এইসব দিনরাত্রি পর্ব – ৩৯ হুমায়ূন আহমেদ

এইসব দিনরাত্রি পর্ব – ৩৯

নীলুউঠে দাঁড়াল। শাহানার এখানে এসে তার মনটাই খারাপ হয়ে গেছে। অনেক রকম ঝামেলা করে আসা। অফিস থেকে এই কারণে তাকে ছুটি নিতে হয়েছে। ভেবেছিল প্রথম আসবে শাহানাদের বাড়ি, সেখানে থেকে যাবে শারমিনদের বাড়িতে। কিন্তু এখন আর কোথাও যেতে ইচ্ছা করছে না। নীলু অবাক হয়ে লক্ষ করল, শাহানা দোতলা থেকে নিচে নামল না। সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে বলল, ঠিক আছে ভাবী, পরে দেখা হবে। সময় পেলে আবার এস। অবশ্যি যদি তোমার ইচ্ছা করে।গেটের কাছে জহিরের গাড়ি। ড্রাইভার বলল, আপনি এসেছেন শুনে স্যার পাঠিয়ে দিয়েছেন। যেখানে–যেখানে যাবেন, নিয়ে যাব। নীলু বলল, আমার গাড়ি লাগবে না, রিকশা নিয়ে চলে যাব।স্যার তাহলে খুব রাগ করবেন। আপা আসেন।বাসায় ফিরে দেখে বসার ঘরে আনিস। জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে। নীলু কেন জানি খুব খারাপ লাগছে। ইচ্ছা করছে খুব কড়া-কড়া কিছু কথা ভাবী, ভালো আছেন?

হ্যাঁ, ভালো।আমার নামে কি কোনো চিঠি এসেছে ভাবী? না, কোনো চিঠিফিঠি আসে নি।যদি আসে একটু রেখে দেবেন, আমি এসে নিয়ে যাব।ঠিক আছে, রাখব।ভাবী, আপনার কি শরীর খারাপ? শরীর ঠিকই আছে। তুমি এখন যাও। আমি শুয়ে থাকব। প্রচণ্ড মাথা ধরেছে।আনিস ইতস্তত করে বলল, ভাবী, আমাকে কিছু টাকা দিতে পারবেন–শ দুই? নীলু ঠাণ্ডা গলায় বলল, এখন আমার কাছে টাকা পয়সা নেই।আনিস চলে গেল। সে প্রচণ্ড লজ্জা পেয়েছে। ঘর থেকে বেরুবার সময় দরজায় একটা ধাক্কা খেল। হাঁটতে গিয়ে লক্ষ করল। ঠিকমতো পা ফেলতে পারছে না। সে ভেবেই পেল না, নীলু ভাবীর মতো মানুষ তার সঙ্গে এমন খারাপ ব্যবহার কেন করলেন?

তার চোখ ভিজে উঠতে শুরু করেছে। নিজেকে সামলাতে না-পারলে টপটপ করে চোখ থেকে পানি পড়বে। রাস্তার লোকেরা হী করে তাকিয়ে থাকবে। রাস্তায় নামবার আগে যে করেই হোক নিজেকে সামলাতে হবে। সে নিঃশব্দে ছাদে উঠে গেল।ছাদে তার নিজের ঘরটির দরজা খোলা। সুন্দর পর্দা ঝুলছে। কে থাকে এখানে? আনিস কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে গেল। পর্দা সরিয়ে উঁকি দিল। বীণা, গভীর মনোযোগে পড়ছে। পিঠময় খোলা চুল। চেয়ারে পা তুলে কী অদ্ভুত ভঙ্গিতে বসা। আর ঘরটি কী সুন্দর সাজিয়েছে।এই বীণা।বীণা চমকে উঠল।আরো আনিস ভাই, আপনি কোথা থেকে? আকাশ থেকে।আসুন, ভেতরে আসুন তো।

