তরুর লেখা ডায়েরি।পঙ্গু চাচার (ওসমান সাহেব) পরামর্শ আমার পছন্দ হয়েছে। ঠিক করেছি ডিটেকটিভ উপন্যাসই লিখব। নির্ভেজাল একজন ভালো মানুষের হাতে খুন হয়েছে দুজন তরুণী। তারা দুই বোন। এই দুজনকেই ভদ্রলোক বিয়ে করেছিলেন। ছোট বোনের গর্ভে একটি মেয়ে জন্মায়। মেয়েটিকে ভদ্রলোক অত্যন্ত পছন্দ করেন। এই মেয়েটিই হত্যা রহস্যের সমাধান করে।আমি কিছু খোঁজখবর নেয়া শুরু করি। বড় মামাকে টেলিফোন করি। তিনি থাকেন রাজশাহীতে। ফিসারিতে কাজ করেন। হঠাৎ আমার টেলিফোন পেয়ে তিনি খুবই অবাক।তরু মা! কেমন আছ গো?
ভালো আছি মামা।হঠাৎ টেলিফোন কেন গো মা? একটা ইনফরমেশন জানতে চাচ্ছি। আচ্ছা মামা আমার মা কিভাবে মারা গিয়েছিলেন? তুই তো জানিস কিভাবে মারা গেছেন।জানি। হার্টফেল করেছেন। বাবা ঘুম থেকে উঠে দেখেন তার প্রাণপ্রিয় পত্নী চেগায়ে পড়ে আছে।এইভাবে কথা বলছ কেন মা? তোমার সমস্যা কি?
কোনো সমসায় নেই। আচ্ছা মামা বড় খালা কিভাবে মারা গিয়েছিলেন?এইসব কেন জিজ্ঞেস করছিস? তিনিও তো হার্টফেল করে মারা গেছেন। ঠিক না? বাবা ঘুম থেকে উঠে দেখেন বড় খালা মরে চেগায়ে পড়ে আছেন।তরু প্রোপার ল্যাংগুয়েজ প্লিজ।মামা তোমাদের কি একবারও মনে হয় নি—এই দুজনের মৃত্যুই স্বাভাবিক না!স্টপ ইট।
মামা এরকম কি হতে পারে যে বাবা এই দুই মহিলাকেই খুন করেছেন। তোমরা আমার কথা ভেবে চুপ ক্রে গেছ। পুলিশ বাবাকে ধরে নিয়ে গেলে আমার কি গতি হবে এটা ভেবে।তরু! মাথা থেকে উদ্ভট চিন্তাভাবনা দূর করে।আচ্ছা যাও দূর করলাম। এখন বলো তুমি কখনোই আমাদের বাসায় আস না। এর কারণ কি। নানিজনও আসেন না।মা আসবে কিভাবে। মা মারা গেছে না?
যখন বেঁচেছিলেন তখনো তো আসেন নি। আমাকে দেখতে ইচ্ছা করলে গাড়ি পাঠাতেন। গাড়ি আমাকে নিয়ে যেত।তরু কোনো কারণে তোমার কি মনটন খারাপ? আমার কাছে চলে আসো। কয়েক দিন থাকবে। তোমাকে নিয়ে পদ্মার পারে ঘুরব। পদ্মার চড়ে ক্যামপ ফায়ার করব। তোমার মামির সঙ্গে কথা বলবে?
মামির সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করছে না মামা।আজেবাজে চিন্তা করবে না। খবর্দার না।এই পর্যন্ত লেখার পর তরুকে উঠতে হলো। কারণ বাসায় আনিস নামের কে যেন এসেছে। কার্ড পাঠিয়েছে। কার্ডে লেখা–
আনিসুর রহমান
বি এ (অনার্স)
শৌখিন অভিনেতা।
টিভি, বেতার এবং চলচ্চিত্র
তরু ভেবেই পাচ্ছে না একজন শৌখিন অভিনেতা তার কাছে কি চায়। ভদ্রলোকের বুদ্ধিবৃত্তি নিম্ন পর্যায়ের বলেই মনে হচ্ছে। শৌখিন অভিনেতার ভিজিটিং কার্ড ছাপায়ে এবং নামের শেষে বি এ অনার্স লিখবে কি জন্যে। বিএ অনার্স কি এমন কোনো বিদ্যা যে কার্ড ছাপিয়ে জাহির করতে হবে! তরুকে দেখে আনিসুর রহমান বিএ অনার্স উঠে দাঁড়াল। তরু বলল, বাবার কাছে এসেছেন? জি। শুনেছি উনার শরীর খারাপ। হাসপাতালে ছিলেন। দেখতে এসেছি।তুরু বলল, খালি হাতে এসেছেন? হরলিক্সের কৌটা, ডাব, কমলা এইসব কিছু আনেন নি?
