নীলু পেনশনের ব্যাপারটা কী করে বলবে বুঝতে পারছে না। আজকের দিনটিতে শফিককে কোনো খারাপ খবর দিতে ইচ্ছা করছে না। হঠাৎ করে বেচারা এক দিনের মধ্যে সাত শ টাকা জোগাড় করবে। কী ভাবে? শফিক ঘুমুবার আয়োজন করছে। শেষ সিগারেটটি ধরিয়েছে। এখন সে খানিকক্ষণ পায়চারি করবে। নীলু হালকা গলায় বলল, আজ আমার এক বান্ধবীর সঙ্গে দেখা হয়েছিল——বন্যা নাম। শফিক কিছু বলল না। নীলু বলল, তোমাকে তো তার কথা বলেছিলাম, এক পুলিশ ইন্সপেকটরেব মেয়ে। খুব ছটফট করত। সারাক্ষণ কথা বলত। ক্লাসে ওর নাম ছিল ফর ফরানি! প্ৰায় ন বছর পর ওর সঙ্গে দেখা। অবিকল আগের মতোই আছে।তাই নাকি?
হ্যাঁ। সারাক্ষণ বকবক করেছে ও আবার চাকরিও করে–চার হাজার টাকার মতো পায়।শফিক কিছু বলল না। মশারি তুলে ভেতরে ঢুকে পড়ল। সহজ স্বরে বলল, বাতি নিভিয়ে দাও নীলু তোমার ঘুমুতে দেরি আছে নাকি? না, আমিও শোব।নীলু বাতি নিভিয়ে শফিকের গা ঘেঁষে ঘুমুতে গেল। শফিক হেসে বলল, কী ব্যাপার, আজ আমার সঙ্গে কেন? নীলু, লজ্জিত স্বরে বলল, কেন, তোমার সঙ্গে আমি ঘুমাই না? তুমিই তো টুনিকে রেখে দাও মাঝখানে! শফিক হাত বাড়িয়ে নীলুকে আকর্ষণ করল। পুরুষদের এই আকর্ষণের অর্থ পৃথিবীর সব নারীদেরই জানা। নীলু জড়িয়ে ধরল শফিককে। চারদিক অন্য রকম হতে শুরু করল। শারীরিক ভালবাসাও এক ধরনের ভালবাসা। এ ভালবাসাও নীলুর ভালো লাগে। এই সময়টাতেই শফিক তরল ভঙ্গিতে কিছু কথাবার্তা বলে। প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলে জবাব দেয়। হাসির কথা বললে হাসে।
আমার এই বন্ধু কী বলছিল, জান? কী বলছিল? আমাকে বলছিল একটা চাকরি-টা করি জোগাড় করতে। চেষ্টা করলেই নাকি পাওয়া যায়।তুমি কী বললে? আমি আবার কী বলব? কিছুই বলি নি।নীলু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, চাকরি একটা পেলে মন্দ হয় না, কী বল? ভালোই হয়। সংসারের টানাটানি দূর হয়।চেষ্টা করে দেখব নাকি? শফিক তরল স্বরে বলল, তুমি কি চাকরি করতে পারবো? পারব না কেন? চাকরি করার মেয়ে অন্য রকম হয়। তুমি সেই টাইপ না। তুমি গৃহী টাইপ মেয়ে।আমি ঠিকই পারব। গৃহী টাইপ হই আর যাই হই।আচ্ছা, দেখা যাবে।
শফিক এক সময় ঘুমিয়ে পড়ল। নীলু জেগে রইল অনেক রাত পর্যন্ত। নানা রকম স্বপ্ন দেখতে লাগল। মন্দ হয় না একটা চাকরি পেলে। সংসারের কষ্ট দূর হয়। মাসে মাসে মাকে কিছু টাকা পাঠানো যায়। একটা টেলিভিশন কেনা যায়। টিভি দেখার জন্যে বাবাকে তাহলে আর রোজ রোজ অন্যের বাড়ি যেতে হয় না। রফিকের হঠাৎ আসা আব্দার মেটানো যায়। শাহানাকে গলার একটা চেইন বানিয়ে দেওয়া যায়। এত বড়ো মেয়ে, অথচ কানে দুটি ছোট্ট ফুল ছাড়া কোনো সোনার গয়না নেই। গয়না দূরের কথা, একটা ভালো শাড়ি পর্যন্ত নেই। গত ঈদে সে লাজুক ভঙ্গিতে বলেছিল, ভাবী, আমাকে একটা কমলা রঙের রাজশাহী সিস্কের শাড়ি কিনে দেবো?
