ইস্টিশন পর্ব-০৮ হুমায়ূন আহমেদ

ইস্টিশন পর্ব-০৮

জাপানি ইঞ্জিনিয়ার চোখ মুখ কুঁচকে বললেন, বিরাট ঝামেলা হয়ে গেছে। বড় সাহেব চলে যাবার পরই জমশেদ বলল, সে চাকরি করবে না। ব্যাগ গুছিয়ে রওয়ানা। তার অপমানের বিচার যদি হয় তাহলেই সে চাকরিতে জয়েন করবে। বিচার না হলে–না। এরা হল লিডার টাইপ লোক। তার দেখাদেখি ফোরম্যান ব্যাগ গুছিয়ে ফেলল। ফোরম্যানের সঙ্গে তিন এসিস্টেন্ট। কাজেই আমি কাজ বন্ধ করে কুলিদের ছুটি দিয়ে দিলাম।ব্রিজের কাজ বন্ধ?

এ ছাড়া উপায় কী? বড় সাহেব যে ভেজাল লাগিয়েছে এই ভাজাল কবে মিটবে কে জানে। সরকারি ব্যাপার তো তদন্ত কমিটি বসবে। মিটিং হবে। ফাইল চালাচালি হবে। সরজমিনে তদন্ত করার জন্যে সেলুন কারে করে রেলওয়ে বোর্ডের মেম্বাররা আসবেন। তদন্ত রিপাের্ট বের না হওয়া পর্যন্ত সব কাজ থাকবে বন্ধ। এবং একদিন ঝুপ করে পুরো ব্রিজ নদীতে পড়ে যাবে।

ব্রিজ কেন পড়ল সেই নিয়ে আবার তদন্ত কমিটি বসবে। আবার মিটিং। আবার ফাইল চালাচালি।আপনার তো মজাই হল—কাজ নেই।কাজ থাকাটাই হল মজার। কাজ না থাকা কোনো মজার ব্যাপার না। কাজ করা মানুষকে একদিন কাজ ছাড়া বসিয়ে রাখ তার মাথা নষ্ট হয়ে যাবে।আপনার মাথা কি নষ্ট হয়ে গেছে?

এখনো যায় নি। তবে যাবে। আজ দুপুরে খাব কী সেটা পর্যন্ত ঠিক নেই। বাবুর্চিও চলে গেছে।কুসুম আপু বলল, আজ দুপুরে আমাদের সঙ্গে খাবেন। আপনার কই মাছ। খাওয়ার দাওয়াত। আমরা আপনাকে নিতে এসেছি।জাপানি ইঞ্জিনিয়ার হাসি মুখে বললেন, তোমরা নিতে না এলেও আমি তোমাদের বাসায় চলে যেতাম। অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে আমাকে মনে হয় ঘন-ঘনতোমাদের ওখানেই খেতে হবে। তোমরা একটু দাঁড়াও আমি কাপড়টা বদলে আসি। কুসুম তাঁবুর ভেতর কেমন দেখা যায় তুমি দেখতে চাও?

কুসুম আপু বলল, আর একদিন দেখব। আজ না।আজ না দেখাই ভালো। খুবই এলোমেলো হয়ে আছে। গুছিয়ে রেখে তোমাকে খবর দেব।ইঞ্জিনিয়ার সাহেব তাঁবুর ভেতর ঢুকে গেলেন। আর তখনি চিটাগাং মেইলের হুইসেল শোনা গেল। কুসুম আপু হুইসেল শুনে হঠাৎ খুবই চমকে গেল। তার মুখ চোখ অন্য রকম হয়ে গেল। কুসুম আপু গলা নামিয়ে বলল, টগর শোন, আমার ঝপাং খেলা খেলতে ইচ্ছে করছে। আমি মগরা ব্রিজে উঠছি। খবর্দার ভয় পাবি না।

ঠিক সময়ে আমি পানিতে ঝাঁপ দেব।আমার হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল। কুসুম আপুর সঙ্গে এখন কোনো রকম তর্ক করা বৃথা। তাকে দুহাতে ঝাপটে ধরে রাখার চেষ্টা করা যায়। তাতে লাভ হবে না। একা আমি তাকে আটকাতে পারবো না। জাপানি ইঞ্জিনিয়ার পারবেন। আমি ছুটি গেলাম তাঁবুর দিকে।

কুসুম আপু হেলতে দুলতে ব্রিজের উপরে রেলের স্লীপারে পা রেখে হাঁটছে। বাতাসে তার শাড়ির আঁচল উড়ছে। মাথার চুল উড়ছে। তার মুখ হাসিহাসি। বাঁকের আড়াল থেকে ট্রেন বের হয়ে এসেছে। ট্রেনের ড্রাইভার এখনো দেখতে পায় নি যে ব্রিজের উপর একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দেখতে পেলে ক্রমাগত হুইসেল দিত।জাপানি ইঞ্জিনিয়ার প্রথমে কিছুক্ষণ বুঝতেই পারলেন না যে কুসুম আপু ব্রিজের উপর। হঠাৎ বুঝতে পেরে হতভম্ব গলায় বললেন, কুসুম তুমি কী করছ?

