শেখ তবারক আলীকে কিছু একটা বলে কথার মােড় ঘুরিয়ে দেবেন সে রকম কোনাে বিষয়ও তিনি খুঁজে পেলেন না। আবু জুনায়েদের পা দুটো মাটির সঙ্গে গেঁথে যাচ্ছিল । ঠোট শুষ্ক হয়ে আসছিল। বারবার তিনি জিভ দিয়ে ঠোট চাটছিলেন।
অবশেষে ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল। শেখ তবারক আলী জানালেন, তিনি মরার আগে বানুর স্বামীকে উপাচার্যের আসনে দেখে গেলেন এটাই তাঁর সান্ত্বনা । তবারক আলীর প্রতি আবু জুনায়েদের মনােভাবটাই পাল্টে গেল।
তবারক আলী ইচ্ছে করলে মাত্র একটি বাক্য উচ্চারণ করে আবু জুনায়েদের মান ইজ্জত ধুলােয় লুটিয়ে দিতে পারতেন, কিন্তু তিনি কথাটি বলেননি। আবু জুনায়েদ তবারক আলীকে অত্যন্ত মহানুভব মানুষ মনে করলেন ছাত্রীনিবাসের নির্মাণ কাজ দেখে ফিরে আসার সময় তিনি শেখ তবারক আলীকে খাওয়ার নিমন্ত্রণ জানিয়ে গেলেন। শেখ তবারকও সেই নিমন্ত্রণ কবুল করেছিলেন।
তারপর সম্পূর্ণ একটা ভিন্ন পরিস্থিতিতে আবু জুনায়েদের সঙ্গে শেখ তবারক আলীর মুলাকাত ঘটল। একদিন তিনি তার অফিসে ফ্যাকাল্টির ডীনদের নিয়ে বহিরাগত মস্তানদের উৎপাত ঠেকানাের উপায় উদ্ভাবন করার বিষয়ে মিটিং করছিলেন ।
মিটিং চলাকালীন সময়ে একেবারে দরজা ঠেলে শেখ তবারক অফিস কক্ষে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন এবং বললেন আমাকে বাঁচান। তাঁর চুল উস্কোখুসকো । পাজামার অর্ধেক কাদায় ভরে গেছে। শরীর থরথর করে কাঁপছিল।
মুখ দিয়ে ঠিকমতাে স্বর বেরুচ্ছিল না। ঠিকাদার সাহেবের এই করুণ অবস্থা দেখে সকলে। ভীষণ হতবাক হয়ে গেলেন। আলােচনায় আপনাআপনিই ছেদ পড়ে গেল। সকলেই উৎকণ্ঠাসহকারে জানতে চাইলেন, কী ঘটেছে? শেখ তবারক আলী বললেন, তিনি পানি খাবেন। এক গ্লাস পানি এনে তাকে দেয়া হল ! সবটা পানি নিঃশেষ করার পর বললেন, আরাে এক গ্লাস পানি। আরাে এক গ্লাস তাকে দেয়া হল, তারপর আরেক গ্লাস।
গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(৭)
শেখ তবারক আলীর নিশ্বাস-প্রশ্বাস কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। শরীরের কাপুনিও অনেকটা কমেছে। কিন্তু চোখ থেকে আতঙ্কের ভাবটা এখনাে কাটেনি। যা হােক, কিছুক্ষণের মধ্যে তিনি পুরােপুরি বােধশক্তি ফিরে পেলেন। এই অবস্থায় তাকে সুসজ্জিত অফিসে দেখে তিনি ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। ঝোঁকের বশে তিনি একপেয়ে জুতাে নিয়ে উপাচার্যের অফিনে চলে এসেছেন। বাকি একপাটি জুতাে কোথায় ফেলে এসেছেন বলতে পারেন না মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদ তাকে আশ্বস্ত করার জন্য বললেন
আপনি বিচলিত হবেন না। কী হয়েছে বলুন
স্যার এই মাত্র আমার একজন ওভারসীয়রের ভান পায়ে গুলি করা হয়েছে। তাকে হাসপাতালেও নিয়ে যেতে দিচ্ছে না। এক লাখ পঁচিশ হাজার টাকা ক্যাশ তাদের হাতে তুলে না দিলে, তারা আহত ওভারসীয়রের কাছে কাউকে ঘেঁষতেও দিচ্ছে না। এই মুহূর্তে আমার হাতে অত টাকা নেই। অনেক কাকুতিমিনতি করেছি। কোনাে কথাই কানে তুলছে না। বেচারী বিধবা মায়ের একমাত্র সন্তান। এই হারে রক্তপাত চলতে থাকলে মারা যাবে । আপনারা দয়া করে কিছু একটা করুন।
সমাজ বিজ্ঞান অনুষদের ডীন ড: শামসুল হুদা জিজ্ঞেস করলেন আপনি পুলিশকে জানাননি?