আনিস বিস্মিত হয়ে বলল, জি না।তরু বলল, আপনার সঙ্গে ঠাট্টা করছিলাম। কিছু মনে করবেন না।আমি কিছু মনে করি নি। তবে খালি হাতে আশা অবশ্যই ঠিক হয় নি।তরু বলল, বাবা ভালো আছেন। কাজকর্ম করে বেড়াচ্ছেন। এখন আপনাকে আমি চিনতে পারছি। বাবা আপনার কাঠের দোকানে অসুস্থ হয়ে পড়েন। আপনি তার যথেষ্ট সেবাযত্ন করেছেন।তেমন কিছু কিন্তু করি নি।
তরু বলল, বাবা জ্বরের ঘোরে ছিলেন তো। আপনার সমস্যাটাই তার কাছে অনেক বড় মনে হয়েছে। বাবা ৰাসায় ফিরেই আমাকে বলেছেন—তোর জন্যে একটা ছেলে দেখে এসেছি।আনিস পুরোপুরি হকচকিয়ে গেল। কি সহজভাবেই মেয়েটা এইসব কথা বলছে। কোনো দ্বিধা নেই—কোনো সংকোচ নেই।তরু বলল, চা খাবেন।আনিস বলল, খেতে পারি।তরু বলল, খেতে পারি বলার অর্থ অনিচ্ছার সঙ্গে খেতে রাজি হচ্ছি। আপনি আগ্রহের সঙ্গে চা খেতে চাইলেই আপনাকে চা দেব।আনিস বলল, আমি আগ্রহের সঙ্গেই চা খেতে চাচ্ছি।
তরু বলল, আপনি হয়তো ভেবেছেন চা খেতে খেতে কিছুক্ষণ আমার সঙ্গে গল্প করবেন। তা হচ্ছে না। আমি এক্ষুনি আপনার কাছ থেকে বিদায়। নিয়ে চলে যাব। কাজের মেয়ে আপনাকে চা দেবে। আপনি একা একা চা খাবেন। উঠে চলেও যেতে পারবেন না। নিজেকে মনে হবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গাধা। আমি যাচ্ছি, আপনার চা এক্ষুনি চলে আসবে।
আনিসকে চা দেয়া হয়েছে। সে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে। সত্যি সত্যি নিজেকে সে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গাধা ভাবছে। একটাই সান্ত্বনা মেয়েটা তাকে চমকে দিয়েছে। কিছুক্ষণের জন্য হলেও এরকম একটা মেয়ের সঙ্গে কথা বলার আনন্দ তুচ্ছ করার মতো না।তরু ছাদে এসেছে। ওসমান সাহেব হুইল চেয়ারে ছাদে ঘুরপাক করছেন। তিনি তরুকে দেখেই বললেন, হ্যালো মিসট্রি।
তরু বলল, হ্যালো।কিছু বলতে এসেছ? না-কি এম্নি সৌজন্য সাক্ষাৎ।তরু বলল, আমি ডিটেকটিভ উপন্যাস লেখা শুরু করেছি।ভেরি গুড।ধার করা উপন্যাস।ধার করা মানে? আপনার প্লটটা নিয়ে লিখছি। এক ভদ্রলোকের হাতে দুই স্ত্রী খুন। তিনি তৃতীয় একজনকে বিয়ে করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তখনই গল্পের শুরু।ইস্টারেস্টিং প্লট।তরু বলল, ইন্টারেস্টিং প্লটে আপনার ভূমিকাটা বুঝতে পারছি না।ওসমান বললেন, আমার ভূমিকা মানে?
ডিটেকটিভ উপন্যাসে আপনিও একটা চরিত্র। আপনাকে কিভাবে ফিট করব বুঝতে পারছি না।আমাকে ফিট করার দরকার কি?এত বাড়িঘর থাকতে আপনি আমাদের এখানে থাকতে এলেন কেন? বাবার সঙ্গে আপনার সম্পর্কটা কি? বাবা অবশ্যই আপনার বন্ধু মানুষ না। বাবাকে কখনোই আপনার সঙ্গে গল্প করতে দেখি না। দুজনের যোগাযোগটা কিভাবে হলো।তোমার উপন্যাসে এই সব তথ্য দরকার?
অবশ্যই দরকার।ওসমান দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বললেন, খুঁজে বের করো। একজন ডিটেকটিভ এই কাজটাই করেন।তরু বলল, আপনি কি আমার মা বা বড় খালাকে চিনতেন? তোমার মাকে চিনতাম।তরু বলল, আপনি কি আপনার স্ত্রীর টেলিফোন নাম্বার দেবেন। আমি তার সঙ্গে কথা বলব।কি কথা বলবেঃ ঠিক আছে যে কথা বলতে ইচ্ছা করে বললো। টেলিফোন নাম্বার দিচ্ছি।তরু বলল, আপনার অস্বস্তি বোধ করার কোনো কারণ নেই। আমি আপনার সামনেই কথা বলব।কে? আমার নাম তরু?
তরুটা কে? ওসমান চাচা আমাদের বাড়ির ছাদে থাকেন। আমার বাবার নাম খালেক।কি চাও তুমি? অনেক দিন আপনি আসেন না। এই জন্যে টেলিফোন করেছি। আবীর কি ভালো আছে? হ্যাঁ সে ভালো আছে। রাখি কেমন। এখন একটু ব্যস্ত। বাসায় গেস্ট।ওসমান বলল, ডিটেকটিভ কর্মকাণ্ডে কিছু পেয়েছ। কোনো ক্লু?
তরু বলল, পেয়েছি।কি পেয়েছ? একজন ডিটেকটিভ কারো সঙ্গে শেয়ার করেন না।ওসমান বললেন, শায়লা মেয়েটা তোমাদের বাড়িতে কি স্থায়ী হয়ে গেছে? তরু বলল, সে রকমই মনে হচ্ছে।খালেক রাতে খেতে বসে বললেন, আনিস এসেছিল? তরু বলল, হ্যাঁ।ছেলে কেমন? ভালো।খালেক বললেন, এ রকম একটা ছেলের সন্ধানেই আমি আছি। Good person. Very good person. আমি খোঁজ লাগায়েছি।কি খোঁজ?
চব্বিশ ঘণ্টা আমার স্পাই তার পিছে ঘুরবে। কোথায় যায়, কি করে, কাদের সঙ্গে মিশে—সব খোঁজ আনবে। যদি দেখি সব ঠিক তাহলে বিসমিল্লাহ শুভ বিবাহ। তোর আপত্তি আছে?না।তোর নিজের পছন্দের কেউ থাকলেও হিসাবে ধরব। আছে কেউ? আছে।খালেক ভুরু কুঁচকে বললেন, কে সে। কি করে? টিচার।তোদের পড়ায়?
হুঁ। চর্যা স্যার। আমাদের চর্যাপদ পড়ায়। বিবাহিত। চার ছেলেমেয়ে। বড় মেয়েটার বিয়ে হয়েছে।খালেক মেয়ের দিকে বেশ কিছু সময় তাকিয়ে থাকলেন। মেয়ের ঠাট্টাতামাশা করার বাজে স্বভাব হয়েছে। বাবার সঙ্গেও ঠাট্টা-তামাশা।তিনি খাবারে মন দিলেন।তরু! কোপ্তা কে বেঁধেছে।শায়লা ভাবী।আমিও তাই ভেনেছিলাম, কাজের মেয়ের রান্না আর ঘরের মহিলার রান্না—-ডিফারেন্স আছে। গ্রেট ডিফারেন্স। মুখে দিলেই বুঝা যায়।তরু বলল, ভালো রান্না বেশিদিন ক্ষেতে পারবে না বাবা। শায়লা ভাবী যে কোনোদিন চলে যাবে।কোখায় যাবে?
তার স্বামী তাকে আয় তুতু করে ডাকবে। সে ছুটে চলে যাবে।খালেক বললেন, এই মহিলা কোনোদিনই যাবে না। কিছু জিনিস বুঝা যায়। এই মহিলার শিকড় এই বাড়িতে বসে গেছে। ঐ দিন দেখলাম ফার্নিচার ঝাড় পোছ করছে। যেন নিজের বাড়ি।তোমার জন্য তো ভালোই।কি ভালো?
তরু বিচিত্র ভঙ্গিতে হাসল। খালেক মেয়েকে কঠিন কিছু কথা বলতে গিয়েও বললেন না। যে মেয়ের বিয়ের কথা হচ্ছে তীকে কঠিন কথা বলা যায় না।জামান বারান্দায় মোড়ার উপর শিরদাঁড়া বাঁকিয়ে অদ্ভুত ভঙ্গিতে বসা। তার সামনে আরেকটা মোড়া। সেখানে টিফিন ক্যারিয়ারে সকালের নাশতা। ছোট লাল ফ্লাস্কে চা। সনজু ভীত ভঙ্গিতে একটু দূরে দাঁড়ানো। প্রতিবারই নাশতা নিয়ে তাকে দুলাভাইয়ের কঠিন কথা শুনতে হয়। আজ মনে হয় আরো বেশি শুনতে হবে। পরোটা, বুটের ডাল আর সবজি আনার কথা। সে এনেছে সবজি আর ডিমের ওমলেট। বুটের ডাল পায় নি।
জামান টিফিন ক্যারিয়ার খুলল। খাওয়া শুরু করল। বুটের ডাল নাই কেন এই নিয়ে হম্বিতম্বি শুরু করল না। মনে হয় বুটের ডালের কথা তার মনে নাই।সনজু বলল, চা কাপে ঢেলে দিব দুলাভাই? দাও। চিনি ছাড়া এনেছ তো? জি।চা কাপে ঢালতে গিয়ে সমস্যা হলো। কিছু চা মেঝেতে পড়ে গেল। সনজু নিশ্চিত দুলাভাই এখন গর্জে উঠে বলবেন, সামান্য কাজটাও ঠিকমতো করতে পারো না। সেরকম কিছু বলল না। বরং চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে জামান তৃপ্তির শব্দ করল।চা কোত্থেকে এনেছ? বিসমিল্লাহ হোটেল?
সনজু বলল, না। রাস্তার পাশে ছোট একটা দোকান আছে। চা ভালো বানায়।এখন থেকে এই চা আনবে।জি আচ্ছা।তোমার বোনের সঙ্গে কথাবার্তা হয়? জি না। এটা মিথ্যা। সনজুর সঙ্গে তার বোনের প্রতিদিনই কথা হয়।) জামান বলল, যদি কোনোদিন ঐ মাগীর সঙ্গে কথা বলতে দেখি তাহলে টান দিয়ে জিহ্বা ছিঁড়ে ফেলব। এটা যেন মনে থাকে।জি আচ্ছা।
আমার চোখের সামনে ঐ মেয়ে অন্য লোকের বাড়িতে উঠে গেল। বাজারের মেয়ের যতটুকু লজ্জা-শরম থাকে তার তো তাও নাই। ঠিক বলেছি কি-না বলো।জি।কি শাস্তি দেয়া যায় বলো। তুমিই বলো! তোমার স্ত্রী যদি এ রকম ঘটনা ঘটাত তুমি কি করতে? জানি না দুলাভাই। দুলাভাই দুলাভাই করবে না। আমি আর তোমার দুলাভাই না।জি আচ্ছা।
বেশ্যা মেয়েটাকে এমন এক শাস্তি দিতে হবে যেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মনে থাকে। পাড়ার মাস্তান ছেলেগুলিকে দিয়ে রেপ করালে কেমন হয়? ছয়সাত জন মিলে রেপ করলে জন্মের শাস্তি হয়ে যাবে। ঠিক বলেছি? সনজু জবাব দিল না। জামানের চায়ের কাপ শেষ হয়েছে। সনজু আবার কাপে চা ঢেলে দিল। ফ্লাঙ্কে তিন কাপ চা ধরে। জামান খায় দু কাপ। শেষ কাপটা সনজুর।
জামান সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলল, তুমি এক কাজ করো, মাগীটার কাছে যাও। তাকে বলো শেষ সুযোগ কানে ধরে আমার সামনে দশ বার উঠবোস করবে। চাটা দিয়ে আমার জুতার ময়লা খাবে। একবার চাটলেই হবে। আমি অতীত ভুলে যাব। এখন বলব? হ্যাঁ এখনই যাও। খালেক সাহেব হাসপাতাল থেকে ফিরেছেন? জি।