কুসুম আপু চেঁচিয়ে বলল, কিছু করছি না। হাঁটছি।দৌড়ে চলে এসো। দৌড়ে আস।না।তোমার কি মাথা খারাপ নাকি। এই কুসুম এই।কুসুম আপু শব্দ করে হাসল। এখন সে আর রেল স্লিপারে পা দিয়ে হাঁটছে। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। ইঞ্জিনিয়ার সাহেব আমার দিকে তাকিয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন—মেয়েটি পাগল? Insane?

ট্রেনের ড্রাইভার এখন কুসুম আপুকে দেখতে পেয়েছে। ক্রমাগত হুইসেল বাজিয়ে যাচ্ছে। হুইসেলের সঙ্গে টুনটুন করে ঘন্টাও বাজছে।ইঞ্জিনিয়ার সাহেব ভাঙ্গা গলায় ডাকলেন এই–কুসুম! এই! কুসুম আপু বলল, আপনি এসে আমাকে নিয়ে যান।

আমি এতক্ষণ খুব ভয় পাচ্ছিলাম। কুসুম আপু দাঁড়িয়ে পড়ার পর আর ভয় পাচ্ছি না। কারণ কুসুম আপু খুব হিসেব করে দাঁড়িয়েছে। দুটা স্প্যানের ঠিক মাঝখানে। এখান থেকেই নদীতে ঝাঁপ দেয়া নিরাপদ। আপু বার বার নদীর দিকে তাকাচ্ছে এর অর্থ হল—ঝাঁপ দেবার আগে হিসেব করে নেয়া। দুই হাত উঁচু করে রাখার কারণও একটাই। ঝাঁপ দেবার আগে দুহাত উঁচু করতে হয়।

ট্রেন ব্রিজের উপর উঠে পড়েছে। কুসুম আপুর আর দেরি করা উচিৎ না। কেন দেরি করছে। ঝপাং খেলার নিয়ম হচ্ছে ট্রেনের ইঞ্জিনের দিকে কখনো না তাকানো। ইঞ্জিনের দিকে চোখ পড়লেই নাকি হাত পা শক্ত হয়ে যায়। কুসুম আপু তাকিয়ে আছে ইঞ্জিনের দিকেই।

এক সময় ইঞ্জিন কুসুম আপুকে আড়াল করে ফেলল, তারপর ব্রিজ পার হয়ে গেল। আমি মগরা নদীর দিকে তাকিয়ে আছি। কুসুম আপুকে দেখতে পাচ্ছি—সাঁতার কেটে তীরের দিকে আসার চেষ্টা করছে। নদীতে প্রবল স্রোত। তার যে বেশ কষ্ট হচ্ছে তা দেখে বোঝা যাচ্ছে।

বাবা চোখ বড়বড় করে তাকিয়ে আছেন। যেন ভাইয়াকে চিনতে পারছেন না। তার চেহারা চেনা চেনা লাগছে। কোথায় দেখেছেন মনে করতে না পারায় একটু যেন বিব্রত।ভাইয়াকে অবশ্যি খুবই চেনা লাগছে। মাথায় বারান্দা দেয়া টুপি পরায় ভালো দেখাচ্ছে। ছোলা মাথা ঢাকা পড়েছে। গায়ের খাকি পােশাকটাও খুব। মানিয়েছে। সবচে মানিয়েছে পায়ের লাল রঙের কাপড়ের জুতো।

খাকি পােশাক পরার জন্যেই হয়তো ভাইয়া অতিরিক্ত গম্ভীর হয়ে আছে। কারো চোখের দিকে সরাসরি তাকাচ্ছে না। খাকি পােশাক পরা মানুষ কারোর চোখের দিকেই সরাসরি তাকায় না। দুই ভুরুর মাঝখানে তাকায়। এটা আমার কথা না, রহমান চাচার কথা। তিনি যৌবনে আনসার বাহিনীতে ঢুকেছিলেন। সেখানেই নাকি। তাকে শেখানো হয়েছে দুষ্ট লোকজনদের চোখে চোখে না তাকিয়ে দুই ভুরুর মাঝখানে তাকাতে৷

বাবা চাপা গলায় বললেন—ব্যাপার কী সং সেজেছিস কেন? ভাইয়া বলল, সার্ভিস পেয়েছি।বাবা বললেন, কোন বেকুব তোকে চাকরি দিল? এনজিওর চাকরি।চাকরিটা কী? গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে স্যানিটারি পায়খানা ফিটিং হবে। তার তদারকি। এ ছাড়াও আরো ডিউটি আছে।বাবা ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেললেন। হতাশ গলায় বললেন, শেষ পর্যন্ত্র পাইখানার মিস্ত্রি? আমার কোনো অসুবিধা নাই। অসুবিধা হবে তোর।ভাইয়া গম্ভীর গলায় বলল, কী অসুবিধা?

তোর বিয়ে শাদি হবে না। পাত্রী পক্ষের কাছে খবর যাবে জামাই গু ইঞ্জিনিয়ার। গু ইঞ্জিনিয়ারকে বিয়ে করতে কোনো মেয়ে রাজি হবে না। মেয়েদের মধ্যে শুচিবায়ু বেশি থাকে।আমার বিয়ে নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না।

চাকরি যেমন যোগাড় করেছিস, বিয়েরও ব্যবস্থা হয়েছে? আলহামদুলিল্লাহ। দুটা বড় খবর শুধু মুখে দিলি। মিষ্টি কিনে আন। বাতাসা কিনে আন। সবাইকে একটা করে বাতাসা দিবি আর এক ঢোক পানি। গু চাকরিতে এরচে বেশি কিছু খাওয়ানো ঠিক না। লোক হাসবে।ভাইয়া বাবার সামনে থেকে চলে গেল।

বাবা নিজের মনে বিড় বিড় করতে লাগলেন—কত রকম কারিগরের কথা শুনেছি—ঘরের কারিগর, জিলাপির কারিগর, আজ শুনলাম গুয়ের কারিগরের কথা। সেই কারিগর আমার ঘরে বসে আছে। আহা কী আনন্দ। কেউ যদি জিজ্ঞেস করে আপনার বড় ছেলে কী করে? আমি বুক ফুলিয়ে বলতে পারব, সে গু-কারিগর। তার সব বাণিজ্য গু নিয়ে।

বাবা আজকাল খুব বেশি কথা বলছেন। একবার কথা বলতে শুরু করলে আর থামেন না। কথা বলেই যান। বলেই যান। একই কথা নানান ভঙ্গিতে বলেন। শেষের দিকে শুনতে খুবই বিরক্তি লাগে। কেরোসিন চিকিৎসার সঙ্গে এর মনে হয় কোনো যোগ আছে। পেটের ব্যথার জন্যে কেরোসিন খাওয়া শুরুর পর থেকেই বাবার কথা বলা বেড়েছে।

আমি হাতের লেখা লিখছিলাম। বাবা আমার দিকে তাকিয়ে-তাকিয়ে ধমকের ভঙ্গিতে বললেন, চট করে একটা অংক কর। একটা গ্রামে তিনশ লোকের বাস। এরা প্রত্যেকে যদি গড়ে দৈনিক ৫০০ গ্রাম করে পায়খানা করে তাহলে এক মাসে গ্রামে গু এর পরিমাণ কত হবে? ঐকিক নিয়মে কর।আমি বললাম, এই অংক করতে হবে কেন?

তোর ভাইতো আর অংক করতে পারবে না। গু-এর অংক সব তোর করতে হবে।এই অংক আমি করব না।আচ্ছা যা করিস না।আমি বাবার সামনে থেকে উঠে চলে এলাম। বাবা নিজের মনে বিড়বিড় করতে লাগলেন। বিড়বিড় করে কী বলছেন বারান্দা থেকে শুনতে পাচ্ছি না। নিশ্চয়ই গু বিষয়ক কিছুই হবে।

বাবার কি শরীরের তাল নষ্ট হয়ে গেছে? একটা বয়সের পর মানুষের শরীরের তাল নষ্ট হয়ে যায়। সেই বয়সটা একেক জনের জন্যে একেক রকম। এটা আমার কথা না। জাপানি ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের কথা। জ্ঞানী-জ্ঞানী কথা তিনি আগে বলতেন না। আজকাল বলেন। তিনি এখন ঘরের মানুষ হয়ে গেছেন। ঘরের মানুষ অনেক কিছু বলতে পারে। জ্ঞানের কথা তো বলতেই পারেই।