নীলু বলেছে, হ্যাঁ, দেব। নিশ্চয়ই দেব।আমাদের ক্লাসের অরুণার এ-রকম একটা শাড়ি আছে। অবিকল সে-রকম একটা শাড়ি চাই।ঠিক আছে।তোমাকে আমি প্রিন্টটা দেখিয়ে দেব।শাহানা প্রিন্ট দেখিয়েও দিল, কিন্তু সেই শাড়ি কেনা হল না। হল না বলা ঠিক না, বলা উচিত কিনে দেওয়া গেল না। শাহানা কিছুই বলল না। শুধু নীলু লজ্জায় এবং দুঃখে বাথরুমের দরজা বন্ধ করে ঈদের দিন ভোরবেলায় দীর্ঘ সময় কেঁদেছিল। কত রকমের দুঃখই না আছে মানুষের!
এক দিন শাহানার হয়তো খুব বড়ো লোকের ঘরে বিয়ে হবে। ভাইয়ের বাড়ির ছোটখাট দুঃখ-কষ্টম নাই থাকবে না। কিন্তু নীলুর মনে তো এই দুঃখ থাকবেই। প্রতিটি ঈদের দিনে ভোরবেলা মনে পড়বে।নীলু সাবধানে বিছানা ছেড়ে উঠল। একটা বেজেছে। বাবুর জেগে ওঠার সময় হয়েছে। এক্ষুণি দুধ খাওয়ার জন্যে কাঁদতে শুরু করবে। দুধ বানিয়ে রাখাই ভালো।বসার ঘরে শাহানা পড়ছে। খুব খাটাখাটনি করছে। নিশ্চয়ই ভালো করবে পরীক্ষায়। নীলু দরজা খুলে বেরুতেই শাহানা বলল, তুমি এখনো জেগে আছ? হুঁ! পড়াশোনায় দারুণ উৎসাহ দেখি।তুমি কি চাও, আমি ফেল করি?
না, তা চাই না। পড়তে পড়তে মাথা খারাপ করে ফেল, তাও চাই না!শাহানা বই বন্ধ করে উঠে এল।ভাবী, একটা কথা বলব? বল।বাবা তোমাকে ছাদে নিয়ে কী বলল? তেমন কিছুনা।না ভাবী, বল। তোমার পায়ে পড়ি।নীলু অল্প হেসে বলল, তোমার বিয়ের ব্যাপারে কথা বললাম।সব সময় ঠাট্টা ভালো লাগে না ভাবী।ঠাট্টা কোথায়, সত্যি কথা বললাম।না ভাবী, বল কী ব্যাপোর? বললাম তো, একটা বিয়ের প্রস্তাব এসেছে, তাই নিয়ে কথা হচ্ছিল। ছেলে বিলেতে ডাক্তারি পড়ে। দেখতে খুব সুন্দর। ছবি আছে আমার কাছে, তুমি চাইলে ছবি দেখাতে পারি।কসম বল।কসম।তিন কসম!তিন কসম আবার কী।
শাহানার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হল। সে ব্যাপারটা বিশ্বাস করতে পারছে না। আবার অবিশ্বাসও করতে পারছে না। তার মুখ কাঁদো-কাঁদো হয়ে গেল। নীলু হাসতে হাসতে বলল, ঠাট্টা করছিলাম। মনে হয় তোমার আশাভঙ্গ হয়েছে? শাহানা ছুটে এসে নীলুর চুল টেনে দিল, কেন তুমি এমন আজেবাজে ঠাট্টা কর! আমি প্ৰায় বিশ্বাস করে ফেলেছিলাম। দেখ, এখনো আমার গা কাঁপছে। নীলু শাহানাকে জড়িয়ে ধরল।বুধবারটা রফিকের জন্যে খুব লাকি। বুধবারে সে নিশ্চিন্ত হয়ে ঘর থেকে বেরুতে পারে। এইদিন কোনো অঘটন ঘটবে না। কারে সঙ্গে দেখা করতে গেলে দেখা হবে। বাসে উঠলে জানালার পাশে বসার সিট পাওয়া যাবে। বাসের কণ্ডাকটার ভাংতি হিসেবে তাকে দেবে চকচকে নতুন নোট।
আজ বুধবার, কিন্তু তবু অঘটন ঘটল। ফার্মগেটে বাস থেকে নোমর সময় নতুন পাঞ্জাবিটা ফস করে পেটের কাছে ছিঁড়ে গেল। অনেকখানি ছিড়ল। রফিকের সঙ্গের শুকনো ভদ্রলোক বললেন, কণ্ডাকটারকে একটা চড় দেন। ভাই। তাড়াতাড়ি করেন, বাস ছেড়ে দেবে।রফিক অবাক হয়ে বলল, তাকে চড় দেব কেন? সে তো ছেঁড়ে নি।সে না ছিড়ুক, তার বাস তো ছিঁড়েছে।অকাট্য যুক্তি। কিন্তু বাস ছেড়ে দিয়েছে। রফিক বিমর্ষ মুখে ষ্টেডিয়ামের দিকে এগুতে লাগল। তার প্ল্যান-প্রোগ্রাম বদলাতে হবে। ছোড়া পাঞ্জাবি নিয়ে ঘুরে বেড়ানো যায় না। সবচে ভালো বুদ্ধি হচ্ছে, একটা বই কিনে পেটের কাছে ধরে রাখা। অত্যন্ত বিরক্তিকর ব্যাপার।রফিক নিউজ ষ্ট্যাণ্ড থেকে এক কপি বিচিত্রা কিনে উঠে দাঁড়ানোমাত্র মেয়েলি গলা শোনা গেল।–রাফিক সাহেব।
সে তাকিয়ে দেখে।–শারমিন। হালকা গোলাপী রঙের শাড়ি গায়ে। লাল টুকটুকে একটা শাল। হাতে পাটের ব্যাগ। শারমিন বলল, এভাবে তাকাচ্ছেন, যেন আমাকে চিনতে পারছেন না।চিনতে পারছি।আমি তখন থেকে লক্ষ করছি।তাই নাকি? হ্যাঁ। দেখলাম পেটে হাত দিয়ে খুব চিন্তিত মুখে আপনি হাঁটছেন। কি হয়েছে আপনার? রফিক কিছু বলল না।আপনার শরীর খারাপ করেছে কিনা এটা জিজ্ঞেস করবার জন্যে দাঁড়িয়ে আছি।শরীর ঠিকই আছে। বাস থেকে নামার সময় পাঞ্জাবি ছিঁড়ে গেছে। ছেঁড়াটা হাত দিয়ে ঢেকে হাঁটছি।শারমিন হেসে ফেলল। রফিক বিরক্ত মুখে বলল, আপনি হাসছেন! সরি, আর হাসব না।এখানে কী করছেন? বই কিনতে এসেছি। বিদেশে কিছু বই পাঠাতে হবে। এক জন চেয়েছে।কী বই? গল্প-উপন্যাস?
