“তা পারে।”
“ধরুন, কোনাে বাইরের লােক রাজবাড়ির এই এলাকায় এলে আনার চোখে পড়তেও পারে।”
“কী জানি।” “ধরুন, সন্ধ্যার পর কোনাে মেয়ে–”
“জয়াবেটির কথা বলছেন কি? সে মাঝেমাঝে এদিকে ঘুরতে আসে দেখেছি।”
“জয়াকে আবছা আঁধারে চিনতে পারেন নিশ্চয়?” “পারি। কিন্তু এসব কথা জিজ্ঞেস করছেন কেন কর্নেলসাব ?”
“প্রায় দুসপ্তাহ আগে এক সন্ধ্যাবেলায় কোনাে মেয়েনা, জয়া নয়-বাইরের একটি মেয়ে এই বাগান আর জঙ্গলের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল। তাকে—”। | মাধবজি চমকে উঠে তাকালেন। “আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করবে না কৃপা করে। আমি কিছু জানি না।”
“আমি শুধু জানতে চাই, মেয়েটি একা ছিল, না তার সঙ্গে কেউ ছিল ?
“কর্নেলসাব, আপনি নিশ্চয় পুলিশ অফিসার!’ আমাকে মাফ করবেন। বিশবছর রাজবাড়ির নিমক খাচ্ছি। আমাকে আর কিছু জিজ্ঞেস করবেন না।”
“মাধবজি আমি পুলিশের অফিসার নই। আমি রাজবাড়ির হিতৈষী।” “তাহলে আর কোনাে কথা নয়। কথা তুললেই বিপদ।”
“আপনি শুধু বলুন ৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় এই এলাকায় কোনাে বাইরের মেয়েকে দেখেছিলেন কি না?” কর্নেল চাপা স্বরে ফের বললেন, “আপনার কথার ওপর একজনের বাঁচা-মরা নির্ভর করছে।”
কর্নেল সমগ্র ২য় খণ্ড এর অংশ-১৬
“সে কী!” অবাক হয়ে উঠে দাঁড়ালেন মাধবজি। “কৃপা করে বুঝিয়ে সুন।”
“পরে বলব। আমার প্রশ্নের জবাব দিন আগে।”
মাধবজি এদিক-ওদিক তাকিয়ে চাপা স্বরে বলল, “ওই পূর্বের ফটক দিয়ে বড়কুমারসাবের সঙ্গে একটা অচেনা মেয়েকে ঢুকতে দেখেছিলাম। তখনও শিনের আলাে সামানা মতাে ছিল। দুজনকে আউট-হাউসের টিলায় না গিয়ে দক্ষিণের জঙ্গল বরাবর আসতে দেখে অবাক হয়েছিলাম। তারপর আর তাদের দেখতে পেলাম না। খুব খারাপ লাগল, বড়কুমারসাব শেষে এমন লম্পট হয়ে গেছে দেখে খুব দুঃখ হচ্ছিল।”
“আপনি ঠিক দেখেছিলেন বড় কুমারসাবকে?” “হ্যা। পরনে প্যান্টশার্ট ছিল। বড় কুমারসাব প্যান্টশার্ট পরে। ভেটো মারসাব ধুতিপাঞ্জাবি পরে।”
“তারপর?” “হুজুর, আমি সামান্য মানুষ। আর কিছু জিজ্ঞেস করবেন না।”
কর্নেল পা বাড়িয়ে কয়েক-পা এগিয়ে দ্রুত ঘুরে বললেন, “মেয়েটির লাশ আপনি দেখতে পেয়ে বিপ্রদাসকে খবর দিয়েছিলেন ?”
মানে ঢিল ছােড়া। নিছক একটা সম্ভাবনার যুক্তিতে। কিন্তু ঢিলটি লক্ষ্যভেদ করল। মাধবজির মুখ সাদা হয়ে গেল। ঠোট ফাক করে রইলেন।
কর্নেল সমগ্র ২য় খণ্ড এর অংশ-১৬
“আপনারা দুজনে লাশটাকে হরটিলার মন্দিরে বেদির তলায় লুকিয়ে রেখেছিলেন।”
মাধবজির ঠোট কাপছিল। অতিকষ্টে বললেন, ‘বিপ্রদাসজি বলেছেন তাহলে?”
কর্নেল একটু হাসলেন শুধু। | মাধবজি এগিয়ে এলেন কাছে। শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে বললেন, “বড়কুমারসাব একাজ করবেন ভাবতে পারিনি, হুজুর কর্নেলসাব! ওকে কিছুক্ষণ পরে দৌড়ে চলে যেতে দেখে সন্দেহ হয়েছিল। তাই মেয়েটিকে খুঁজতে গিয়েছিলুম। গিয়ে দেখি পড়ে আছে ঠাণ্ডা হিম হয়ে। ওঃ ! সে এক সাংঘাতিক ঘটনা।” । কর্নেল হনহন করে ঠাকুরদালানের সামনে দিয়ে চলতে থাকলেন। মাধবজি খড়িতে আঁকা মূর্তির মতাে দাঁড়িয়ে রইলেন।
কর্নেল গৌরীটিলার পাথরের ধাপ বেয়ে উঠতে শুরু করলেন।
দক্ষিণ-পশ্চিমকোণের এই টিলার মাথায় মন্দিরটা সামান্য বড় শিবমন্দিরটার চেয়ে। ভেতরে পাথরের ছােট গৌরীমূর্তি। সেখানে দাঁড়িয়ে বাইনােকুলারে মাজবাড়ি দেখতে থাকলেন কর্নেল। | জয় ব্যালকনিতে বসে কিছু খাচ্ছে। সারারাত সত্যিই কি সে হরটিলায় শাহারা দিচ্ছিল ? মাধবজি তাকেই সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় রমলার সঙ্গে দেখেছেন। পরে তাকে পালিয়ে যেতেও দেখেছেন, মেয়েটির লাশও আবিষ্কার করেছেন। | তাহলে বলতে হয়, জয় বড় দক্ষ চতুর অভিনেতা। কিন্তু কেন সে রমলাকে খুন করবে—যদি রমলা হয় তার প্রেমিকা ?
বাইনােকুলারে রাজবাড়ির নিচের তলাও পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলেন কর্নেল। নিচের তলার বারান্দায় রঙ্গিয়া হেঁটে যাচ্ছে। নিজেদের ঘরে গিয়ে সে ঢুকল। দোতলার বারান্দায় জয়া দাঁড়িয়ে আছে। লেন্স আডজাস্ট করলে বিজয়ের ঘরের দরজার পর্দা ভেসে উঠল চোখে। মনে হল বিজয় তার ঘরে আছে।
কর্নেল সমগ্র ২য় খণ্ড এর অংশ-১৬
হা। বুদ্ধরাম বেরিয়ে এল তার ঘর থেকে। নিশ্চয় এবার ভাগলপুর যাচ্ছে সে। তারদিকে লক্ষ্য রাখলেন কর্নেল। একটু পরে তাকে পাের্টিকোর তলা থেকে বেরিয়ে প্রধান ফটকের দিকে যেতে দেখা গেল। তারপর সে রাস্তা ধরে হনহন করে চলতে থাকল বাজারের দিকে।
কর্নেল বাইনােকুলারে উত্তর-পূর্বকোণে আউট-হাউস বা চিড়িয়াখানার টিলাটি দেখতে থাকলেন। হঠাৎ আউট-হাউসের শেষ জানালাটায় একটা মুখ দেখা গেল। তারপর নানকু যেন মাটি খুঁড়ে গজাল এবং জানালাটার কাছে গেল। কথা বলছে দুজনে। ভেতরকার লােকটা | কনে গৌরীটিলা থেকে নেমে বাগান ও ঝােপঝাড়ের ভেতর দিয়ে চলতে থাকলেন আউট-হাউসের টিলার দিকে। মাধবজি তখন ঠাকুরদালানে পুজোয় বসেছেন। ঘণ্টার শব্দ শােনা যাচ্ছিল।….
বামুন গেছে যমের বাড়ি’ নানকুর যেন জন্তুদের ইন্দ্রিয়। চিড়িয়াখানার তারের বেড়ার কাছে পৌছে কর্নেল দেখলেন, সে গিনিপিগের খাঁচায় ঘাস ঠেলে দিচ্ছে–পিঠ এদিকে বন্ধ গেটের সামনে কর্নেল দাঁড়ালে সে ঘুরল এবং সেলাম করে উঠে দাঁড়াল। বলল, “আসুন স্যার।”
লােহার মজবুত গরাদ দেওয়া গেট খুলে দিল সে। কর্নেল সােজা আউট হাউসের বারান্দায় গিয়ে উঠলেন। পেছনে নানকু জিজ্ঞাসার সুরে “স্যার” বলল। ডাইনে প্রথম ঘরটা খােলা এবং ভেতরে চিতাবাঘের খাঁচা রয়েছে। বাদিকের ঘরের দরজা বন্ধ ভেতর থেকে। সামনে করিডােরের পর দেয়াল। কর্নেল বাঁদিকের দরজায় নক করে কোনাে সাড়া পেলেন না। নানকু’অবাক হয়ে নিচের খােলা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। একবার বলল, “বড়কুমারসাব তাে রাজবাড়িতে আছেন স্যার।” কিন্তু কর্নেল তাকে গ্রাহ্য করলেন না।
কর্নেল সমগ্র ২য় খণ্ড এর অংশ-১৬
তারপর পেছনদিকে দরজা খােলার চাপা শব্দ হতেই করিডর দিয়ে এগিয়ে দেখেন বাঁদিকে একটা বারান্দা রয়েছে এবং সেই বারান্দা থেকে একটা লােক সবে নেমে যাচ্ছে। বারান্দার নিচেই বড়বড় পাথর এবং খানিকটা দূরে গঙ্গা। কর্নেল ছুটে গিয়ে ডাকলেন, “পরিতােষবাবু! পরিতােষবাবু!”।
সে পাথরের স্তুপের আড়ালে লুকিয়ে গেল। তখন কর্নেল রিভলবার বের করে বারান্দা থেকে একলাফে একটা পাথরে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর বললেন, “পালানাের চেষ্টা করলে গুলি ছুঁড়তে বাধ্য হব পরিতােষবাবু!”
Read More