আনিস ভেতরে ঢুকল। বীণা বলল, আপনার ঘরের দখল নিয়ে নিয়েছি।তাই তো দেখছি।নিরিবিলি। পড়াশোনার জন্যে এটা করলাম। আপনাকে তাড়িয়েছিও এই কারণে।ভালো করেছ।উপায় ছিল না, কারণ আমাকে খুব ভালো রেজাল্ট করতে হবে। সারা জীবন ফার্স্ট সেকেণ্ড হতে হবে। কেন বলুন তো? বলতে পারছি না।কারণ আমি এমন এক জন পুরুষকে বিয়ে করব যার কাজ হবে দিন-রাত ঘরে বসে থাকা। কাজেই চাকরি-টা করি করে এই লোককে খাওয়াতে হবে। তার জন্যেই আমার খুব ভালো রেজাল্ট দরকার। যেন পাস করলেই চাকরি হয়ে যায়। বুঝতে পাছেন?পারছি।এখন বলুন তো, আমি কেমন মেয়ে?

তুমি খুব জেদী মেয়ে।ঠিক বলেছেন। আর আপনি হচ্ছেন একজন ভ্যাবদা পুরুষ। এখন বলুন, এ বাড়িতে কেন এসেছেন? এমনি এসেছি।না, এমনি না। নিশ্চয়ই কোনো কাজে এসেছেন।নীলু ভাবীর কাছে এসেছিলাম।কেন? আমার কিছু টাকার দরকার হল, মানে ইয়ে… পেয়েছেন টাকা? না, ওর হাত খালি।কত টাকা দরকার? তোমার ব্যস্ত হতে হবে না, আমি ব্যবস্থা করব।আহ, যেটা জিজ্ঞেস করেছি সেটা বলুন—কত টাকা দরকার? শ দুই।

বসুন। এখানে, আমি নিয়ে আসছি। খবরদার পালাবেন না।বীণা নিচে নেমে গেল। মা-বাবা দু জনের কেউই বাসায় নেই। এক খালা আছেন, ষ্টিল আলমিরার চাবি তাঁর কাছে নেই। লতিফা তোষকের নিচে ভাংতি টাকা পয়সা রাখেন, সেখানে দুটি ময়লা ন্যাতন্যাতে পাঁচ টাকার নোট ছাড়া কিছুই নেই। বীণা খালিহাতেই উপরে উঠে এল। ক্ষীণ স্বরে বলল, আনিস ভাই, আপনি কোথায় থাকেন ঠিকানাটা লিখে যান, আমি সন্ধ্যার আগেই টাকা পাঠাবার ব্যবস্থা করব।তুমি শুধু—শুধু ব্যস্ত হচ্ছে বীণা।

আমি যা বলছি করুন–এই নিন। কাগজ-কলম। পরিষ্কার করে। ঠিকানা লিখুন। আমি চা বানিয়ে আনছি, চা খেয়ে তারপর যাবেন।বীণা আবার নিচে নেমে গেল।সন্ধেবেলায় আনিসের বিস্ময়ের সীমা রইল না।তার কেন জানি মনে হচ্ছিল, বীণা এ-রকম কিছু করে বসতে পারে। সত্যি সত্যি করলেও তাই। নিজেই এসে উপস্থিত। নোংরা ঘর। চারপাশের নোনাধরা দেয়াল, আস্তর উঠে-উঠে আসছে। দীনহীন পরিবেশের কিছুই মেয়েটিকে প্রভাবিত করল না। কিংবা হয়তো করেছে, সে তা বুঝতে দিচ্ছে না। সে আনিসের চৌকিতে বসে আছে বেশ সহজ ভঙ্গিতে, যেন এটাই তার ঘরবাড়ি। কথাও বলছে সহজ স্বরে।পাশের চৌকিটায় কে থাকেন?

