ভেরি গুড। ছোকরা খারাপ না ভালই। কমিউনিটিং সেন্টার ভাড়া নিয়েছ? না নিয়ে থাকলে নিও না। হাফ খরচে বাড়ির সামনে প্যান্ডেল খাটিয়ে ব্যবস্থা করে দেব। নো প্রবলেম।
মুনা হেসে ফেলল। বাকের অবাক হয়ে বলল, হাসছ কেন?
বেকার যুবকরা সামান্য একটা কাজ পেলে কেমন লাফিয়ে ওঠে তাই দেখে হাসছি।
বাকের মিইয়ে গেল। মুনা বলল, আইসক্রিম খাব না। তবে চা খেতে পারি। আশপাশে ভাল চায়ের দোকান আছে?
আশপাশে না থাকলেও কোনো অসুবিধা নেই। আমার সঙ্গে মোটর সাইকেল আছে।
কি আছে?
মোটর সাইকেল। ভটভটি।
মোটর সাইকেলে আপনার পিছনে বসে চা খেতে যাব? পাগল হয়েছেন নাকি? আশপাশে কোথাও চায়ের স্টল থাকলে চলুন যাই।
তোমার অফিস নেই?
না ছুটি নিয়েছি।
কি জন্যে?
ঘুরে বেড়াবার জন্যে।
বাকের কিছুই বুঝতে পারল না। খুঁজে পেতে চায়ের স্টল একটা বের করল। মেয়েদের জন্য কেবিন আছে। মুনা ঠোট উল্টিয়ে বলল, কোন নরকে নিয়ে এসেছেন আপনি?
কি করব, ভাল কিছু নেই এদিকে। উঠে পড়বে?
এসেছি যখন চা খেয়েই যাই।
আমি একটা সিগারেট ধরালে তোমার অসুবিধা হবে মুনা?
না অসুবিধা হবে না।
বাকের খুব কায়দা করে সিগারেট ধরাল এবং এই সঙ্গে খুব সাবধানে মানিব্যাগটা ঠিক আছে কিনা দেখল। চা খাবার পর যদি দেখা যায় মানিব্যাগ আনা হয়নি। কিংবা পকেট মারা গেছে তাহলে সর্বনাশ। মেয়েমানুষের কাছে হাত পাততে হবে। বেইজ্জাতি ব্যাপার হবে।
চাটা ভালই বানিয়েছে কি বল মুনা?
ভাল কি দেখলেন এর মধ্যে আপনি? বমি আসছে।
কফি খাবে? কফি পাওয়া যায়। এক্সপ্রেস কফি।
না। যথেষ্ট হয়েছে। আপনি তাড়াতাড়ি শেষ করুন।
বাকের কোনো রকম তাড়া দেখাল না। তার ইচ্ছা করছে অনন্তকাল এই ঘুপসি ঘরটাতে বসে থাকতে।
মুনা।
বলুন।
মামুন সাহেবের সঙ্গে তোমার ঝগড়া হয়েছে নাকি?
ঝগড়া হবে কেন?
এমনি জিজ্ঞেস করছি। আগে তো প্রায়ই আসতেন তোমাদের বাসায় এখন আসতে দেখি না।
আপনি কী দিনরাত মানুষের বাসার দিকেই তাকিয়ে থাকেন? কে আসছে কে যাচ্ছে তাই দেখেন?
না তা না। তোমাদের বিয়ে কবে?
হবে শিগগিরই। হলে খবর পাবেন। সস্তায় কোথায় ডেকোরেটর পাওয়া যায়। এইসব খোঁজ তো আপনাকেই করতে হবে।
মুনা অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাসতে লাগল। বাকের বলল, এখন কি বাসায় যাবে?
হুঁ।
চল একটা রিকশা করে দি।
রিকশা আমি নিজে নিয়ে নেব। আপনার যেখানে যাবার যান;
আমার তেমন কোন কাজ নেই। একটা অবশ্যি আছে সেখানে পরে গেলেও কোন ক্ষতি হবে না। বকুলের বিয়ের তারিখ হয়েছে নাকি?
মোটামুটি ভাবে হয়েছে, তেসরা জ্বিলকদ।
জিলকদটা আবার কি?
আরবি মাসের নাম। মোহররমের আগের মাস হচ্ছে জিলকদ। বিয়েশাদিতে আরবি মাস ব্যবহার করা হয় জানেন না?