পুলিশকে জানাব কি? পুলিশের চোখের সামনেই তাে তারা ওভারসীয়রকে টেনে নিয়ে ডান পায়ে গুলি করেছে এবং ঘােষণা দিয়েছে আড়াইটার মধ্যে যদি তাদের দাবি না মেটাই তাহলে তারা বাম পায়ে গুলি করবে । আমাকেও খোঁজাখুঁজি করছিল কিন্তু পালিয়ে আসতে পেরেছি।
পুলিশ যেখানে কিছু করছে না, আমরা কী করতে পারি? আমাদের এখতিয়ারে তাে আর এমন সৈন্য-সামন্ত নেই যে, মস্তান-গুণ্ডাদের ঠেকাতে পারি। আপনি আইজির কাছে যান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে যান, প্রধানমন্ত্রীর কাছে গিয়ে নালিশ করুন, তারা একটা বিহিত করবেন। আমরা কী করব, কী করতে পারি?
গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(৭)
ড. হুদার এই বক্তব্যের জবাবে শেখ তবারক আলী অনেক কথা বলতে পারতেন। তিনি বলতে পারতেন আইজির কাছে গেলে আইজি বলবেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনাে কিছু ঘটলে সেখানে পুলিশের নাক গলানাের অধিকার নেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ৩ দিনে পাওয়া যাবে না। তার মতাে একজন সামান্য ঠিকাদার কী করে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যােগাযােগ করবেন। সেসব কিছুই উল্লেখ না করে বললেন-স্যার একজন মানুষের জীবন, আপনারা এ মুহূর্তে কিছু না করলে ছেলেটা মারা যাবে। তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে দু’হাত দিয়ে সরাসরি উপাচার্যের পা দুটো চেপে ধরলেন ।
আহ করেন কী বলে আবু জুনায়েদ তিড়িং করে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর আবু জুনায়েদের কাছ থেকে যে আচরণ স্বপ্নেও কেউ আশা করেননি তাই করে বসলেন। তিনি বললেন
হুদা সাহেব দয়া করে আমার সঙ্গে চলুন, বজলু সাহেব আসুন, একজন মানুষ মারা যাচ্ছে কী করে আমরা চুপ করে থাকতে পারি ।
স্যার ওই বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তাে সব সময়েই মানুষ মারা যাচ্ছে, কী করতে পেরেছি আমরা? গেলে আমাদেরও তাে গুলি করতে পারে । তাদের দাবি টাকা, ভালাে কথা শুনবে কেন?
আবু জুনায়েদ গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাড়িয়ে বললেন, তখন হুদা সাহেব আপনার দার্শনিক বক্তব্য। আমাদের কিছু একটা এ মুহূর্তে করতে হবে। তারপর তিনি গট গট করে হেঁটে অফিস থেকে বেরিয়ে এলেন। সেই সভায় আগত মাননীয় ডীনদের সকলকে অগত্যা আবু জুনায়েদের পিছু পিছু আসতে হল। উপাচার্যের অফিসের পিয়ন, চাপরাশি, দারােয়ান, কেরানী থেকে শুরু করে সমস্ত অফিসার কেউ কৌতুহলের বশবর্তী হয়ে, কেউ চাকরিগত বাধ্যবাধকতার কারণে আবু জুনায়েদকে অনুসরণ করলেন। বের হবার আগে আবু জুনায়েদ ব্যক্তিগত সহকারীকে হাসপাতালে ফোন করে এ্যাম্বুলেন্স পাঠাতে বললেন। সকলে বেরিয়ে যাচেচ্ছন, অথচ শেখ তবারক আলী চৌকাঠ ধরে স্থানুর মতাে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। আবু জুনায়েদ শেখ তবারককে উদ্দেশ করে বললেন | একি আপনি দাঁড়িয়ে রইলেন যে। শেখ তবারক আবার আবু জুনায়েদের পা ধরতে উদ্যত হলেন। আবু জুনায়েদ একটু সরে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন আপনি এসব করেন কী?
গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(৭)
স্যার আপনাদের সঙ্গে আমাকে দেখলে মনে করবে আমি আপনাদের ডেকে নিয়ে এসেছি। তারা চটে গিয়ে আমার বাড়িতে হামলা করবে। আমার পুত্র কন্যাদের খুন করে ফেলবে ।।
সেদিন আবু জুনায়েদের হস্তক্ষেপে ওভারসীয়রটি প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন। তিনি আহত ব্যক্তিকে অবস্থা আয়ত্তের বাইরে যাওয়ার আগে হাসপাতালে পাঠাতে পেরেছিলেন। আবু জুনায়েদের শত্রুরাও স্বীকার করেন এটা আবু জুনায়েদের একটা সাহসী কাজ। এই কাজটি কেন তিনি করতে পেরেছিলেন, আবু জুনায়েদের একটি নিজস্ব ব্যাখ্যা আছে। তিনি যখন বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করেন, এভাবে যুক্তি দাঁড় করান।
শেখ তবারক আলী সেদিন ইচ্ছে করলে তার মান-সম্মান ধুলােয় লুটিয়ে দিতে পারতেন। তিনি ফাস করে দিতে পারতেন আৰু জুনায়েদ শ্বশুরের টাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছেন।
বলতে পারতেন একেবারে সাধারণ খেটে খাওয়া পরিবার থেকে তিনি এসেছেন। আবু জুনায়েদের জীবন বৃত্তান্ত যে বিশ্ববিদ্যালয়ের তাঁর সহকর্মীদের কাছে অজানা এটা মােটেও সত্যি নয়। এখানে সকলে সকলের হাঁড়ির খবর জানেন। প্রকৃত সত্যটা অনেক সময় রঙচঙে হয়ে প্রকাশ পায়। আবু জুনায়েদের বিপক্ষের লােকেরা তাঁর নামে সাম্প্রতিককালে যে অপপ্রচার চালাচ্ছেন, তার সঙ্গে প্রকৃত তথ্যের অনেক গড়মিল আছে।
বিরুদ্ধবাদীরা বলে থাকেন, আবু জুনায়েদ অন্যের টাকায় পড়াশােনা করেছেন, একথা সঠিক। কিন্তু তিনি মেয়েটিকে বিয়ে না করে কন্যার পিতা ভদ্রলােককে প্রতারিত করেছেন। যা হােক, আবু জুনায়েদ মনে করেন শেখ তবারক তার একটা উপকার করেছেন। তিনি ওভারসীয়রকে হাসপাতালে পাঠিয়ে একটু প্রত্যুপকার করেছেন মাত্র। তার সঙ্গে সাহস মহানুভবতা ওসবের কোনােই যােগ নেই।
গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(৭)
একদিন রাত নটার দিকে শেখ তুবক লী মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদকে টেলিফোন করলেন । ধরেছিলেন নুরুন্নাহার বনু হ্যালাে কে বলতেই ও প্রান্ত থেকে দরদী মােলায়েম কণ্ঠস্বর ধ্বনিত হল ।
-কে বানু? | নুরুন্নাহার বানু একটু চমকালেন। আব্বা মারা যাওয়ার পর তাঁকে এ নামে সম্বােধন করার কোনাে মানুষ এ দুনিয়াতে আছে তিনি জানতেন না । আম্মা তাঁকে বানু টানু বলেন না। সরাসরি নুরুন্নাহার বলেই ডাকেন। ইদানীং টেলিফোনে তার বিরক্ত বিরক্ত কর্তৃত্বব্যঞ্জক কণ্ঠস্বর প্রকাশ করে এক ধরনের গােপন আনন্দ অনুভব করতেন।
একটু রাগত স্বর, একটু বিরক্তি, একটু কর্তৃত্বের ভাব না দেখালে মানুষ তাকে আলাদা করে চিনে নেবে কীভাবে । নুরুন্নাহার বানুর ধারণা উপাচার্যের স্ত্রীদের কণ্ঠস্বর একটু উত্তাপ একটু ঝাঝ থাকা ভালাে। আবু জুনায়েদ টেলিফোনের রিসিভার কানে লাগিয়ে যেভাবে বিনয়ে বিগলিত হয়ে মিনি মিনি করে কথা বলেন, দেখলে নুরুন্নাহার বানুর পিত্তি জ্বলে যাওয়ার উপক্রম হয়।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষক কর্মচারী সব মিলিয়ে তিরিশ পঁয়ত্রিশ হাজার মানুষের নায়ক এবং চালক হলেন মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদ। নুরুন্নাহার বানু মনে করেন, তুমি যদি একটু ধমক ধামক দিতে না পারাে, একটু রাগ একটু হুঙ্কার না দিতে পারাে, তাহলে উপাচার্য হওয়ার মজা কোথায়। নুরুন্নাহার বানু বালিকা বয়সে থানার একজন সামান্য দারােগাকেও বাঘের মতাে হুঙ্কার ছাড়তে দেখেছেন।
আবু জুনায়েদ এত বড় একটি বিশ্বব্যিালয়ের এক নম্বর মানুষ, অথচ তার কণ্ঠে রাগ ঝাল নেই। | আবু জুনায়েদের স্থলে নুরুন্নাহার বানু যদি দায়িত্বভার গ্রহণ করতেন, তাহলে প্রথম চোটেই তিনি যে সকল মেয়ে ঘরে ঢুকে তাকে অপমান করে গেছে তাদের খোপার চুল কেটে কপালে লােহা পুড়িয়ে সারা জীবন অক্ষয় থাকে এমন দাগ বসিয়ে দেয়ার হুকুম দিতেন।
গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(৭)
খারাপ মানুষদের কপালে একটা স্থায়ী দাগ থাকা উচিত। নুরুন্নাহার বানু মনে করেন, যে সকল মেয়ে তার বাড়িতে চড়াও হয়েছিল, বাথরুমের কমােড, জানালার কাচ এবং ডাইনিং হলের বেসিন চুরমার করেছে আর নুরুন্নাহার বানুকে বিবস্ত্র করে ফেলেছিলেন, তাদের বেশিরভাগই নষ্টা এবং খারাপ মেয়ে মানুষ ।
নষ্টা না হলে কি কেউ আচমকা এসে এমন জঘন্য কাণ্ড করতে পারে । এভাবে চিন্তা করলে নুরুন্নাহার শাস্তিযােগ্য ব্যক্তিদের তালিকা অনেক দীর্ঘ হয়ে দাঁড়ায়। তার মধ্যে প্রথমে আসবেন তাদের পাশের ফ্ল্যাটে যে ফাত্তাহ সাহেব থাকতেন তার স্ত্রী রহিমা খাতুন। রহিমা খাতুনের ছাগল একাধিকবার তার তরকারী বাগান খেয়ে ছারখার করেছে। নালিশ করলে জবাবে রহিমা খাতুন সােজা সাপটা জানিয়ে দিয়েছিলেন নুরুন্নাহারের বাগান ভক্ষণ করার জন্যেই রহিমা খাতুন ছাগল পুষেছেন । তারপরে আসে ওপরতলার সালমা বেগম ।
সালমা বেগমের পােষা মুরগি একবার ঘরে ঢুকে নুরুন্নাহার বানুর কালােজিরে চাল সবটা খেয়ে ফেলেছিল। নুরুন্নাহার বানু যদি চাল ডাল এসব মুরগির নাগালের বাইরে রাখেন তাহলে কষ্ট করে পুনরায় তাকে নালিশ করতে আসতে হবে না এই বাজা মহিলাটির এমন জবাব শুনে নুরুন্নাহার বানুর ব্রহ্মতালু পর্যন্ত জ্বলে উঠেছিল, কিন্তু বাদানুবাদ করেননি। ঠিক করেছিলেন সুযােগ পেলে আস্ত মুরগিটাই জবাই করে হালাল করবেন। সেই পুণ্য কর্মটি সমাধা না করেই তাকে উপাচার্য ভবনে চলে আসতে হয়েছে ।
নুরুন্নাহার বানুর সবচেয়ে বেশি আক্রোশ আবু আবদুল্লাহর মাকাল চেহারার ঢ্যাঙা ছেলেটির ওপর। একদিন চারদিক থেকে অন্ধকার কেঁপে এসেছে। সেই কার্তিকের মিহি হিমের সন্ধ্যেয় দেখেছেন তার আদরের মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরে আবু আবদুল্লাহর মাকাল ছেলেটা চুমু খাচ্ছে। আর মেয়েটি বাঁশের কঞ্চির মতাে এঁকে বেঁকে যাচ্ছে। এই সংবাদটি তিনি আবু জুনায়েদের কাছেও প্রকাশ করতে পারেননি। কেবল মেয়েটিকে চুল ধরে টেনে এনে মারতে মারতে আধমরা করে ছেড়েছিলেন।
গাভী বিত্তান্ত -পর্ব-(৭)
আবু আবদুল্লাহর মাকাল ছেলেটিকে তার ফাঁসিতে লটকাবার ইচ্ছে হয়েছিল । সে আকাঙ্ক্ষাটিও এখনাে মরেনি। এরকম ছােট বড় অনেক খেদ অনেক ক্ষোভ তার মনে ফোস্কা ফেলতে থাকে । তার স্বামীরত্নটি বিশ্ববিদ্যালয়ের দণ্ডমূণ্ডের কর্তা। কিন্তু তাকে দিয়ে নুরুন্নাহার বানুর কোন কাজটি হয়েছে, কোন শখটি পূরণ হয়েছে? নুরুন্নাহার বানু মনে করেন, একেবারে চালচুলােহীন পরিবারের সন্তান বলেই তাঁর স্বামীটির এমন মেন্দামারা স্বভাব ।
স্বামীটি ওরকমই থেকে যাবে। নুরুন্নাহার বানুকে মনের জ্বালা, মনের ভেতর পুষে যেতে হবে। টেলিফোনে তার কণ্ঠস্বরে ঝাঁজ এবং বিরক্তি প্রকাশ হয়ে পড়ে, কারণ তাঁর অবদমিত দুঃখ যন্ত্রণাগুলাে প্রাণ পেয়ে উঠতে চায় ।
শেখ তবারক আলীর বানু সম্বােধন শুনতে পেয়ে নুরুন্নাহার বানুর সমস্ত অস্তি ত্বের মধ্যে ঢেউ খেলে গেল। একটি আওয়াজ শােনামাত্রই তাঁর শৈশব, তার কৈশাের দৃষ্টির সামনে মূর্তিমান হয়ে উঠল । শরীর ভেদ করে প্রথম রক্তপাতের ঘটনাটি তার মনে পড়ে গেল। বানু, বানু, কে ডাকে, কে ডাকে? সেই ভাবাবেশমাখা কণ্ঠেই জবাব দিলেন ।
-জ্বী আমি বানু, আপনি কে বলছেন? -আমি তােমার তবারক চাচা, আমার কথা তােমার মনে আছে?
-কী যে বলেন চাচা আপনার কথা মনে থাকবে না? কতদিন পর আপনার গলার আওয়াজ শুনলাম। আনন্দে নুরুন্নাহার বানুর নাচতে ইচ্ছে হল, দুঃখে কাঁদতে ইচ্ছে হল ।
-হা মা দিন বসে থাকে না। তােমার সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল তােমার বিয়ের দিন। প্রায় চব্বিশ পঁচিশ বছর হয়ে গেল । -চাচা আপনি কোথেকে বলছেন, চলে আসুন আমার আপনাকে দেখার খুব ইচ্ছে করছে।।
-শেখ তবারক জবাব দিলেন আমি তাতে আমার অফিস থেকে বলছি। জামাই মিয়া কি আমার কথা কিছু বলেননি।
-আপনাদের জামাইয়ের সঙ্গে দেখা হল কখন? -বানু আমি তাে এখন জামাইর অধীনে করছি । -চাচা আপনি কী যে বলেন
-ঠিকই বলছি বানু, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের কনস্ট্রাকশন কাজ করছি। জামাই আমাকে তােমার বাড়িতে খাওয়ার দাওয়াত করেছিলেন। সব সময় টেনশনের মধ্যে থাকেন, বােধহয় ভুলে গিয়ে থাকবেন।
Read more