আমার রুমমেট।উনি এখন নেই? না। অফিস শেষ করে টিউশ্যনিতে যান, ফিরতে ফিরতে দশটা—এগারটা।আপনারা কি নিজেরাই রান্না করেন-হাঁড়ি-পাতিল দেখছি।হ্যাঁ, নিজেরাই করি। খরচ কম পড়ে।রান করেন কে? বেশির ভাগ সময় আমিই করি। আমার অবসর বেশি।আজ কী রান্না করলেন? এখনো কিছু করিনি।আজকের রান্নাটা আমি করে দিই? আনিস আঁৎকে উঠে বলল, কী বলছি এসব! তুমি কি রান্না করবে? আপনার কি ধারণা, আমি রান্না জানি না?

জানবে না কেন? নিশ্চয়ই জোন। কোনো রকম ঝামেলা না-করে তুমি চুপচাপ বসে থাক তো।আমি কিন্তু এখানে অনেকক্ষণ থাকব।অনেকক্ষণ থাকব মানে? অনেকক্ষণ থাকব মানেও জানেন না? বাংলা ভুলে গেছেন নাকি? আনিস কী বলবে, কী করবে ভেবে পেল না। এই মেয়েটা তাকে মনে হচ্ছে সত্যি-সত্যি বিপদে ফেলবে। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। পাশের ঘরগুলির বোর্ডাররা বারবার উঁকিঝুকি দিচ্ছে। আনিস হারিকেন ধরাল। বীণা অবাক হয়ে বলল, হারিকেন কেন, আপনাদের ইলেকট্রিসিটি নেই? ছিল। বাড়িওয়ালা এক বছর যাবত ইলেকট্রিসিটির বিল দিচ্ছে না, লাইন কেটে দিয়েছে।বাড়িওয়ালাও মনে হয় আপনাদের মত গরিব।

আসলেই তাই। এই এতটুকু বাড়ি, এর সাত জন শরিক। শরিকে-শরিকে বিবাদ লেগেই আছে। বিবাদ মানে কঠিন বিবাদ। মারামারি হচ্ছে ভালোভাবে। পরশু এক জন আরেক জনকে রামদা নিয়ে তাড়া করেছিল।বলেন কি? আজও হয়তো করবে।করে করুক। এই ঘরে না চুকলেই হল।রাত দশটা বেজে গেছে। বীণা ফিরছে না। বীণার বাবা থানায় ডাইরি করতে গিয়েছেন। ওসি সাহেব চোখ মটকে জিজ্ঞেস করেছেন, মেয়ের কোন লভ—টভ আছে নাকি? তিনি শুকনো গলায় বলেছেন, আমার মেয়ে ঐ রকম না।আগে ভালো করে খোঁজ নিন। মেয়ের ট্রাংক, সুটকেস এসব খুলে দেখুন চিঠিপত্র পান। কিনা। তার ঘনিষ্ঠ বান্ধবীদের জিজ্ঞাসাবাদ করুন। ওরা এইসব ভালো জানবে। টাকা পয়সা কিছু নিয়ে গেছে?

তার মার কাছ থেকে পাঁচ শ টাকা নিয়ে গিয়েছিল। নিউ মার্কেট থেকে কী-একটা বই কিনবে। টেক্সটবুক।ঐটা ফালতু কথা। যাওয়ার ভাড়া নিয়ে গেছে। সপ্তাহে এ-রকম তিন-চারটা কেইস আমরা ডিল করি। মেয়ে পালিয়ে যায়। পেয়ারের লোকের সঙ্গে। সস্তার একটা হোটেলে উঠে ফুর্তি করে।এইসব কী বলছেন। আপনি?

