চলন্তিকা ডিকশনারিতে আড্ডার অর্থ দেয়া হয়েছে—কুলোকের মিলনস্থান। আমার ‘দখিন হাওয়া’র বাসায় প্রায়ই আড্ডা বসে। অর্থাৎ কিছু কুলোক একত্রিত হন। আড্ডার প্রধান ব্যক্তিকে বলে আড্ডাধারী। আমি সেই জন। বাকিদের পরিচয় দিচ্ছি।শাওন। (তার বাড়িতেই আড্ডা বসছে, সে যাবে কোথায়?)
আলমগীর রহমান। (অবসর এবং প্রতীক প্রকাশনীর মালিক। আমার নিচতলায় থাকেন।) আর্কিটেক্ট করিম। (তিনি আপে দখিন হাওয়াতেই থাকতেন, এখন বিতাড়িত।) মাজহারুল ইসলাম। (অন্যদিন পত্রিকার সম্পাদক-প্রকাশক, অন্যপ্রকাশ এবং অন্যমেলার স্বত্বাধিকারী। আমার পাশের ফ্ল্যাটেই থাকেন।)
কমল বাবু। (নাম কমল বাবু হলেও ইনি মুসলমান। মাজহারুল ইসলামের পার্টনার। শখের অভিনেতা। যে কটি নাটকে উপস্থিত তার প্রতিটি ডায়লগ মুখস্থ। কবিতা আবৃতির মতো তিনি ডায়লগ বলে আনন্দ পান।)
এঁরা আড্ডার স্থায়ী পাখি। সবসময় থাকেন। বেশ কিছু অতিথি পাখিও আছেন। এঁরা হঠাৎ হঠাৎ আসেন। যেমন চ্যালেঞ্জার, মাসুদ আখন্দ।কিছু আছেন নিমন্ত্রিত পাখি। নিমন্ত্রণ করলে এরা আসেন। অনিমন্ত্রিতভাবে কখনোই উপস্থিত হন না। যেমন, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, শফি আহমেদ, আর্কিটের রবিউল হুসাইন… প্রয়োজনের পাখিও আছে। তাঁদের উপস্থিত দেখলেই বুঝা যায় কোনোকিছুর প্রয়োজন হয়েছে। যেমন, অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূর।
আমাদের এই আড্ডার একটি নামও আছে। Old Fools’ Club, বৃদ্ধ বোকা সংঘ। ঔপন্যাসিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের আড্ডার নাম বুধসন্ধ্যা। তাঁরা প্রতি বুধবার বসেন। প্রধানত সাহিত্য নিয়ে কথাবার্তা হয়। রচনা পাঠ করা হয়।আমাদের এখানেও রচনা পাঠ করা হয়। আমার একার রচনা। বৃদ্ধ বোকা সংঘে আমি ছাড়া লেখক কেউ নেই। তবে অত্যন্ত সুখের বিষয়, সাহিত্য নিয়ে কোনো আলোচনা হয় না। পরাবাস্তবতা, জাদুবাস্তুবতা, কিংবা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমগ্র রচনায় কোনো কৃষক চরিত্র নেই কেন–এ নিয়ে কোনো আলোচনায় কেউ যায় না। তাহলে আমরা কী করি?
শুরুর কিছুক্ষণ আমরা ঝিম ধরে থাকি। যাদের মোবাইল আছে, তারা মোবাইল টিপাটিপি করে। আলমগীর রহমান ঘনঘন হাই তোলেন এবং বলেন, শরীর ভালো লাগছে না। আজ যাই। মুখে বলে, কিন্তু উঠেন না। কেউ তাকে থাকার জন্যে সাধাসাধিও করে না।
বাকি সদস্যরাও আলোচনা শুরুর বিষয় পান না। তারাও উসখুস করেন। তখন আড্ডাধারী হিসেবে আমার দায়িত্ব পড়ে আসর জমানোর। আমি নৌকার পাল তুলে দেই। জানি পাল তুললেই নৌকা চলা শুরু করবে। রাজনীতির কোনো প্রসঙ্গ তুলি। সবাই লুফে দেয়। তুমুল আলোচনা শুরু হয়ে যায়। বাঙালিরা হলো নাচুনি বুড়ি। আর রাজনীতি ঢোলের বাদ্য।
উদাহরণ দেই। আমি বললাম, আওয়ামী লীগের ডিজিটাল মন্ত্রীসভায় কিছু মন্ত্রী থাকা উচিত, যাদের কোনো দপ্তর থাকবে না। তাদের একটাই কাজ। তারা বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে শুধু টকশো করবেন।করিম বলল, তাদের গাড়িতে কি ফ্ল্যাগ থাকবে?
