বাহান্নটা কার্ড বাহান্ন রকম।দর্শকরা হাতে নিয়ে পরীক্ষা করবেন। তারপর ফিরিয়ে দেবেন। ম্যাজিশিয়ানকে। ম্যাজিশিয়ানের হাতে নয়, টেবিলে রাখা একটি চারকোণা বাক্সে। ম্যাজিশিয়ান দূর থেকে মন্ত্র পড়বেন। ম্যাজিক ওয়াণ্ড শূন্যে দোলাবেন, ওমনি বাহান্নটি তাস হয়ে যাবে বাহান্নটি সাহেব। খেলার আসল মজাটা হচ্ছে ম্যাজিশিয়ান এক বারও হাত দিয়ে তাস ছেবেন না। তিনি দাঁড়িয়ে থাকবেন। দূরে। কাজেই দর্শকরা এক বারও ভাববে না। এর মধ্যে হাতসাফাইয়ের কিছু আছে। অসাধারণ একটি খেলা, তবে পুরোপুরি যান্ত্রিক। ম্যাজিশিয়ানের করবার কিছু নেই। যা করবার স্প্রিং লাগানো কাঠের বাক্সটাই করবে। তাসের প্যাকেট রাখামাত্র তা চলে যাবে লুকানো একটি খোপে। উপরে উঠে আসবে আগে থেকে রাখা এক প্যাকেট তাস। তাসের বদলে অন্য কিছুও উঠে আসতে পারে।
একটি ডিম উঠে আসতে পারে। ছোট্ট চড়ুইছোনা উঠে আসতে পারে। কিন্তু তা করা ঠিক হবে না। তাহলে দর্শকরা ভাববে কাঠের বাক্সেই কিছু একটা আছে। তখন তারা বাক্স পরীক্ষা করতে চাইবে। তাসের বদলে যদি তাস আসে তাহলে কোনো সমস্যা হবে না। দর্শকরা ভাববে গণ্ডগোলটি তাসে। তারা ব্যস্ত থাকবে তাস পরীক্ষায়। ম্যাজিক হচ্ছে মনস্তত্ত্বের খেলা।আনিস স্প্রিং-দেওয়া বাক্সটি নিজেই বানিয়েছে, কিন্তু ঠিকমতো কাজ করছে না। ডালা নেমে আসার সময় ঝাপ্ত করে শব্দ হচ্ছে। শুধু তাই নয়, সব সময় নামছেও না। স্প্রিংটি আরো শক্ত করে সেই ত্রুটি দূর করা যায়, কিন্তু তাতে ঝাপ্ শব্দ আরো বেড়ে যায়। এই মুহূর্তে সেই শব্দ-সমস্যার কোনো সমাধান মনে আসছে না।
শাহানা অনেকক্ষণ থেকেই ছাদে হাঁটছে। আনিসকে লক্ষ করছে। কিন্তু আনিস এক বারও তাকাচ্ছে না। কেউ এক জন যে ছাদে আছে, এই বোধাটুকুও সম্ভবত তার নেই। শাহানা দরজার প্লাশে এসে দাঁড়াল। হালকা গলায় ডাকল, আনিস ভাই।আনিস অবাক হয়ে বলল, কী ব্যাপার, অসময়ে? অসময়ে মানে? আপনার এখানে কি পঞ্জিকা দেখে আসতে হবে? না, তা হবে না। ভেতরে আসবে? আসতে বললে হয়তো আসব। আগে বলুন।আস। ভেতরে আস।আপনি বাক্স হাতে নিয়ে কী করছেন? ধ্যান করছেন নাকি? অনেকক্ষণ থেকে লক্ষ করছি। এক সারা দেখি বিড়বিড় করে কথা বলছেন। কার সঙ্গে কথা বলছেন? বাক্সটার সঙ্গে?