না, সে গল্প-উপন্যাস পড়ে না। সিরিয়াস ধরনের বই পড়ে।একটা ডিকশনারি কিনে পাঠিয়ে দিন।শারমিন খিলখিল করে হেসে ফেলল। রফিকের মনে হল, বুধবার দিনটি আসলে তার জন্যে ভালোই।রফিক সাহেব, আপনার কাজ না থাকলে আসুন আমার সঙ্গে, বই পছন্দ করে দেবেন। আছে কোনো কাজ? না, কাজ নাই কোনো। আর থাকলেই-বা কি? তারা হাঁটতে শুরু করল। শারমিনের হাঁটার ভঙ্গি স্বাভাবিক। কোনো রকম সঙ্কোচ নেই, জড়তা নেই। যেন তারা দীর্ঘদিনের বন্ধু। শারমিন হালকা গলায় বলল, ঐদিন আপনি খুব রাগ করেছিলেন, তাই না? হ্যাঁ।খুব বেশি রাগ করেছিলেন?
হ্যাঁ।এখানে রাগ আছে? আছে।কী করলে আপনার রাগ কমবে? আপনি যদি আজ সারা দিন আমার সঙ্গে থাকেন, তাহলে রাগ কমবে।শারমিন চমকে তাকাল। অনেকক্ষণ কোনো কথা বলল না। রফিক বলল, এখন বোধহয় আপনি রাগ করেছেন, তাই না? ন, আমি রাগ করি নি।তাহলে কি আজ সারা দিন থাকবেন আমার সঙ্গে? বাজার শেষ করে আমরা চিড়িয়াখানায় যেতে পারি।শারমিন হেসে ফেলল। রফিক বলল, হাসছেন কেন?
চিড়িয়াখানায় যাবার কথা শুনে হাসছি।তাহলে অন্য কোথাও, মিউজিয়ামে কিংবা সোনার গাঁয়ে যেতে পারি।প্রাচীন বাংলার রাজধানী।আজ আপনার এত ঘোরাঘুরির শখ হয়েছে কেন? কারণ, আজ আমার জন্মদিন।বলেই রফিকের একটু খারাপ লাগল। একটা মিথ্যা কথা বলা হল। কিছু কিছু মানুষের সঙ্গে মিথ্যা কথা বলতে ইচ্ছা করে না। কপটতা করতে ইচ্ছা করে না। রফিক সিগারেট ধরিয়ে টানতে লাগল। জন্মদিন প্রসঙ্গে এই মিথ্যা কথাটা বলে তার খুব খারাপ লাগছে।আপনার জন্মদিন আজ?
বাহ্, বেশ মজা তো! খুব ভালো দিনে দেখা হল আপনার সঙ্গে। আসুন, আপনাকে একটা গিফট কিনে দেব। আপনি কিন্তু না বলতে পারবেন না।রফিক কিছু বলল না।আপনাকে খুব সুন্দর একটা পাঞ্জাবি কিনে দেব। ছেঁড়া পাঞ্জাবি পরা কেউ আমার পাশে পাশে হাঁটলে আমার ভালো লাগে না।শারমিন আবার হেসে উঠল। কিশোরীদের মতো হাসি। ক্লিনারিন করে কানে বাজে। হঠাৎ করে মন খারাপ করে দেয়।রফিক মৃদুস্বরে বলল, শারমিন, আমার জন্মদিনের কথাটা মিথ্যা। আজ আমার জন্মদিন নয়।জন্মদিন নয়, তাহলে জন্মদিনের কথাটা কেন বললেন?
আমার ধারণা ছিল, এটা বললে আপনি আমার সঙ্গে থাকবেন।আমার থাকাটা এত জরুরি কেন? রফিক কোনো জবাব দিল না। কিছু কিছু প্রশ্ন আছে যার জবাব সরাসরি দেওয়া যায় না। শারমিন দ্বিতীয় বার বলল, বলুন, কেন আপনি চান আমি আজ সারা দিন। আপনার সঙ্গে থাকি।জানি না, কোন চাই।শারমিন হালকা গলায় বলল, আমরা সারা জীবনে অনেক কিছুই চাই, কিন্তু সবকিছু পাই না। আমি সব সময় স্বপ্ন দেখি, আমার অনেকগুলি ভাইবোন। সবাই হৈচৈ ছোটাছুটি করছে, ঝগড়া করছে। কিন্তু থাকি একা একা। আমার কী মনে হয় জানেন, কেউ যদি তীব্রভাবে কোনো জিনিস চায়, সে সেটা পায় না। কোনো কিছুর জন্যেই প্রবল আকাঙ্খা থাকা ঠিক না। বুঝতে পারছেন?
