আমাদের গোষ্ঠীতে পীর-ফকির কেউ নেই। দাদার বাবা ছিলেন চাষা। জমিজমা তেমন ছিল না। কাজেই শেষের দিকে পানের ব্যবসা শুরু করেন। সেতাবগঞ্জ থেকে পানের বাকা মাথায় করে এনে নীলগঞ্জ বাজারে বিক্রি করতেন। এতে তেমন কিছু ভালোমন্দ না হওয়ায় ডিমের কারবার করতে চেষ্টা করেন। চাষা সমাজ থেকে নির্বাসিত হন ডিম বেচার কারণে। তাঁর দুটি মেয়ের বিয়ে আটকে যায়। ডিম বেচা ব্যাপারীর সঙ্গে সম্বন্ধ করা যায় না। খুবই দুদিন গেছে বেচারার।
এই সব তথ্য দাদার কাছ থেকে পাওয়া। হতদরিদ্র মানুষ যখন দারুণ বড়লোক হয়ে যায়, তখন তার অভাবের গল্প করতে ভালোবাসে। দাদা যখন সুস্থ থাকেন এবং কথা বলার মতো কাউকে পান, তখন শুরু করেন। পুরনো দিনের গল্প। কবে পরপর দু দিন পেয়ারা খেয়ে ছিলেন। কবে বেতন না-দেওয়ার জন্যে স্কুল থেকে তাঁকে তাড়িয়ে দেওয়া হল এবং তাঁর বাবা গিয়ে হেডমাস্টার সাহেবের পা ধরে বসেছিলেন একটা কিছু ব্যবস্থা করে দেবার জন্যে।
হেডমাস্টার সাহেব উচ্চাঙ্গের হাসি হেসে বলেছিলেন, ম্যাটিক পাশ করে হবেটা কি? ছেলেকে কাজে লাগান, সংসারে সাহায্য হোক। দাদার ম্যাট্রিক পাশ করা হল না। তিনিও ডিমের ব্যবসা শুরু করলেন। তুতার চল্লিশ বছর পর নীলগঞ্জে একটি হাইস্কুল এবং একটি ইন্টারমিডিয়েট কলেজ দিলেন। দুটিই অবৈতনিক। স্কুলের সমস্ত ব্যয়ভার তিনিই বহন করতেন। এখনো করেন।
অভাব এবং অহংকারের গল্প শুনতে আমার ভালো লাগে না। শুধু আমার একার নয়, কারোই ভালো লাগে না। কাজেই বেশির ভাগ গল্প শুনতে হয় শাহানাকে। এবং সে মেয়েলি ভঙ্গিতে আহা-উঁহু করে, বলেন কি নানাভাই, এ রকম অবস্থা ছিল? কী সর্বনাশ! থাক থাক আর বলবেন না, কষ্ট লাগে। দাদা তাতে উৎসাহ পেয়ে আরো সব ভয়াবহ কষ্টের বর্ণনা শুরু করেন। খুবই বিরক্তিকর ব্যাপার।
পৃথিবীতে বৃদ্ধদের মতো বিরক্তির আর কিছুই নেই। বৃদ্ধরা অসুন্দর বুদ্ধিহীন নারীদের চেয়েও বিরক্তিকর। বাবুভাইয়ের মতে পঞ্চাশের পর এদের সবাইকে কোনো একটি দ্বীপে চালান করে দেওয়ার ব্যবস্থা রাষ্ট্ৰীয় পর্যায়ে করা উচিত। যেখানে সব বুড়ো-বুড়ি মিলে এক সঙ্গে বকবক করবে। ছ মাসে এক বার জাহাজ গিয়ে তাদের খাবার দাবার দিয়ে আসবে।
আমাদের বংশ দীর্ঘজীবী বংশ। দাদার ডিমা-বেচা বাবা মারা গিয়েছিলেন প্ৰায় এক শ বছর বয়সে। শেষ সময়ে চোখে দেখতেন না, কানে শুনতেন না, চলচ্ছক্তি ছিল না। দিনরাত নিজের মলমূত্রের মধ্যে বসে থেকে পশুর মতো গো-গোঁ করতেন। সবই শোনা কথা। মায়ের কাছ থেকে শুনেছি। দাদার এই অতিবৃদ্ধ বাবাকে দেখবার কেউ ছিল না। তিনি গ্রামের বাড়িতে পড়ে থাকতেন। সেখানে তখনো সেই প্রকাণ্ড দালান (যা পরে নীলমহল নামে খ্যাত হয়) তৈরী হয় নি। দাদা সবে টাকা পয়সার মুখ দেখতে শুরু করেছেন। বন্যার মতো সম্পদ আসা শুরু হয় নি।