দাঁড়াও, তোমাকে ব্যাপারটা বলি! এই বাক্সটাকে বলে টু-ওয়ে বক্স। দুটো কম্পার্টমেন্ট আছে। একটা দেখা যায়, অন্যটা দেখা যায় না!আনিস দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়ে ফেলল। স্প্রীংটা কীভাবে কাজ করে সেটা দেখাল। বর্তমানে কী সমস্যা হচ্ছে, সেটা বোঝাতে চেষ্টা করল। শাহানা গভীর মনোযোগে তাকিয়ে আছে। যেন সব কিছু পরিষ্কার বুঝতে পারছে! আনিস বলল, কত সহজ টেকনিকে কেমন চমৎকার একটা কৌশল, দেখলে?
হ্যাঁ, দেখলাম। আপনি কথা বলার সময় আমি একটা কথাও বলি নি, চুপ করে শুনেছি। এখন আমি কিছুক্ষণ কথা বলব, আপনি চুপ করে শুনবেন। আমার কথা শেষ না-হওয়া পর্যন্ত মুখ খুলবেন না। হাঁ ই কিছুই বলবেন না।আনিস অবাক হয়ে তাকাল। শাহানার চোখ জ্বলজ্বল করছে। মুখ রক্তলাভ। গলার স্বর গাঢ়। ব্যাপারটা কী!আনিসভাই।বল।শুক্রবারে আমার বিয়ে, আপনি তো জানেন। আপনাকে কার্ড দেওয়া হয়েছে না? হয়েছে।এখন আপনি যদি মনে করেন। আপনার সাহস আছে, তাহলে আমি আপনার সঙ্গে অন্য কোথাও চলে যেতে পারি। কোর্টে কীভাবে নাকি বিয়ে করে। আমি তো কিছু জানি না, আপনিই ব্যবস্থা করবেন। আমার কাছে চারশ টাকা আছে।আনিস হতভম্ব হয়ে গেল। কী বলছে শাহানা! সুস্থ মাথায় বলছে, না। অন্য কিছু?
আনিস ভাই, আমি একটা স্যুটকেস গুছিয়ে রেখেছি। আপনি আপনার দরকারী জিনিসগুলি গুছিয়ে নিন।এসব তমি কী বলছ শাহানা!আপনি কি চান না। আমি সারা জীবন আপনার সঙ্গে থাকি? চাইলেই কি সব হয়? আমি তোমাকে নিয়ে যাব কোথায়? কী খাওয়াব তোমাকে? শাহানা উঠে দাঁড়াল। শান্ত স্বরে বলল, আনিস ভাই, আমি যাচ্ছি।শাহানা শোন, একটা কথা শোন! শাহানা দাঁড়াল না। সিঁড়ি ভেঙে দ্রুত নেমে গেল। আনিস সন্ধ্যা পর্যন্ত তার ঘরে বসে রইল। সন্ধ্যা মেলাবার পর নিচে নেমে এল। বারান্দায় নীল কী যেন করছে। আনিসকে দেখেই বলল, তোমার কি শরীর খারাপ নাকি আনিস? জ্বি না।চোখ মুখ বসে গিয়েছে।মনটা ভালো নেই ভাবী। বারান্দায় কী করছেন?