পারছি।চলুন, পাঞ্জাবি কিনি। জন্মদিন উপলক্ষেই দিলাম। এ্যাডভান্স গিফ্ট।না, কোনো দরকার নেই। আচ্ছা, আমি যাই।চলে যাবেন।হ্যাঁ।শারমিন বলল, রফিক সাহেব, আপনাকে একটা কথা বলা দরকার। আসুন কোথাও বসে কথাটা বলি। এখানে কোনো ভালো রেস্টুরেন্ট আছে? না, এদিকে তেমন কিছু নেই।চলুন, কোনো একটা চাইনিজ রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসি। চাইনিজ রেস্টুরেন্টগুলি এই সময় ফাঁকা থাকে। আসবেন? চলুন যাই।রফিক, শারমিনের সহজ-স্বাভাবিক আচার-আচরণের প্রশংসা করল। এই মেয়েটি জানে, সে কী বুলছে, কী করছে। এটা খুব বড়ো কথা। বেশির ভাগ জানে না, সে কী করছে, কী বলছে।রমিন বলল, চায়ের সঙ্গে আর কিছু খাবেন? এরা খুব ভালো সমুসা। জাতীয় একটা খাবার তৈরি করে। চায়ের সঙ্গে ভালো লাগবে। দিতে বলি? বলুন।
শারমিন খাবারের কথা বলল। অস্বস্তির সঙ্গে এদিক-ওদিক খানিকক্ষণ তাকাল। যেন কী বলবে তা একটু গুছিয়ে নিচ্ছে। রফিক বলল, বলুন, কী বলবেন।আপনি এত গম্ভীর হয়ে থাকলে বলি কী করে? সহজ হয়ে বসুন। আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনি ভাইভা দিতে এসেছেন।রফিক হাসতে চেষ্টা করল। শারমিন কী বলবে, তা সে বুঝতে চেষ্টা করছে।শারমিন চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, সাব্বির আহমেদ নামে এক জন ভদ্রলোক আছেন। পি-এইচ. ডি করছেন আমেরিকায়। অত্যন্ত ভালো ছাত্র এবং আমার বাবা তাঁকে খুব পছন্দ করেন। আমি নিজেও করি। পছন্দ করার মতোই মানুষ। তাঁর মাকে আমি চাচী ডাকি। যখন আমার কোনো কারণে খুব মন খারাপ লাগে, তখন আমি ওনার কাছে যাই, মন ভালো করবার জন্যে। বুঝতেই পারছেন ইনি কেমন মহিলা। পারছেন না?
পারছি।ঐ সাব্বির আহমেদ ছেলেটির সঙ্গে আমার বিয়ে ঠিক হয়ে আছে, যখন আমি কলেজে পড়ি, তখন থেকে। সে জুলাই মাসে দেশে ফিরবে——তখন আমাদের বিয়ে হবে।রফিক কিছু বলল না। শারমিন মৃদুস্বরে বলল, আমি সুখী হতে চাই। গুরু আমি জানি এই বিয়ে আমার জন্যে সুখ নিয়ে আসবে। আমার ইনট্যুশন তাই বলে।রফিক সিগারেট ধরাল। শারমিন বলল, আমি আসলে এক জন দুঃখী মেয়ে। আমি সুখ চাই, সুখী হতে চাই।সবাই চায়।হ্যাঁ, সবাই চায়। তবে আমি বোধহয় একটু বেশি চাই।সে মুখ নিচু করে হাসল। রফিক বলল, কঠিন কঠিন বইগুলি ঐ ভদ্রলোকের জন্যে কিনবেন? হ্যাঁ। আপনার কথামতো একটা ডিকশনারিও কিনে দেব। ওর খুব মেজাজ খারাপ হবে।রফিক হেসে ফেলল। শারমিন বলল, বই পছন্দ করবার জন্যে আপনি আসবেন তো আমার সঙ্গে?
হ্যাঁ, আসব।কেনাকাটার পর আপনার কথামতো আমরা ঘুরে বেড়াব। সারা দিন ঘুরব।তার দরকার নেই।দরকার আছে। আজ আমার খুব ঘুরতে ইচ্ছা হচ্ছে। এবং আরেকটা কথা, রফিক সাহেব।বলুন।এখন থেকে আমরা তুমি-তুমি করে বলব। আপনি-আপনি শুনতে খারাপ লাগছে।ঠিক আছে।প্রথম প্রথম বলতে হয়তো একটু অস্বস্তি লাগবে, পরে আর লাগবে না।সত্যি সত্যি তারা সারা দিন ঘুরে বেড়াল। চিড়িয়াখানা, বোটানিক্যাল গার্ডেন দেখার পর শারমিনের ইচ্ছা হল, প্রাচীন বাংলার রাজধানী সোনার গী দেখবো। রফিক বলল, ফিরতে দেরি হয়ে যাবে। সন্ধ্যা হয়ে যাবে! হোক সন্ধ্যা, আমার দেখতে ইচ্ছা হচ্ছে। সঙ্গে গাড়ি আছে, অসুবিধা কী?
উৎসাহে ও আনন্দে শারমিন ঝলমল করছে। এই আনন্দের উৎসটি কোথায়, কে জানে? সারা পথ হাত নেড়ে নেড়ে সে অনেক গল্প করতে লাগল। তুচ্ছ সব কথা–এতেই একেক বার সে হাসতে হাসতে ভেঙে গড়িয়ে পড়ছে।রফিক মুটামুটি চুপচাপই আছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে, সে একটা ঘোরের মধ্যে আছে। পরিষ্কারভাবে সে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না।সোনার গাঁ যাওয়ার পথে শারমিনের চায়ের পিপাসা পেয়ে গেল। পথের পাশে গাড়ি থামিয়ে তারা চা খেল। শারমিন বলল, কেমন গ্রাম-গ্রাম চারদিক, তাই না? এটা তো গ্রামই। গ্রাম-গ্রাম তো লাগবেই।তুমি কখনো গ্রামে গিয়েছ রফিক? যাব না কেন, অনেক বার গিয়েছি।আমি কখনো গ্রাম দেখি নি। এক বার তোমার সঙ্গে গিয়ে দেখে আসব।বেশ তো।গ্রামের জোছনা নাকি খুব সুন্দর হয়?
হয় বোধহয়, আমার এমন কাব্য ভাব নেই। মন দিয়ে দেখি নি কখনো।তেমন কোনো হাসির কথা নয়, কিন্তু খিলখিল করে হেসে উঠল। শারমিন, যেন খুব মজার কথা, রফিক বলল, তোমার সাব্বির সাহেব কি তোমাকে আমার সঙ্গে গ্রামে যেতে দেবেন? দেবে না কেন? নিশ্চয়ই দেবে।দেখা যাবে।ওর মধ্যে কেনো প্রিজুডিস নেই।না থাকলেই ভালো।আর সে খুব ভাবুক ধরনের, রাতদিন বই নিয়ে থাকে।তাই নাকি? হ্যাঁ। মাঝে মাঝে হঠাৎ রোমান্টিক হতে চেষ্টা করে, সেটা আরো হাস্যকর লাগে।দু একটি উদাহরণ দাও, শুনি।না, থাক, আমার লজ্জা করবে।আহ, লজ্জার কী আছে। এর মধ্যে?