সত্যি কথা বলছি রে ভাই। তাও তো সবটা বলছিনা। রেখেঢেকে বলছি। মাঝে মাঝে কী হয় জানেন? ছেলে মেয়েটাকে ভুজুখভাজৎ দিয়ে বের করে নেয়। একটা হোটেলে নিয়ে তোলে। সেই হোটেলে আগে থেকেই তার বন্ধুবান্ধব অপেক্ষা করছে। তারপর মছাবটা বুঝতে পারছেন তো? এইসব হারামজাদাদের ধরতেও পারি না। মেয়ে বা মেয়ের আত্মীয়স্বজন কেউ কেইস করে না। সম্মানহানির ভয়। মানে ইজতের ভয়। মেয়ের আবার বিয়ে দেয়ার প্রশ্ন আছে।ভাই, আপনি এসব কী বলছেন? যা বলছি সত্য বলছি। একটা শব্দও মিথ্যা না। যান, বাড়ি যান। যা করতে বললাম করেন। চিঠি পড়ে কোনো নাম-ঠিকানা পেলে আমাদের খবর দেবেন-টাইট দিয়ে দেব।

তিনি বাড়ি ফিরলেন ঘোরের মধ্যে। কয়েক বার এমন হল, যেন রিকশা থেকে গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছেন। শরীর দিয়ে ঘাম বেরুচ্ছে। তাঁর ধারণা হল, হাট অ্যাটাক হয়েছে। হার্ট অ্যাটাকের সময় নাকি খুব ঘাম হয়।কী করে বাড়ি পৌঁছলেন তিনি নিজেই জানেন না।বারান্দার একটা মোড়াতে আনিস বসে আছে। বাড়ির ভেতর বেশ কিছু লোকজন। এদের গোলমাল ছাপিয়েও লতিফার গলা ছেড়ে কান্না শোনা যাচ্ছে। তিনি কাঁপা গলায় আনিসকে বললেন, এখনও পাওয়া যায় নি? আনিস বিব্রত স্বরে বলল, বীণার কথা বলছেন তো? ওকে নিয়ে এসেছি।নিয়ে এসেছ? কোথায় ছিল সে? ইয়ে, মানে আমার ওখানে একটা বিশেষ প্রয়োজনে–বিশেষ প্রয়োজনে তোমার কাছে? শুয়োরের বাচ্চা, তুমি মানুষ চেন না? জুতিয়ে আমি তোমার দাঁত খুলে ফেলব, বেইমান, নিমকহারাম-

তিনি সত্যি সত্যি তাঁর স্যাণ্ডেল খুলে ফেললেন। হৈচৈ শুনে ভেতরের বাড়ির সবাই বেরিয়ে এল। লতিফা এসে স্বামীর হাত ধরে প্রায় টেনে হিচড়ে ভেতরে নিয়ে গেলেন। হিসহিস করে বললেন, কেলেঙ্কারি। আর বাড়িও না। যা হবার হয়েছে। এই রাতেই মেয়ের আমি বিয়ে দেব।কী বলছ এসব? কার সাথে বিয়ে দেবে? এই হারামজাদাটার সঙ্গেই দেব, উপায় কী? এত রাত পর্যন্ত এক সঙ্গে ছিল। কিনা, কী হয়েছে কে জানে। আগুন আর ঘি।তিনি হতভম্ব হয়ে হয়ে পড়লেন। লতিফা কাঁদতে-কাঁদতেই বললেন, দাঁড়িয়ে থেক না। কাজীর জোগাড় দেখা।মাথাটা তোমার খারাপ হয়ে গেল নাকি? ঐ হারামজাদাকে আমি জেলের ভাত খাওয়াব। জুতাপেটা করব।

লতিফা কঠিন স্বরে বললেন, আমি কোনো কথা শুনব না। আজ রাতেই বিয়ে হবে। মেয়ে কি না কি করে এসেছে, আমার গা ঘিনঘিন করছে। বমি এসে যাচ্ছে।সত্যি তিনি হাড়হড় করে একগাদা বমি করলেন।রাত বারটা পঁয়ত্ৰিশ মিনিটে আনিসের বিয়ে হয়ে গেল। লতিফা ট্রাকে তুলে রাখা তাঁর নিজের বিয়ের শাড়িতে বৌ সাজালেন। শফিকের একটা ধোয়া পাঞ্জাবি আনিসকে পরানো হল। পাঞ্জাবি একটু বড়ো হল। কাঁধের বুল অনেকখানি নেমে গেল, তবু সেই মাপে বড়ো ঘিয়ে রঙের পাঞ্জাবিতে অপূর্ব দেখাল আনিসকে। লতিফারাও এক সময় মনে হল, ছেলেটার চেহারা তো ভালোই। সুন্দরই তো লাগছে। মেয়ে জামাই খারাপ কেউ বলবে না।