কিছু করছি না। তুমি আমাকে দুটো মোমবাতি এনে দিতে পারবে? আমাদের বাড়িতে ইলেকট্রিসিটি নেই।আনিস মোমবাতি আনতে গেল। মোমবাতি এনে দেখল, ইলেকট্রিসিটি এসে গেছে। সমস্ত বাড়ি আলোয় আলোয় ঝলমল করছে। একটি রিকশায় করে কারা যেন এসেছে, সম্ভবত নীলু ভাবীয় মা। বিয়ে বাড়ির লোকজন আসতে শুরু করেছে। করাই তো উচিত। আনিস মন্থর পায়ে দোতলায় উঠে এল।তেমন কোনো ঝামেলা ছাড়াই শাহানার বিয়ে হয়ে গেল। বড়ো সমস্যা ছিল বিয়ের খরচের সমস্যা।
তার সমাধান হল অদ্ভুত ভাবে। হোসেন সাহেব কবির মাস্টারকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন রফিকের শ্বশুর রহমান সাহেবকে দাওয়াত দিতে। দুজনই ভেবে রেখেছিলেন পরিচয়পর্ব খুব সুখকর হবে না। হোসেন সাহেব আসতে চান নি। তিনি বারবার বলছিলেন, ছোট বৌমা আগে যাক, বাবার সঙ্গে ঝগড়া মিটিয়ে আসুক, তারপর আমি যাব। মনোয়ারা বিরক্তিতে মুখ কুঁচকেছেন, ছোট বৌমা যেতে চাচ্ছে না, তাকে জোর করে পাঠাব? তাকে জোর করে পাঠাবে না, তাহলে আমাকে জোর করে পাঠােচ্ছ কেন? বাজে কথা বলবে না। তৈরি হও, কবির ভাই যাবে তোমার সাথে। কথাবার্তা যা বলবার সেই-ই বলবে, তুমি চুপ করে থাকবে।তাহলে আমার যাবার আর দরকারই—বা কী? আবার বাজে কথা?
হোসেন সাহেব চুপ করে গেলেন। দাওয়াতের চিঠি হাতে এমনভাবে বের হলেন যেন ফাঁসিকাঠে ঝোলবার জন্যে যাচ্ছেন। ইয়া মুকাদেমু পড়ে ডান পা ফেললেন। আয়াতুল কুরসি পড়ে বুকে ফুঁ দিলেন। দোয়ার কারণেই হোক বা অন্য কোনো কারণেই হোক রফিকের শ্বশুর হোসেন সাহেবকে জড়িয়ে ধরলেন। আন্তরিক স্বরে বললেন, আমার এত সৌভাগ্য, এত বড় মেহমান আমার ঘরে! আদরযত্বের চূড়ান্ত করলেন ভদ্রলোক। নিজের মেয়ের কথা এক বারও জিজ্ঞেস করলেন না। কবির মাস্টার সে-প্রসঙ্গ তুলতেই তিনি তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, আমার মেয়ের সঙ্গে যা বোঝাপড়া তা আমাকেই করতে দিন। ঐটা বাদ থাক। আপনি আপনার নীলগঞ্জের ব্যাপারটা বলুন। এই বয়সে একটা শক্ত কাজ হাতে নিলেন।
যখন বয়স কম ছিল, তখন এইসব চিন্তা মাথায় আসে নি। এখন এসেছে। এখন কি বয়সের কারণে ঐ চিন্তা বাদ দেওয়া ঠিক হবে?মোটেই ঠিক হবে না। বয়স কোনো ব্যাপার নয়।আপনি আমার মনের কথাটা বলেছেন বেয়াই সাহেব।এক দিন যোব আপনার নীলগঞ্জ দেখতে।ইনশাআল্লাহ। বড়ো খুশি হলাম বেয়াই সাহেব, বড়ো খুশি হলাম।শাহানার বিয়েতে তিনি থাকতে পারবেন না বলে খুব দুঃখ করলেন, কারণ আজ সন্ধ্যায়। তাঁকে ব্যাংকক যেতে হচ্ছে। কিছুতেই থাকা সম্ভব নয়।বুঝলেন বেয়াই সাহেব, এক দিন আগে জানতে পারলেও ব্যাংককের প্রোগ্রাম ক্যানসেল করতাম। এখন তো সম্ভব না। আপনি কিছু মনে করবেন। না।