তিনি যে শুধু জ্ঞানের কথা বলেন তা না, প্রাইভেট টিচারের মতো আমার পড়া ধরেন। আবার ধাঁধা জিজ্ঞেস করেন। জটিল সব ইংরেজি ধাঁধা। ঠোঁট গোল করে বলেন—বল দেখি টগর—নয় কেন সাতকে ভয় পায়? চট করে বল why nine is afraid of seven. নয় তো সাতের চেয়ে বড় নয়ের তো সাতকে ভয় পাবার কথা না। দেখি তোমার বুদ্ধি কেমন চট করে বল।

এ ধরণের ধাঁধা তিনি তখনি জিজ্ঞেস করেন যখন কুসুম আপু আশেপাশে থেকে। জাপানি ইঞ্জিনিয়ারের লক্ষ্য আমি না, কুসুম আপু। কাজেই আমি ধাঁধা নিয়ে মোটেই মাথা ঘামাই না। জাপানি ইঞ্জিনিয়ার খুবই হতাশ হয়ে বলেন, এ কী পারছ না কেন? চেষ্টা করে দেখ। আচ্ছা কুসুম তুমি বল।

কুসুম আপু হাই তুলতে তুলতে বলল—নয় সাতকে ভয় পায় কারণ নয় খুব ভীতু প্রকৃতির। আপনার মতো।আমি ভীতু? অবশ্যই ভীতু ঐ দিন ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে আপনাকে ডাকলাম। বললাম, আমাকে হাত ধরে নিয়ে যান। আপনি এসেছিলেন?

আমি যদি ঐ দিন তোমাকে আনতে যেতাম তাহলে আমিও মারা পড়তাম। তুমিও মারা পড়তে।মারা পড়লে পড়তাম। মরার আগে জেনে যেতাম আপনি খুব সাহসী একজন মানুষ। আপনার সম্পর্কে আমার একটা ভালো ধারণা হত।এখন কি আমার সম্পর্কে খারাপ ধারণা? হ্যাঁ।আচ্ছা ঠিক আছে খারাপ ধারণা থাকলে খারাপ ধারণা, এখন ধাঁধার জবাব দাও—why nine is afraid of seven?

জানি না।Because Seven eight nine. তার মানে? তার মানে eight বানানটা ate কর। Seven ate nine. এখন বুঝতে পারছ। সাত নয়কে খেয়ে ফেলল।Very funny তাই না? কুসুম আপু মুখ গম্ভীর করে বলল—আপনি শুধু যে ভীতু তাই না, আপনি খানিকটা বোকাও।বোকা কেন?

বোকারাই এই জাতীয় ধাঁধা বলে খুব মজা পায়।ও।কুসুম আপু প্রতিদিনই জাপানি ইঞ্জিনিয়ার সাহেবকে কঠিন-কঠিন কিছু কথা বলেন। আগে এই সব কথায় ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের মুখ কালো হয়ে যেত। এখন হয় না। তিনি কুসুম আপুর কঠিন কথাগুলি সহজ ভাবেই নেন। বাইরের কেউ হলে তিনি কথাগুলি সহজভাবে নিতেন না। এখন তিনি ঘরের মানুষ।

তিনি নাকি ইঙ্গিতে জানিয়েছেন কুসুম আপুকে তার খুবই পছন্দ। তার প্ল্যান আরো ছবছর পর বিয়ে করা। কারণ ছবছর পর রেলের কোয়ার্টার পাবেন। তবে কথাবার্তা এখনই পাকা করে রাখা যেতে পারে। রেলের এই চাকরি তার পছন্দ না। তিনি দেশের বাইরে চলে যাবার চেষ্টা করছেন। নানান জায়গায় লেখালেখি করছেন। কোনো একটা যদি লেগে যায় তাহলে কিছুটা আগেই হবে।

কুসুম আপু তার উত্তরে কি বলেছেন তা জানা যায় নি। আমার ধারণা তিনি শরীর দুলিয়ে খুব হেসেছেন। যে হাসির দুরকম অর্থ করা যায়—প্রথম অর্থ—আমি খুব খুশি এবং দ্বিতীয় অর্থ—এইসব কী হাস্যকর কথা। আমি কোন দুঃখে আপনার মতো বোকাকে বিয়ে করব।

জাপানি ইঞ্জিনিয়ার ভদ্রলোক এখন দুবেলাই আমাদের এখানে খান। দুপুরে টিফিন কেরিয়ারে করে সাইটে তার জন্যে খাবার যায়। রাতে তিনি নিজেই খেতে আসেন। খাওয়া দাওয়ার পর বেশির ভাগ সময়ই রাতে থেকে যান।ভাইয়া রাতে বাসায় থাকেন না, তার বন্ধু আজীজের বাসায় ঘুমুতে যান। জাপানি ইঞ্জিনিয়ার আমাকে পাশে নিয়ে ঘুমান।