উনার সামনে বা উনার মেয়ের সামনে কিছু বলবে না। আড়ালে ডেকে নিয়ে বলবে। সময় বেঁধে দিবে। যদি ফিরে আসতে চায় তাহলে সকাল দশটার মধ্যে আসতে হবে। আর একটা কথা বলবে, সেটা হলো—রাগের মাথায় তালাক কোনো তালাক না। সে যেন ভেবে না বসে যে তালাক হয়ে গেছে।
সনজু বের হয়ে গেল। জামান পুরোপুরি নিঃসন্দেহ শায়লা এক্ষুনি চলে আসবে। তার যাবার কোনো জায়গা নেই। খালেক সাহেব বাসা থেকে বের করে দিলে প্রথম কয়েক দিন থাকবে ফুটপাথে। তারপরে স্থান হবে চন্দ্রিমা উদ্যানে। নিজের ভাই হবে দালাল। কাস্টমার ধরে আনবে। দরদাম ঠিক করবে।
শায়লা বলল, এখন যেতে বলেছে? সনজু বলল, সকাল দশটার মধ্যে যেতে বলেছে। তুমি যাবে? হুঁ। অন্যের বাড়িতে কত দিন থাকব? সনজু বলল, দশবার কানে ধরে উঠবোস করতে হবে। জুতা চাটতে হবে। তারপরেও যাবে? শায়লা বলল, আমি নিরুপায়। তুই নিজেই বল আমরা দুইজনই নিরুপায় না?
সনজু কিছু বলল না। চোখ-মুখ শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইল। বড় বোনের গালে চড় দিতে ইচ্ছা করছে। তা সম্ভব না। বড় বোন মায়ের অধিক।শায়লা উঠে দাঁড়াল। সনজু বলল, তরুকে কিছু বলে যাবে না? শায়লা বলল, না। ওকে বললে ও হয়তো যেতে দিবে না। নানান কথা বলবে। কি দরকার? তোর দুলাভাই কি বলেছে? কানে ধরে দশ বার উঠবোস আর জুতা চাটলেই হবে? হুঁ।জানালা দিয়ে দেখলাম বারান্দায় বসে নাশতা খাচ্ছে। এখন মেজজি কেমন? ভালো।
শায়লা বলল, তুই আমার সঙ্গে আসবি না। একটু পরে আয়। তোর সামনে কানে ধরে উঠবোস করতে লজ্জা লাগবে।সনজু বলল, তুমি একাই যাও। আমি দশ মিনিট পরে আসব।সনজু বাড়ির ছাদে উঠে গেল। ওসমান সাহেবের কিছু লাগবে কি-না খোঁজ নেবে। প্রতিদিন সকালে সে এই কাজটা করে। মাসের শেষে ওসমান সাহেব পাঁচশ করে টাকা দেন। টাকাটা সে খরচ করে না, জমায়। সে তার তোষকে একটা ফুটো করেছে টাকা জমানোর জন্যে।
সিঁড়িঘরের সামনে সনজু থমকে দাঁড়াল। তরু চা খেতে খেতে ওসমান সাহেবের সঙ্গে গল্প করছে। ওসমান সাহেবের হাতেও চা। দুজনের মুখ হাসি হাসি। সনজুর হঠাৎ প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ করল। কোমর ভাঙা এই বুড়োর এত কি গল্প তরুর সঙ্গে? সনজু যেখানে দাঁড়িয়েছিল সেখান থেকে একটু সরে গেল। এখন আর তরু বা ওসমান সাহেব তাদের দেখতে পাবেন না। অথচ সে দরজার ফাঁক দিয়ে ঠিকই দেখবে।
ওসমান বললেন, আজ তোমাকে অন্যদিনের চেয়েও বেশি আনন্দিত মনে হচ্ছে। কারণ কি?তরু বলল, কারণ আজ আমাকে দেখতে আসবে।দেখতে আসবে মানে কি? বিয়ের কনে দেখা? হুঁ।ছেলে করে কি?কাঠুরিয়া। কাঠ কাটে।ওসমান বললেন, টিম্বার মার্চেন্ট? তরু বলল, ভদ্র ভাষায় তাই। বাবার উনাকে খুবই পছন্দ। ছেলের নাম আনিস।আনিস?
তরু বলল, হ্যাঁ আনিস। আমার খুবই অপছন্দের নাম। আমাদের ক্যান্টিনের বয়ের নাম আনিস। তার প্রধান চেষ্টা কোনো এক অপার গায়ের সঙ্গে হাত লাগিয়ে দেয়া যায় কি-না। ভাবটা এরকম যে ভুলে লেগে গেছে।ওসমান বললেন, বয়কে দোষ দিয়ে লাভ নেই সমাজের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির এই স্বভাব আছে।
তরু হঠাৎ প্রসঙ্গ পাল্টে গলা নিচু করে বলল, আনিস সাহেব বিকেলে চা কোথায় খাবেন জানেন? আপনার এখানে। আপনার মতামত বাবার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। কাজেই আপনি আনিস সাহেবকে ভালোমতো লক্ষ করবেন। তার আইকিউ-এর অবস্থা বুঝবেন।তুমি বিয়ে করতে চাচ্ছ? চাচ্ছি। ভালো ঔপন্যাসিকের বিয়ের অভিজ্ঞতা দরকার।সত্যি সত্যি ঔপন্যাসিক হবার জন্যে বিয়ের অভিজ্ঞতা চাচ্ছ? হুঁ। আমি কিছুদিন জেলেও থাকতে চাই। জেলের অভিজ্ঞতা লেখালেখিতে সাহায্য করে।কে বলেছে?
স্যার বলেছেন। যে স্যার চর্যাপদ পড়ান—ড. আখলাক। তাঁর নিক নেম হলো ছোঁক ছোঁক স্যার। তিনি মেয়ে দেখলেই ছোঁক ছোঁক করেন। টিউটোরিয়েলে মেয়েরা সবসময় তার কাছে বেশি নাম্বার পায়।মেয়েদের জন্যে তো ভালো।হ্যাঁ ভালো। আপনাকে একটা মজার কথা বলব? বলো।সুতাকৃমি অর্থাৎ সনজু অনেকক্ষণ থেকে দরজার ফাঁক দিয়ে আমাদের দেখছে।কতক্ষণ? বেশ অনেকক্ষণ। আমি এখন কি করব জানেন? ওর দিকে তাকিয়ে ভেংচি কাটব।ভেংচি কাটবে কেন?
ওর মধ্যে টেনশন তৈরি করার জন্যে। ভেংচি খেয়ে সে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাবে এবং সারাক্ষণ চিন্তা করবে ঘটনাটা কি। সাহস করে আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারবে না। সনজু প্রতিদিন চার-পাঁচ বার করে মারা যায়।ওসমান বললেন, তোমার কথার অর্থ ধরতে পারলাম না। প্রতিদিন চারপাঁচবার করে মারা যায় মানে?
তরু বলল, আপনার কাছ থেকেই শুনেছি শেক্সপিয়ার সাহেব বলেন Cowards die many times before their death. সেই অর্থেই সনজু তিন-চার বার মারা যায়।তরু সিঁড়িঘরের দরজার দিকে মুখ ফিরিয়ে বিকট ভেংচি কাটল।ওসমান বললেন, তুমি বেশ ইন্টারেস্টিং মেয়ে। যে তোমাকে বিয়ে করবে সে কখনো বোরও হবে না। তবে তুমি যাকেই বিয়ে করবে তাকে নিয়েই বোরড হবে।তরু হাতের কাপ নামিয়েই বলল, যাই।
ওসমান বললেন, চা তো শেষ হয়নি। চা শেষ করে যাও।তরু বলল, আমি এখনই যাব। আমার ক্ষীণ সন্দেহ সুতাকৃমি চলে যায় নি। দরজার আড়ালে লুকিয়ে আছে, তাকে হাতেনাতে ধরব।সনজু চলে যায় নি। দরজার আড়ালেই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। তরুর সঙ্গে চোখাচোখি হতেই সে বলল, বড় আপা চলে গেছে।তরু বলল, কোথায় গেছে? তোমার দুলাভাইয়ের কাছে? হুঁ।তালাক না হয়েছিল?
সনজু বলল, মুখের তালাক তো। রাগের মাথায় তালাকে কিছু হয় না। দুলাভাই বলেছেন তালাক হতে কোর্টের অর্ডার লাগে।তরু বলল, সব ভালো যার শেষ ভালো। ঠিক আছে তুমি যাও। আড়াল থেকে উঁকি দিও না। আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে কিছু দেখার চেষ্টা করা খুব বাজে ব্যাপার।
সনজু বলল, আপনাকে একটা খবর দেবার জন্যে দাঁড়িয়ে আছি! আজ দুলাভাইকে শিক্ষা দেয়া হবে।তুমি শিক্ষা দেবে? আমার বন্ধুরা দিবে। মেরে তক্তা বানাবে। পেটে একটা ছুরিও ঢুকাবে। এমনভাবে ঢুকাবে যেন কোনো ক্ষতি না হয়। মারা যাবে না।ঘটনা কখন ঘটবে? আজ রাতে।তরু বলল, ঘটনা যে ঘটাবে সে এনাটমি জানে তো? বেকায়দায় ছুরি ঢুকিয়ে মেরে না ফেলে।সনজু বলল, সে এক্সপার্ট।নাম কি?
হারুন। সবাই বলে ক্ষুর হারুন।তরু বলল, ক্ষুরের কাজ ভালো জানে এই জন্যে ক্ষুর হারুন? হুঁ। হারুন ভাই ভালো গান জানে।তাই না-কি? সনজু আগ্রহ নিয়ে বলল, তার আরেক নাম মুনসিগঞ্জের হেমন্ত। মুনসিগঞ্জে বাড়ি তো।ভেরি গুড। গায়কের হাতে মৃত্যু।মারা যাবে না। হারুন ভাই হাতের কাজে খুব সাবধান। ঘটনা ঘটামাত্র আপনাকে খবর দেব।রাত নটা।
তরু বারান্দায় মোড়া পেতে বসে আছে। এখান থেকে বাড়ির গেট দেখা যায়। কে আসছে কে যাচ্ছে সেই খবরদারিও করা যায়। তরুর মেজাজ সামান্য খারাপ। সন্ধ্যাবেলা আনিস এসেছিল। একা না, তার চাচাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছে। তরুকে তাদের এতই পছন্দ হয়েছে যে চাচা মিয়া পাঞ্জাবির পকেট থেকে আংটি বের করে নিমিষেই তরুর হাতে পরিয়ে বলেছেন—সবাই হাত তোলেন। দোয়া হবে। নাটকীয় দোয়া ও দোয়ার মধ্যে গলা কাঁপানো বক্তৃতা আছে। অশ্রুজল আছে।
দোয়া শেষ হবার পর ওসমান বললেন, মেয়ে দেখী অনুষ্ঠানে আমরা সবসময় কিছু ভুল করি।আনিসের চাচা (নাম কবিরুল ইসলাম চোখ সরু করে বললেন, কি ভুল করি?ওসমান বললেন, পকেটে করে একটা আংটি নিয়ে যাই। মেয়ে পছন্দ হলে সঙ্গে সঙ্গে আংটি পরিয়ে দেয়া হয়। পছন্দ না হলে গোপনে আংটি ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।কবিরুল ইসলাম বললেন, তাতে সমস্যা কি?