তাঁরা উঠে আসবার সময় রহমান সাহেব বেশ বিব্রত মুখেই একটি খাম এগিয়ে দিলেন। নরম স্বরে বললেন, এটা দিতে খুবই লজ্জা পাচ্ছি। নিজের হাতে কোনো একটা গিফটু দেওয়া দরকার ছিল। এত অল্প সময়ে কিছু কেনা সম্ভব নয়। আপনার মেয়েকে বলবেন, সে যেন নিজের পছন্দ মতো ভালো একটা কিছু কেনে।বাড়ি ফেরার পথেই খাম খোলা হল। দশ হাজার টাকার একটা ক্রসূড় চেক। অবিশ্বাস্য ব্যাপার! হোসেন সাহেব ভেবেছিলেন চেক দেখে মনোয়ারা রেগে যাবেন। ক্যাটিক্যাট করে বলবেন, এত বড় সাহস, আমাকে টাকা দেখাচ্ছে। টাকার গরম আমার কাছে?আশ্চর্যের ব্যাপার–সে রকম কিছু হল না। মনোয়ারা একটি কথাও বললেন না। ঐ টাকায় শাহানাকে কিছু কিনে দেওয়া হল না। পুরোটাই খরচ হল বিয়েতে। আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা হল।
খাবারের মেনুতে আগে টিকিয়া ছিল না, এখন টিকিয়া এবং দৈ মিষ্টি যোগ হল। গরিব আত্মীয়স্বজন যারা বিয়েতে এসেছে, তাদের অনেকের জন্যে শাড়ির ব্যবস্থা হল। ছেলেকে যে আংটি আগে দেবার কথা ছিল, তার চেয়ে অনেক ভালো একটা আংটি কেনা হল। মনোয়ারার ইচ্ছা ছিল সু্যুটের কাপড় আরেকটু ভালো দেওয়া। কিন্তু আগেই কাপড় কিনে দরজির দোকানে দিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে সেটা সম্ভব হল না।শাহানা বিয়ের সমস্ত অনুষ্ঠানটি খুব সহজভাবেই পার করল। মনোয়ারা ভেবেছিলেন মেয়ে কেঁদেকেটে বিশ্ৰী একটা কাণ্ড করবে। সে রকম কিছু হল না! শাহানার আচরণ সহজ এবং স্বাভাবিক। এক বার শুধু নীলুকে বলল, ভাবী, আনিস ভাইকে একটু ডেকে আনবে? কথা বলব।নীলু বিরক্ত স্বরে বলল, এখন ওর সঙ্গে কথা বলবে মানে? কী কথা?
তেমন কিছু না। ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করেছে কিনা।ঐসব নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না।আচ্ছা যাও, ভাবব না।শাহানা মিষ্টি করে হাসল। বিয়ের সাজে আজ তাকে তেমন সুন্দর লাগছে। না। কেমন যেন জবড়াজং দেখাচ্ছে। গা ভর্তি গয়না। ফুলেফেপে আছে জমকালো শাড়ি। ঠোঁটে কালচে রঙের লিপস্টিক। একেবারেই মানাচ্ছে না। এক দল মেয়ে তাকে ঘিরে আছে। এরা অকারণে হাসছে। এদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে হাসছে শাহানা। একেক বার হাসতে— হাসতে ভেঙে পড়ছে। দৃশ্যটি কেমন যেন ভালো লাগে না। নীলু এক সময় শাহানাকে এক পাশে নিয়ে নিচু গলায় বলল, এত হাসছ কেন? হাসির গল্পগুজব হচ্ছে, তাই হাসছি। কেন ভাবী, আমার হাসায় কোনো বাধা আছে?