শুধু বীণার বাবা কোনো কিছুতেই অংশগ্রহণ করলেন না। অন্ধকার বারান্দায় ইজিচেয়ারে গা এলিয়ে বসে রইলেন। হোসেন সাহেব গেলেন কথাবার্তা বলে তাঁর মন ভালো করে দিতে। বিভিন্ন দিকে তিনি চেষ্টা করলেন। সব শেষে অত্যাশ্চর্য ওষুধ পালসেটিলা নিয়ে কথা বলা শুরু করতেই বীণার বাবা বললেন, এত ফালতু কথা বলেন কেন? ভ্যাজার-ভাঁজর করে মাথা ধরিয়ে দিয়েছেন। যান, বাড়িতে গিয়ে ঘুমান।চিলেকোঠার ঘরে তাড়াহুড়া করে বাসর সাজান হয়েছে। আশপাশের বাড়ির মেয়েরা এসে জুটেছে। এদের আনন্দের কোনো শেষ নেই। সমস্ত ছাদ জুড়ে ছোটা-ছুটি। একটি রেডিওগ্রাম আনা হয়েছে ছাদে। বিশাল দুটি স্পিকারে তারস্বরে গান হচ্ছে। সন্ধ্যা কিন্নরকণ্ঠে গাইছেন-ও বাক বাক বাকুম বাকুম পায়রা।

অপূর্ব সুরধ্বনিতে শীতের বাতাসে যেন নেশা ধরে গেছে। আনিসের চোখ বারবার ভিজে উঠছে। সে ছাদের এক কোণায় দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ। প্রায় শেষরাতের দিকে নীলু এসে বলল, আনিস, তোমার ঘরে যাও। বীণাকে আমরা নিয়ে আসছি।আনিস কিছু বলল না। নীলু বলল, আজ আমি তোমার সঙ্গে খুব খারাপ ব্যবহার করেছিলাম। কিছু মনে রেখো না ভাই। অন্য কারণ ছিল। আমি এমন খারাপ মেয়ে না, আনিস। আমি তোমাকে খুবই পছন্দ করি।ভাবী, আমি তা জানি।আজ যা হল, তোমার জন্য ভালো স্থল। বীণা একটি অসাধারণ মেয়ে। দেখবে, ও তোমার জীবনটাই বদলে দেবে।তাও আমি জানি, ভাবী।এস, ঘরে এস।আপনার আঁচলে কী?

গোলাপী। টবের গাছ থেকে ছিঁড়ে এনেছি। ফুল ছাড়া কি বাসর হয়? তোমার খুব ভাগ্য ভালো। আজ অনেকগুলি গোলাপ একসঙ্গে ফুটেছে।রাত প্ৰায় শেষ হয়ে এল। আনিস অপেক্ষা করছে। তাকে ঘিরে আছে গোলাপের সৌরভ। জগতে কত অদ্ভুত ঘটনাই না—ঘটে। এই ঘরে এমন একটি নাটক হবে, কে জানে!আনিসের মাথা বিমঝিম করছে। মনে হচ্ছে জ্বর এসে যাচ্ছে।বীণা এসে দাঁড়িয়েছে দরজার ওপাশে। তার সঙ্গে বেশ কটি মেয়ে, সবাই চাপা হাসি হাসছে। বীণার মাথা নিচু। তার মুখ দেখা যাচ্ছে না। সে মাঝে-মাঝে কোপে-কোপে উঠছে। কাঁদছে নাকি মেয়েটা? কান্নার কী আছে? শেষ পর্যন্ত নীলগঞ্জ যাবার দিনক্ষণ ঠিক হয়ে গেল। দলটা মোটামুটি বড়োই। রফিক-শারমিন ছাড়া সবাই যাচ্ছে। শাহানা এবং তার বরও যাচ্ছে। শাহানার যাবার ইচ্ছা ছিল না। যাচ্ছে জহিরের কারণে।