আলমগীর বলল, অবশ্যই থাকবে। ডাবল ফ্ল্যাগ থাকবে। একটা আমাদের জাতীয় পতাকা, আরেকটা যে টিভি স্টেশনে টকশোতে অংশ নিতে যাচ্ছেন তাদের মনোগ্রামখচিত পতাকা।কমল বলল, আর কিছু মন্ত্রী থাকবেন যারা শুধু সংবাদ সম্মেলন করবেন। আর কিছু না। তাদের টাইটেল, চিৎকারক মন্ত্রী।আলোচনা জমে ওঠে। একটা পর্যায়ে শাওন হতাশ এবং দুঃখিত গলায় বলে, তোমাদের এই রাজনৈতিক আলাপটা কি বন্ধ করবে? এই আলোচনার কোনো ফলাফল কি আছে?
সমস্যা হচ্ছে আড্ডার কোনো আলোচনারই কোনো ফলাফল নেই। শুধু আড্ডা কেন, গোটা বাংলাদেশেরই আলোচনা, গোলটেবিল বৈঠক, চারকোনা টেবিল বৈঠক, চলমান গাড়ি বৈঠক সবই ফলাফল শূন্য। আনক্সা সবাই শূন্য আমাদের এই শূন্য রাজত্বে।
আড্ডায় মাঝে মাঝে গানের আসর বসে। শাওনের মুড ভালো থাকলে একের পর এক গান করতে থাকে। আবার অতিথি পাখি সাব-ইন্সপেক্টর টুটুল (এস আই টুটুল) যখন আসে তখনো গান হয়। তবে সে এই আড্ডায় কখনো হুমায়ুন আহমেদের লেখা গান ছাড়া অন্য কোনো গান করে না। আবার শুনেছি যখন সে অন্য কোনো আড্ডায় যায়, তখন হুমায়ুন আহমেদকে ভাসুরের মতো দেখে। তার গান দূরে থাকুক, নামও উচ্চারণ করে না। হুমায়ূন আহমেদ বিষয়ক পরচর্চায়ও না-কি অনিচ্ছায় অংশগ্রহণ করে।
টুটুল শুধু যে গান চমৎকার করে তা-না। আড্ডাবাজ হিসেবেও সে অসাধারণ। তার মতো সুন্দর করে গল্প আর একজনই শুধু করতে পারে, তার নাম জাহিদ হাসান। আমাদের আড্ডায় সে অতিথি পাখি ক্যাটাগরিতে পড়ে। আরেকজন অতিথি পাখির নাম জুয়েল আইচ। আগে যখন ধানমণ্ডিতে থাকতেন, তখন প্রায়ই আসতেন। এখন প্রায় ভিসা নেবার দূরত্বে চলে গেছেন বলে তার ক্যাটাগরি অতিথি পাখি থেকে বদলে হয়েছে নাই পাখি। তিনিও সুন্দর কথা বলেন এবং কথা বলতে পছন্দ করেন। তবে ইদানীং কথা বলায় তাঁর কিছু সমস্যা যাচ্ছে বলে আড্ডায় ঠিকমত অংশ নিতে পারছেন না।
জুয়েল আইচ আড্ডায় উপস্থিত হওয়া মানেই ম্যাজিক এই কথা আমাদের Old Fools ক্লাবের জন্যে সত্যি না। আমাদের কয়েকটি নিয়ম আছে–আড্ডায় কোনো ম্যাজিশিয়ান এলে তাকে ম্যাজিক দেখাতে বলা যাবে না, কোনো ডাক্তার এলে রোগের বর্ণনা নিয়ে তার কাছে যাওয়া যাবে না, কোনো গায়ক এলেই বলা যাবে না, ভাই শুরু করুন তো। কেউ নিজ থেকে কিছু করতে চাইলে কোনো বাধা নেই।
জুয়েল আইচ আমাদের আড্ডায় নিজ থেকে কিছু অসাধারণ ম্যাজিক দেখিয়েছেন। তাসের একটা Closetup মাজিক মানুষকে কিছুক্ষণের জন্যে হলেও প্রতিবন্ধী অবস্থায় নিয়ে যায়।আমাদের আড্ডার আরেকটি ক্যাটাগরি হচ্ছে Foreign পাখি। যেমন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার বা আগরতলার কবি রাতুল দেব বর্মন। তখন তাঁদের সম্মানে ঢাকা ক্লাব থেকে তরল খাবার আসে। বিদেশী পাখিরা তাঁদের কোমল শারীরবৃত্তীয় কারণে কঠিন খাবার সহ্য করতে পারেন না।
আমরা তখন মোটামুটি সচেতন আলোচনা করি। বেশির ভাগ সাহিত্য বিষয়ক। যেমন নি কেন শব্দের সঙ্গে ব্যবহার না করে আলাদা ব্যবহার করা হচ্ছে। নি তো নার মতো আলাদা শব্দ না।একজন বলেন, নি এসেছে নাই থেকে, খাই নাই থেকে খাই নি। কাজেই আলাদা হবে।আরেকজন বলেন, যেহেতু উচ্চারণ একসঙ্গে করা হয় কাজেই একসঙ্গেই হবে। আলাদা কখনোই হবে না।কি এবং কী নিয়ে কথা ওঠে। দীর্ঘ ঈ-কার যখন আমরা উঠিয়েই দিচ্ছি তখন শুধু ক বেচারার ওপর কেন এই হামলা?
আলোচনা কঠিন থেকে আরো কঠিনে চলে যায়। সৌন্দর্যের ব্যাখ্যা কী জাতীয় জটিলতা নিয়ে দার্শনিক কথাবার্তা। একসময় নৌকার হাল ফেরাবার জন্যে আমি বেমাক্কা কিছু কথা বলি। যেমন, আচ্ছা সুনীলদা, চর্যাপদে মৌরলা মাছের উল্লেখ আছে, কিন্তু ইলিশ মাছের উল্লেখ নেই, কেন বলুন তো?
বিদেশী পাখিদের উপস্থিতিতে আড্ডা শেষ হয় গানে। এই উপলক্ষে হায়ার করে অর্থাৎ পেটেভাতে কিছু গায়ক আনা হয়। যেমন, সেলিম চৌধুরী।বিদেশী পাখিদের আড্ডায় আনার সবচয়ে বড় সমস্যা, তাদের সঙ্গে থাকে ফেউ পাখি। আরো খারাপভাবে বললে সাহিত্যের মাছি। এইসব মাছির কাছে পশ্চিমবঙ্গের লেখক মানেই পাকা কাঁঠাল। তারা কাঁঠাল ঘিরে ভনভন করে উড়বেই।
সবচেয়ে মুশকিল হয়, যখন পশ্চিমা দেশের সাহেবরা এসে উপস্থিত হন। একজনের গল্প বলি। তিনি এসেছেন রাশিয়া থেকে। বাংলাদেশের রাশিয়ান অ্যাম্বাসিতে কাজ করেন। তিনি এসেছেন সাহিত্য নিয়ে আলাপ করতে। আমি হতাশ হয়ে আড্ডার বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বললাম, মহাযন্ত্রণায় পড়লাম। এই রাশিয়াভসকির সঙ্গে সাহিত্য নিয়ে কী ঘটর ঘটর করব?
রাশিয়ান হাসিমুখে পরিষ্কার এবং শুদ্ধ বাংলায় বলল, আমি বাংলা ভাষা ও সাহিত্য ভালোমতো অধ্যয়ন করেছি, আপনি ইচ্ছা করলে আমার সঙ্গে সাহিত্য নিয়ে ঘটর ঘটর করতে পারেন। এই রাশিয়ান (পাভেল) আমার একটি উপন্যাস সবাই গেছে বনের রুশ ভাষায় অনুবাদ করেছেন।
আড্ডাতে আরেক ধরনের উপস্থিতির কথা তুলতে ভুলে গেছি। এঁরা আসেন তাদের বানানো ছবি বা টেলিফিল্ম দেখাতে কিংবা ছবির জন্যে গান রেকর্ড করেছেন তা শোনাতে। এদের উপস্থিতিতে নিয়মিত আড্ডা বাতিল হয়ে যায়। আড্ডাবাজরা জ্ঞানীর মতো মুখ করে ছবি দেখেন, টেলিফিল্ম দেখেন। ছবির গান শোনেন এবং গোপন দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।
প্রয়াত লেখক প্রণব ভট্ট আড্ডায় যোগ দেখার আগে সবসময় খোঁজ নিতেন খাসির মাংসের কোনো ব্যবস্থা আছে কি-না। ব্যবস্থা থাকলে তিনি অবশ্যই আসবেন। দুর্ভাগ্য এই খাসির হাতেই তাঁর মৃত্যু হলো। আর্টারীতে চর্বি জমে হার্ট অ্যাটাক।এদেশের লেখকলের মধ্যে ইমদাদুল হক মিলন প্রায়ই আসতেন। এখন টকশোতে অতি ব্যস্ত বলে আসতে পারেন না। আড্ডায় তাঁকে সবাই অত্যন্ত পছন্দ করে, কারণ তিনি সবার সঙ্গে সব বিষয়ে একমত হন।
আড্ডায় কেউ যদি বলে–রবীন্দ্রনাথ কোনো লেখকই না। ইমদাদুল হক মিলন বলবেন, একটা খাঁটি কথা সাহস করে বলেছেন। ধন্যবাদ। (মিলন এই লেখা পড়লে রাগ করবে। আরে বাবা, ঠাট্টা করলাম। তবে আনন্দের কথা মিলন এই লেখা পড়বে না। সে সেলিব্রেটি টকশো নিয়ে ব্যস্ত। কাঠপেন্সিল পড়ার তার সময় কোথায়? কাঠপেন্সিল সেলিব্রিটি না, পার্কার ফাউনটেন পেন হলেও কথা ছিল। হা হা হা।) এখন আমাদের আড্ডার কিছু নিয়মকানুন বলি। সবই অলিখিত নিয়ম, তবে কঠিনভাবে মান্য করা হয়–
ক) কোনো খারাপ শব্দ ব্যবহার করা যাবে না। উপস্থিত মহিলারা যেন কোনো অবস্থাতেই আহত না হন।
খ) পরচর্চা করা যাবে, তবে শুধুই শুধু মজা করার জন্যেই এবং যার পরচর্চা করা হবে তাকে আড্ডায় উপস্থিত থাকতে হবে। তার অনুপস্থিতিতে না।
গ) আড্ডায় মনোমালিন্য কথা কাটাকাটি হতেই পারে। আড্ডা শেষ হওয়া মাত্র সব ভুলে যেতে হবে। আড্ডার ডেডবডি কেউ কাঁধে করে বাড়িতে নিয়ে যাবে না।
‘দখিন হাওয়া’র এই আড্ডার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো, আড্ডায় যাদের উপস্থিতির কথা বলা হয়েছে তারা কখনো কোনোদিনও তাদের স্ত্রীদের নিয়ে আসেন না। মাজহার যেহেতু পাশের বাসায় থাকে, তার স্ত্রী স্বর্ণা এসে মাঝে মধ্যে উঁকি দিয়ে স্বামীকে দেখে যায় এবং চোখের ইশারায় স্বামীকে উঠে যেতে বলে। মাজহার ভান করে সে চোখের ইশারা দেখে নি।একমাত্র ব্যতিক্রম ঔপন্যাসিক মইনুল আহসান সাবের। তিনি আমাদের আড্ডায় কম আসেন, তবে বেশির ভাগ সময় তার স্ত্রীকে নিয়ে আসেন।
মহিলারা কেন Old Fools’ Club এড়িয়ে চলেন তা এখনো জানি না। মিসির আলি সাহেবকে কারণটা বের করতে বলেছি। তিনি চিন্তাভাবনা করছেন। সিদ্ধান্তে পৌঁছালেই আমি জানব।কিছুদিন আগে আমাদের আড্ডা সম্পর্কে আমি একটি ভয়ঙ্কর তথ্য আবিষ্কার করেছি। বন্ধুদের বলেছি। সবাই একমত হয়েছেন। তথ্যটা আপনাদের জানাই।
তেমন ঘনিষ্ঠতা নেই এমন কেউ যদি হঠাৎ এসে এই আড্ডায় আসক্ত হন, তাহলে বুঝা যাবে তার দিন শেষ হয়েছে। ডাক এসেছে, তাকে চলে যেতে হলে। চারজনের উদাহরণ আমাদের কাছে আছে। তাদের নাম বলতে মন সায় দিচ্ছে না। সর্বশেষ নামটা শুধু বলি। কেমিস্ট্রির দেলোয়ার ভাই। তিনি যাবেন ইউরোপ। রাত একটায় ফ্লাইট। তারপরেও কিছুক্ষণ আড্ডায় থাকার জন্যে তিনি টেলিফোন করেছিলেন। টেলিফোনে এটাই তাঁর সঙ্গে আমার শেষ যোগাযোগ। ইউরোপ থেকে ফিরেই তিনি মারা গেছেন।
এখন হঠাৎ আড্ডায় যোগ দিয়েছেন নতুন একজন। আমার শৈশববন্ধু কঠিন মাওলানা সেহেরি। সন্ধ্যা মিলানোর পর তিনি ঘরে থাকতে পারেন না। যদি কোনো একদিন না আসেন আমি ভয়ে ভয়ে তাঁর বাসায় টেলিফোন করি। ভাবি টেলিফোন ধরেন। আমি বলি, ভাবি, সেহেরি কেমন আছে? তার কোনো সমস্যা নাই তো? শরীর ঠিক আছে?
ভাবি বলেন, বুড়া ভালো আছে। খাটে বসে বকরবকর করছে।আমি বলি, শুনে শান্তি পেলাম ভাবি। পৃথিবীতে বকরবকর অবিনশ্বর। আর সবই নশ্বর। Silence is golden কথাটা মিথ্যা। Silence কখনোই Golden না।কাউকে মুখের ওপর না বলা আমার স্বভাবে নেই। না বলতে না-পারার অক্ষমতার খেসারত আমাকে নানানভাবে দিতে হয়। যেমন—
ক) চিনি না জানি না তরুণীর বিয়েতে উকিল বাবা।
খ) অপরিচিত্র শিশুর খৎনা অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি।
গ) নতুন লেখকের অখাদ্য উপন্যাসের ভূমিকায় লেখা– তরুণ ঔপন্যাসিকের গল্প বলার মুন্সিআনায় আমি বিস্মিত।
না বলতে না-পারার জটিল ব্যাধিতে যিনি আক্রান্ত তাকে দিয়ে ঢেঁকি বা রাইসমিল গেলানো তেমন কঠিন কর্ম না। কাজেই এক দুপুরে আমি দেখলাম যে নুহাশ পল্লীর হিমু উৎসব নামক রাইসমিল আমি গিলে বসে আছি।কুড়িজন হিমু (এদের মধ্যে চারজন তরুণী হিমু) যাবে নুহাশ পল্লীতে। তারা সারাদিন সেখানে ঘুরবে। আমাকে হ্যামিলনের বংশীবাদকের মতো তাদের সঙ্গে সঙ্গে থাকতে হবে। উদ্যোক্তা বাংলালিংক নামক টেলিফোন কোম্পানি।
হিমুদের নিয়ে তারা একটি sms কনটেস্ট করেছে। পঞ্চাশ হাজারের মতো হিমু সেই কনটেস্টে অংশগ্রহণ করেছে। এদের মধ্যে সেরা বিশজন যাবে নুহাশ পল্লীতে।প্রতিটি দুষ্ট বুদ্ধির পেছনে একজন দুষ্টমান থাকেন। (বুদ্ধিমানের মতোই দুষ্টমান।) পুরো পরিকল্পনার দুষ্টমানের নাম ইবনে ওয়াহিল বাপ্পি। সে একসঙ্গে অনেক কিছু করে—
কবিতা লেখে।
নাটক লেখে।
অভিনয় করে।
বই ছাপায়।
অ্যাড বানায়।
প্রয়োজন অপ্রয়োজনে জনসংযোগ করে।উদ্ভট উদ্ভট আইডিয়া দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করে।বাপ্পির আইডিয়াতে হিমু উৎসবে রাজি হলাম। বাপ্পি বলল, স্যার, দেখার মতো দৃশ্য হবে। বিশজন হিমু মনের আনন্দে হলুদ পোশাক পরে খালিপায়ে নুহাশ পল্লীতে ছোটাছুটি করছে। হিমুর স্রষ্টা হিসেবে তাদের আনন্দ আপনি দেখবেন না?
আমি বললাম, আনন্দ দেখা যেতে পারে।সে উৎসাহের সঙ্গে বলল, হিমু সঙ্গীত লিখে ফেলেছি। একটা অন্তরা শুধু বাকি। আশা করছি ঐদিন হিমু সঙ্গীত গীত হবে।হিমু সঙ্গীতও আছে? অবশ্যই। আমার মূল পরিকল্পনা জাতীয় পর্যায়ে হিমু দিবস পালন। অশোকের শিলালিপির মতো জায়গায় জায়গায় হিমুলিপি। হিমু পদযাত্রা।আমি বললাম, সেটা আবার কী?
একদল খাঁটি হিমু তেতুলিয়া থেকে হাঁটতে হাঁটতে টেকনাফ যাবে। সেখান থেকে যাবে সেন্টমার্টিন। আপনার বাড়ি সমুদ্র বিলাস-এ পৌঁছার পর পদযাত্রার সমাপ্তি। আপনিও আমাদের সঙ্গে থাকবেন। তবে আপনাকে হাঁটতে হবে না। আপনি থাকবেন গাড়িতে।
হিমু সঙ্গীত একটা অন্তরার অভাবে শেষ পর্যন্ত আটকে রইল। তবে কেন্দুয়া থেকে ইসলামুদ্দান বয়াতী তার দলবল নিয়ে চলে এল এবং সকাল থেকে বাদ্যবাজনা শুরু হয়ে গেল–
নুহাশ পল্লীতে এলে আমরা
কী দেখিতে পাই?
চারদিকে ঘুরিতেছে
শত হিমু ভাই।
আহা বেশ বেশ বেশ
আহা বেশ বেশ বেশ।
তাদের গায়ের জামা হলুদ রঙের হয়
পায়ে জুতা স্যান্ডেল কখনোই নয়।
আহা বেশ বেশ বেশ
আহা বেশ বেশ বেশ
এগারোটার দিকে টেলিফোন কোম্পানির গাড়ি ভর্তি করে হিমুদের দল চলে এল। অবাক হয়ে দেখি তাদের কারো গায়েই হলুদ পাঞ্জাবি নেই এবং কারোর পা খালি না। আমি বাপ্পিকে বললাম, ব্যাপার কী? এরা শুনেছি ভেজালবিহীন খাঁটি হিমু। এদের হলুদ পাঞ্জাবি কোথায়?
বাপ্পি মাথা চুলকে বলল, ব্যাপারটা আমিও বুঝতে পারছি না। আমার ধারণা ব্যাগে করে নিয়ে এসেছে। এখন পরবে।আলোচনার শুরুতেই ছিল পরিচয়পর্ব। পরিচয়পর্বে দেখা গেল অর্ধেকের বেশি মফস্বলের হিমু। চাঁদপুরের হিম, দিনাজপুরের হিমু। মফস্বলের হিমুদেরকে খানিকটা উগ্র বলেও আমার কাছে মনে হলো। তারা আমাকে জানাল যে, হিমু বিষয়ক সমস্ত বই তারা অধ্যয়ন করেছে। একটি বিষয়ে তারা কোনো দিকনির্দেশনা পাচ্ছে না বলে চিন্তিত। আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, কোন বিষয়ে?হিমুদের কি প্রেম করার অধিকার আছে?
আমি জবাব দেবার আগেই অন্য হিমুরা কথা বলা শুরু করল। এবং তাদের কাছ থেকে জানলাম–
ক) হিমুরা আগ বাড়িয়ে প্রেম নিবেদন করতে পারবে না। তবে কোনো মেয়ে তাদের প্রেমে পড়লে তারা ধরি মাছ না ছুঁই পানি নীতি অবলম্বন করবে।
খ) হিমুদের রূপা টাইপ প্রেমিকা একজন থাকতে পারে। তবে রূপার সঙ্গে (অর্থাৎ রূপা টাইপ প্রেমিকার সঙ্গে) কখনো দেখা করা যাবে না, তবে মোবাইলে কথা বলা যাবে এবং sms চালাচালি করা যাবে।
আলোচনার মাঝখানে একজন মফস্বল হিমুকে হঠাৎ বের হয়ে যেতে দেখলাম। মিনিট দশেক পর সে হলুদ পাঞ্জাবি, খালি পা এবং সানগ্লাস চোখে পরে উদয় হলো।বাকি হিমুরা হৈহৈ করে উঠল, হিমুরা কখনো সানগ্লসি পরে না।বেচারা সানগ্লাস খুলে মনমরা হয়ে একা ঘুরে বেড়াতে লাগল।
আধঘণ্টা পর নুহাশ পল্লীর ম্যানেজার চিন্তিত মুখে কানে কানে আমাকে বলল, খালি পায়ের হিমু ভাইয়ের মাথায় মনে হয় ক্র্যাক স্যার। উনি কিছুক্ষণ এক জায়গায় লাফিয়ে এখন কদম গাছের মগডালে উঠে কেমন করে জানি শুয়ে আছে। মনে হচ্ছে ঘুমিয়ে পড়েছেন।আমি বললাম, তুমি আশে পাশে থাক। এবং যে-কোনো সময় যে-কোনো দুর্ঘটনার জন্য তৈরি থাক।ম্যানেজার চিন্তিত মুখে কদমগাছের দিকে ছুটে গেল।অনুষ্ঠানের একটি পর্বে ছিল হিমুর স্রষ্টার সঙ্গে একান্তে কিছুক্ষণ।
এই পর্বে আমি সবার চোখের আড়ালে বসে থাকব। আমার সামনে একটা খালি চেয়ার থাকবে। হিমুরা একজনের পর একজন সেই চেয়ারে বসবে এবং একান্তে কথা বলবে।আমি বাপ্পিকে বললাম, এই পর্বটি বাদ দাও। আমি হিমুদে ভাবভঙ্গির মধ্যে হঠাৎ প্রবল আউলাভাব লক্ষ করছি। কে কী করে বসে তার নাই ঠিক।এই পর্ব বাদ গেল।
দুজন হিমুকে দেখলাম অত্যন্ত উত্তেজিত। তারা বলছে, একটা হলুদ পাঞ্জাবি কিনলেই হিমু হওয়া যায় না। হিমু হওয়া সাধনার ব্যাপার। যুব সমাজের ভেতর এই সাধনার অভাব। বাংলাদেশে যত হিমু দেখা যাচ্ছে তার সবই ভেজাল। প্রতি পূর্ণিমাতে জোছনা দেখা হিমুদের জন্যে অবশ্যকর্তব্য, অথচ বেশির ভাগ হিমু পূর্ণিমা কবে তাই জানে না। হিমদের জন্যে মিসির আলির বই পড়া নিষিদ্ধ। অথচ এখানে অনেক হিমু আছে যারা মিসির আলির বই পড়ে। এরা হিমু সমাজের কলঙ্ক।হিমুদের যে মিসির আলির বই পড়া নিষিদ্ধ এই তথ্য আমি নিজেও জানতাম না। নতুন জ্ঞান পেয়ে ভালো লাগল।
মেয়ে হিমুদের একজন এসে বলল, স্যার, সোনার রঙ তো হলুদ। আমরা মেয়ে হিমুরা কি সোনার গয়না পরতে পারি? আমি বললাম, অবশ্যই পরতে পার।হলুদ শাড়ি পরলে মনে হয় কোনো গায়েহলুদের অনুষ্ঠানে যাচ্ছি। এর কী করব? হলুদ পাঞ্জাবি পরলে হয় না? না হয় না। তাহলে ছেলে হিমুদের সঙ্গে আমাদের তফাত কী থাকল?
টেলিফোন কোম্পানি হিমুদের জন্যে কিছু গিফটের ব্যবস্থা করেছিল। তার মধ্যে একটা করে মোবাইল ফোনের সেট ছিল। হিমুরা সবাই আগ্রহ করে মোবাইল সেট নিল, যদিও হিমুদের বৈষয়িক আসক্তি থেকে মুক্ত থাকার কথা।
দুপুর আড়াইটায় খাবার দেয়া হলো। হলুদ রঙের খাবার– খিচুড়ি। আমি প্রচণ্ড মাথা ধরেছে এই অজুহাতে হিমুদের কাছ থেকে বিদায় চাইলাম।তারা বলল, গুরু রেস্ট নিন। আপনার রেস্টের প্রয়োজন আছে।খুব হালকাভাবে লেখাটা লিখলাম। লেখাটা আরেকটু গুরুত্বের সঙ্গে লেখা উচিত ছিল। পৃথিবীতে কাল্টের (Cult) বিষয়টি প্রবলভাবেই আছে। কিছু মানুষের জিনের ভেতরই হয়তোবা Cult সদস্য হবার বিষয় থাকে। গুরুর নির্দেশে এরা করতে পারে না এমন কাজ নেই।
কাল্টের সংজ্ঞা হচ্ছে, ক্ষুদ্র একদল মানুষ যারা গুরুর পেছনে সীমাহীন আবেগে একত্রিত হয়। শ্রীলঙ্কার প্রভাকরণকে এক অর্থে Cult গুরু বলা চলে। তালেবানরাও তাই। জাপানে এক প্রায় অন্ধ Cult গুরুর (Shoko Asahara) আদেশে বহু মানুষকে Serin গ্যাস দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনা ১৯৯৫ সনের। এই গুরুর দলের নাম Aum Shinikyo দলের সদস্যরা গুরুকে দেখত শারের
জিম জোনস (James Warrarn Jim Jones)-এর ঘটনা তো সবার জানা। ১৭ নভেম্বর ১৯৭৮ সনে তার কারণে ৯০০ মানুষ স্বেচ্ছামৃত্যু বরণ করে।হিমু নামের যে গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে এরা অবশ্যই নির্বিষ, ভেজিটেবল টাইপ। তবে এদেরকে কখনোই একত্রিত হতে দেয়া যাবে না। সব কাল্ট সদস্য একসময় নির্বিষ ভেজিটেবল থাকেন।
রাশিয়ার মস্কো শহরে একটি হিমু ক্লাব হতে যাচ্ছে। ক্লাবের সদস্যরা বাঙালি না, রাশিয়ান। মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ের ছাত্রছাত্রী। ওরা হিমুকে নিয়ে লেখা কয়েকটি বই রুশ ভাষায় অনুবাদ করেছে। বইগুলির প্রকাশনা উৎসবেই ক্লাব তৈরির ঘোষণা দেয়া হবে। উৎসবে আমন্ত্রিত সব অতিথিনে হলুদ রঙের কিছু পরতে হবে। অতিথিদের বড় অংশ ডিপ্লোমেট। তাদের জন্যে ৫০টা হলুদ টাই কেনা হয়েছে।
সূত্র : বাংলাদেশে রুশ দূতাবাসের এক তরুন কর্মকর্তা, পাভেল। সে নিজেও নাকি একজন হিমু।