না জানি না তো।
রিকশায় উঠে মুনার বিরক্তির সীমা রইল না। বাকের মোটর সাইকেলে করে তার পেছনে আছে। ভাবটা এর রকম যেন পাহারা দিতে দিতে যাচ্ছে। একবার ইচ্ছা হল কড়া করে ধমক দেয়। কিন্তু ধমক দিতে মায়া লাগছে। চোখে চশমা পরে কেমন মহাকাপ্তান ভঙ্গি নিয়ে এসেছে চেহারায়। ঠোঁটে আবার একটা সিগারেট কামড়ে ধরা আছে। রিকশাওয়ালা একবার একটু বেশি স্পিড দিয়ে ফেলায় সে বাঘের মতো গর্জন করে উঠেছে–থাবরা দিয়ে মুখ ভোতা করে দেব। একসিডেন্ট করে প্যাসেনজার মারতে চাস নাকি? অত্যন্ত বিরক্তিকর অবস্থা। মাঝে মাঝে আবার দু’হাত ছেড়ে মোটর সাইকেল চালাবার চেষ্টা করছে। এটা বোধ হয় নতুন কোন কায়দা। মুনা ভেবে পেল না। একজন বুদ্ধিমান মানুষ কী করে মাঝে মাঝে এমন বির্বোধের মতো আচরণ করে? নাকি সে ঠিক বুদ্ধিমান নয়? বুদ্ধিমান মানুষ স্বার্থপর হয়। এটাই নিয়ম। টিকে থাকবার জন্যেই তাকে স্বার্থপর হতে হয়। বাকেরকে কী স্বার্থপর বলা যাবে? না বোধ হয়।
বকুলকে আজ তার শাশুড়ি দেখতে আসবেন।
এর মানে কি বোঝা যাচ্ছে না। জহিরের আত্মীয়-স্বজন এর আগে কয়েক দফায় তাকে দেখে গেছে। আংটি পরিয়ে দিয়েছে। বিয়ের তারিখ ঠিক করেছে। এরপর আবার মা আসছেন কেন? টিনা এসে বকুলকে খানিকটা ভয়ও পাইয়ে দিয়েছে। গম্ভীর হয়ে বলেছে, খুব ক্যাটক্যাটে মহিলা। স্কুল মাস্টারি করেছে। কিছুদিন তাই মেজাজ এ রকম হয়েছে। কথাবার্তা সাবধানে বলবি। বেশি কথা বলার দরকার নেই।
বকুল বলল, উনি কী বিয়েটা পছন্দ করছেন না?
না।
বুঝলে কি করে, তোমার সঙ্গে কথা হয়েছে?
না, জহির আমাকে কথায় কথায় বলল; তোর একটা ছবি দিয়েছিল। ভদ্রমহিলা ছবির দিকে না তাকিয়েই বললেন, মেয়ের নাক মোটা।
আমার নাক কি মোটা?
নাক ঠিকই আছে। বুদ্ধি মোটা।
বকুলের মন খারাপ হয়ে গেল। তার বুদ্ধি কম এটা সে নিজেও জানে। যাদের বুদ্ধি বেশি তারা পাটিগণিত ভাল জানে। সে একেবারেই জানে না। মেট্রিকে সে যদি ফেল করে পাটিগণিতের জন্যেই করবে।
ভদ্রমহিলার সন্ধ্যাবেলা আসার কথা। তিনি বিকেলে একা একা চলে এলেন। চল্লিশ-পয়তাল্লিাশ বছর বয়সী একজন মহিলা। লম্বা, ফর্সা, রোগা মাথা ভর্তি ঘন কালো চুল। পান খাবার কারণে ঠোট টকটকে লাল। সাদা সিন্ধের শাড়ি পরেছেন। শাড়ির ওপর নীলের ওপর সাদা কাজ করা একটা চাদর। তাকে দেখে মনেই হয় না তার এত বড় একটা ছেলে আছে। তিনি রিকশা থেকে নেমেই বললেন, খুব ফার্সা ফর্সা শুনেছি, তুমি কিন্তু মা একটু কালো।
মুনা হেসে ফেলল।
আপনি ভুল মেয়েকে দেখেছেন। ফার্সা মেয়ে ঘরে আছে। আমার নাম মুনা। আমি বকুলের মামাতো বোন।
ভদ্রমহিলা মোটেই অপ্রস্তুত হলেন না। আরো শক্ত করে মুনার হাত চেপে ধরলেন। মুনার মনে হল ইনি ইচ্ছে করেই ভুলটা করছেন। তিনি ভালই জানেন এই মেয়ে তার ছেলের পছন্দের মেয়ে নয়। ছবি দেখেছেন অন্যদের কাছে শুনেছেন।
মুনা, তোমার নাম?
জি।
তোমার কথা আমি জহিরের কাছে শুনেছি।
কি শুনেছেন?
তুমি নাকি খুব শক্ত মেয়ে।
আপনার কাছে কি সে রকম মনে হচ্ছে?
হ্যাঁ হচ্ছে। আমি নিজেও বেশ শক্ত মেয়ে। জহিরের চার বছর বয়সে তার বাবা মারা গেলেন। তারপর আমিই এদের এত দূর টেনে তুললাম। শক্ত মেয়ে না হলে কি এটা সম্ভব তুমিই বল।
বকুলকে দেখে তিনি তেমন কোন উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেন না। গল্প করতে লাগলেন শওকত সাহেবের সঙ্গে। ঘর-বাড়ির গল্প, জমিজমার গল্প। পঞ্চাশ বিঘা জমি আছে তার। জমির বিলি ব্যবস্থা নিয়ে যে সব সমস্যা হচ্ছে তার গল্প। ঘুরে ঘুরে প্রতিটি ঘর দেখলেন।
কে কোথায় ঘুমায় আগ্রহ করে জানতে চাইলেন। শওকত সাহেবের স্ত্রীর বাধানো ছবি দেখে বললেন, বেয়ান সাহেব তো খুব সুন্দর ছিলেন। ছেলেমেয়েরা কেউ তাঁর মতো হয়নি।
মুনা এক ফাঁকে বলল, বকুলকে কি আপনার পছন্দ হয়েছে?
তিনি শীতল গলায় বললেন, আমার পছন্দ-অপছন্দের তো কোনো ব্যাপার না। জহির পছন্দ করেছে, বিয়ে হচ্ছে ওর পছন্দে।
তার মানে আপনার পছন্দ হয়নি?
না মা হয়নি। আমার দরকার ছিল তোমার মত একটা মেয়ে। শক্ত, তেজী। বকুল সে রকম না। কোনো একটা ঝামেলা হলেই এ মেয়ে ভেঙে পড়বে। আমার সংসার হচ্ছে মা ঝামেলার সংসার।
কিসের এত ঝামেলা আপনার?
আছে অনেক। বলব সবই।
বকুলের ভদ্রমহিলাকে ভাল লাগছে না। ইনি এত কথা বলছেন কেন? একজন বয়স্ক মানুষ বয়স্ক মানুষের মত থাকবেন। হড়বড় করে এত কথা বলবেন কেন? তাছাড়া উনার জমিজমার সমস্যা। সে সব পৃথিবী সুদ্ধ মানুষকে জানানোর দরকার কী? বকুল রান্নাঘরে চলে এল। মুনা খাবার-দাবারের ব্যবস্থা করছে। সবই বাইরের খাবার। ঘরের বলতে পায়েস। সেটা এত মিষ্টি হয়েছে যে মুখে দেয়া যাচ্ছে না।
আপা!
বল।
ভদ্রমহিলাকে তোমার কেমন লাগছে?
ভালই।
এত সাজগোজ করেছেন কেন বল তো?
সাজগোজ কোথায় দেখলি?
আমার ভাল লাগছে না আপা। তার এই সমস্যা সেই সমস্যা। এ সব শুনতে কি কারো ভাল লাগে।
যা চা দিয়ে আয়।
আমি পারব না।
বাজে কথা বলবি না। নে ট্ৰে’টা ধর।
বকুল ট্রে নিয়ে মুখ কালো করে বের হবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বাবু এসে বলল, আপা, মামুন ভাই এসেছে। বসার ঘরে বসেছে। মুনা সহজ স্বরে বলল, গিয়ে বল ঘরে অনেক মেহমান অন্যদিন যেন আসে।
বাবু নিচু স্বরে বলল, এটা আমি বলতে পারব না আপা। বলতে হলে তুমি বলবে।
মামুন জড়সড় হয়ে বসে ছিল। তার হাতে এক হাঁড়ি দই। আসার পথে কি মনে করে সে এক হাঁড়ি দই কিনে ফেলেছে। এর জন্যে নিজেই সে খানিকটা বিব্রত বোধ করছে। মিষ্টি, দই এসব কিনে কারো বাড়ি যাওয়াটাই অস্বস্তিকর। নিজেকে কেমন জামাই জামাই মনে হয়। মুনা এসে ঢুকল। মামুন হাসতে চেষ্টা করল। হাসিটা ঠিক ফুটিল না। কোথায় যেন আটকে গেল।
তোমাদের বাড়িতে কি হচ্ছে? কেউ এসেছে নাকি?
হুঁ। বকুলের বিয়ে হচ্ছে। ওর শ্বশুর বাড়ি থেকে এসেছে।
বকুলের বিয়ে হচ্ছে নাকি?
হুঁ।
এত তাড়াতাড়ি যে?
ভাল ছেলে পাওয়া গেছে বিয়ে দিয়ে দেয়া হচ্ছে।
এটা খারাপ না। একদিক দিয়ে ভালোই। আমি তাহলে বরং অন্যদিন আসি। কথা ছিল তোমার সঙ্গে।
কথা থাকলে এখনি বল। আবার আসার দরকার কি?
আর আসার দরকার নেই, কি বল তুমি?
একবার তো বলেছি তোমাকে।
শোন মুনা, ঠাণ্ডা মাথায় একটা কথা শোন। ঠাণ্ডা মাথায় কথা বল।
আমি যা বলছি ঠাণ্ডা মাথায় বলছি।
আচ্ছা ঠিক আছে, একটা কথা রাখ, তুমি বরং আরো মাসখানেক নিজের মতো থাক। মাসখানেক আমি তোমাকে বিরক্ত করব না।
ভাল।
গ্রামের বাড়িতে চলে যাচ্ছি। মাসখানেক ওখানে থাকব। চাকরি ছেড়ে দিচ্ছি।
মুনা চুপ করে রইল। মামুন সিগারেট ধরাল একটা। নিচু গলায় বলল, বাসা যেটা নিয়েছিলাম সেটা থাকবে। ভাড়া দিয়ে যাব। তোমার রাগ ভাঙলে বিয়ে করে ঐ বাড়িতে গিয়ে উঠব। উঠি এখন?
এসেছ যখন বস। চা খেয়ে যাও।
আচ্ছা খেয়েই যাই। তোমাদের জন্যে দই এনেছিলাম। দইটা নাও।
মুনা দই হাতে রান্নাঘরে চলে গেল। বাবুকে দিয়ে চা এবং পায়েস পাঠিয়ে দিল। মামুন চা খেয়ে বেশ খানেক সময় একা একা বসে রইল। একসময় বাবু ঢুকল। মামুন নড়েচড়ে বসল।
বাবু কেমন আছ?
ভাল আছি।
তোমার যে মাথাব্যথা হত। সেটা সেরে গেছে, না এখনো মাঝে মাঝে হয়?
হয় মাঝে মাঝে।
তুমি যেন কোন ক্লাসে পড়?
ক্লাস সেভেন।
বাহ ভাল তো। সাঁতার জানো তুমি?
না।
আমাদের গ্রামের বাড়িতে বিরাট পুকুর আছে। নিয়ে যাব তোমাকে। সাঁতার শিখিয়ে দেব, দুদিনে শিখিয়ে দেব।
বাবু কিছু বলল না। বকুলের শ্বশুর বাড়ির আরো কিছু লোকজন এল এ সময়। সবই মেয়ে মানুষ। এরা সরাসরি ভেতরে চলে গেলেন। বাবুও উঠে ভেতরে চলে গেল। মামুন থাকল আরো খানিকক্ষণ। একটা টিকটিকি উঁকি দিচ্ছে।-কৌতূহলী হয়ে তাকে দেখছে। বিশাল তার সাইজ। সম্ভবত এটা তক্ষক।
বিদেয় নেবার আগে মুনাকে বলে যাওয়া দরকার কিন্তু মুনা আসছে না। হয়ত আর আসবে না। মেহমানদের নিয়ে ব্যস্ত। মামুনের মনে হল মুনার রাগ কিছুটা কমেছে। আজকের ব্যবহার তো খুব সহজ ও স্বাভাবিক। নিজ থেকেই চা খেয়ে যেতে বলল। রাগ কমে যাবে। নিশ্চয়ই কমবে। এক মাস দীর্ঘ সময়। আদর্শন কোন না কোন ভাবে মন দ্রবীভূত করায় একটা ভূমিকা নেবে।
মামুন বসেই রইল। কাউকে না বলে চলে যাওয়াটা ভাল দেখায় না। টিকটিকিটা এখনো তাকে দেখছে।
বাকেরের বড় ভাই হাসান সাহেব ফাইন্যান্সের জয়েন্ট সেক্রেটারি লোকটি শান্ত প্রকৃতির।
কখনো কোনো ব্যাপারে সামান্যতম উত্তেজনাও তার আচার-ব্যবহারে প্রকাশ পায় না। অফিস শেষে সরাসরি বাসায় ফেরেন। দোতলা থেকে পারতপক্ষে নিচে নামেন না। মাঝে মাঝে বারান্দায় গম্ভীর মুখে বসে থাকেন।
আজও তেমনি বসে ছিলেন। আজ তার মুখ শুধু গভীর নয় কিছুটা বিষগ্নও। বারান্দায় বসে থাকলে সাধারণত তার হাতে খবরের কাগজ কিংবা কোনো ম্যাগাজিন থাকে। আজ তাও নেই। তার ফর্সা গাল কিঞ্চিৎ লাল হয়ে আছে। আজ তাদের একটি নাটক দেখতে যাবার কথা। তিনি কিছুক্ষণ আগে সেলিনাকে জানিয়ে এসেছেন, তিনি যাবেন না। সেলিনা ব্লাউজ ইন্ত্রি করছিলেন। নাটকে যেতে হবে এই উপলক্ষেই শাড়ির রঙ মিলিয়ে ব্লাউজটি আজই কেনা হয়েছে। রঙ মিলছিল না। বহু ঝামেলা করে পাওয়া গেছে। তিনি কিছুক্ষণ আগেই ব্লাউজ ধুয়েছেন। ভেজা কাপড়টি এখন ইন্ত্রি করে করে শুকান হচ্ছে। এখন দেখা যাচ্ছে নাটকেই যাওয়া হবে না। তার স্বভাব-চরিত্র হাসান সাহেবের মত নয়। তিনি অল্পতেই রাগেন। আজও রাগলেন। রাগ প্রকাশ না করে বললেন, কেন যাবে না? হাসান সাহেব বিরস মুখে বললেন, যেতে ইচ্ছা করছে না।
কেন ইচ্ছা করছে না। সকালেও তো বললে যাবে। আমি ইয়াসিনকে পাঠিয়ে টিকিট আনালাম। দুপুরে টেলিফোন জিজ্ঞেসও করলাম। তখনো বললে যাবে।
শরীরটা ভাল লাগছে না।
আমি তো খারাপ কিছু দেখছি না। আমার কাছে তো তোমার শরীর ভালই মনে হচ্ছে।
হাসান সাহেব কথা না বাড়িয়ে বারান্দায় চলে গেলেন। কাজের মেয়েটি চা নিয়ে এল। অন্য সময় সেলিনা চা নিয়ে আসতেন। তিনি চায়ে বেশি চিনি খান। কাজের মেয়েটির সেই আন্দাজ নেই। চায়ে চুমুক দিয়ে তাঁর মেজাজ খারাপ হল। কিন্তু তিনি কিছু বললেন না।
আজ অফিসে একটা ঝামেলা হয়েছে। সামান্য ঝামেলা নয় বড় রকমের ঝামেলা। এক মন্ত্রীর সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়েছে। সামরিকান্স সরকারের মন্ত্রী, এদের মেজাজ উঁচু তারে বাধা থাকে, সারাক্ষণই মনে করে তাদের যোগ্য সম্মান দেয়া হচ্ছে না। এই মন্ত্রীটি পান খেতে খেতে হাসান সাহেবের ঘরে ঢুকেই বললেন, এগারটার সময় আপনাকে দেখা করতে বলেছিলাম।
হাসান সাহেব বিনীত ভাবে বললেন, আমি স্যার গিয়েছিলাম। আপনি ব্যস্ত ছিলেন। কাদের সঙ্গে যেন কথা বলছিলেন।
ব্যস্ত তো থাকবই। এয়ারকন্ডিশন্ড ঘরে বসে ঠাণ্ডা বাতাস খাবার জন্যে তো মন্ত্রী হই নাই। অপেক্ষা করতে পারলেন না?
আধঘণ্টা অপেক্ষা করেছি।
আধঘণ্টা অপেক্ষা করেই আপনার মাথায় ব্যথা হয়ে গেল। নিজের ঘরে তো বসেই থাকেন। কাজকর্ম তো কিছু করেন না।
হাসান সাহেব শীতল গলায় বললেন, কাজকর্ম প্রসঙ্গে আপনি যা বলছেন তার জনো প্রয়োজনীয় তথ্য কি স্যার আপনার আছে?
তথ্য? আপনি তথ্য কপচাচ্ছেন আমার সাথে। একজন মন্ত্রীকে আপনি কি মনে করেন?
মন্ত্রীকে মন্ত্রীই মনে করি এর বেশি কিছু মনে করি না।
আপনারা সিএসপি রা মিলে দেশটাকে নষ্ট করেছেন। এটা জানেন?
না। স্যার আমার জানা ছিল না।
দেশের কমন মানুষ আপনাদের ধারে কাছে যেতে পারে না। নিজেদেরকে আপনার একজন লাট-বেলাটি ভাবেন।
আপনি এসব কি বলছেন?
একজন মন্ত্রী আপনাকে কল দিয়েছে আপনি দশ মিনিট অপেক্ষা করতে পারেন না? আপনি কি জানেন চব্বিশ ঘণ্টার ভেতর আমি আপনার চাকরি খেতে পারি?
স্যার এটা আমার জানা ছিল না।
মন্ত্রী কোনো কথা না বলে ঘর ছেড়ে চলে গেল। ডেপুটি সেক্রেটারি। আমিনুল ইসলাম বললেন, আপনি স্যার চলে যান, ক্ষমা চেয়ে আসুন। ক্ষমা চাইলেই এরা পানি হয়ে যায়।
হাসান সাহেব বিরক্ত স্বরে বললেন, ক্ষমা চাওয়ার মত কিছু হয়নি।
সময় খারাপ স্যার।
তা খারাপ।
ঝামেলা টামেলা হতে পারে।
আগে হোক। তারপর দেখা যাবে।
বাকি সময়টায় অফিসের কোনো কাজে তার মন বসেনি। এখনো বসছে না। বারান্দায় বসে থেকে মেজাজ খারাপ হচ্ছে। সেলিনার সঙ্গে গল্পটল্প করলে ভাল লাগত। সেলিনার মেয়েলি গল্প শুনতে তার খারাপ লাগে না। সেলিনা আসবে না। তাকে রাগিয়ে দিয়েছেন। হাসান সাহেবের মনে হল নাটক দেখতে না যাওয়াটা অন্যায় হচ্ছে। আগে থেকে প্রোগ্রাম করা। প্রোগ্রাম ঠিক রাখা উচিত। জীবনযাত্ৰা ওলট-পালট করে ফেলবার মত কিছু হয়নি।
তিনি সেলিনার ঘরে ঢুকলেন। হালকা গলায় বললেন, চল নাটক দেখে আসি। এখনো নিশ্চয়ই সময় আছে।
তোমার শরীর সেরে গেল?
হুঁ সেরেছে। এখন ভালই লাগছে। সাতটার সময় শুরু হবার কথা না? সাড়ে ছটা বাজে। আধঘণ্টা আছে এখনো। চট করে তৈরি হয়ে নাও। পারবে না?
সেলিনা হাসিমুখে বললেন, পারব। তুমি কি ভাব দুতিন ঘণ্টা লাগিয়ে আমি সাজগোজ করি? সেলিনার মুখে রাগের চিহ্নও নেই। তার এই গুণটি হাসান সাহাবের খুব পছন্দ। রাগ করে বেশিক্ষণ থাকতে পারে না। হাসান সাহেবের মনে হল তাদের দু’একটা ছেলেমেয়ে থাকলে মোটামুটি একটি সুখের সংসার হত। সেটা কখনো সম্ভব হবে না।
বাকের জলিল মিয়ার চাযের স্টলের বাইরে টুল পেতে বসে ছিল। ভাই এবং ভাবীকে আসতে দেখে সে অন্য দিকে তাকিয়ে রইল। যাতে চোখে না পড়ে। চোখে চোখ পড়লেই দেড় টাকা দামের সিগারেটটা ফেলে দিতে হবে। ভাইয়া হয়ত হাত ইশারা করে ডাকবে। কাছে গেলেই গম্ভীর মুখে বাণী-টানী দিবে। এরচে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকাই ভাল।
সেলিনা বললেন, তোমার মাস্তান ভাইকে দেখেছ?
হুঁ।
সেও আমাদের দেখেছে, এখন এ রকম ভান করছে যেন দেখতে পায়নি।
এটাই স্বাভাবিক। বাবার সঙ্গে আমার যখন দেখা হত। আমিও এ রকমই করতাম না। না দেখার ভান করতাম।
তোমার ভাই তোমার মতই হয়েছে, তাই বলতে চাও?
হাসান সাহেব কোন কথা বললেন না। রাস্তার মোড়ে রিকশার জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলেন। কোথাও যাবার তাড়া থাকলে কখনো রিকশা পাওয়া যায় না। সেলিনা বললেন, তোমার গাড়ি কেনার কী হল?
টাকা কোথায়?
প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে লোন নেবে বলেছিলে? ব্যাংকেও তো কিছু আছে।
দেখি।
দেখাদেখি না। রোজ এমন রিকশা করে ঘোরাঘুরি করতে ভাল লাগে না।
হাসান সাহেব চুপ করে রইলেন। একটা খালি রিকশা দ্রুতগতিতে আসছে। এর তাড়া দেখে মনে হয় না। এ থামবে। কিন্তু হাসান সাহেবকে অবাক করে দিয়ে রিকশা থামল। রিকশাওয়ালা গম্ভীর গলায় বলয়, উঠেন।
আমরা বেলি রোডে যাব। যাবে তুমি?
যেখানে কন হেইখানে যামু। আমারে পাঠাইছে বাকের ভাই। উঠেন।
সারাপথ দু’জন কোনো কথা বললেন না। রিকশাওয়ালা অনবরত কথা বলে গেল।
দশ টাকা সের চাইল কেমনে চলুম কন দেহি। ছয়জন খানেওয়ালা। বড় মাইয়ার বিয়া দেওন দরকার। ক্যামনে দিমুকন? রিকশার জমা হইছে আফনের চল্লিশ টাকা। টায়ার ফাটলে হেই খরচ আমার, শিক ভাঙলেও আমার। আহন কন দেহি ভাইজান ক্যামনে চলি? আপনে বিচার-বিবেচনা কইরা কন।
হাসান সাহেব বিচার-বিবেচনা করে কিছুই বললেন না। পরিষ্কার বুঝতে পারছেন যা ভাড়া তার ওপর গোটা পাঁচেক টাকা দিতে হবে বকশিস। লম্বা দুঃখের পাঁচালী শুনবার এটা হবে খেসারত।
কিন্তু রিকশাওয়ালা কোন পয়সাই নিল না। চোখ কপালে তুলে বলল, না না ভাড়া দেওনের দরকার নাই। বাকের ভাই পাঠাইছে।
সেলিনা তিক্ত গলায় বললেন, আর সাধাসাধি করতে হবে না। তোমার বিখ্যাত ভাই পাঠিয়েছে পয়সা সে নেবে কেন? দেরি হচ্ছে চলে আস। ঘণ্টা দিয়ে দিয়েছে। শুরুটা মিস করতে চাই না।
বাকের সন্ধ্যা পর্যন্ত জলিল মিয়ার দোকানে বসে রইল। তার সঙ্গে আছে মাখন এবং কুদ্দুস। দু’জনই গাঁজা টেনে এসেছে। বিকট গন্ধ ছড়াচ্ছে। মাখন কিছু-একটা নিয়ে চিন্তিত । সে কিছু বলছে না। কিন্তু ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে বলবে। সে দেরি করছে। কারণ তার বক্তব্য বাকেরের পছন্দ হবে না বলেই মনে হচ্ছে। গাজা টেনে আসার কারণে কুন্দুসের গলা শুকিয়ে আছে। সে কিছুক্ষণ পর পর খুথু ফেলবার চেষ্টা করছে। থুথু আসছে না। জলিল মিয়া দোকানের কাজকর্মের ফাঁকেও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখছে। এই টেবিলে। দিন দশেক আগে কোন রকম কারণ ছাড়াই কুদ্দুস এবং মাখনের মধ্যে এই চায়ের দোকানেই ধুন্ধুমার লেগে গিয়েছিল। চারটা কাপ এবং দু’টা গ্লাস ভেঙেছে। একটা চেয়ারের পায়া ভেঙেছে। আজও লেগে যেতে পারে। তবে ভরসার কথা হচ্ছে বাকের ভাই আছে। তার সামনে এরা কিছু করতে সাহস পাবে না। জলিল মিয়া দাঁত বের করে বলল, বাকের ভাই, চা দিতে কাই? বাকের কিছু বলল না। মাখন বলল, সিগারেট আনান জলিল মিয়া।
জলিল বিরসমুখে পাঁচটা টাকা বের করে সিগারেট আনতে পাঠাল। মাখন বলল, বাকের ভাই একটা কথা ছিল।
কি কথা?
প্রাইভেট কথা।
বলে ফেল।
মাখন গলা নিচু করে ফেলল। কানের কাছে মুখ এগিয়ে নিয়ে বলল, ধোলাইয়ের ব্যবস্থা করতে হয়। সিদ্দিক সাহেবের রিকোয়েস্ট।
ব্যাপারটা কি?
ভাড়াটে উঠে না। ধানাই-পানাই করছে। এখন বলছে, উঠব না মামলা করে উঠাও। শালা, মামলার ভয় দেখায়। সিদ্দিক ভাই খুব রেগেছেন। আমাকে বললেন, তোমরা থাকতে এই অপমান!
বাকের ঠাণ্ডা গলায় বলল, এর মধ্যে অপমানের কী আছে? মামলা করতে বলছে মামলা করুক।
বাকের ভাই, ব্যাপারটা বুঝতে পারছেন না। আমরা থাকতে মামলা-মকদ্দমা কি? শালাকে একটু কড়াকে দিলে কালই বাসা ছেড়ে দিবে।
সিদ্দিক সাহেবের কাছ থেকে কত নিয়েছিস?
টাকা-পয়সার কোন ব্যাপার না। খাতিরে কাজটা করে দিচ্ছি। আর কি।
খুব পিতলা খাতির জন্মাচ্ছিস ব্যাপারটা কি?
ব্যাপার কিছু না। ব্যাপার আবার কি? উঠিয়ে দেই শালাকে। কি বলেন বাকের ভাই?
বাকের কিছু বলল না। মনে মনে খুশিই হল। একটা কাজ করবার আগে এরা তাকে জিজ্ঞেস করছে। মান্যগণ্য করছে। তবে সিদ্দিক সাহেবের ব্যাপারটার বোঝা যাচ্ছে না। তাকে বাদ দিয়ে অন্যদের কাছে যাচ্ছে। কয়েক’দিন আগে রাস্তায় দেখা হল এমন ভাব করল যে চিনতে পারছে না।
কুদ্দুস বহু কষ্টে একদলা থুথু ফেলে বলল, পাঁচটা টাকা দেন বাকের ভাই। পকেট খালি।
বাকের দশ টাকার নোট দিয়ে গম্ভীর মুখে বেরিয়ে গেল। এখন বাজছে আটটা। সাধারণত আটটার দিকে কম্পাউন্ডওয়ালা বাড়িতে লোকজন আসে। আজও আসবে হয়ত। কারা আসছে লক্ষ্য রাখা দরকার।
গেটের কাছে জোবেদ আলি দাঁড়িয়ে আছে। বাকেরকে দেখে সে আড়ালে সরে গোল
বাকের উঁচু গলায় ডাকল, এই যে ভাই আছেন কেমন?
ভাল।
ঘর অন্ধকার কেন? লোকজন নাই?
দাওয়াতে গেছে।
দাওয়াত কোথায়?
জানি না কোথায়? এত সব জিজ্ঞেস করেন কেন?
এক পাড়ায় থাকি। খুঁজে-খবর নিতে হয়। নেন সিগারেট নেন।
বাকের সিগারেটের প্যাকেট হাতে এগিয়ে এল। জোবেদ আলি বলল–আমি সিগারেট খাই না। কথাটা সত্যি নয়। উটের মত মুখের এই লোকটিকে দেখেছি খেতে। ভাম কোথাকার!
মাঝে-মধ্যে সিগারেট টানতে দেখি।
জোবেদ আলি গম্ভীর হয়ে গেল। বাকের তার গভীর মুখ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে বলল, মেয়েরা ভর্তি হয়েছে কলেজে?
কি বললেন?
মেয়েরা কলেজে ভর্তি হয়নি? আপনি বলছিলেন ভর্তি হবে।
জানি না কিছু।
বোধ হয় হয়নি। কোথাও তো যেতে-টোতে দেখি না। আচ্ছা ভাই যাই, বিরক্ত করলাম। খাবেন একটা সিগারেট?
না।