জহির কেন জানি যাবার জন্যে উৎসাহী হয়ে পড়েছে। অবশ্যি শেষ সময়ে এই দুজনও বাদ পড়ল। ট্রেন রাত নটায়। জহির সন্ধ্যাবেলা এসে বলল, একটা সমস্যা হয়েছে ভাবী। নীলু হেসে ফেলল। জহির বলল, বানানো সমস্যা নয়, সত্যি সমস্যা।তোমরা তাহলে যেতে পারছি না? না।সমস্যাটা কী? জহির ইতস্তত করে বলল, চলুন ভাবী ছাদে যাই, সেখানে বলব।বলতে না-চাইলে বলার দরকার নেই।ভাবী, আমি আপনাকে বলতে চাই। বলা দরকার।নীলুচিন্তিত মুখে ছাদে উঠে গেল। নিৰ্ঘাত শাহানা খুব ঝামেলা বাঁধিয়েছে। সেই ঝামেলার প্রকৃতিটি কী, কে জানে। নিশ্চয়ই জটিল কিছু। নয়তো জহির এতটা অস্থির হত না। সে সহজে অস্থির হবার ছেলে নয়।কী ব্যাপার, বল।

বুঝতেই পারছেন, শাহানাকে নিয়ে একটা সমস্যা। আজ ভোরবেলায় নাস্তা খাবার সময় সামান্য একটু কথা কাটাকাটি হল। তার পরপরই সে ছুটে তার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। সেই বন্ধ দরজা এখনও খোলেনি। বেশ অস্বস্তিকর অবস্থা বলতে পারেন। মানে এই জাতীয় অবস্থায় পড়ে আমার অভ্যাস নেই। খুব বিব্রত বোধ করছি।কথা কাটাকটি কী নিয়ে হচ্ছিল? আনিস সাহেবকে নিয়ে। ও বলল, আনিস সাহেবকে এক দিন দাওয়াত করে খাওয়াতে চায়। আমি বললাম-খুব ভালো কথা। ওনাকে এবং ওনার স্ত্রীকে বল। তাতেই ও রেগে আগুন।আমি বুঝলাম না, তাতে রেগে আগুন হবার কী?

আমি বুঝতে পারি নি। শাহানা বলেছিল—তুমি এখানে তার স্ত্রীর কথা কেন বললে? তোমার কি ধারণা, আমি শুধু তাকে একা খেতে বলব? তা যদি চাইতাম, তাহলে তো অনেক আগেই বলতে পারতাম। তা তো বলি নি। বিশ্ৰী ব্যাপার, ভাবী। কাজের লোকদের সামনে হৈচৈ চিৎকার। প্ৰায় হিস্টিরিয়ার মতো অবস্থা।শাহানার কথা শুনে তুমি কী বললে? আমি কিছু বলি নি। যা বলার মনে-মনে বলেছি। লোকজনের সামনে সিন ক্রিয়েট করতে চাই নি।চল তোমার সঙ্গে যাই, ওকে নিয়ে আসি।বাদ দিন, ভাবী। আপনারা ঘুরে আসুন। নীলগঞ্জ গিয়ে আরো ঝামেলা করবে। আপনাদের আনন্দই মাটি করবে।আমি সব ঠিক করে দেব।

