বদরুল সাহেব চামচ আনতে গেলেন। ভদ্রলোকের জন্যে আমার মায়া লাগছে। গত দু’মাস ধরে তাঁর কোন চাকরি নেই। ইনসুরেুন্স কোম্পানীতে ভাল চাকরি করতেন। ইন্সপেক্টর জাতীয় কিছু। কোম্পানী তারা তাকে ছাঁটাই করে দিয়েছে। এই বয়সের একজন মানুষের চাকরি চলে গেলে আবার চাকরি জোগাড় করা কঠিন। ভদ্রলোক কিছু জোগাড় করতে পারছেন না। মেসের ভাড়া তিন মাস বাকি পড়েছে। যতদূর জানি, মেসের খাওয়াও তাঁর বন্ধ। ফিস্টে তার নাম থাকার কথা না, বাজার-টাজার করে দিয়েছেন, রান্নার সময় কাছে থেকেছেন এই বিশেষ কারণে হয়ত তাঁর খাবার ব্যবস্থা হয়েছে।
চামচ নিয়ে এসে বদরুল সাহেব আরাম করে খাচ্ছেন। তাঁকে দেখে এই মুহূর্তে মনে করার কোন কারণ নেই যে, পৃথিবীতে নানান ধরনের দুঃখ-কষ্ট আছে। যুদ্ধ চলছে বসিনিয়ায়। রুয়ান্ডায় অকারণে, একজন আরেকজনকে মারছে। তাঁর নিজের সমস্যাও নিশ্চয়ই অনেক। দু’মাস বাড়িতে মনিঅর্ডার যায়নি। বাড়ির লোকজন নিশ্চয়ই আতংকে অস্থির হচ্ছে। ভদ্রলোক নির্বিকার।
‘হিমু সাহেব।’ ‘জ্বি।’ ‘হাড়গুলি চুষে যে খান, মজা পাবেন। ইংরেজিতে একটা কথা আছে ‘Nearer the bone, sweeter is the meat.’ আমি একটা হাড় মুখে ফেলে চুষতে লাগলাম।তিনিও একটা মুখে নিলেন। আনন্দে তাঁর চোখে প্রায় বন্ধ।‘বদরুল সাহেব!’ ‘জ্বি।’ ‘চাকরি-বাকরির কিছু হল?’
‘এখনো হয়নি, তবে ইনশাআল্লাহ্ হবে। আমার অনেক লোকের সঙ্গে জানাশোনা। এদের বলেছি—এরা আশা দিয়েছে।’ ‘শুধু আশার উপর ভরসা করাটা কি ঠিক হচ্ছে?’ ‘আমার খুব ক্লোজ একজনকে বলেছি। ইস্টার্ন গার্মেন্টস-এর মালিক। ইস্কুলে এক সঙ্গে পড়েছি। এখন রমরমা অবস্থা। গাড়ি-টাড়ি কিনে হুলস্থুল। বাড়ি করেছে গুলশানে।’ ‘তিনি কি আশা দিয়েছেন?’
‘পরে যোগাযোগ করতে বলেছে। সেদিনই সে হংকং যাচ্ছিল। দারুণ ব্যস্ত। কথা বলার সময় নেই। এর মধ্যেই সে পেস্ট্রি কোক খাইয়েছে। পূর্বাণীর পেস্ট্রি, স্বাদই অন্য রকম। মাখনের মত মোলায়েম। মুখের মধ্যেই গলে যায়। চাবাতে হয় না।’ ‘আপনার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু?’ ‘বললাম না স্কুল-জীবনের বন্ধু। নাম হল গিয়ে আপনার ইয়াকুব। স্কুলে সবাই ডাকত—বেয়াকুব।’ ‘আসলেই বেকুব?’
‘তখন তো বেকুবের মতই ছিল। তবে স্কুল-জীবনের স্বভাব-চরিত্র দেখে কিছু বোঝা যায় না। আমাদের ফার্স্ট বয় ছিল রশিদ। আরে সর্বনাশ, কি ছাত্র। অংকে কোন দিন ১০০-র নিচে পায় নাই। প্রিটেস্ট পরীক্ষায় এক্সটা ভুল করেছে। সাত নাম্বার কাটা গেছে। কাঁদতে কাঁদতে চোখ ফুলিয়ে ফেলেছিল। সেই রশিদের সঙ্গে একুশ বছর পর দেখা। গাল-টাল ভেঙ্গে, চুল পেকে কি অবস্থা। চশমার একটা ডাণ্ডা ভাঙ্গা, সুতা দিয়ে কানের সঙ্গে বেঁধে রেখেছে। দেখে মনটা খারাপ হল।’
‘অংকে একশ পাওয়া ছেলের এই অবস্থা, মন খারাপ হবারই কথা। অংকে টেনে—টুনে পাশ করলে কানে সূতা বেঁধে চশমা পরতে হত না।’ ‘কারেক্ট বলেছেন। একুশ বছর পর দেখা—কোথায় কুশল জিজ্ঞেস করবে, ছেলেমেয়ে কতবড় এইসব জিজ্ঞেস করবে—তা না, ফট করে একশ’টাকা ধরে চাইল।’ ‘ধার দিয়েছেন?’ ‘কুড়ি টাকা পকেটে ছিল, তা-ই দিলাম। খুশি হয়ে নিয়েছে।’ ‘মেসের ঠিকানা দেননি তো? মেসের ঠিকানা দিয়ে থাকলে মহা বিপদে পড়বেন। দু’দিন পরে পরে টাকার জন্যে বসে থাকবে। আপনার জীবন অতিষ্ঠ করে ফেলবে।’
বদরুল সাহেব দুঃখিত গলায় বললেন, স্কুল-জীবনের বন্ধু তো—দুরবস্থা দেখে মনটা এত খারাপ হয়েছে, আমার নিজের চোখে পানি প্রায় এসে গিয়েছিল। সুতা দিয়ে কানের সাথে চশমা বাঁধা— বদরুল সাহেব দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন। তাঁর ভবিষ্যতের চেয়ে বন্ধুর ভবিষ্যতের চিন্তায় তাঁকে বেশি কাতর বলে মনে হল।
‘হিমু ভাই।’ ‘জ্বি।’ ‘ভাল একটা নাশতা হয়ে গেল, কি বলেন?’ ‘হ্যাঁ, হয়েছে। আপনি যে কষ্ট করে আমার অংশটা জমা করে রেখেছেন তার জন্যে ধন্যবাদ।’ ‘আরে ছিঃ ছিঃ! এটা একটা ধন্যবাদের বিষয় হল? এতদিন পরে ফিস্ট হচ্ছে আপনি বাদ পড়বেন এটা কেমন কথা? তাছাড়া আপনি যেদিন মেসে খান না সেদিনের খাওয়াটা আমি খেয়ে ফেলি।’ ‘ভাল করেন। অবশ্যেই খেয়ে ফেলবেন। দেশে টাকা পাঠিয়েছেন?’
‘গত মাসে পাঠিয়েছি। এই মাস বাদ পড়ে গেল। তবে সমস্যা হবে না, আমার স্ত্রী খুবই বুদ্ধিমতী মহিলা—সে ব্যবস্থা করে ফেলবে।’ ‘আপনার চাকরি যে নেই সেই খবর স্ত্রীকে জানিয়েছেন?’ ‘জ্বি-না। আপনার ভাবী মনটা খারাপ করবে। কি দরকার! চাকরি তো পাচ্ছিই, মাঝখানে কিছুদিনের জন্যে টেনশানে ফেলে লাভ কি? আজই ইয়াকুবের সঙ্গে দেখা করব। সংস্কৃতে একটা কথা আছে না—“শুভস্য শীঘ্রম”। চা খাবেন হিমু ভাই?’
‘জ্বি-না। দরজা-টরজা বন্ধ করে লম্বা ঘুম দেব। আমার স্বভাব হয়ে গেছে বাদুরের মত। দিনে ঘুমাই রাতে জেগে থাকি।’ ‘কাজটা ঠিক হচ্ছে না ভাই সাহেব। শরীরের দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। শরীর নষ্ট হলে—মন নষ্ট হয়। আমার শরীরটা ঠিক আছে বলেই এত বিপদে-আপদেও মনটা ঠিক আছে। শরীরটা ঠিক রাখবেন।’ ‘আমার আবার উল্টা নিয়ম। মনটাকে ঠিক রাখে যাতে শরীর ঠিক থাকে।’
বদরুল সাহেব বাটি এবং চামচ নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। লজ্জিত ভঙ্গিতে বললেন, ছোট্ট একটা কাজ করে দিবেন হিমু ভাই! ‘জ্বি, বলুন।’ ‘মেসের মালিক আমাকে বলেছে সোমবারে মধ্যে মেস ছেড়ে দিতে। আজেবাজে সব কথা। গালাগালি। আপনি যদি একটু বলে দেন! ও আপনাকে মানে।’ ‘আমি এক্ষুনি বলে দিচ্ছি।’
‘তাকে বললাম যে চাকরি হয়ে যাচ্ছে। ইয়াকুবকে বলেছি। এত বড় গার্মেন্টস-এর মালিক। চাকরি তার কাছে কিছুই না। সে একটা নিঃশ্বাস ফেললে দশটা লোকের এমপ্লয়ম্নেট হয়ে যায়। বিশ্বাস করে না। আপনি বললে বিশ্বাস করবে।’
আমাদের ম্যানাজারের নাম হায়দার আলি খাঁ। নামের সঙ্গে তার চেহারার কোন সঙ্গিত নেই। রোগা, বেঁটে একজন মানুষ। বেঁটেরা সচবাচর কুঁজো হয় না। তিনি খানিকটা কুঁজো। ব্যক্তিবিশেষের সামনে তার কুজোভাব প্রবল হয়। আমি সেই ব্যক্তিবিশেষের একজন। তিনি কোন কারণ ছাড়াই আমাকে ভয় পান।হায়দার আলি খাঁ চেয়ারে গুটিসুটি মেরে বসে আছে। পিরিচে করে চা খাচ্ছে। ঐ লোককে আমি কখনো চায়ের কাপে করে চা খেতে দেখিনি। আমি কাছে এসে হাসিমুখে বললাম, ভাই সাহেব, খবর কি?
ভদ্রলোক যে ভাবে চমকালেন তাতে মনে হল, সাত রেক্টার স্কেলের একটা ভূমিকম্প হয়ে গেছে। পিরিচের সব চা তার জামায় পড়ে গেল। আমি বললাম, করেছেন কি?
‘চা খাচ্ছি স্যার।’ ‘খুব ভাল। বেশি বেশি করে চা খান। রিসার্চ করে নতুন বের করেছে—দৈনিক যে সাত কাপ চা খায় তার হার্টারি কখনো ব্লক হয় না।’ ‘থ্যাংক য়্যু, স্যার।’
যেভাবে তিনি থ্যাংক য়্যু বললেন তাতে ধরণা হতে পারে হার্টের আর্টারি সংক্রান্ত রিসাচটা আমার করা। আমি অবসর সময়ে মেসের ঘরের দরজা বন্ধ করে রিসার্চ করেছি।‘বদরুল সাহেবকে নাকি নোটিশ দিয়ে দিয়েছেন—কথা কি সত্যি? ‘জ্বি। তিন মাসের রেন্ট বাকি। আর নানান যন্ত্রণা করে। বোডাররা নালিশ করেছে।’ ‘কি যন্ত্রাণা করেছে?’
‘রান্নার সময় বাবুর্চির পাশে বসে থাকে। ফিস্ট হয়েছে—ত্রিশ’ টাকা করে চাঁদা। একটা পয়সা দেয় নাই—ফিস্ট খেয়ে বসে আছে।’ ‘চাঁদা না দিলেও খাটাখাটনি তো করেছে। গোশত কিরে আনা, খাসির গোশত যে-কেউ কিনতে পারে না। খুবই জটিল ব্যাপার। খাসি ভেবে কিনে এনে রান্নার পর প্রকাশ পায় পাঁটা।’
হায়দার আলি খাঁ তাকাচ্ছেন। আমার কথাবাতার ধরন বুঝতে পারছেন না। কি বলবেন তাও গূছিয়ে উঠতে পারছে না। ‘ম্যানেজার সাহেব।’ ‘জ্বি স্যার।’ ‘বদরুল সাহেবকে আর কিছু বলবেন না।’ ‘তিন মাসের রেন্ট বাকি পড়ে গেছে। অন্য পাটিকে কথা দিয়ে ফেলেছি। মানুষের কথার একটা দাম আছে। ঠিক না স্যার?’
‘ঠিক তো বটেই। কথার দাম আগে যা ছিল মুদ্রাস্ফীতির কারণে সেই দাম আরো বেড়েছে। তবু একটা ব্যবস্থা করুন। এক মাসের মধ্যে সব পেমেন্ট ক্লিয়ার হয়ে যাবে।’ ‘কিভাবে হবে? শূনেছি উনি ছাঁটাই হয়ে গেছেন । অফিসের পাওনা টাকাপয়সাও দিচ্ছে না। টাকাপয়সার কি না-কি গন্ডগোল আছে।’ ‘গন্ডগোল তো থাকবেই। পৃথিবীতে বাস করবেন আর গন্ডগোলে পড়বেন না, তা তো হয় না। এই গন্ডগোল নিয়েই বাস করতে হবে। উপায় কি? মনে থাকবে তো কি বললাম?’ ‘জ্বি স্যার।’
আমি ঘরে এসে দরজা বন্ধ করে শূয়ে পড়লাম। ম্যানেজার অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে জ্বি স্যার বলেছে বলেই ঠিক ভরসা পাচ্ছি না। বিনয়ের বাড়াবাড়িটাই সন্দেহজনক। আমার নিজের ধারণা বিনয় ব্যাপারটা পৃথিবী থেকে পুরোপুরি উঠে গেলে পৃথিবীতে বাস করা সহজ হত। বিনয়ের কারণে সত্য-মিথ্যা প্রভেদ করা সমস্যা হয়। মিথ্যার সঙ্গে বিনয় মিমিয়ে দিলেই সেই মিথ্যা ধরার কারো সাধ্য থাকে না।
ঘুমের চেষ্টা করছি। ঘুম আসছে না। বেশ কয়েকদিন থেকে নিদ্রা এবং জাগরণের সাইকেলটা বদলাবার চেষ্টা করছি। রাত ঘুমের জন্যে এবং দিন জেগে থাকার জন্যে, এই নিয়ম ভাঙা দরকার। মানুষ ঘুমকে নিয়ন্ত্রণ করবে। সৃর্য নিয়ন্ত্রণ করবে না। সৃর্য হচ্ছে জ্বলন্ত অগ্নিগোলক। মানুষের মত অসাধারণ মেধার প্রাণীগোষ্ঠিকে নিয়ন্ত্রণ করার তার কোন অধিকার নেই।
টানা ঘুম দিলাম। ঘুম ভাঙল সন্ধ্যায় সন্ধ্যায়। এই সময় মেসটা ফাঁকা ফাঁকা থাকে। বেশির ভাগিই চা-নাশতা খেতে বাইরে যায়। মেসে শূধু একবেলা খাবার ব্যবস্থা, রাতে। এক কাপ চা খেতে হলেও রাস্তা পার হয়ে স্টল যেতে হবে। ইদানীং অবশ্যি নতুন, এক চাওয়ালা শ্রেণীর উদ্ভব হয়েছে। এরা বিশাল ফ্লাস্কে করে চা ফেরি করে। চায়ের দাম ফক্সড—এক টাকা কাপ। চিনি বা দুধের দাম বাড়ালে কাপের সাইজ ছোট হয় কিন্তু চায়ের দামের হের-ফের হয় না।
আমাদের এখানে যে ছেলে চা বিক্রি করে তার নাম মতি। দেখতে রাজপুত্রের মত, আসলে ভিখিরিপুত্র। বারান্দায় এসে মতিকে খুঁজলাম। মতি এখনো আসেনি, তবে অপরিচিতি এক ভদ্রলোক এসেছেন। শুকানো মুখ টুলে বসে আছেন। ভদ্রলোক অপরিচিত হলেও দেখামাত্র চিনলাম—কারণ তাঁর চশমার একটা ডাঁটা ভাঙা সুতা দিয়ে কানের সঙ্গে বাঁধা। ভদ্রলোক সন্দেহজনক দুষ্টিতে আমাকে দেখছেলন। আমি বললাম, কি ভাই, ভাল আছেন?
তিনি হকচকিয়ে গেলেন। উঠে দাঁড়ালেন। ‘বদরুল সাহেবের কাছে এসেছেন, তাই তো?’ ‘জ্বি স্যার?’ ‘টাকা ধারের জন্যে?’ ভদ্রলোক খানিকটা বিভ্রান্ত হয়ে গেছেন। চট করে কিছু বলতে পারছেন না। আবার খুব চেষ্টা করছেন কিছু বলতে।
আমি বললাম, বদরুল সাহেব আমাকে আপনার কথা বলেছেন। খুবই প্রশংসা করছিলেন। প্রি-টেস্ট পরীক্ষায় একটা এক্সটা না-কি ভুল হয়েছিল। তাড়াহুড়া করেছিলেন নিশ্চয়ই। অনেক সময় ওভার কনফিডেন্সেও সমস্যা হয়। যাই হোক, কেমন আছেন বলুন। ‘জ্বি ভাল। বদরুল কখন আসবে?’ ‘উনি আসবেন কোথেকে?’ ‘এখানে থাকেন না?’ ‘আগে থাকতেন। মেসে অনেক বাকি পড়ে গেছে। চারদিকে ধার-দেনাঅ পালিয়ে গেছেন।’ ‘নিচের ম্যানেজার সাহেব আমাকে বললেন, মেসেই থাকে।’
‘ম্যানেজার তাই বলেছেন? সে রকমই বলার কথা। সেও জানে না। জানলে জিনিসপত্র ক্রোক করে রেখে দিত। চুপি চুপি পালিয়েছে। শুধু আমি জানি। আপনাকে বললাম, কারণ আপনি তার ক্লোজ ফ্রেন্ড। ছাত্র জীবনের বন্দু। অংকে সব সময় হাই মার্ক পেয়েছেন।’ ‘বদরুল থাকে কোথায়?’
‘সেটাও বলা নিষেধ। যাই হোক, আপনাকে বলছি। দয়া করে খবরটা গোপন রাখবেন। উনি টেকনাফের দিকে চলে গেছেন।’ ‘কোন দিকে গেছে বললেন?’ ‘টেকনাফের দিকে । চিটাগাং হিল ট্রেক্ট।তাঁর দুর সম্পর্কের এক মামা আছেন, বন বিভাগে চাকরি করেন, তাঁর কাছে গেছেন। কিছু মনে করবেন না, আপনার নামটা যেন কি?’ খোঁজে আসাও অর্থহীন। চলে যান।’ ‘চলে যাব?’ ‘আপনাকে এক কাপ চা খাওয়াতে পারি, শুধু চা খাবেন?’
আবদুল রশীদ হ্যাঁ-না কিছুই বলল না। মুখ দেখে যাচ্ছে সে পুরোপুরি আশাহত। আমি ভদ্রলোককে চা খাওয়াতে নিয়ে গেলাম। চা খাওয়ালাম, সিঙ্গাড়া খাওয়ালাম। এইখানেই শেষ করলাম না, রাস্তার পাশে ঘড়ি সারাইয়ের দোকানে নিয়ে গিয়ে চশমার ডাঁট লাগিয়ে দিলাম। আমার সর্বমোট ১৩ টাকা খরচ হল।ভদ্রলোক বললেন, ভাই সাহেব, আপনাকে একটা কথা বলি যদি কিছু মনে না করেন। আপন ভেবে বলছি।
‘বলুন, কিছু মনে করব না।’ ‘কথাটা বলতে খু্বই লজ্জা পাচ্ছি। আপনি অতি মহৎপ্রাণ এক ব্যক্তি। আপনাকে বিব্রত করতেও লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে…’ ‘মাথা কাটা যাওয়ার কিছু নেই, আপনি বলুন।’ ‘দারুণ এক সংকটে পড়েছি ভাই সাহেব। আত্মহত্যা ছাড়া এখন আর পথ দেখছি না।’ ‘ছেলে অসুস্থ। টাকার অভাবে চিকিৎসা হচ্ছে না?’
‘ধরেছেন ঠিকই। তবে ছেলে না, মেয়ে। কনিষ্ঠা কন্যা। সকাল থেকে হাঁপনির মত হচ্ছে। ডাক্তার ইনজেকশন, সেই সঙ্গে কি ট্যাবলেট যেন দিয়েছে। আমি আমার স্ত্রীকে বললাম, চিকিৎসা করার টাকা কোথায়? তুমি বরং গলা টিপে মেরে ফেল।’ ‘উনি গলা টিপে মারতে রাজি হচ্ছেন না।
আবদুর রশীদ আমার এই কথায় অস্বস্তিতে পড়ে গেল। আমি বললাম, এইসব কঠিন কাজ স্ত্রীকে দিয়ে হবে না। এইসব হল পুরুষের কাজ। গলা টেপে মারতে হলে আপনাকেই মারতে হবে।‘ভাই সাহেব, ঠাট্টা করছেন?’ ‘না, ঠাট্টা করছি না। মৃত্যু কোন ঠাট্টা-তামাশার বিষয় না। আমি আপনাকে একশ’ টাকা দেব।’ ‘দিবেন? সত্যি দিবেন?’
‘অবশ্যই দেব।স্কুল-জীবনে আপনি অংকে খুব ভাল ছিলনে, তাই না? কেমন ভাল ছিলেন প্রমাণ দিন দেখি। সহজ একটা অংক জিজ্ঞেস করব। কারেক্ট উত্তর দেবেন—একশ’ টাকা নিয়ে চলে যাবেন।’ আবদুর রশীদ ক্ষীণ স্বরে বলল, কি অংক? ‘একটা বাড়িতে চারটা হারিকেন জ্বলছিল। গভীর রাতে কথা নেই বার্তা নেই শুরু হল ঝড়। একটা হারিকেন নিভে গেল। এখন আপনি বলুন ঐ বাড়িতে হারিকেন এখন কয়টা?’
‘তিনটা!’ আমি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললাম, হয়নি। একটা হারিকেন নিভে গেছে ঠিকই। হারিকেনের সংখ্যা তো কমেনি। হারিকেন চারটাই আছে। আপনি তো ভাই অংক শিখতে পারেননি। টাকাটা দিতে পারলাম না। কিছু মনে করবেন না।
আবদুর রশীদ দাঁড়িয়ে আছে—আমি হাঁটা ধরেছি। মেসে ফিরে যাব। সারাদিন কিছু না খাওয়াতে খিদেয় নাড়িভুড়ি পাক দিচ্ছে। মেসে রান্না হয়েছে কি-না খোঁজ নিতে হবে। মেসের ভাত সকাল সকাল নেমে যায়। ভাত নেমে গেলে একটা ডিম ভেজে দিতে বলব। আগুন-গরম ভাত ডিমভাজা দিয়ে খেতে অতি উপাদেয়। তবে খেতে হয় চুলা থেকে ভাত নামার সঙ্গে সঙ্গে, দেরি করা যায় না।
ঘর থেকে বেরুবার জন্যে রাত বারোটা খুব ভাল সময়। জিরো-আওয়ার। কাউন্ট আপ শুরু হয় জিরো-আওয়ার থেকে—0,1,2,3,…ঠিক রাত বারোটায় কি বার হবে? শনিবার নয়, রবিবারও নয়। জিরো আওয়ারে বার থেমে থাকে।দরজা তালাবন্ধ করে বেরুচ্ছি, দেখি বদরুল সাহেব। কলঘর থেকে হাত-মুখ ধুয়ে ফিরছেন। মুখ ভেজা, কাঁধে গামছা। রাত বারোটায় আমার মন-টন খুব ভাল থাকে। কাজেই আমি উল্লাসের সঙ্গেই বললাম,কি খবর বদরুল সাহেব।
তিনি লজ্জিত ভঙ্গিতে হাসলেন।‘কোথায় ছিলেন আজ সারাদিন?’ তিনি আবারো হাসলেন। আমি বললাম, গিয়েছিলেন নামি ইয়াকুব আলির কাছে? ‘জ্বি।’ ‘দেখা হয়নি?’ ‘দেখা হয়েছে। অতিরিক্ত ব্যস্ত।’ ‘কথা হয়নি?’ ‘হয়েছে। চাকরির ব্যাপারটা বললাম।’ ‘আগেও তো বলেছিলেন। আবার কেন?’ ‘ভুলে গিয়েছে। নানান কাজকর্ম নিয়ে থাকে তো। আজকে তার আবার একটা দুঘর্টনা ঘটল। তার মনটা ছিল খারাপ।’ ‘কি দুঘর্টনা?’
‘একুশ লাখ টাকা দিয়ে নতুন গাড়ি কিনেছে। সেই গাড়ির হেডলাইট ভেঙ্গে ফেলেছে। কেয়ারলেস ড্রাইভার। ঐ নিয়ে নানান হৈ-চৈ, ধমকাধমকি চলছে, তার মধ্যে আমি গিয়ে পড়লাম।’ ‘আপনি ধমক খেয়েছেন?’
‘জ্বি-না, আমি ধমক খাব কেন? আমার ছেলেবেলার বন্ধু। ভেরি ক্লোজ ফ্রেন্ড। গাড়ির হেডলাইট ভাঙার কারণে ইয়াকুবের মন খারাপ দেখে আমারো মন খারাপ হল।এর মধ্যে চাকরির কথাটা তুলে ভুল করেছি।’ ‘ইয়াকুব সাহেব রেগে গেছেন?’
‘তা ঠিক না। বলল বায়োডাটা তার সেক্রেটারির কাছে দিয়ে যেতে। দু’টা পাসপোর্ট সাইজের ছবিসহ বায়োডার্টা, সে দেখবে।’
Read more
