হুঁ। | মাঝখানে রেলের একটা হাঙ্গামা হয়ে গেল। এই নিয়ে তােলপাড় হয়ে গেছে—আমি স্ট্রংলি কয়েকজনকে ধরেছি।
হেলাল রাখি? আমার শরীরটা ভাল লাগছে না। সে কি! কি হয়েছে? আপনি এত কাজ করেন শরীর খারাপ হবারই কথা। ভাবী আছে ভাবীকে দিন। ভাবীর সঙ্গে কথা বলি। ‘তােমার ভাবী একটু ব্যস্ত আছেন।’ বলেই খায়ের সাহেব টেলিফোনের লাইন কেটে দিলেন। তিনি বসেছেন জানালার পাশে। ট্রেনের চাকায় ঝুম ঝুম শব্দ হচ্ছে। জানালার ও পাশের বন জঙ্গল ঘরবাড়ি দ্রুত সরে যাচ্ছে। দেখতে ভাল লাগছে। সবচে ভাল লাগছে অনেক দূরের বাড়িঘরের হারিকেন বা কূপীর আলাে। ছােটবেলায় এইসব আলাে দেখতে ভয় ভয় লাগতাে। তাকে কে যেন বলেছিল ঐগুলা জ্বীনের চোখ। জ্বীন কখনাে তাকিয়ে থাকে, কখনাে চোখ বন্ধ করে।
এই জন্যেই দূরের আলাে কখনাে দেখা যায় কখনাে দেখা যায় না। খায়ের সাহেবের মনে হল ট্রেনে করে তিনি উল্টা যাত্রা শুরু করেছেন। ট্রেন অতি দ্রুত তাকে শৈশবে নিয়ে যাচ্ছে। ছােটবেলায় তাদের বাড়িতে একজন লজিং মাস্টার থাকতেন। নাম আক্কাস। আক্কাস স্যার তাকে অংক আর ইংরেজি শেখাতেন। অংক এবং ইংরেজির বাইরে আরেকটা জিনিস শেখাতেন। তিনি সেই শিক্ষার নাম দিয়েছিলেন সত্য শিক্ষা।
মিথ্যা কথা মানুষ কি জন্যে বলে জানিস? জি না। মিথ্যা কথা বলতে আরাম এই জন্যে মানুষ মিথ্যা কথা বলে। সত্যি কথা বলতে বেআরাম।
বেআরাম কেন?
জানি না কেন। আমি নিজে পরীক্ষা করে দেখেছি। মিথ্যা কথা হুট করে মুখ দিয়ে বের হয়। সত্যিটা বের হয় না। আজিব ব্যাপার।
তাদের এই লজিং স্যার পরে স্কুলেই চাকরি পান। সত্যি কথা বলার বদঅভ্যাসের কারণে তাঁর চাকরি চলে যায়। সেবার স্কুলের উন্নয়নের জন্যে একশাে বস্তা গম বরাদ্দ হয়েছিল। হেডমাস্টার সাহেব নিজে দশ বস্তা রেখে অন্য সব শিক্ষকদের দুই বস্তা করে দিলেন।
কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ
স্কুল কমিটির সেক্রেটারি পেলেন পাঁচ বস্তা। গভর্নিং বডির মেম্বাররা তিন বস্তা করে। একজন শুধু গম নিলেন তার নাম আক্কাস মাস্টার । তিনি শুধু যে গম নিলেন না, তা-না জেলা শিক্ষা অফিসারের কাছে চিঠি দিয়ে বিস্তারিত জানালেন। তদন্ত হল। তদন্তে প্রমাণিত হল আক্কাস আলি স্কুলের শিক্ষকদের সম্মান নষ্ট করার জন্যে এই কাজ করেছেন। নিজে সাধু সেজে অন্যদের চোর বানাতে চেয়েছেন।
আক্কাস মাস্টারের শুধু যে চাকরি গেল তা-না, অন্যদের নামে বিশেষ করে স্কুল কমিটির সেক্রেটারি রজব মিয়ার নামে মিথ্যা অভিযোেগ আনার শাস্তিও হল। আক্কাস মাস্টারকে কানে ধরে রজব মিয়ার বাড়ির সামনে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হল। তাঁর পাঞ্জাবীর বুকে সেফটি পিন দিয়ে একটা কাগজ লাগিয়ে দেয়া হল। সেখানে লেখা
“আমি চোর” আক্কাস মাস্টার কাঁদছিল। তাকে কাঁদতে দেখে বালক খায়েরের হঠাৎ খুব কান্না পেয়ে গেল। সে ছুটে নিজের ঘরে ঢুকে চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করল। তার বাবা এসে তাকে কোলে তুলে নিয়ে বললেন, বাবা কি হইছে? কান্দ কেন?
সে কিছুই বলে না শুধু কাঁদে।
তার মা তখন বললেন, আক্কাস মাস্টার কানে ধইরা কানতেছে এইটা দেইখা তােমার পুলা কানতেছে ।
কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ
খায়েরের বাবা অতি বিস্মিত হয়ে বললেন, আমার পুলার অন্তরে এত মায়া? এত মায়া আমার পুলার অন্তরে। তিনি তৎক্ষণাৎ হাত তুলে দোয়া করলেন, হে আল্লাহপাক আমার ছেলের অন্তরের এই মায়া যেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত থাকে। আমিন।
খায়েরের যখন আট বৎসর বয়স তখন তার বাবা মারা যান। আজ তার বয়স ৫৯-এর কিছু বেশি। দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর পর আজ তার বাবার কথা মনে পড়ল এবং চোখে পানি এসে পড়ল। তার পরহেজগার বাবার প্রার্থনা আল্লাহপাক শােনেন নি। শৈশবের মায়ার কিছুমাত্র তার মধ্যে নেই। তিনি এই সমাজে অতি দুষ্ট মানুষ হিসেবে পরিচিতি।
ট্রেন থেমে পড়েছে। স্টেশন ছাড়াই থেমেছে। দু’দিকে শালবন। নিঝুম এক জায়গা। জানা গেছে ইনজিনে কি এক ঝামেলা হয়েছে। ড্রাইভার ইনজিন সারাবার চেষ্টা করছে। কিছু যাত্রী ট্রেন থেকে নেমে চিন্তিত মুখে হাঁটাহাঁটি করছে। অনেকে ভীড় করেছে ইনজিনের পাশে।।
কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ
মাওলানার স্ত্রীর অবস্থা ভাল না। প্লেসেন্টা এখনাে বের হয়নি। অস্বাভাবিক রক্তপাত হচ্ছে। এই মহিলাকে অতি দ্রুত হাসপাতালে নেয়া প্রয়ােজন। জঙ্গলে ট্রেন থেমে থাকলে গুরুতর সমস্যা হবে। মাওলানা সমস্যার ব্যাপারটা ধরতে পারছেন না। পুত্র লাভ উপলক্ষে তিনি শােকরানা নামাজ শেষ করেছেন। আনন্দিত মুখে বার বার তাঁর কামরায় উঁকি দিচ্ছেন। বাচ্চা কোলে নিয়ে সাজেদা বেগম বসে আছেন।
সমস্যার জটিলতা তিনি বুঝতে পারছেন। একটু পর পর তিনি চিত্রাকে বলছেন, বৌমা খোজ নাও ট্রেন কখন ছাড়বে। কামরায় আশহাব আছে। সে ক্ষণে ক্ষণে মার কাছ থেকে ধমক খাচ্ছে–তুই তাে গাধা ডাক্তার। কিছু করতে পারছিস না এটা কেমন কথা। তুই কি নকল করে পাস করেছিস যে কিছু জানিস না। গাধার গাধা। তাের বাপ ছিল গাধা। তুইও গাধা! | এমন কঠিন সময়ে মাওলানা উঁকি দিল এবং সবগুলি দাঁত বের করে জিজ্ঞেস করল, খালাম্মা ছেলে কি আমার মতাে হয়েছে?
সাজেদা বললেন, ছেলের গালে ছাগলা দাড়ি নাই। ছেলে তােমার মতাে হয় নাই। ছেলে কার মতাে হয়েছে এই চিন্তা বাদ দাও। তােমার বৌকে বাঁচাবার চেষ্টা কর।
কিছুক্ষণ- হুমায়ূন আহমেদ
মাওলানা বললেন, কঠিন দোয়ার মধ্যে আছি খালাম্মা। দেখবেন কিছুক্ষণের মধ্যে ইনজিন ঠিক হবে ইনশাল্লাহ। আমরা একটানে ময়মনসিংহ পৌছে যাব।
সাজেদা বললেন, আল্লাহপাক কি ইনজিন ঠিক করার জন্যে ফেরেশতা পাঠায়েছেন?
মাওলানা বললেন, এই ধরনের কথা বলবেন না খালাম্মা। বিরাট পাপ হবে। এইসব খােদা নারাজি কথা ।
খােদা তােমার আমার মতাে না। এত্ত সহজে তিনি নারাজ হন না। তুমি আমার সামনে থেকে যাও। তুমি হচ্ছ রামছাগল। ট্রেন থেকে নেমে দেখ কাঁঠাল গাছ পও কি-না। যদি পাও পাতা ছিড়ে পাতা খাও।
Read more