কোনো দরকার নেই, ভাবী। এই ব্যাপারটা আমিই ঠিক করতে চাই। বিশ্বাস করুন, আমি ভালোমতোই করব।ও খুবই ছেলেমানুষ জহির। ওর বয়সটা দেখ।আমি জানি। চলুন নিচে যাই। আপনাদের অনেক গোছগাছ বাকি। আমি গাড়ি রেখে যাচ্ছি, আপনাদের টেনে তুলে দেবে।শারমিনের না যাওয়ার ব্যাপারটা নিয়ে মনোয়ারা নতুন করে কথা তুললেন। এই প্রসঙ্গ নিয়ে গত কদিন ধরেই তিনি চেঁচামেচি করছেন। রফিকের সঙ্গে এক দিন তুমুল ঝগড়া হল। শারমিন এ বাড়িতে আসছে না কেন, এর জবাবে রফিক বিরক্ত হয়ে বলেছে, আমি কী করে বলব? সেটা শারমিনকে জিজ্ঞেস করা। ওটা তার ব্যাপার। হয়তো এ বাড়ি তার ভালো লাগছে না।

এ বাড়ি ভালো লাগবে না কেন? খুব সম্ভব তোমার জন্যেই লাগে না। দিন-রাত ক্যাচ ক্যাচ কর।দিন-রাত ক্যাচ ক্যাচ করি? রফিক এই প্রশ্নের জবাব না-দিয়ে কেটে পড়ল। মনোয়ারা সারাদিন হৈচৈ করে কাটালেন। আজ আবার শুরু হল। নীলু, টিফিন কেরিয়ারে খাবারদাবার ভর্তি করছিল। মনোয়ারা তাকে ধরলেন, বৌমা, হচ্ছেটা কী? নীলু বিস্মিত হয়ে বলল, কিসের কথা বলছেন? ছোট বৌমা এ বাড়িতে আসে না কেন?

নীলু বলল, অনেক দিন পরে বাবার বাড়ি গিয়েছে, কটা দিন থাকছে, থাকুক না। নীলগঞ্জ থেকে ফিরে এসে আমি ওকে এ বাড়িতে নিয়ে আসব। এখন নিজের বাড়িতেই থাকুক।নিজের বাড়ি তুমি কী বলছি? বিয়ের পর মেয়েদের বাড়ি থাকে একটাই। সেটা হচ্ছে স্বামীর বাড়ি।আপনাদের সময় তাই ভাবা হত। এখন দিনকাল পাল্টেছে।কী রকম পাল্টেছে? এখন বুঝি আর স্ত্রীরা স্বামীদের বাড়িতে থাকে না? তাহলে তুমি এখানে পড়ে আছ কেন? নীলু কথা ঘোরাবার জন্যে বলল, আপনার কি সব গোছগাছ হয়েছে মা?

গোছগাছ আর কী করব? আমার হল গিয়ে মাথার ঘায়ে কুত্তা পাগল অবস্থা। সংসারে কী শুরু হয়েছে, কিছু বুঝতে পারছি না।রাত আটটায় স্টেশনের দিকে রওনা হবার কথা। হোসেন সাহেবের দেখা নেই। শেষ মুহূর্তে তাঁর মনে হয়েছে দুটি খুবই প্রয়োজনীয় ওষুধ তাঁর সঙ্গে নেই। একটি হচ্ছে নাকসমৃভমিকা, অন্যটি পালসেটিলা। গ্রামে যাচ্ছেন, দরকারের সময় হাতের কাছে ওষুধ পাওয়া যাবে না, বিপদে পড়তে হবে। তিনি কাউকে কিছু না-বলে ওষুধের খোঁজে গেলেন।

ফিরলেন রাত সাড়ে আটটায়, যখন সম্বাই প্ৰায় নিশ্চিত যাওয়া হবে না। স্টেশনে রওনা হবার সময়ও কেউ জানে না, ট্রেন ধরা যাবে কি যাবে না। টেন অবশ্যি ধরা গেল। এবং টেন ছেড়ে দেবার পর জানা গেল, তাড়াহুড়োয় মনোয়ারার সুটকেসটাই আনা হয় নি। তিনি মুখ হাঁড়ির মতো করে নীলুকে বললেন, আমার জিনিসের দিকে কেউ কি আর লক্ষ রেখেছে? তা রাখবে কেন? আমি কি একটা মানুষ?

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *