দিকে তাকিয়ে ভীত গলায় বলল, যেতে বলছে যা। এমন শক্ত হয়ে বসে আছিস কেন?

কুসুম আপু আমাকে নিয়ে তার নিজের ঘরে ঢুকল। ভেতর থেকে দরজার ছিটকিনি দিয়ে দিল। আমি লক্ষ করলাম তার শরীর কাঁপছে। নিশ্চয় রাগে কাঁপছে। এত রাগ করার মতো কোনো ঘটনা তো ঘটে নি। কুসুম আপু আমার দিকে তাকাল। হাসল। তারপর খুবই স্বাভাবিক গলায় বলল, টেবিলের ড্রয়ারে একটা কাঁচি আছে। কাঁচিটা নিয়ে আমার চুল কেটে দে। কচকচ করে কাটবি। চুল কাটার কচকচ শব্দ শুনতে খুব ভালো লাগে। পারবি না?

আমি ভীত গলায় বললাম, পারব না।অবশ্যই পারবি। আমি যা বললাম তোকে শুনতে হবে।শুনতে হবে কেন? কারণ আমি কোনো সাধারণ মেয়ে না। আমার শরীরে একটা বিশেষ চিহ্ন আছে। এই চিহ্ন যে সব মেয়েদের থাকে পৃথিবীর সব পুরুষরা তাদের কথা শুনে।বিশেষ চিহ্নটা কী? বুকের ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় একটা লাল তিল। দেখতে চাস?

আমি কিছু বললাম না। চোখ নামিয়ে নিলাম। কুসুম আপুর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে লজ্জা লাগছে।মুখে না বললেও তুই যে দেখতে চাস এটা আমি তোর চোখ দেখেই বুঝতে পারছি। আচ্ছা যা তোকে তিলটা দেখাব। আজ না। অন্য আরেকদিন।

কিন্তু খবর্দার, শুধু তিলটাই দেখবি। অন্যকিছু দেখবি না। অন্য কোনো দিকে যদি চোখ যায় তাহলে আমি কিন্তু কুরুশ কাটা দিয়ে তোর চোখ গেলে দেব। নে এখন আমার চুল কাটতে শুরু কর। খবর্দার হাত কাঁপাবি না।কুসুম আপু কাঁচি এনে আমার হাতে দিল। আমি চুল কাটছি। বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে রহিমা ফুপু বলছেন, দরজা বন্ধ কেন? এই কুসুম দরজা বন্ধ কেন? দরজা বন্ধ করে তুই কী করছিস?

যে সুন্দর সে সব সময়ই সুন্দর। মাথা ভর্তি চুল থাকলেও সুন্দর, চুল না থাকলেও সুন্দর। চুল কাটার পর কুসুম আপুকে কী সুন্দর যে লাগছে। আমি তাকিয়ে থাকি আর অবাক হই। কুসুম আপুর মুখ আগে লম্বা টাইপ ছিল। চুল কাটার পর মুখটা গোল হয়ে গেছে। চোখগুলি হয়ে গেছে টানা টানা। আমার ধারণা সবার কাছেই কুসুম আপুকে সুন্দর লাগছে। শুধু রহিমা ফুপুর লাগছে না।

তিনি মেয়ের দিকে তাকালেই মুখ কাঁদো কাঁদো করে বলেন—মেয়েটাকে বান্দরের মতো লাগছে। ছিঃ ছিঃ কী সর্বনাশ। দুই দিন পরে আমি মেয়ের বিয়ে দিব। কোমর পর্যন্ত চুল আসতে লাগবে দশ বছর। আমার কী সর্বনাশ হয়ে গেল।কুসুম আপু তার উত্তরে ঝগড়া করে না। খিল খিল করে হাসে এবং বলে, তোমার সর্বনাশ হবে কেন। আমার বিয়ে না হলে আমার সর্বনাশ। তোমার কী?

চুল ছোট করার পর কুসুম আপুর রাগও মনে হয় পড়ে গেছে। পড়ায় মন বসেছে। এখন আর ভাইয়ার সঙ্গে ঝগড়া করে না। রাতে বৃষ্টি নামলে অদ্ভুত গোসলও করে না। অনেক রাত পর্যন্ত দরজা বন্ধ করে পড়াশোনা করে। দরজা বন্ধ থাকে বলে রহিমা ফুপু ঘুমাতে যেতে পারেন না। বারান্দায় চৌকির উপর বসে থাকেন। হঠাৎ হঠাৎ মা তাকে তার ঘরে ডেকে নিয়ে যান। খুব নিচু গলায় দুজনের মধ্যে কথা হয়। নিশ্চয়ই বিশেষ কোনো কথা, কারণ তাদের কথা শেষ।

হবার পর রহিমা ফুপু ঘর থেকে কাঁদতে কাঁদতে বের হন। মা নিজেও কাঁদতে থাকেন। এবং হুট করে তাঁর আধকপালী মাথা ব্যথা শুরু হয়। মা কাউকে। চিনতে পারেন না।মার হাসি কান্না কোনোটাকেই আমরা তেমন গুরুত্ব দেই না। খুব ছোট বেলা থেকেই দেখছি মা কারণ ছাড়াই হাসেন। আবার কারণ ছাড়াই কাঁদেন। তার মানে এই না যে তার মাথার ঠিক নেই। সব মানুষ এক রকম হয় না। একেক মানুষ হয় একেক রকম।

মে মাসের ২৮ তারিখ থেকে এস এস সি পরীক্ষা শুরু হবে। প্রথম দিনে বাংলা। ভাইয়ার পরীক্ষার প্রিপারেশন শেষ। শুধু বাকি ছিল নিন্দালিশের পীর সাহেবের নিজের হাতের লেখা তাবিজ। এই তাবিজও যোগাড় হয়েছে। এই তাবিজের নিয়ম হল যেদিন পরীক্ষা শুরু হবে সেদিন ফজরের নামাজের পর তাবিজটা ডানহাতের কজিতে পরতে হবে। পড়ার সময় তিনবার বলতে হবে— রাব্বি জেদনি এলমান। এর অর্থ হে রব তুমি আমাকে জ্ঞান দাও।

যে কদিন তাবিজ বাঁধা থাকবে সে কদিন ফজরের নামাজ কাজা করা যাবে না, মিথ্যা কথা বলা যাবে না, চুল নখ কাটা যাবে না। শেষ পরীক্ষা হয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে স্রোতস্বিনী নদীতে তাবিজটা ফেলে দিতে হবে। তাবিজ ফেলার পরও সব শেষ না। কিছু কাজ বাকি, মাথা কামিয়ে সেই চুলও ঠিক তাবিজ যেখানে ফেলা হয়েছে সেখানে ফেলে দিতে হবে। মাথার কাটা চুল পানিতে ড়ুবে গেলে উদ্দেশ্য সফল ধরে নিতে হবে। আর চুল যদি পানিতে ভেসে থাকে তাহলে সর্বনাশ।

নিন্দালিশের পীর সাহেব সবাইকে এই তাবিজ দেন না। পীরসাহেবের এক মুরিদের হাতে পায়ে ধরে ভাইয়া তাবিজ জোগাড় করেছে। পরীক্ষা নিয়ে ভাইয়ার মনে সামান্য দুঃশ্চিন্তা ছিল। তাবিজ পাওয়ার পর দুঃশ্চিন্তা দূর হয়েছে।ভাইয়ার সিট পরেছে আঠারো বাড়ি হাই স্কুলে। ভাইয়ার ধারণা এটাও আল্লাহপাকের খাস রহমত। আঠারো বাড়ির সেন্টার নকলের জন্যে খুবই বিখ্যাত। এই সেন্টারের শিক্ষকরাও নকলের ব্যাপারে সাহায্য করেন।

হঠাৎ কোনো ম্যাজিস্ট্রেট চলে এলে শিক্ষকরা ছুটে গিয়ে ছাত্রদের খবর দেন। যে যার বই খাতা যাতে লুকিয়ে ফেলতে পারে।এমন সুযোগ সুবিধার পরেও কী যে হল—পরীক্ষার ঠিক আগের দিন–২৭শে মে, ভাইয়া আমাকে ডেকে শিমুল গাছের নিচে নিয়ে গেল। গলা নিচু করে বলল, সিদ্ধান্ত নিয়েছি পরীক্ষা দিব না।আমি কিছু বললাম না। তাকিয়ে রইলাম।

পরীক্ষা দিয়ে লাভ নাই। মাথার ভেতর সব আউলা হয়ে গেছে। ধর পরীক্ষা দিয়ে যদি পাশও করি—তিন ডাণ্ডার পাশ হবে। তিন ডাণ্ডা বুঝিস তো থার্ড ডিভিশন। এদিকে কুসুম পাবে ফার্স্ট ডিভিশন। এক ডাণ্ডা! লজ্জার ব্যাপার।হুঁ? এরচে পরীক্ষা না দেয়া ভালো। ঠিক কি না তুই নিজেই বল।ঠিক।আমি তো থাকব না। তুই খবরটা সবাইকে দিবি।তুমি যাচ্ছ কোথায়?

এখনো কিছু জানি না। সাইকেল নিয়ে বের হই। সাইকেলের চাক্কা যে দিক যাবে-আমিও যাব সেই দিকে।ভাইয়ার সাইকেলের ক্যারিয়ারে কাপড়ের একটা ব্যাগ। হ্যান্ডেলে আরেক ব্যাগ। পানির একটা বোতল। ভাইয়ার মাথায় ক্রিকেট খেলোয়াড়দের টুপির মতো টুপি। তাকে দেখাচ্ছে ভূপর্যটকের মতো। শার্টের পকেট থেকে সানগ্লাস বের হয়ে আছে। আমি বললাম, তুমি ফিরবে কবে?

ভাইয়া উদাস গলায় বলল, কিছুই জানি না। নাও ফিরতে পারি।আমি তাকিয়ে আছি। ভাইয়া সাইকেল নিয়ে রেল লাইনের পাশের রাস্তায় পায়ে চলা পথে উঠে পড়ল। দৃশ্যটা দেখতে এত ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে এই সাইকেল চলতেই থাকবে। কোনোদিন থামবে না। ভাইয়া একবার পেছনে ফিরে হাসল। সেই হাসিটাও এত সুন্দর। সুখী মানুষের হাসি।মগরা ব্রিজের দুপাশে তাঁবু পড়েছে। শাদা রঙের তাঁবু। রেলের ইঞ্জিনিয়ার এসেছেন, সঙ্গে অনেক লোকজন।

মালগাড়িতে করে রোজই কিছু না কিছু আসছে। সবচে বেশি আসছে বালির বস্তা। চটের ব্যাগ ভর্তি বালির বস্তায় ছোটখাট পাহাড়ের মতো হয়ে গেছে। মাটি কাটার একটা ক্রেন এসেছে। হলুদ রঙের এই ক্রেনটা যখন চলে তখন শকুনের বাচ্চার কান্নার মত শব্দ উঠে। ক্রেন যে চালায় সে মোটাসোটা থলথলে ধরণের মানুষ। তার চোখ সব সময় বন্ধ থাকে। মনে হয় সে ঘুমিয়ে ঘুমিয়েই ক্রেন চালায়। তাকে সারাক্ষণ বকা শুনতে হয়। ইঞ্জিনিয়ার সাহেব তাকে বকেন।

এই জমশেদ, এই জম্বু, ঘুমাচ্ছ নাকি? চোখ বন্ধ করে কি করছ? হ্যালো, হ্যালো।জমশেদ নামের লোকটা চোখ মেলে ফিক করে হেসে আবার চোখ বন্ধ করে ফেলে। ইঞ্জিনিয়ার সাহেব রাগে কাঁপতে থাকেন। গলার রগ ফুলিয়ে চেঁচাতে চেঁচাতে বলেন, তোমার নামে আমি হেড অফিসে রিপাের্ট করব। তুমি চাকরি কী করে কর আমি দেখব। চোখ বন্ধ করে ফাজলামি?

ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের নাম—কামরুল ইসলাম। তার বয়স নিশ্চয়ই বেশি। কিন্তু মাঝে মাঝেই তাকে কলেজের ছেলেদের মতো দেখায়। ভদ্রলোকের গায়ের রঙ শ্যামলা। চেহারা খুবই সুন্দর। শাদা রঙ মনে হয় তার খুব পছন্দ। বেশির ভাগ সময় তার পরনে থাকে শাদা প্যান্ট এবং শাদা গেঞ্জি। মাথায় বারান্দাওয়ালা শাদা টুপিও তার ছিল।

প্রথম দিনেই বাতাসে সেই টুপি, তার মাথা থেকে উড়ে গিয়ে মগরা নদীতে পড়ল। তিনি অতি ব্যস্ত হয়ে বললেন, টুপিটা রেসকিউ করার ব্যবস্থা কর। কুইক কুইক! কেউ নড়ল না।ইঞ্জিনিয়ার সাহেব প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে বললেন, আমার এটা খুব শখের টুপি। জাপান থেকে কেনা। আমি সাঁতার জানি না। জানলে নিজেই তুলতাম কেউ তুলে দিন বখশিশ পাবেন। ভালো বখশিশ দিব।

বখশিশের ঘোষণাতেও কাজ দিল না। ইঞ্জিনিয়ার সাহেব অসহায়ভাবে টুপির দিকে তাকিয়ে ছটফট করছেন। উপস্থিত দর্শকদের এই দৃশ্য দেখতেই বেশি ভালো লাগছে। টুপি তুলে ফেললে তো আর এমন মজার দৃশ্য দেখা যাবে না। টুপিটা ব্রিজের মাঝখানের স্প্যানের সঙ্গে লেগে ঘুরপাক খাচ্ছে। মনে হচ্ছে। টুপিটাও মজা পাচ্ছে। ড়ুবতে গিয়েও ড়ুবছে না।

একশ টাকা বখশিশ। একশ টাকা। আমার খুব শখের টুপি। ওয়ান হান্ড্রেড রুপিস।একশ টাকা ঘোষণা দেবার পর রহমান এন্ড ব্রাদার্স আইস ফেক্টরির এক কুলিকে লুঙ্গি মালকোচা করে এগুতে দেখা গেল। দর্শকরা সবাই তাতে খুব মজা পেল। হাত তালি দিতে শুরু করল। একজন চিৎকার করে বলল—সাবাস। মজনু। সাবাস।

মজনু পানিতে নেমে পড়ল মহাবিপদে। প্রবল স্রোত তাকে কাবু করে ফেলছে, সে টুপি পর্যন্ত যেতে পারছে না। তাকে ভাটির দিকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। পাড়ে উঠে সে আবারো শুরু করে। দর্শকরা নানান উপদেশ দেয়, উজান থেকে শুরু কর। ভাটি থেকে সাঁতার দিয়ে যাবি কীভাবে? গাধা নাকি। শরীরে শক্তি নাই? এই তুই ভাত খাস নাই?

এক হাত দিয়ে লুঙ্গিটা ধররে গাধা। তোর কালা পুটকি দেখা যায়। হি হি হি।টুপি উদ্ধার হল না। হাঁপাতে হাঁপাতে মজনু যখন স্প্যানের কাছে উপস্থিত হয়েছে তখন টুপি ড়ুবে গেছে। তারপরেও ইঞ্জিনিয়ার সাহেব মজনুকে একশ টাকা বখশিশ দিলেন। মজনু টাকা হাতে নিয়ে সবার দিকে তাকিয়ে বোকার মতো হাসতে লাগল।

জাপানি টুপির কারণে প্রথম দিনেই ইঞ্জিনিয়ার কামরুল ইসলাম সাহেবের নাম হয়ে গেল জাপানি ইঞ্জিনিয়ার। আমরা খুব আগ্রহের সঙ্গে জাপানি ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের কর্মকান্ড লক্ষ করতে লাগলাম।জাপানি ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের কর্মকান্ড অবিশ্যি লক্ষ করার মতোই। তিনি দিনের মধ্যে বেশ কয়েকবার রেলের স্লীপারে পা রেখে দৌড়ান। দৌড়ের সময়। সাপের শীস দেবার মতো শব্দ করেন।

প্রতিদিন সন্ধ্যার আগে আগে ব্রিজের মাঝখানের স্প্যানে পা ঝুলিয়ে বসে গান করেন। তিনি একটা গানই বোধহয় জানেন—আমি অধম জেনেও তো কিছু কম করে মোরে দাও নি। তখন তার পাশে টকটকে লাল রঙের একটা ফ্লাক্স থাকে। গানের ফাঁকে ফাঁকে ফ্লাক্স থেকে চা ঢেলে চুক চুক করে খান। এবং অবাক হয়ে নদীর স্রোতের দিকে তাকিয়ে থাকেন। তার দৃষ্টি বেশির ভাগ সময় থাকে যেখানে টুপি ড়ুবে গিয়েছিল সেইখানে।

বাবা একদিন দাওয়াত করে ভদ্রলোককে আমাদের বাসায় নিয়ে এলেন। রহিমা ফুপু অনেক পদ রান্না করলেন। কলার থােড় ভাজি, ঢেড়স ভর্তা, সরিষা ভর্তা, আলু দিয়ে মুরগি, মাছের ঝোল, টেংরা মাছের টক। কাচা মরিচ দিয়ে হিদল ভর্তা। বাবা হাত কচলাতে কচলাতে বললেন- নিজ গুনে ক্ষমা করবেন স্যার। দরিদ্র আয়োজন। আমার স্ত্রীর শরীরটা খারাপ। সে কিছু করতে পারে নি। তার শরীর ভালো থাকলে….।

জাপানি ইঞ্জিনিয়ার অবাক হয়ে বললেন—দরিদ্র আয়োজন মানে? এর নাম দরিদ্র আয়োজন? দরিদ্র আয়োজন কাকে বলে যদি দেখতে চান—আমার খাবার একদিন খেয়ে যাবেন। স্রেফ ভাত আর ডিম সিদ্ধ। সেই ভাতও কোনোদিন হচ্ছে জাউ, কোনোদিন লোহার মতো শক্ত।স্যার আপনার যখনই ইচ্ছা করবে আমার বাড়িতে খেয়ে যাবেন। এটা আপনার নিজের বাড়ি বলে বিবেচনা করবেন। আমার রিকোয়েস্ট।রোজ এসে আপনার বাড়িতে খেয়ে যাব?

জি স্যার। রিজিকের মালিক আল্লাহপাক। আল্লাহপাক যদি আমার বাড়িতে আপনার রিজিক ঠিক করে রাখে তাহলে এখানেই খাবেন। আমি বড় খুশি হব স্যার। ভেরি হ্যাপী হব।বাবা বিশিষ্ট মেহমানদের সামনে কথায় বার্তায় ইংরেজি বলতে পছন্দ করেন এবং হাত কচলাতে থাকেন। তখন তাঁর চেহারার মধ্যেই চাকর চাকর ভাব চলে আসে। তিনি যে বিনয়ের বাড়াবাড়ি করছেন এটা সবার চোখে পড়ে শুধু তাঁর চোখে পড়ে না।

বাবার ভাগ্য খারাপ তিনি সামনে বসিয়ে মেহমান খাওয়াতে পারলেন না। তাকে ইস্টিশন চলে যেতে হবে। আঠারবাড়ি স্টেশনে মালগাড়ি লাইন থেকে পড়ে গেছে। তাকে স্টেশনে থেকে আঠারবাড়ি স্টেশনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে।মেহমানদারির দায়িত্ব পড়ল কুসুম আপুর উপর। মেহমানদারি মানে ভাত শেষ হবার আগেই প্লেটে ভাত দিয়ে দেয়া। তরকারি নিয়ে সাধাসাধি। মেহমান না বলে দুহাতের দশ আঙুল মেলে প্লেট ঢাকবেন।

সেই আঙুলের ফাঁক দিয়ে তরকারি দিয়ে দিতে হবে। পাতে তরকারি চলে যাবে কিন্তু আঙুল ভিজবে না। এই জাতীয় কাজ কুসুম আপু কখনো করে না, আজ দেখি খুব উৎসাহ নিয়ে। করছে। বয়স্ক মহিলাদের মতো বলছে—একবার দিতে হয় না, দুবার দিতে হয়। হাত সরান আমি দুবার দেব। হাত না সরালে আমি আপনার হাতে তরকারি ঢেলে দেব।ভদ্রলোক বিস্মিত হয়ে হাত সরাতে সরাতে বললেন, একবার দিলে কী হয়?

কুসুম আপু বলল, একবার দিলে আদরের বৌ মরে যায়।সে কি আমি তো জানি একবার দিলে খালে পড়ে।বৌ মরা আর খালে পড়া একই জিনিস।আমার তো বৌ নেই, বৌ মরার প্রশ্ন আসছে না।এখন নেই পরেতো হবে। সেই বৌ মরে যাবে। অবিশ্যি বৌ যদি আদরের হয়। অনাদরের বৌ হলে মরবে না। আপনাকে যন্ত্রণা দেবে।ভদ্রলোককে দেখেই বুঝেছি কুসুম আপুর কথাবার্তায় তিনি চমকে গেছেন। আমরা কুসুম আপুর অদ্ভুত কথাবার্তায় চমকাই না, শুনে শুনে অভ্যস্ত। ভদ্রলোক তো আর শুনেন নি। তাছাড়া কুসুম আপুকে দেখাচ্ছিল পরীর মতো।

মেট্রিক পরীক্ষা উপলক্ষে বাবা যে শাড়িটা দিয়েছেন আপু সেই শাড়ি পরেছে। কপালে টিপ দিয়েছে। আমাদের বাড়িতে কপালে টিপ দেয়া খুবই খারাপ ব্যাপার বলে গণ্য করা হয়। টিপ দেয়া আর সিঁদুর দেয়া একই। এতে হিন্দুয়ানী করা হয়। বিয়ের পর দেয়া যায় তবে বিয়ের আগে দিলে স্বামী পর নারীতে আসক্ত হয়। মুসলমান মেয়ের হিন্দুয়ানী করার এই হল শাস্তি। কুসুম আপু পরেছে, কারণ সে নিয়ম কানুন মানে না।

আপুকে শাড়িতে খুবই মানিয়েছে। সবুজ শাড়ির সঙ্গে লাল টিপটাতেও মানিয়েছে। আমি তাকে কত ছোট থেকে দেখছি এই আমিই চোখ ফেরাতে পারছি না। জাপানি ইঞ্জিনিয়ার বাইরের মানুষ সে তো মুগ্ধ হবেই। তাছাড়া কুসুম আপুর শরীরে আছে বিশেষ একটা চিহ্ন। এই চিহ্ন থাকলে পুরুষ মানুষ তার আশেপাশে এলেই ফণা নামিয়ে ফেলবে। সাপের মতো সব পুরুষ মানুষেরও ফণা আছে। খুব বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া পুরুষ মানুষ ফণা নামাতে পারে না। (এটা আমার কথা না। কুসুম আপুর কথা।)।

 

Read more

ইস্টিশন পর্ব-০৫ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *