ভূ মি কা
ট্রেন দেখলেই আমার ট্রেনে চড়তে ইচ্ছা করে। ঢাকা শহরে অনেকগুলি রেল ক্রসিং। গাড়ি নিয়ে প্রায়ই দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। চোখের সামনে দিয়ে ট্রেন যায় আর দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে ভাবি ট্রেনের যাত্রীরা কি সুখেই না আছে।
আমার এই উপন্যাসটা ট্রেনের কামরায় শুরু, সেখানেই শেষ। কাহিনী শেষ হয়ে গেছে-ট্রেন চলছেই। মনে হচ্ছে এই ট্রেনের শেষ গন্তব্য অপূর্ব লীলাময় অলৌকিক কোনাে ভুবন। উপন্যাসের নাম কিছুক্ষণ’ ধার করা নাম। ধার করেছি আমার প্রিয় একজন লেখক বনফুলের (বলাই চাঁদ মুখােপাধ্যায়) কাছ থেকে।
হুমায়ূন আহমেদ
৭-২-২০০৭
ট্রেন কিছুক্ষণের মধ্যেই ছাড়বে। চিত্রাকে সিদ্ধান্ত যা নেবার এখনই নিতে হবে। সে ট্রেনে থাকবে, না-কি স্যুটকেস নিয়ে নেমে যাবে? বিশাল এই স্যুটকেস হাতে নিয়ে নামা তার পক্ষে সম্ভব না। নেমে যাবার সিদ্ধান্ত নিলে তাকে কুলি ডাকতে হবে। দেরি করা যাবে না। এক্ষুণি ডাকতে হবে। ট্রেন ছাড়ার সময় হয়ে গেছে। ছ’টায় ছাড়ার কথা। এখন বাজছে পাঁচটা পঞ্চাশ । দুঃখে চিত্রার চোখে পানি এসে যাচ্ছে। চিত্রার হাতে প্রথম শ্রেণীর স্লিপিং বার্থের টিকেট। হাত পা ছড়িয়ে যাবে। ট্রেনে তার একফোটা ঘুম হয় না। তাতে অসুবিধা নেই গল্পের বই পড়তে পড়তে যাবে। হাত ব্যাগে দুটো গল্পের বই আছে। দু’টাই ভূতের গল্প।
স্টিফেন কিং। চলন্ত ট্রেনে ভূতের গল্প পড়তে ভাল লাগে। স্টেশনের বুক স্টল থেকে এক কপি রিডার্স ডাইজেস্ট কিনেছে। ট্রেনে বাসে ডাইজেস্ট জাতীয় পত্রিকা পড়তে আরাম। মন দিয়ে পড়তে হয় না। চোখ বুলালেই চলে। | ট্রেন এখনাে দাঁড়িয়ে। আজ কি ট্রেন লেট হবে? চিত্রা জানালা দিয়ে মুখ বের করল। একজন কুলিকে জানালার পাশেই দেখা যাচ্ছে। সে কি ডাকবে তাকে? বলবে স্যুটকেস নামিয়ে দিতে? | সে ঠিক করল নেমেই যাবে আর তখনই বিশাল বড় বড় দু’টা কালাে ট্রাঙ্ক দরজায় নামল।
কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১)
ট্রাঙ্কের সঙ্গে বেডিং, বেতের ঝুড়ি। এইসবের মালিক এক মাওলানা । সুফি সুফি চেহারা যার গা থেকে আতরের গন্ধ আসছে। মাওলানার স্ত্রী গর্ভবতী। বােরকায় তাঁর অস্বাভাবিক বিশাল পেট ঢেকে রাখা যাচ্ছে না। ভদ্রমহিলা দৌড়ে ট্রেনে উঠার পরিশ্রমে ক্লান্ত। তিনি ট্রাঙ্কের উপর বসে পড়েছেন। বড় বড় নিঃশ্বাস নিচ্ছেন। বিশাল এই ঝামেলা ডিঙিয়ে চিত্রার পক্ষে নামা অসম্ভব। বােরকাপরা মহিলা স্বামীকে বললেন, পানি খাব। পানি । আর ঠিক তখনই ট্রেন দুলে উঠল।
চিত্রার প্রধান সমস্যা দুজনের যে কামরায় তার সিট সেখানে বুড়াে এক ভদ্রলােক আধশােয়া হয়ে আছেন। ভদ্রলােকের মাথা অস্বাভাবিক ছােট। তিনি তার ছােটমাথা হলুদ রঙের মাফলার দিয়ে পেঁচিয়ে বলের মতাে বানিয়েছেন। গায়ে প্রায় মেরুন রঙের কোট। কোন রুচিবান মানুষ এই রঙের কোট পরে বলে চিত্রার জানা নেই। তাঁর হাতে সিগারেট। সিগারেটে একেকটা টান দিচ্ছেন আর বিকট শব্দে কাশছেন। ঘর ভর্তি সিগারেটের ধূয়া। ভদ্রলােকের পরণে লুঙ্গি। এক শ্রেণীর মানুষ আছে যারা ট্রেনে বা লঞ্চে উঠেই কাপড় বদলে লুঙ্গি পরে ফেলে। উনি মনে হয় সেই জাতের। প্লেনে উঠেও কি এরা এই কাণ্ড করে? হয়ত করে। লাঞ্চ টাইমে গামছা নিয়ে বাথরুমে ঢুকে যায় গােসলের জন্যে। বিমানবালার কাছে গায়ে মাখার জন্যে তেল চায়। অসহ্য!
ভদ্রলােকের লুঙ্গি হাঁটু পর্যন্ত উঠে এসেছে। কাঠির মতাে দুটো পা বের হয়ে আছে। পা ভর্তি পাকা লােম। ভদ্রলােক আবার কিছুক্ষণ পর পর এক পা দিয়ে আরেক পা ঘসছেন। পায়ের বেহালা বাজাচ্ছেন। কি কুৎসিত! কি কুৎসিত।
কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১)
এমন একজন মানুষের সঙ্গে দিনাজপুর পর্যন্ত যেতে হবে? চিত্রা করিডােরে পঁড়িয়ে আছে। কামরায় ঢুকছে না। রেলের একজন এটেনডেন্টকে পাওয়া গেলে জিজ্ঞেস করত খালি কোনাে কামরা আছে কি-না। এত বড় স্লিপিং বগি। একটাও খালি সিট থাকবে না? শাদা পােশাকের কোনাে এটেনডেন্টকে দেখা যাচ্ছে না। প্রয়ােজনের সময় এদের কাউকেই পাওয়া যায় না।
চিত্রাকে এই বিপদে ফেলেছে তার রুমমেট লিলি। ট্রেনের টিকিট লিলি তার মামাকে দিয়ে কাটিয়েছে। সেই মামা না-কি রেলের বিরাট অফিসার। লিলি তার মামাকে বলেছে টু সিটার স্লিপারের একটা টিকিট দিতে। সেখানে যেন অন্য কেউ না যায়। একটা সিট অবশ্যই খালি যাবে। লিলির মামার কাছে এই ব্যবস্থা করা না-কি কোনাে বিষয়ই না।
এখন দেখা যাচ্ছে বিষয়।
লিলির ক্ষমতাবান রেল মামা কিছু করতে পারেন নি।
চিত্রাকে যেতে হবে পা ভর্তি সাদা লােমের বুড়ােটার সাথে।
যে বুড়াে দুই পা ঘসে ঘসে পা বেহালা বাজাবে।
মহান পা-সঙ্গীত! ইচ্ছা করলে চিত্রা এখনই লিলির সঙ্গে কথা বলতে পারে।
মােবাইল ফোন সঙ্গে আছে ।
কিন্তু লাভ কি।
লিলি নিশ্চয়ই বুড়ােকে সরাতে পারবে না।
ম্যাডাম, কোনাে সমস্যা?
কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১)
চিত্রা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল রেলের একজন এটেনডেন্ট। হাতে চাবির গােছা। সরল ধরনের চেহারা। গােল মুখ, বড় বড় কান। চিত্রা শরীর বিদ্যা নামের একটা বই-এ পড়েছে যাদের মুখ গােলাকার, কান বড় বড় তারা সরল প্রকৃতির হয় এবং অন্যকে বিপদে সাহায্য করার মানসিকতা এদের আছে। এরা পরােপকারী । | চিত্রা বলল, “স্লিপিং বার্থে খালি কোনাে সিট কি আছে? আমি এই বৃদ্ধ ভদ্রলােকের সঙ্গে যেতে চাচ্ছিনা। উনি ক্রমাগত সিগারেট খাচ্ছেন। একটু আগে একটা শেষ করেছেন এখন আরেকটা ধরিয়েছেন।
এটেনডেন্ট বলল, কামরার ভেতরে সিগারেট খাওয়া যাবে না, আমি উনাকে নিষেধ করে দিচ্ছি।
আর কোনাে সিট কি আছে? বাথরুমের কাছের ফোর সিটারে একটা খালি আছে কিন্তু সেখানে আপনি যেতে পারবেন না।
যেতে পারব না কেন?
ম্যাডাম, সামান্য অসুবিধা আছে। তারপরেও খোঁজ নিয়ে দেখি। আপাতত নিজের কামরায় বসুন।
এটেনডেন্ট স্যুটকেস ঢুকিয়ে দিল। চিত্রাকে তার পেছনে পেছনে যেতে হল। চিত্রাকে ঢুকতে দেখে বুড়াে পা গুটিয়ে নিল। পিট পিট করে তাকাল বুড়াের নাকের নিচে বিশাল গোফ। উপরের ঠোটটা গোঁফের কারণে ঢাকা পড়ায় তাকে কার্টুন ফিগারের মত লাগছে।
চিত্রা বলল, দয়া করে সিগারেট খাবেন না। আমি সিগারেটের গন্ধ সহ্য করতে পারি না।
বুড়াে বলল, তুমি কি আমার সঙ্গে যাচ্ছ? আমার রুম মেট?
জি।
Read more