শাহানার গলার স্বরও যেন অন্য রকম। কঠিন এবং কিছু পরিমাণে কৰ্কশ। নীলু আর কিছু বলল না। শাহানা ফিরে গিয়ে আরো শব্দ করে হাসল।বিয়ের প্রথম কিছুদিন ঘোরের মধ্যে কেটে যায়। অনেকগুলি ঘটনা একসঙ্গে ঘটে এবং খুব দ্রুত ঘটে। অনেকটা স্বপ্নদৃশ্যের মতো। নিজের জীবনেই ঘটছে অথচ যেন নিজের জীবনে ঘটছে না। এটা যেন অন্য কারো জীবন।বিয়ের রাতটি নিয়ে শাহানাকে অনেক রকম দুশ্চিন্তা ছিল। না জানি কী হয়, না জানি কী ঘটে।বাসর রাত নিয়ে কত রকম গল্প সে বন্ধুদের কাছ থেকে শুনেছে। কিছু কিছু ভারি মিষ্টি। বারবার শুনতে ইচ্ছে করে। গল্পের বইয়েও এই রাতের কত সুন্দর সুন্দর বর্ণনা আছে। অপরাজিতায় কী সুন্দর বর্ণনা। অপুর সঙ্গে তার স্ত্রীর প্রথম দেখা। ছোট-ছোট কথা বলছে দু জনে। কত দ্রুত বন্ধুত্ব হচ্ছে দু জনের মধ্যে। আবার সম্পূৰ্ণ অন্য ধরনের গল্পও আছে। নারীজীবনের চরম অবমাননার গল্প। গ্লানি ও পরাজয়ের গল্প। সেখানে ভালোবাসা নেই, অন্য কিছু আছে।
শাহানার বেলায় এর কোনোটাই হল না। জহির এল রাত একটার দিকে। তার মুখ দেখে মনে হল সে খুব বিরক্ত। জহিরের বড়ো বোনের গলা শোনা যাচ্ছে। খুব চেঁচিয়ে কী-যেন বলছে, অন্য সবাই তাকে সামলাতে চেষ্টা করছে। বড়ো রকমের ঝগড়া হচ্ছে। শাহানার এক বার ইচ্ছে হল জিজ্ঞেস করে কী নিয়ে ঝগড়া। সে অবশ্যি জিজ্ঞেস করল না। খাটে হেলান দিয়ে বসে রইল। তার ঘুম পাচ্ছিল। আবার একই সঙ্গে মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছিল। ভোঁতা ধরনের ব্যথা। সারা দুপুর ঘুমুলে যেমন ব্যথা হয়, তেমন।জহির নিজে কিছু বলল না। লাগোয়া বাথরুমে ঢুকে হাও–মুখ ধুতে লাগল। এই সময় বাইরের হৈচৈ আরো বেড়ে গেল, মোটা পুরুষালি গলায় কে একজন বলছে, এসব আমি টলারেট করব না। যথেষ্ট টিলারেট করেছি।
তার পরপরই ঝনঝনি করে কী যেন ভাঙল। জহির বাথরুম থেকে বের হয়ে এসেছে। সে অসহায় ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকাল। কিছু বলবে না বলবে না করেও শাহানা বলল, কী হয়েছে? একটা পুরোনো পারিবারিক ঝগড়া। উৎসব-টুৎসবের দিনে এই ঝগড়াগুলি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। আজ এসব শুনে দরকার নেই। পরে শুনবে! তুমি থাক কিছুক্ষণ একা একা, আমি এক্ষুণি সব মিটিয়ে দিয়ে আসছি। সরি এবাউট ইট।অপেক্ষা করতে— করতে কখন যে শাহানা ঘুমিয়ে পড়েছিল, সে নিজেই জানে না। জহির তাকে আর জাগায় নি। বিয়ের প্রথম রাতটি সে ঘুমিয়ে পার করে দিল। নিজকে কেমন যেন অপরাধী মনে হচ্ছিল। ভোরবেলা জেগে উঠে দেখে, জহির পাশের ইজিচেয়ারে বসে। অম্বুমজনিত কারণে তার চোখ ঈষৎ রক্তগত। জহির বলল, ঘুম ভালো হয়েছে শাহানা?
শাহানা জবাব দিল না।তুমি এত তৃপ্তি করে ঘুমুচ্ছিলে যে জাগাতে মন চাইল না।শাহানার খুব ইচ্ছে করল জিজ্ঞেস করে, আপনি ঘুমুন নি? জিজ্ঞেস করতে পারল না। লাজ লাগল।জহিরের বড়ো বোনের নাম আসমানী। কাল রাতে যে-মেয়ে এত কাণ্ড করেছে, আজ ভোরে তাকে দেখে তা কে বলবে? খুব হাসিখুশি যেন কিছুই হয় নি। শাহানায় হাত ধরে বাড়ি দেখাচ্ছে হড়বড় করে কত কথা বলছে– কত বড়ো বারান্দা, দেখলে শাহানা? ফুটবল খেলা যায়, তাই না? অনেকেই বলেন এত বড়ে বারান্দা একটা ওয়েস্টেজ। আমার তা মনে হয়। না। ছোট বারন্দার বাড়িগুলিতে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। তোমার আসে না? না। আমার জীবন কেটেছে ছোট বারান্দার বাড়িতে।এখানে কিছুদিন থাকলে আর ছোট বারান্দার বাড়িতে থাকতে পারবে না। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসবে। এস শাহানা, লাইব্রেরিঘরটা তোমাকে দেখাই। তোমার তো আবার গল্পের বইয়ের খুব নেশা।কে বলল আপনাকে?
কেউ বলে নি। এক বার তোমাদের বাসায় গিয়ে দেখি বই পড়ছ। আর চোখে আঁচল দিচ্ছ।শাহানা কিছু বলুল না। আসমানী হাসতে-হাসতে বলল, গল্প উপন্যাসের নায়ক-নায়িকাদের সুখদুঃখে যারা কাতর, তারা সাধারণত নিজেদের সুখদুঃখের ব্যাপারে উদাসীন হয়। এ-রকম হয়ে না। নিজের সুখ নিজে আদায় করে নেবে। বুঝতে পারছি? পারছি।জহির অবশ্যি খুবই ভালো ছেলে, সুখ তুমি পাবে। যথেষ্টই পাবে। এ নিয়ে তোমার সঙ্গে এক লক্ষ টাকা বাজি রাখতে পারি। রাখবে বাজি? শাহানা হেসে ফেলল। আসমানী প্রসঙ্গ পাল্টে বলল, কাল রাতে বড়ো রকমের একটা ঝগড়া হয়েছে, তুমি কিছু-কিছু বোধহয় শুনেছ। জহির কি কিছু বলেছে? না।সত্যি বলে নি? না। আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।ও, আচ্ছা! তুমি কি শুনতে চাও? জ্বি-না, আমি শুনতে চাই না।
আসমানী অবাক চোখে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে সহজ স্বরে বলল, শুনতে না চাইলেও তুমি শুনবে। অন্য কারো কাছ থেকে শোনার চাইতে আমার কাছ থেকে শোন। ঝামেলাটা বাড়ি নিয়ে। এই বাড়ি আমি চাই, কিন্তু বাবা আমাকে দিতে রাজি না। ঢাকায় বাবার আরো দুটি বাড়ি আছে, সে দুটি বাবা জহিরকে দিয়ে দিক। তা দেবে না। বাবা আমার কোনো কথাই শুনতে চাচ্ছে না। জহির যখন তাঁর ছেলে, আমিও তেমনি তাঁর মেয়ে। আমি তো নদীর পানিতে ভেসে আসি নি। তাই না। শাহানা?
তা তো ঠিকই।শোন শাহানা, তোমার কাছে অনুরোধ-পারিবারিক এই ঝামেলায় তুমি নিরপেক্ষ থাকবে, এবং আমার মন খুব ছোট, এইসব ভাববে না। আমার মন ছোট না। তবে আমি অধিকার ছেড়ে দেবার মেয়েও না। আই উইল ফাইট টু দি লাষ্টি। এস, তোমাকে বাগানটা দেখাই। খুব সুন্দর বাগান।