আমাদের দুজনের মাঝখানে তিনি একটা বালিশ দিয়ে রাখেন। গায়ের সঙ্গে গা লাগলে তার নাকি ঘুম হয় না। ভদ্রলোকের ঘুম এমনিতেও কম। প্রায়ই আমি ঘুম ভেঙ্গে দেখি ভদ্রলোক জেগে বসে আছেন। সিগারেট খাচ্ছেন। আমাকে হঠাৎ জেগে উঠতে দেখলে স্বস্থি পান। তখন বেশ আগ্রহ নিয়ে গল্প করেন। বেশির ভাগই ভুত-প্রেতের গল্প।তোমাদের বাড়িতে কি ভূতের উপদ্রপ আছে নাকি?

নাহ্।আমার তো মনে হয় আছে। মাথার কাছের জানালাটা হঠাৎ দেখলাম আপনা আপনি বন্ধ হল। আবার খুলেও গেল। কোনো বাতাসটাতাস কিছু ছিল না। আচ্ছা ধরলাম বাতাসে বন্ধ হয়েছে। তাহলে খুলল কীভাবে? জানালা খুলতে হলে ঘরের ভেতর থেকে বাতাস বাইরে যেতে হবে। তাই না?

জি।ব্যাপারটা আমি আগেও লক্ষ করেছি। অন্য কোনো জানালা না, মাথার। কাছের এই জানালাটাতেই শুধু এই ঘটনাটা ঘটে। খুব পুরানো বাড়িতে জিন ভূত থাকে, আবার ধর নতুন বাড়িতেও থাকে। ধর তুমি একটা বাড়ি বানালে। বাস করার জন্য প্রথম সেই বাড়িতে উঠলে। তখন অবিশ্যিই বিচিত্র সব জিনিস দেখবে।

ও।আমার ছোট মামা সিরাজগঞ্জে একটা বাড়ি বানিয়ে ছিলেন। ছেলে মেয়ে নিয়ে সেই বাড়িতে উঠলেন। তার পর যে কান্ড শুরু হল—সেটা বললে কেউ বিশ্বাস করবে না। ভয়াবহ। মামাও বাঘা তেঁতুল টাইপ। মামা বললেন—ভূতের আমি কেথা পুড়ি। দেখি ভূত কী করে। পয়সা দিয়ে বাড়ি বানিয়েছি ভূতের থাকার জন্য না। আমার থাকার জন্য। ভূতদের হাউজিং প্রবলেম—বাড়ির পেছনে দুটা শ্যাওড়া গাছ লাগিয়ে দিব। শ্যাঁওড়া গাছে প্রেমসে থাক। টগর গল্পটা শুনছ?

জি।চোখ বন্ধ করে ফেললে যে। ভাবলাম ঘুমিয়ে পড়েছ। একটা জিনিস খেয়াল রাখবে কেউ যখন গল্প করে তখন চোখ বন্ধ করতে নেই। এটা বিরাট বেয়াদবি। এই কাজ আর কখনো করবে না।জি আচ্ছা।চা খেতে ইচ্ছা করছে। কী করা যায় বলতো।

টি ব্যাগ চিনি দুধ সবই আছে। শুধু গরম পানি পেলে কাজ হত।গরম পানি কে করবে সবাই তো ঘুমাচ্ছে।না সবাই ঘুমাচ্ছে না। কুসুম জেগে আছে। তার হাসির শব্দ শুনেছি। মনে হয় সে তার মার সঙ্গে গল্প করছে।কুসুম আপু ঘুমের মধ্যে হাসে।আমি যে হাসি শুনেছি সেতা ঘুমের হাসি না। ঘুমের হাসি অন্য রকম।

তুমি দরজার কাছে গিয়ে তোমার আপুকে ডাক দিয়ে দেখ সে ঘুমাচ্ছে কিনা। একা যেতে ভয় করলে আমি সঙ্গে থাকব। নো প্রবলেম। যাদের চা খেয়ে অভ্যাস তাদের যদি হঠাৎ চায়ের নেশা চাপে তাহলে ভয়ংকর অবস্থা হয়। চা না খাওয়া পর্যন্ত কিছু ভালো লাগে না। কুসুম ঘুমিয়ে থাকলেও আমাকে চা খেতে হবে। রান্নাঘরে গিয়ে নিজেই চা বানাব। তাতে আমার কোনো সম্মান হানি হবে না। বুঝতে পারছ? জি।

 

Read more

ইস্টিশন পর্ব-০৯ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *