ডঃ মল্লিকের স্ত্রী দেশবিভাগের তিন বছরের মাথায় বাড়ি বিক্রি করে তার অপ্রকৃতস্থ কন্যাকে নিয়ে চলে যান জলপাইগুড়ি। এই বাড়ি তারপর চার বার হাতবদল হয়ে বর্তমানে আছে মহসিন সাহেবের হাতে। আগের বাড়ির কিছুই নেই। গাছপালার অধিকাংশই কেটে ফেলা হয়েছে। বাড়ির পেছনে জলজ গাছ লাগানর জন্যে একটা ঝিলের মতো ছিল, সেই ঝিল ভরাট করে চার কামরার এ প্যাটার্নের ঘর করা হয়েছে। ঘরগুলিতে মহসিন সাহেবের ড্রাইভার, মালী এবং দারোয়ান থাকে। বছর দুই ধরে আছে নিশানাথ বাবু।
নিশানাথ বাবু একসময় মহসিন সাহেবেরও প্রাইভেট টিউটর ছিলেন। অঙ্ক করাতেন। খুব যত্ন করেই করাতেন। পড়ানর ফাঁকে ফাঁকে মজার মজার গল্প করতেন। মহসিন সাহেব শিশু অবস্থায় সেইসব গল্প শুনে মুগ্ধ ও বিস্মিত হতেন। তাঁর সেই বিস্ময়ের কিছুটা এখনো অবশিষ্ট আছে বলে নিশানাথ বাবুকে যত্ন করে নিজের বাড়িতে এনে রেখেছেন। নিশানাথ বাবুর দায়িত্ব সন্ধ্যার পর মহসিন সাহেবের পুত্র-কন্যাকে নিয়ে বসা, পড়া দেখিয়ে দেওয়া।
এই দায়িত্ব তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন। দায়িত্বের বাইরে যা করেন তা হচ্ছে গাছপালার যত্ন। প্রায় সময়ই মালীর সঙ্গে তাঁকেও নিড়ানি হাতে বাগানে বসে থাকতে দেখা যায়।মহসিন সাহেবের এক ছেলে, দুই মেয়ে। বড়ো ছেলে ল্যাবরেটরি স্কুলে ক্লাস সিক্সে পড়ে। পড়াশোনায় মোটামুটি ধরনের, তবে সুন্দর ছবি আঁকে। দ্বিতীয় সন্তানরাত্রি পড়ে ভিকারুননেসা স্কুলে ক্লাস ফাইভে। এই মেয়েটি অসম্ভব বুদ্ধিমতী। স্মৃতিশক্তিও অসাধারণ।
কোন জিনিস এক বার পড়লে দ্বিতীয় বার পড়ার দরকার হয় না। মহসিন সাহেবের তৃতীয় সন্তান আলো–ভাইবোনদের মধ্যে সবচেয়ে রূপবতী। তার দিকে তাকালে চোখ ফিরিয়ে নেওয়া মুশকিল। আলো এবং রাত্রির বয়সের তফাত এক বৎসর। আলো জন্ম থেকেই মূক ও বধির। এই মেয়েটিকে নিয়ে বাবা-মার দুঃখের কোনো সীমা নেই।
মহসিন সাহেবের স্ত্রী দীপা মেয়েটিকে সারাক্ষণ চোখে চোখে রাখেন। মাঝে মাঝে থমথমে গলায় বলেন, মা, তুই এত সুন্দর হচ্ছিস কেন? তুই তো বিপদে পড়বি, মা। আলো চোখ বড়ো বড়ো করে মার দিকে তাকিয়ে থাকে। মার কথা সে শুনতে পায় না, মা কী বলছেন বুঝতে পারে না। মার কথা শেষ হওয়া মাত্র সে হাসে। সেই হাসি এতই মধুর যে দীপার ইচ্ছা করে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদতে।
রাত প্রায় আটটা বাজে। তুষারএবং রাত্রি ভিডিও গেম নিয়ে বসেছে। রাত্রি গত জন্মদিনে এই যন্ত্রটি উপহার হিসেবে পেয়েছে। অনেকগুলি খেলার ক্যাসেট আছে। তবে তাদের পছন্দ হয়েছে ঘোড়ার খেলাটা। খেলা শুরু হতেই টিভি পর্দায় দেখা যায় অনেক জীবজন্তুর মাঝখানে ল্যাসো হাতে এক ঘঘাড়সওয়ার বসে আছে। খেলার বিষয়টি হচ্ছে জীবজন্তু ধরা। কালো ছাগল তিন পয়েন্ট, সাদা হরিণ পঁচিশ পয়েন্ট, বসে থাকা বাঘ এক শ পয়েন্ট। জন্তুগুলি ধরা বেশ কঠিন, কারণ এরা দ্রুত দৌড়াতে থাকে।
রাত্রির জয়স্টিকের কনট্রোল খুবই চমৎকার। সে পাঁচ হাজার পর্যন্ত করতে পারে। তুষার অনেক কষ্টে এক বার এগারো শ করেছিল। ছোট ববানের কাছে পরাজিত হবার লজ্জায় সে খানিকটা মিয়মাণ। এখন খেলছে। রাত্রি। তুষার ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছে। ওদের থেকে অনেকটা দূরে সোফায় আধশোয়া হয়ে বসে আছে আলো। সেও গভীর মনোযোগে খেলা দেখছে।দীপা ট্রেতে করে ছেলেমেয়েদের জন্যে দুধের গ্লাস নিয়ে ঢুকলেন। বিরক্ত গলায় বললেন, এখন গেম নিয়ে বসেছ কেন? পড়াশোনা নেই?
রাত্রি খেলা বন্ধ না করেই বলল, স্যার আজ পড়াবে না মা। স্যারের শরীর ভালো না।দীপা বললেন, উনি পড়াবেন না বলেই তোমরা পড়বে না কেমন কথা? পরীক্ষায় খারাপ করবে তো।রাত্রি বলল, আমি কি কখনো খারাপ করেছি? কখনো কর নি বলেই যে ভবিষ্যতেও করবে না, তা তো না। না পড়লে কী ভাবে ভালো করবে?
রাত্রি খেলা বন্ধ করে মার দিকে তাকিয়ে হাসল। মিষ্টি করে বলল, পড়তে যাচ্ছি মা।দীপা বললেন, আরেকটা কথা, তোমরা যখন খেলা নিয়ে বস, তখন আলোকে ডাক না কেন? সে একা একা দূরে বসে থাকে। ওর নিশ্চয়ই খেলতে ইচ্ছা করে।তুষার বলল, ও খেলতে পারে না, মা।না পারলে ওকে শিখিয়ে দেবে। তোমরা আছ কেন? ওর বুঝি খেলতে ইচ্ছা করে না? যেটারি একা একা দূরে বসে আছে।রাত্রি বলল, আমি ওকে ডেকেছি মা। ও তো আসতে চায় না। ও আমাদের পছন্দ করে না।কে বলল পছন্দ করে না?
কাছে গেলে খামচি দেয়।এই দেখ খামচির দাগ।দীপা দীর্ঘনিঃশ্বাস গোপন করে বললেন, ঠিক আছে। যাও, হাত মুখ ধুয়ে পড়তে বস। দুধ টেবিলে রইল। পড়তে বসার আগে দুধ খেয়ে নেবে। নটা বাজতেই খেতে আসবে। আর শোন, তোমাদের স্যারের যে অসুখ তোমরা কি তাঁকে দেখতে গিয়েছিলে?
রাত্রি বলল, হ্যাঁ, গিয়েছিলাম। না গেলে জানব কি করে যে তাঁর অসুখ। ঘর অন্ধকার করে শুয়ে আছেন। মাথায় খুব যন্ত্ৰণা।তুষার বলল, দারোয়ান ভাই বলেছেন, স্যারের মাথায় কুকুরের বাচ্চা হয়েছে। এক বার তো তাঁকে কুকুর কামড়ে দিয়েছে, তাই। মেয়েদের যদি কুকুরে কামড় দেয় তাহলে তাদের পেটে বাচ্চা হয়, আর ছেলেদের যদি কামড়ায় তাহলে তাদের মগজে বাচ্চা হয়। খুব ছোট ছোট বাচ্চা ইদুরের চেয়েও ছোট।
দীপা খুব রাগ করলেন। নতুন দারোয়ানটা রোজই কিছু না কিছু উদ্ভট কথা বলবে। তাকে মানা করে দেওয়া হয়েছে, তার পরেও এই কাণ্ড। তাছাড়া তার ঘরের পাশের ঘরে এক জন অসুস্থ মানুষ পড়ে আছে, এই খবরটা তাঁকে জানাবে না? ডাক্তার ডাকতে হতে পারে। বুড়ো মানুষ। হয়তোবা হাসপাতালে নিতে হতে পারে। রাতে নিশ্চয়ই ভাত খাবেন না। পথ্যের ব্যবস্থা করতে হবে। ঘরে চালের আটা আছে কিনা কে জানে! থাকলে চালের আটার রুটি করার কথা বলে দিতে হবে।
দীপা নিশানাথ বাবুকে দেখতে যাবার জন্যে রওনা হলেন। ইট বিছানো রাস্তা অনেকখানি পার হতে হয়। দুপাশে উঁচু হয়ে ঘাস জমেছে। এক সপ্তাহও হয় নি কাটা হয়েছে, এর মধ্যেই ঘাস এত বড়ো হয়ে গেল। মালী। কোনো কিছুই লক্ষ করে না। বর্ষাকাল সাপখোপের সময়। এই সময়ে বাগান পরিষ্কার না রাখলে চলে? নিশানাথ বাবুর ঘর অন্ধকার।দীপা ভেতরে ঢুকে আলো জ্বালালেন। নিশানাথ বললেন, কে?
দীপা বললেন, চাচা, আমি দীপা।মহসিন নিশানাথ বাবুকে স্যার ডাকেন। তাঁর ছেলে-মেয়েরাও ডাকে স্যার। শুধু দীপা ডাকেন চাচা।দীপাকে দেখে নিশানাথ বাবু উঠে বসলেন এবং কোমল গলায় বললেন, কেমন আছ গো মা? আমি ভালেই আছি। আপনি কেমন আছেন? অসুখ নাকি বাঁধিয়ে বসেছেন।তেমন কিছু না। জ্বর-জ্বর লাগছে। শুয়ে আছি।
দীপা হাত বাড়িয়ে নিশানাথ বাবুর কপাল স্পর্শ করলেন। এই অসম্ভব ক্ষমতাবান মানুষের কন্যা এবং ধনবান মানুষের স্ত্রীর আন্তরিকতায় নিশানাথ বাবুর চোখে পানি আসার উপক্রম হল। দীপা বললেন, আপনার গায়ে তো বেশ জ্বর। মাথায় যন্ত্রণা কি আছে?
আছে।খুব বেশি? না, খুব বেশি না।সাইনাসের জন্যে এক্সরে করাবার কথা ছিল যে, তা কি করিয়েছেন।হ্যাঁ। একটা ঝামেলা হয়েছে এক্সরেতে, আবার করাতে হবে।রাতে আপনি কী খাবেন? কিছু খাব না, মা। উপোস দেব। উপোস দিলে ঠিক হয়ে যাবে।চালের আটার রুটি করে দেব? আচ্ছা দাও।
দীপা চলে যেতে পা বাড়িয়েছেন তখন নিশানাথ বাবু বললেন, একটু বস মা। এই দুমিনিট।দীপা বিস্মিত হয়ে ফিরে এলেন। নিশানাথ বাবুর সামনের চেয়ারটায় বসলেন। নিশানাথ বাবু বললেন, বিশ্রী সব স্বপ্ন দেখছি, বুঝলে মা। মনটা খারাপ হয়ে গেছে।কী স্বপ্ন?
একই স্বপ্ন বারবার ঘুরে ফিরে দেখছি। একটা ঘরে কামিজ-পরা অল্পবয়স্ক একটা মেয়ে বসে আছে। মেয়েটার নাম নাসিমা। নাসিমার মন খুব খারাপ। অথচ তার মন খুব ভালো থাকার কথা ছিল। সে একটা ট্রাকের সামনে লাফিয়ে পড়ল, অবশ্যি নাসিমার কিছু হল না।আপনি চুপচাপ শুয়ে থাকুন। শরীর দুর্বল, এই জন্য স্বপ্নট দেখছেন।নিশানাথ বাবু চুপ করে রইলেন। দীপা বললেন, আপনি কি আর কিছু বলবেন, চাচা?
না, মা।আমি তাহলে যাই। দারোয়ানকে বলে যাচ্ছি সে গেট বন্ধ করবার পর আপনার রুমের সামনে শুয়ে থাকবে।লাগবে না মা, শরীরটা এখন আগের চেয়ে ভালো লাগছে।নিশানাথ বাবু বিছানায় যে পড়লেন। ক্লান্ত গলায় বললেন, বাতিটা নিভিয়ে দিয়ে যাও, মা। আলো চোখে লাগছে।দীপা বাতি নিভিয়ে ঘর থেকে বেরুলেন। তাঁকে খানিকটা চিন্তিত মনে হল। নিশানাথ বাবুর স্বপ্নের ব্যাপারটা তাঁর ভালো লাগল না। তিনি কোথায় যেন শুনেছেন, মানুষ পাগল হবার আগে আগে একই স্বপ্ন বারবার দেখে।
রাতে নিশানাথ বাবুর প্রবল জ্বর এল। জ্বরের প্রকোপে তিনি থরথর করে। কাঁপতে লাগলেন। দারোয়ান তাঁর রুমের বাইরেই ক্যাম্প খাট পেতে শুয়েছে। নিশানাথ বাবু বেশ কয়েক বার ডাকলেন, এই কুদ্দুস, এ-ই। এই কুদ্দুস মিয়া। দারোয়ানের ঘুম ভাঙল না। দারোয়ানদের সাধারণত খুব গাঢ় ঘুম হয়।ভোর হবার ঠিক আগে আগে তাঁর জ্বর ছেড়ে গেল। শরীরটাও কেমন ঝরঝরে মনে হল। সামান্য ক্লান্তির ভাব ছাড়া আর কোনো সমস্যা নেই। তিনি বাগানে বেড়াতে গেলেন। ভোরবেলার এই ভ্ৰমণ তাঁর কাছে বড়োই আনন্দদায়ক মনে হল।
সূর্য ওটার পর হাত মুখ ধুতে গিয়ে অবাক হয়ে লক্ষ করলেন তাঁর মাথায় একটিও চুল নেই। এক রাত্রিতে মাথার সব চুল উঠে গেছে। কেন এরকম হল তিনি বুঝতে পারলেন না। কি অদ্ভুত দেখাচ্ছে তাকেসামান্য চুল মানুষের চেহারা যে এতটা বদলে দিতে পারে, তা তিনি আগে কখনো ভাবেন নি। নিজেকে দেখে তাঁর নিজেরই খুব হাসি পেতে লাগল। তিনি প্রথমে মৃদু স্বরে তারপর বেশ শব্দ করেই হেসে উঠলেন। তাঁর হাসির শব্দে কৌতূহলী হয়ে কুদুস উকি দিল। তার চোখে ভয়-মেশানো দৃষ্টি। কুদ্দুস বলল, কি হইছে মাস্টর সাব?
কিছু হয় নি কুদ্দুস। হাসছি।নিশানাথ বাবুর হঠাৎ মনে হল, কুদ্দুস মনে মনে তাকে পাগল বলে ডাকছে। এরকম মনে হল কেন? তিনি স্পষ্ট শুনলেন কুদুস বলছে, আহা মানুষটা পাগল হইয়া যাইতেছে। আহা রে।কুদ্দুস।জ্বি।তুমি মনে মনে কী ভাবছিলে?
কিছু ভাবছিলাম না মাস্টর সাব। আফনের মাথার চুল বেবাক গেল কই? পড়ে গিয়েছে। আমাকে দেখতে কেমন অদ্ভুত লাগছে, তাই না কুদ্দুস? মনে হচ্ছে আমি একটা ভূত। শ্যাওড়া গাছে থাকি।কুদ্দুস জবাব দিল না।নিশানাথ অবির হাসতে শুরু করলেন। কুদুস চোখ বড়ো বড়ো করে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তুষার এবং রাত্রির জন্যে আজ খুব শুভদিন।আজ বাবা তাদের স্কুলে নামিয়ে দেবেন। মাসে এক দিন মহসিন সাহেব তার ছেলেময়েদেরকে স্কুলে নামিয়ে দেন এবং স্কুল থেকে ফেরত আনেন। ফেরত আনার সময় খুব মজা হয়। বাচ্চারা যা চায় তাই তিনি করেন। তুষার যদি বলে–বাবা আইসক্রিম খাব তাহলে তিনি আইসক্রিম পার্লারের সামনে গাড়ি দাঁড় করান।
রাত্রি একবার বলেছিল—সাভার স্মৃতিসৌধ দেখতে ইচ্ছা করছে বাবা। মহসিন সাহেব বলেছেন–চল যাই, দেখে আসি। তখন ঝনঝম বৃষ্টি হচ্ছে। রাস্তায় পানি। মহসিন সাহেব তার মধ্যে গাড়ি ঘুরিয়েছিলেন।আজও নিশ্চয়ই এরকম কিছু হবে। রাত্রি ঠিক করে রেখেছে ফেরার পথে সে বাবাকে বলবে গল্পের বই কিনে দিতে। তুষার এখনো কিছু ঠিক করতে পারে নি। কী চাওয়া যায় সে ভেবে পাচ্ছে না। এই জন্যে তার খুব মন খারাপ।গাড়িতে ওঠার মুহূর্তে মহসিন সাহেব বললেন, আজ স্কুলে না গেলে কেমন হয়?
তুষার ভেবে পেল না–বাবা ঠাট্টা করছেন, না সত্যি সত্যি বলছেন।মহসিন সাহেব বললেন, মাঝে মাঝে স্কুল পালানো ভাল। আমি যখন তুষারের মতো ছিলাম তখন স্কুল পালাম।রাত্রি বলল, সত্যি বাবা? হুঁ সত্যি।স্কুল পালিয়ে কী করতে? মার্বেল খেলতাম। আমাদের সময় সবচেয়ে মজার খেলা ছিল মার্বেল। এখন আর কাউকে খেলতে দেখি না। তোমরা কেউ মার্বেল দেখেছ?
না।চল, দোকানে গিয়ে খুজব। যদি পাওয়া যায়, তোমাদের জন্যে কিনব। কীভাবে খেলতে হয় শিখিয়ে দেব। আজ সারা দুপুর মার্বেল খেলা হবে।আনন্দে তুষারের বুক কাঁপতে লাগল। আজ কী ভীষণ সৌভাগ্যের দিন, স্কুলের ইংলিশ গ্রামার শেখা হয় নি। তার জন্যে আজ আর বকা খেতে হবে না।রাত্রি অবশ্যি তুষারের মতো এত খুশি হল না। স্কুল তার খুব ভালো লাগে। স্কুলে তার দুজন প্রাণের বন্ধু আছে। তাদের সঙ্গে কথা না বললে রাত্রির ভালো লাগে না।
মহসিন সাহেব বললেন, তোমরা যাও, আলোকে নিয়ে এস। ব্যাটালিয়ান নিয়ে রওনা হওয়া যাক।তুষার বলল, ও যাবে না, বাবা।তুমি তাকে গিয়ে জিজ্ঞেস কর, না জিজ্ঞেস করেই বলছ কেন যাবে না। যেতেও তো পারে।কখনো তো যায় না।যেতেও তো পারে। আমার কাছে নিয়ে এস, আমি বুঝিয়ে সুজিয়ে রাজি করাব।আলো মাকে ছেড়ে কখনো কোথাও যায় না। এই বাড়ির দেয়ালের বাইরে পা ফেলতেই তার আপত্তি।
বাধ্য হয়ে যদি কখনো যেতে হয় চোখমুখ শক্ত করে রাখে। একটু পরপর চমকে উঠে। অচেনা কাউকে দেখলেই এমন ভাব করে যাতে মনে হয় সে কোনো একটি বিচিত্র কারণে ভয় পাচ্ছে।মহসিন সাহেব খুব খুশি হলেন। কারণ আলো যেতে রাজি হয়েছে। গাড়িতে তিনি আলোকে তার পাশে বসালেন।রাত্রি এবং তুষার বসল পেছনের সীটে। রাত্রি বলল, তুমি কিন্তু আস্তে গাড়ি চালাবে, বাবা। তুমি এত স্পীডে গাড়ি চালাও যে ভয় লাগে।আজ রিকশার চেয়েও আস্তে চালাব।
রাত্রি এবং তুষার দুজনই খিলখিল করে হেসে উঠল। আলো মুখ ঘুরিয়ে তাকাল। সে হাসির কোনো কারণ বুঝতে না পেরে অস্বস্তি বোধ করছে। আলোর মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। কত মজার মজার ব্যাপার চারদিকে হয়, সে কিছু বুঝতে পারে না। তাকে কেউ বুঝিয়ে দিতেও চেষ্টা করে না। এই দুজন এত হাসছে কেন? আলোর কান্না পেতে লাগল। সে অবশ্যি কাঁদল না। চোখ-মুখশক্ত করে বসে রইল।মহসিন সাহেব বলরেন, আজ আমি এক হাতে গাড়ি চালাব। সাঁই সই বন বন।রাত্রি বলল, আরেকটা হাত দিয়ে তুমি কী করবে বাবা?
আরেকটা হাত আমি আলো মায়ের কোলে ফেলে রাখব।এই কথায় দুজন আবার হেসে উঠল। আলো এদের হাসিহাসি মুখ গাড়ির ব্যাকভিউ মিররে দেখতে পাচ্ছে। তার আরো মন খারাপ হয়ে গেল। এরা এত আনন্দ করছে কেন? গাড়ি চলতে শুরু করেছে। মহসিন সাহেব দুই হাতেই স্টিয়ারিং হুইল ঘোরাচ্ছেন। স্লো স্পীডে তিনি গাড়ি চালাতে পারেন না। দেখতে দেখতে গাড়ি ফোর্থ গিয়ারে চলে গেল।
তুষার বলল, বাবা।বল।তুমি কি আজ সকালে স্যারকে দেখেছ, বাবা? না।দেখলে তুমি হাসতে হাসতে মরে যেতে।কেন? স্যারের মাথায় একটা চুলও নেই। সব পড়ে গেছে।তাই নাকি? হুঁ। স্যারকে কী যে অদ্ভুত দেখাচ্ছে। রাত্রি ফিক করে হেসে ফেলেছে। হাসাটা কি উচিত হয়েছে, বাবা?
মোটেই উচিত হয় নি।আমিও হেসেছি। তবে মনে মনে। কেউ দেখতে পায় নি।তুমি খুবই বুদ্ধিমানের কাজ করেছ।ওর সব চুল পড়ে গেল কেন, বাবা? বয়স হয়েছে তো, সেই জন্যে পড়ে গেছে। বয়স হলে মাথার চুল পড়ে যায়।কেন পড়ে যায়? মাথার চুল হচ্ছে মাথা ঠাণ্ডা রাখার জন্য। বুড়ো মানুষদের মাথা ঠাণ্ডা রাখার দরকার নেই, তাই চুল পড়ে যায়।দাঁত পড়ে যায় কেন, বাবা?
Read more