শারমিন গম্ভীর হয়ে বলল, যেমন, গত মাসে হঠাৎ চিঠি লিখল——শারমিন, তুমি অবশ্যই তোমার মাথার একগাছি চুল খামে ভরে পাঠাবে।বলেই শারমিন লজ্জা পেল। সন্ধ্যার আলোয় তার লজ্জারাঙা মুখ দেখতে বড়ো ভালো লাগল। রফিকের। তার জীবনে এই দিনটি বিশেষ দিন হয়ে থাকবে। একটি গোপন সঞ্চয়। রফিক একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস গোপন করল। তার মনে হল, সুখ এবং দুঃখ একসঙ্গে মিশে থাকে, এমন ঘটনার সংখ্যা পৃথিবীতে খুব বেশি।
শারমিন বাড়ি ফিরল রাত আটটায়। রহমান সাহেব উদ্বিগ্ন হয়ে অপেক্ষা করছিলেন। তাকে দেখেই বললেন, কোথায় ছিলে মা? ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। আমেরিকায় পাঠাবার জন্যে কিছু বই কিনলাম, তারপর এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। ওকে নিয়ে খুব ঘুরলাম।খবর তো দেবে। খুব চিন্তা করছিলাম।আই এ্যাম সরি।একটা টেলিফোন করে দিলেই হত।একদম মনে হয় নি। প্লীজ বাবা, রাগ করো না।শারমিন বাবাকে জড়িয়ে ধরল। রহমান সাহেব হেসে ফেললেন।খুব ভালো বন্ধু বুঝি? হ্যাঁ।অনেক দিন পর দেখা হল? বাসায় নিয়ে এলে না কেন? নিয়ে আসব এক দিন।সাব্বিরের চিঠি এসেছে। তোমার টেবিলে রেখে এসেছি।থ্যাংকস।কিছু বইপত্রও বোধহয় পাঠিয়েছে। বিরাট একটা প্যাকেট দেখলাম।ভূতের বই পাঠাতে বলেছিলাম–তাই পাঠিয়েছে।
সাব্বিরের চিঠিগুলো সাধারণত ছোট হয়। তুমি কেমন আছ? আমি ভালো। এখানকার ওয়েদার এখন বেশ চমৎকার! এতেই শেষ।কিন্তু এবারের চিঠিটি বেশ দীর্ঘ। ওয়েদার ভালো ছাড়াও অনেক কিছু লেখা। শারমিন লক্ষ করল, চিঠি পড়তে তার কেমন যেন আগের মতো ভালো লাগছে না। জড়ানো ধরনের হাতের লেখার দিকে তাকিয়ে তার সত্যি সত্যি হাই উঠল।পাঠানো বইগুলিও খুলে দেখতে ইচ্ছা করছে না। এরকম হচ্ছে কেন? দায়িত্ব পালনের মতো করে সে চিঠি শেষ করল। বইয়ের প্যাকেট খুলে বইগুলি উল্টেপাল্টে দেখল। রাত দশটার দিকে গেল বাবার ঘরে। শোবার আগে গুড নাইট জানাতে।
রহমান সাহেব বেতের চেয়ারে গা এলিয়ে চুরুট টানছিলেন। ঘরে একটা হালকা মিষ্টি গন্ধ। রাতের খাবারের পর তিনি সাধারণত এক পেগ হুইঙ্কি খেয়ে থাকেন।শারমিনকে ঢুকতে দেখে নড়েচড়ে বসলেন। আদুরে গলায় বললেন, ঘুমুতে যাচ্ছ মা? বস, একটু।শারমিন বসল।কী লিখেছে সাব্বির? কেমন আছে সে? ভালোই আছে।কবে আসবে কিছু লিখেছে? না।আমি ভাবছি। ওকে লিখব। জুন-জুলাইয়ের দিকে এক বার দেশে আসতে। বাই দিস টাইম তোমার এম. এ. পরীক্ষার রেজাল্টও নিশ্চয়ই বের হয়ে যাবে। হবে না?
