এক ঘণ্টা আগে খবর পেয়েছি। তােমরা আপসেট হবে বলে তােমাদের বলি নি।
সুরমা হতভম্ব গলায় বললেন, সর্বনাশ!
সর্বনাশ মানে, মহাসর্বনাশ। যাকে শাস্তি দিচ্ছ কিছুক্ষণের মধ্যে সেও জানবে আমি আর মন্ত্রী না। তখন কি হবে বুঝতে পারছ? যাও এক্ষুনি শাস্তি বন্ধ কর।
যমুনা আর তার স্বামীকে এখনি কিছু বলার দরকার নেই। তাদেরকে পরে জানালেও হবে।সুরমা কানে ধরে উঠবােস করা দৃশ্যের কাছে এগিয়ে গেলেন। কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, হয়েছে হয়েছে আর লাগবে না। একসিডেন্ট সবারই হয়। আমি নিজে কতবার হাত থেকে গ্লাস ফেলেছি। আমার নিজের মেজাজ অন্য একটা কারণে খারাপ ছিল। ওভার রি-এক্ট করেছি। এই তােমার নাম কি?
সবুর।
সুরমা হ্যান্ড ব্যাগ খুলতে খুলতে বললেন, একশটা টাকা রাখাে। চা নাশতা খেও।
সবুর টাকা নিল না। মেঝেতে পড়ে থাকা গ্লাস নিয়ে সেলুন কার থেকে বের হয়ে গেল। | যমুনা বলল, কত বড় বেয়াদব দেখেছ আপা। থাপড়ায়ে এর দাঁত ফেলে দেয়া উচিত ছিল। তুমি আবার মহিলা হাজী মােহাম্মদ মহসীন হয়ে গেলে একশ টাকা বখশিস।।
মাওলানা আজিজুর রহমান স্ত্রীর হাত ধরে বসে আছেন। ভয়ে এবং আতংকে তিনি অস্থির। নিজের মনের ভয় কমানাের জন্যে তিনি ইয়া আহাদু একশবার পড়েছেন। মনের ভয় কমছে না। সত্যি সত্যি ট্রেনে কিছু হয়ে গেলে মহা বিপদ হবে। ট্রেনের এটেনডেন্ট বসিরকে কানে কানে বলেছেন একজন লেডি ডাক্তার আছে কি-না এই খোঁজ করতে। ব্যাটা খোজ করবে কি-না কে জানে। তিনি নিজেই প্রতিটি বগিতে গিয়ে ডাক্তার খুঁজতে পারেন। স্ত্রীকে ফেলে যেতে ইচ্ছা করছে না। তিনি মহাবিপদের দোয়া একমনে পড়ে যাচ্ছেন। দোয়া ইউনুস।
কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ
ব্যাথার একেকটা প্রবল ঝাপ্টা আসছে আফিয়া স্বামীকে খামচি দিয়ে ধরছে এবং ব্যাকুল গলায় বলছে আমার আম্মু কই। ও আম্মু আম্মু।
মাওলানা বললেন, আল্লা-খােদাকে ডাক। আম্মা আম্মা করছ কেন?
আফিয়া বলল, আল্লাহপাকরে তাে আপনি ডাকতেছেন। আমি আম্মুরে ডাকি। ও আম্মু। আম্মু।
মাওলানা বললেন, সমস্যা তুমি তৈরি করেছ। আম্মার কাছে যাব। আম্মার কাছে যাব। এখন দেখেছ অবস্থা। তােমার মা’র কাছে যাবার জন্যে রওনা না দিলে এই বিপদ হত না।
আফিয়া বলল, চুপ করে বসে থাকেন। কথা বন্ধ। কথা বললে কানে ঝন ঝন করে। | মাওলানা চুপ করে গেলেন। তিনি মনে মনে দুরুদে-শেফা পাঠ করা শুরু
করেছেন।
বসির আরেক দফা বরফ এনেছে। রশীদ সাহেব তার হাত ধরে বললেন
You are a good boy You will get a toy. তবে এখন খেলার সময় নয়।
একটা খবর যে জোগাড় করতে হয়। বসির বলল, স্যার! কি খবর জোগাড় করব?
রশীদ সাহেব বললেন, যে মৃত ব্যক্তিটি আমাদের সঙ্গে যাচ্ছে তার পরিচয় আমার জানা দরকার। জটিল গবেষণার মধ্যে পড়ে গেছি। মৃত ব্যক্তির নাম এবং আমাদের মন্ত্রী মহােদয়ের জন্ম তারিখ জানা অতি জরুরী।
বসির বলল, মরা মানুষ তাে কেউ যাচ্ছে না। তুমি তাে খবর দিলে একটা ডেড বডি যাচ্ছে।
বসির লজ্জিত গলায় বলল, ভুল খবর দিয়েছিলাম স্যার। চাদর দিয়ে ঢেকে কামরায় তুলেছে তখন ভেবেছি লাশ।
এখন সে লাশ না? জি-না। চা-কফি খেয়েছে। ছেলে না মেয়ে?
ছেলে। বয়স কত?
ত্রিশ পয়ত্রিশ। নাম জিজ্ঞেস করেছ? নাম জিজ্ঞেস করি নাই। চাদর দিয়ে ঢেকে তাকে তুলেছে কেন? জানি না। রশীদ সাহেব বললেন, মিথ্যা কথা বলছ কেন বসির? হঠাৎ তােমার মিথ্যা বলার প্রয়ােজন পড়ল কেন? আমি ঐ কামরায় গিয়েছিলাম। মৃত ছেলেটির মা’র সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তারা ডেড বডি কফিনে করে নিয়ে যাচ্ছে। কফিনে প্রচুর বরফ এবং প্রচুর চা পাতা দেয়া হয়েছে। ঠিক বলছি না?
কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ
বসির কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “জি স্যার। তাহলে মিথ্যা কথা কেন বললে?
বসির জবাব দিল না। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। রশীদ সাহেব বললেন,
You are a naughty boy You will not get a toy.
আমার সামনে থেকে দূর হবার হয়েছে সময়। সামনে থেকে যাও।
বসির দ্রুত বের হতে গিয়ে দরজায় বাড়ি খেল। রশীদ সাহেব ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে বললেন, ছেলেটা মিথ্যা কথা কেন বলল?
আশহাব বলল, বুঝতে পারছি না। কারণ ছাড়াই হয়ত বলেছে। রশীদ সাহেব বললেন, কারণ ছাড়া কেউ মিথ্যা বলে না। তবে প্যাথলজিক্যাল লায়াররা বলে । সমগ্র মানব গােষ্ঠীর অতি ক্ষুদ্র অংশই প্যাথলজিক্যাল লায়ার। বসির নামের এই ছেলের মিথ্যা বলার পেছনে অবশ্যই কারণ আছে। কারণটা বের করতে হবে।
আশহাব বলল, আপনি সব সময় কিছু না কিছু নিয়ে চিন্তা করেন। রশীদ সাহেব বললেন, আমি একা না, তুমি নিজেও সব সময় কিছু না কিছু নিয়ে চিন্তা কর। ডাক্তার হিসেবে তুমি এই তথ্য নিশ্চয়ই জান যে মানুষের হার্ট এবং ব্রেইন কখনাে বিশ্রাম নেয় না। হার্ট এবং ব্রেইনের বিশ্রাম নেয়ার অর্থ মৃত্যু। ঘুমের মধ্যে হার্ট যেমন কাজ করে ব্রেইনও কাজ করে। ভাল কথা, এই মাত্র তােমার ম্যাজিকের কৌশলটা আমি ধরে ফেলেছি।
Read more