মানুষের মল এবং মূত্রের মধ্যে জীবনদায়িনী কিছু হয়তো আছে। দাদার বাবা মলমূত্র মেখে প্রায়-অমর হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যু বাৰ্ধক্যজনিত কারণে হয় নি। হয়েছিল। ইদুরের কামড়ে। শোনা যায় ইঁদুর কামড়ে তাঁর নাভির কাছ থেকে মাংস তুলে নিয়েছিল। সেই কামড় বিষিয়ে গিয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর ছেলের সীমাহীন ক্ষমতার কিছুই তিনি চোখে দেখে যেতে পারেন নি।
তাঁর মৃত্যুর দু বছরের মধ্যেই নীলমহল তৈরির কাজ শুরু হয়। সে নাকি এক রাজকীয় ব্যাপার! গ্রাম-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছিল, ডিমা-বেচা খবির মিয়ার ছেলে সোনার মাইট পেয়েছে। রাজা-বাদশাদের সঞ্চিত গোপন স্বর্ণমুদ্রা পূৰ্ণ সাতটা ঘড়া। সবাই বলত–এই সব পাপের অর্থ কি আর ভোগে লাগবে? লাগবে না। তাদের কথা আংশিক ফলে গেল। দাদা বা তাঁর বংশধররা কেউ সেই প্রকাণ্ড বাড়িতে থাকল না। দাদার দশা হল বাবুই পাখির মতো।
বাবুই পাখি বহু কষ্টে বহু মমতায় চমৎকার একটি বাসা বানায়, সে নিজে বাসাটিতে বাস করতে পারে না। রোদ বৃষ্টি বাদলে বসে থাকে বাইরে, বাসায় নয়। তার চোখের সামনে ভালোবাসায় তৈরি বাসাটি হাওয়ায় দোল খায়।দাদারও তাই হল। নীলমহলে তিনি গিয়ে উঠতে পারলেন না। কারণটি বিচিত্র। রাতদুপুরে সে-বাড়ির ছাদে অশরীরী শব্দটব্দ হতে লাগল।
কোথায়ও হাওয়া নেই, নীলমহলের জানালা আপনাআপনি খুলে যাচ্ছে। রাতের বেলা খড়ম পায়ে বারান্দার এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত পর্যন্ত কে যেন হাঁটে। নীলমহলের ছাদে নাকি আগুনের কুণ্ড হঠাৎ-হঠাৎ ঝলসে ওঠে। আজগুবি সব ব্যাপার। নিশ্চয়ই এ সবের কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে, কিংবা সবটাই মনগড়া। কিন্তু মানুষমাত্রই কিছু-না–কিছুতে বিশ্বাস করতে ভালোবাসে। দাদা নীলমহল ছেড়ে তাঁর ছেলেদের সঙ্গে এলেন বাস করতে।
সেই চমৎকার বাড়িটির জন্যে তাঁর কি মন কদে? তাঁর ভালোবাসার নীলমহল। মৃত্যুর আগে আগে সমস্ত অতীত নাকি ছবির মতো ভেসে ওঠে। নীলমহলের অতীত কি ভাসছে তাঁর সামনে? আজ কি তাঁর মনে হচ্ছে, সমস্তই অর্থহীন? নীলমহল-লালমহল কোনো মহলাই কাজে আসে না। আজ তাঁর যাত্রা অজানা এক মহলের দিকে, যার রঙ তাঁর জানা নেই।
ছোটফুফা কাগজ-কলম নিয়ে বসেছেন। দাদার কিছু একটা হয়ে গেলে গণ্যমান্য যাদেরকে খবর দেওয়া হবে তাদের নাম-ঠিকানা এবং টেলিফোন নাম্বার লেখা হচ্ছে। দেখতে-দেখতে তিনি ফুলস্কেপ কাগজ তিন-চারটা ভরিয়ে ফেললেন। বাবুভাইকে বললেন, দেখ তো, কেউ বাকি আছে কিনা? বাবুভাই না তাকিয়েই বললেন, না, সবাই আছে।না দেখেই কী করে বললি? দেখতে হবে না। যা লিখেছেন ঠিকই লিখেছেন। সবাই আছে।কেউ বাদ গেলে কেলেঙ্কারি হবে।
কেলেঙ্কারি হবে কেন? ফুফা বহু কষ্টে রাগ সামলালেন। বরফশীতল স্বরে বললেন, সামাজিকতার একটা ব্যাপার আছে।মানুষ মারা যাচ্ছে, এর মধ্যে আবার সামাজিকতা কী? মানুষের মৃত্যুর মধ্যে সামাজিকতা নেই? না। এটার মধ্যে এসব কিছু নেই।বাবু ভাই হাই তুললেন। তিনি ফুফাকে রাগাতে চাইছেন। ফুফা গম্ভীর স্বরে বললেন, এটা একটা খান্দনী ফ্যামিলি। জলে-ভাসা ফ্যামিলি না। খান্দানী ফ্যামিলিতে অনেক রকম সামাজিকতা আছে।
খান্দানী! আমরা খান্দানী হলাম কবে? আমি যতদূর জানি, আমাদের পূর্বপুরুষ চাষা ছিলেন। কেউ কেউ হাটে গিয়ে ডিম বেচতেন। আমাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে এক জন সিঁধেল চোর ছিল। কানুচোরা নাম।এ রকম কোনো কিছু তো জানি না।আমি জানি।ছোটফুফা মুখ অন্ধকার করে ফেললেন। বাবুভাই বললেন, একটা লোক মারা যাচ্ছে, তাকে মরতে দিন।কিসের সঙ্গে কী বলছ? মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোমার।
মাথা ঠিকই আছে। ঠিক আছে বলেই বলছি, আমরা খান্দানীফান্দানী না।ছোটফুফা গম্ভীর হয়ে বললেন, তৰ্ক করা তোমার একটা বদ অভ্যাস। এটা ছাড়া উচিত।বাবুভাই ঘাড় মোটা করে বললেন, আমাদের খান্দানী কি জন্যে বলছেন সেটা আগে বলুন।তোমরা খান্দানী না? না।বেশ তো ভালো কথা। তোমার ইচ্ছাটা কি? কাউকে কোনো খবর দেওয়া হবে না?
খবর দেওয়ার কোনো দরকার নেই।তুমি ঠিক সোবার অবস্থায় নেই! তোমার সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলতে চাই না!কথা বলতে না-চাইলে বলবেন না।ছোটফুফা মুখ কালো করে উঠে গেলেন। আমি খানিকক্ষণ উদ্দেশ্যবিহীনভাবে ঘুরে বেড়ালাম। মাথা ব্যথা করছে। আমার টেবিলের ড্রয়ারে এনসিন আছে। কিন্তু বাবুভাই ঘর বন্ধ করে বসে আছেন। দরজায় ধাক্কা। তেই তিনি বিরক্ত স্বরে বললেন, কে?
আমি।
যা এখন।
ঘুমোচ্ছ নাকি?
না, ঘুমাচ্ছি-টুমাচ্ছি না। তুই যা, বিরক্ত করিস না।
দরজাটা একটু খোল।
বাবুভাই জবাব দিলেন না।
রান্নাঘরে আকবরের মাকে দেখা গেল কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুমিয়ে আছে। এদিকে গ্যাসের চুলায় একটা মাঝারি আকারের ডেকচিতে পানি ফুটছে। নিৰ্ঘাত আকবরের মার কাণ্ড। পানি ফোটাতে দিয়ে ঘুমুতে শুরু করেছে। কাউকে ঘুমুতে দেখলেই ঘুম পায়। আমি হাই তুললাম। তারপর এক সময় আবার নেমে এলাম নিচে। নিচের বারান্দা জনশূন্য। মৌলানা সাহেব পর্যন্ত নেই। মনে হচ্ছে বসার ঘরে তাঁর ঘুমাবার ব্যবস্থা হয়েছে। মৃত্যুর অপেক্ষা করতে গিয়ে সখাই বোধ করি ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।
দাদার ঘরে উঁকি দিয়ে দেখি–সিরিয়াস ব্যাপার। অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে। স্যালাইনের ব্যাগ ঝুলছে হ্যাঁঙ্গার জাতীয় জিনিসে। মোটামুটি একটা হাসপাতাল। হাসপাতাল-হাসপাতাল গন্ধ পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে। রুগীর মনে হয় অক্সিজেন দেওয়ায় কিছুটা আরাম হয়েছে। ছটফটানি নেই। নিঃসাড়ে ঘুমাচ্ছেন। এদিকে বড়োচাচীর ঘুম ভেঙেছে। তিনি একটি মোটামতো নার্সের সঙ্গে আলাপ করছেন। বড়োচাচীর মুখ গভীর। নার্সটির মুখ হাসি-হাসি। নার্স কখন এসেছে কে জানে। ছোটফুফুর কাণ্ড নিশ্চয়ই।
এক বার দাদার শরীর খারাপ হল। ব্লাড প্ৰেশার বা এই জাতীয় কিছু-মাথা ঘুরে পড়ে গেছেন। খবর পাওয়ামাত্র ছোটফুফা এক জন নার্স নিয়ে উপস্থিত। দিনরাত এখানে থাকবে। নার্সটির নাম ছিল–সুশী। খ্রিশ্চিয়ান। বয়স কম। খুব মিষ্টি চেহারা নাসটির। এমন সব সুন্দরী নার্স থাকে, আমার জন্য ছিল না। সুশী সেই জাতীয় নার্স, যাদের সঙ্গে হাসপাতালের ইন্টানী ডাক্তারদের প্রেম হয়। রুগীরা যাদের সঙ্গ পাওয়ার জন্যে ব্যাকুল থাকে।
সুশী অল্প সময়ের মধ্যে দাদাকে সারিয়ে তুলল। দু দিনের মধ্যে দেখা গেল দাদা বারান্দায় ইজিচেয়ারে চোখ বন্ধ করে বসে আছেন! সুশী তার পাশে অন্য একটি চেয়ারে বসে গম্ভীর মুখে ফুশফুশ করে সিগারেট টানছে। মাঝে মাঝে দাদা কীসব বলছেন, সুশী সে-সব শুনে খুব হাসছে। আমাদের বিস্ময়ের সীমা রইল না। দাদা কি ওর সঙ্গে রসিকতা করছেন?
সেবার সুশীকে উপহার হিসেবে একটি রাজশাহী সিলের শাড়ি এবং কাশ্মীরী শাল দিলেন। উপহার পেয়ে তার কোনো ভাবান্তর হল না। যেন এ রকম উপহার সে সব সময়ই পেয়ে আসছে। রেগে গেলেন বড়োফুফু। খুব হৈ-চৈ করতে লাগলেন। একটা নার্সকে দু হাজার টাকার শাল? বাবার না হয় মাথা খারাপ, তাই বলে কি অন্য সবারও মাথা খারাপ, কেউ একটা কথা বলবে না? আমি ফুফুকে বললাম, আপনি যখন এসেছেন, আপনিই বলুন।
বলবই তো, এক শ বার বলব। একটা রাস্তার মেয়েকে দু হাজার টাকার শাল দেবে কেন? রাস্তার মেয়ে হবে কেন? নার্স এক জন। ভালো নাস। দাদাকে সারিয়ে তুলেছে।বাজে বকবক করিস না তো। এক্ষুণি যাচ্ছি আমি বাবার কাছে।ফুফু ফুটে গেলেন দাদার ঘরে, ফিরে এলেন মুখ অন্ধকার করে। কী কথাবার্তা হল জানা গেল না।
অবশ্যি আজকের এই নার্সটির চেহারা বাজে। মুখে বসন্তের দাগ। বিরাট স্বাস্থ্য। মাংসের চাপে চোখ ছোট হয়ে গেছে। আমাকে উঁকি দিতে দেখেই নার্সটি চট করে। রুগীর কাছে গেল। অভিজ্ঞ ভঙ্গিতে স্যালাইনের বোতলটি নেড়েচেড়ে দিল। এ সুশীর মতো নয়। সুশী। এখানে থাকলে দাদার শরীর হয়তো অনেকখানি সেরে যেত! আমার ধারণা চোখ মেলে এই নার্সটিকে দেখামাত্র আবার দাদার হাঁপানির টান উঠবে।
বড়োচাচী চেয়ার ছেড়ে উঠে এলেন আমার কাছে, গলার স্বর খাদে নামিয়ে বললেন, নার্সকে আনাল কে? জানি না।বড়োচাচী আমার সঙ্গে বের হয়ে এলেন। তাঁর মুখ অস্বাভাবিক গভীর। আমি বললাম, শুধু আপনারা দু জন? আর মানুষজন কোথায়? জানি না কোথায়।আমি লক্ষ করলাম বড়োচাচী কথা বলছেন খুব নিচু গলায়। কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তিত থাকলে তাঁর এ-রকম হয়। কথাই শুনতে পাওয়া যায় না।শুনেছিস নাকি, তোর বড়োচাচা বাবুকে ত্যাজ্যপুত্র করেছে?
কি যে বলেন! হ্যাঁ করেছে। আমাকে বলল।এই সব কিছু না চাচী। মুসলিম আইনে ত্যাজ্যপুত্র হয় না।তোকে কে বলল? আমি জানি। হিন্দু আইনে হয়, মুসলিম আইনে হয় না। আর খামাকা ত্যাজ্যপুত্র করবে। কেন? মদ খেয়ে মাতলামি করছিল, এই জন্যে করেছে।না চাচী, এই সব কিছু না।
বড়োচাচীর মুখ সঙ্গে সঙ্গে আলো হয়ে উঠল। ইনি যে-কোনো কথা বিশ্বাস করেন। তাঁকে কেউ যদি এসে বলে–দেখে এলাম বুড়িগঙ্গায় একটা মৎস কন্যা ধরা পড়েছে। তিনি সঙ্গে সঙ্গে বলবেন, সত্যি? কথা বলতে পারে? চুল কত বড়ো? মানুষের বুদ্ধি যে ঠিক কতটা কম হতে পারে তা চাচীকে না দেখলে বোঝা যাবে না।বুঝলি টগর, আমি তো শুনে আকাশ থেকে পড়লাম। ভদ্রলোকের ছেলে, মদ খাবে কি? আমি বললাম, কেউ যদি খায়ও সেটা কোনো সিরিয়াস ব্যাপার না। ওষুধের সঙ্গে তো সবাই খাচ্ছে।
তাই নাকি?
হুঁ। হোমিওপ্যাথি অযুদ্ধর সবটাই তো মদ।
তুই জানালি কোথেকে?
এটা নতুন কথা নাকি? সবাই জানে।
আগে আমাকে বলিস নি কেন?
আগে বললে আপনি কি করতেন?
তাও ঠিক, কি করতাম।
বড়োচাচী নিশ্চিত ভঙ্গিতে হাসলেন–তাঁর বুক থেকে পাষাণ-ভার নেমে গেছে। আমাকে বললেন, তোর চাচা এমনভাবে বলল কথাটা যে আমি বিশ্বাস করে ফেলেছিলাম।সব কথা এরকম চট করে বিশ্বাস করবেন না চাচী।না, এখন থেকে আর করব না।
এই সময় বড়োফুফুকে উত্তেজিত ভঙ্গিতে নিচে নামতে দেখা গেল। আমাদের দেখতে পেয়ে থমকে দাঁড়ালেন। যেন আমাদেরকেই খুঁজছিলেন। তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, নীলু নামের ঐ মেয়েটির ঘরে নাকি আজ রান্না হয় নি? আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। এরকম চোঁচোনর কি মানে? বড়োচাচী কিছুই বুঝতে না পেরে অবাক হয়ে তাকালেন।কার ঘরে রান্না হয় নি?
ঐ যে তোমাদের ভাড়াটে। নীলু নাম যে মেয়েটির।আমি বললাম, যা বলার আস্তে বলুন ফুফু।আস্তে বলব কেন? ওরা শুনবে! শুনলে শুনবে। তোর আঙ্কেল দেখে আমি অবাক হয়েছি। এই রকম একটা ভিখিরি শ্রেণীর মেয়ে, আর তুই ওর সঙ্গে দিব্যি বিয়ের কথাবার্তা চালালি?
বড়োচাচী স্তম্ভিত হয়ে বললেন, কার সঙ্গে বিয়ের কথাবার্তা হচ্ছে? কই, আমি তো কিছু জানি না।তুমি চুপ কর ভাবী। তোমার কিছু জানতে হবে না। টগর, তোদের কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই। তোদের উপর নির্ভর করে আমি অনেক বার বেইজিত হয়েছি। মেয়েটাকে আমি বাসায় পর্যন্ত যেতে বলেছি।বলে দিলেই হয়, যেন না যায়।হ্যাঁ বলব। একদম রাস্তার ভিখিরি, ঘরে হাঁড়ি চড়ে না।আস্তে বলুন ফুফু। চিৎকার করছেন কেন?
চিৎকার করব না? তোদের কোনো মান-অপমান নেই বলে কি আমারো নেই? যত ছোটলোকের আড্ডা হয়েছে! সমস্ত ছোটলোকদের কোটিয়ে আমি বিদায় করব। পেয়েছে কি? দারুণ একটা হৈ-চৈ শুরু হয়ে গেল। বড়োচাচা এলেন। বাবা নেমে এলেন তিনতলা থেকে। নীলু। এসে দাঁড়াল সিঁড়ির মাথায়। রামিজ সাহেব এলেন আমাদের বসার ঘর থেকে। সন্ধুচিত ভঙ্গিতে বললেন, কী হয়েছে? কিছু হয় নি।নীলু কাঁদো-কাঁদো গলায় বলল, উনি এসব কথা বলছেন কেন?
আমি বললাম, তুমি দাদার ঘরের দিকে একটু যাও তো নীলু। দেখে এস কিছু লাগবে কিনা। নীলু নড়ল না। আমি লক্ষ করলাম সে থরথর করে কাঁপছে। তার মুখ রক্তশূন্য। বড়োফুফু। সমানে চেঁচাচ্ছেন, যত রাস্তার ছোটলোক দিয়ে বাড়ি ভর্তি করা হচ্ছে। এদের ঘাড় ধরে ধরে আমি বিদেয় করব। আমার ছেলের সঙ্গে একটা ভিখিরির মেয়ের বিয়ের কথা বলছে। এত বড়ো সাহস! নীলু বলল, আপনি চুপ করুন।
বড়োফুফু চুপ করে গেলেন। সিঁড়ির মাথা থেকে তীক্ষ্ণ কষ্ঠে নীলু বলল, বাবা তুমি যাও এখান থেকে। রমিজ সাহেব কিছুই বুঝতে পারলেন না। ফ্যালফ্যাল করে তাকাতে লাগলেন। এই অবস্থা স্থায়ী হল না। বাবা গম্ভীর গলায় বললেন, কিসের জটলা হচ্ছে? এতেই ভিড় পাতলা হল। বড়োফুফু এবং চাচী, দাদার ঘরের দিকে এগোলেন, আমি উঠে এলাম সিঁড়ি বেয়ে। নীলুর দিকে তাকিয়ে হাসির ভঙ্গি করলাম। নীলুকে তা স্পর্শ করল না। হালকা স্বরে বললাম, শাহানা কোথায়, নীলু? নীলু। তার জবাব না দিয়ে তরতর করে নিচে নেমে গেল।
শাহানাকে পাওয়া গেল। তেতলার বারান্দায়। সেখানে একটা ইজিচেয়ারে সে আধশোওয়া হয়ে বসেছিল। আমাকে দেখেই সোজা হয়ে বসল। তার বসার ভঙ্গিটা ছিল অদ্ভুত একটা ক্লান্তির ভঙ্গি। বাবুভাই কি তাকে কিছু বলেছে? বিশেষ কোনো কথা–যার জন্যে একটি মেয়ের হৃদয় তৃষিত হয়ে থাকে? আমি খুব নরম স্বরে বললাম, বাবুভাই কি তোমাকে কিছু বলেছে?
শাহানা জবাব না দিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে রইল। বারান্দার আলো কম বলেই এতক্ষণ চোখে পড়ে নি, এখন দেখলাম শাহানার গাল ভেজা। সে তার ভেজা গাল গোপন করার জন্যেই অন্য দিকে তাকিয়ে আছে? কারো গোপন কষ্টে উপস্থিত থাকতে নেই। আমি ঘুরে দাঁড়ালাম। শাহানা বলল, নিচে হৈ-চৈ হচ্ছিল কিসের? বড়োফুফু একটা ঝামেলা বাধিয়েছেন। নীলুকে আজেবাজে সব কথা বললেন।শাহানা কোনো রকম আগ্রহ দেখাল না। আমি বললাম, তুমি একটু নীলুকে খুঁজে বের করবে? কথা বলবে ওর সঙ্গে?
শাহানা উত্তর দিল না।এই সময় নিচ থেকে সাড়াশব্দ হতে লাগল। দাদা কি মারা গিয়েছেন? আমরা ছুটে নিচে এলাম। দাদার কিছু হয় নি। তিনি তখনো যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। হৈ-চৈ হচ্ছে সম্পূৰ্ণ ভিন্ন ও বিচিত্র কারণে। রামিজ সাহেব অন্ধকার বাগানে একা একা ছোটাছুটি করছেন যেন অদৃশ্য কিছু তাঁকে তাড়া করছে। সবাই এসে ভিড় করেছে বারান্দায়। আমাদের ড্রাইভার টর্চলাইটের আলো তাঁর গায়ে ফেলতে চেষ্টা করছে।
বড়োফুফু চাপা স্বরে বললেন, পাগল-ছাগল আর কি! দিব্যি ভালোমানুষের মতো বসেছিল। হঠাৎ ছুটে চলে গেল।কদমগাছের কাছ থেকে তীক্ষ্ণ হাসির শব্দ ভেসে এল। এ হাসি পৃথিবীর হাসি নয়। এ হাসি অচেনা কোনো ভুবনের। যারা বারান্দায় জটিল। পাকাচ্ছিল, সবাই একসঙ্গে চুপ করে গেল। বাবুভাই বাগানে নেমে গেল। এগিয়ে গেল। কদমগাছের দিকে। নীলুকে দেখা গেল না।
শুধু দেখলাম বিলু তাদের দরজার পাশে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তারপর একসময় ছোট মেয়েটি বাগানে নেমে গেল। চারিদিক চুপচাপ, শুধু বাগানের শুকনো পাতায় তার হেটে যাবার মচমচ শব্দ হতে লাগল।বাবুভাই রমিজ সাহেবের হাত ধরে তাঁকে এনে বারান্দায় বসাল। রামিজ সাহেবের চোখের দৃষ্টি অস্বচ্ছ। সমস্ত মুখমণ্ডল ঘামে ভেজা। বাবুভাই বলল, রমিজ সাহেব, এখন কেমন লাগছে?
ভালো।
আমাকে চিনতে পারছেন?
জ্বি।
কী নাম আমার, বলুন দেখি?
রমিজ সাহেব নিঃশব্দে হাসলেন। বিলু। তার বাবার শার্ট শক্ত করে ধরে রেখেছে; ভয়ানক অবাক হয়েছে সে।
বাবার কী হয়েছে?
কিছু হয় নি।
এ রকম করছে কেন?
ঠিক হয়ে যাবে। মাথায় পানি ঢাললেই ঠিক হয়ে যাবে!
বাবুভাই রমিজ সহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন, এখন কি একটু ভালো লাগছে?
জ্বি হ্যাঁ। লাগছে।
আমি কে বলুন?
রমিজ সাহেব। আবার হাসলেন। নীলু। এগিয়ে আসছে। রমিজ সাহেব তাকালেন নীলুর দিকে। তাঁকে দেখে মনে হল না, তিনি নীলুকে চিনতে পারছেন। নীলু ভয়-পাওয়া গলায় বলল, বাবার কী হয়েছে?
দাদা মারা গেলেন ভোর পাঁচটা দশ মিনিটে। নব্বুই বৎসর আগে দরিদ্র কৃষক পরিবাবে তাঁর জন্ম হয়েছিল। নব্বুই বছর তিনি তাঁর ছেলেমেয়েদের অসম্ভব বিত্তশালী করে দিয়ে নিঃশব্দে মারা গেলেন।সকাল হচ্ছে। পুবের আকাশ অল্প অল্প ফর্সা হতে শুরু করেছে। অনেক দিন সূর্যোদয় দেখা হয় নি। আমি ছাদের আলিশায় হেলান দিয়ে সূর্যের জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলাম।
ছাদ থেকে দেখতে পাচ্ছি লোকজন ব্যস্ত হয়ে ছোটাছুটি করছে। শুধু বাবুভাই রমিজ সাহেবের হাত শক্ত করে চেপে ধরে বসে আছে। আরো অনেক দূরে টিউবওয়েলের পাশে, পাথরের মূর্তির মতো নীলু বসে আছে একা একা। আমার খুব ইচ্ছা হল চেঁচিয়ে বলি, নীলু, ভয়ের কিছু নেই। সব ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু কিছুই তো ঠিক হয় না। সকালের পবিত্র আলোয় কাউকে মিথ্যা আশ্বাস দিতে নেই।তবু আমাদের সবার মিথ্যা আশ্বাস দিতে ইচ্ছে করে। ঠিক এই মুহুর্তে আমার ইচ্ছা করছে নীলুরু-পাশে গিয়ে দাঁড়াতে। ভোরের আলো এসে পড়ছে নীলুর চোখেমুখে। কী সুন্দর লাগছে নীলুকে।
Read more
