সালমা বানু উঠে দাঁড়ালেন। আর্ট টিচার ভদ্রলোক সঙ্গে সঙ্গে খুবই আগ্রহের সঙ্গে বলল–চিনি বেশি দিতে বলবেন। আমি তিন-চার চামচ চিনি খাই। এরচে বেশি হলেও আমার অসুবিধা হয় না। ডায়াবেটিস যখন হবে তখন হবে। এখন থেকে চিনি খাওয়া ছাড়ার কোনো মানে হয় না।
সালমা বানু জবাব না দিয়েই ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন। লোকটা রনির দিকে তাকিয়ে বলল, এই ফাঁকে তোমার মার একটা ছবি এঁকে ফেলা যাক, কী বলো? ভদ্রমহিলা তো আমার ওপর খুবই রেগে আছেন, ছবি দেখে যদি রাগটা কমে।রনি বলল, আপনার জন্যে পেন্সিল আর কাগজ নিয়ে আসব?
লোকটা বলল, কিছু আনতে হবে না। আমার চাদরের নিচে সবকিছু থাকে। বলেই সে প্রথমে একটা পেন্সিল বের করল। তারপরই বের করল কাগজ।কাগজ কুঁচকে ভাঁজ হয়ে আছে। দুই হাত দিয়ে ঘষে ভাজ ঠিক করল। চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ ঝিম ধরে বসে রইল। তারপর অতি দ্রুত ছবি এঁকে ফেলে রনির দিকে কাগজটা এগিয়ে দিয়ে বলল–দেখ তো খোকা, কেমন হয়েছে?
রনির মন বলছিল লোকটা খুব ভালো ছবি আঁকে। দেখা গেল আসলেই সুন্দর ছবি। রাগী মুখে রনির মা বসে আছেন।রনি বলল, ছবিটা খুব সুন্দর।তোমার কি মনে হয় এই ছবি দেখে আমাকে চাকরি দেবে? না। আমারো মনে হয় না। আমার চেহারা তোমার মার পছন্দ হয়নি। মেয়েরা চেহারার ওপর খুব গুরুত্ব দেয়। শেভ করে ভালো কাপড়-চোপড় পরে আসা দরকার ছিল। নামটাও সমস্যা করেছে। মুহাব্বত আলি পছন্দ করার মতো নাম না। যাই হোক, কফি খেয়ে বিদায় নিই। তোমার নাম কী?
আপনি তো আমার নাম জানেন। যখন দরজা খুললাম তখন বললেন, কেমন আছ রনি।রনি নাম জানি। এর মধ্যে নাম বদলে গেল কি-না সেইজন্যে জিজ্ঞেস করা। দেখ না আমার নাম ছিল মুহাব্বত আলি, তিন মিনিটের মধ্যে হয়ে গেল হাব্বত আলি।রনি হেসে ফেলল এবং বুঝতে পারল এই আর্ট টিচারকে তার খুবই পছন্দ হয়েছে।
তোমার বুদ্ধি কেমন? ধাঁধা জিজ্ঞেস করলে পার? মাঝে মাঝে পারি।যে-সব ধাঁধা পার তার দুই একটা বলো তো। তাহলে বুঝব কোন ধরনের ধাঁধা পার।কোন মাছি উড়ে না–ঘামাছি। কোন স্টেশনে গাড়ি থামে না–রেডিও স্টেশন। এইসব।এইসব সহজ ধাঁধা। কঠিন একটা জিজ্ঞেস করি। বলো দেখি—
কহেন কবি কালিদাস শৈশবের কথা।
নয় লক্ষ তেঁতুলগাছে কয় লক্ষ পাতা।
পারব না!
আমিও পারি না। নয় লক্ষ তেঁতুলগাছে কয় লক্ষ পাতা–কীভাবে বলব? একটা তেঁতুলগাছে কয়টা পাতা থাকে গুণে অবশ্যি দেখা যেতে পারে। সময়সাধ্য ব্যাপার।রহিমা বুয়া কফির কাপ নিয়ে ঢুকল। সঙ্গে পিরিচের উপর দুটা বিসকিট। রনি দেখল লোকটা খুব আগ্রহ করে বিসকিট দুটা খেল। কিছু বিসকিটের গুঁড়া পিরিচে পড়ে ছিল। আঙুল দিয়ে জড়ো করে সেগুলিও মুখে দিল। কফির কাপে চুমুক দিয়ে আরামের শব্দ করল। তার মুখভর্তি হাসি। রহিমা বুয়া বলল, কফি খাইয়া আম্মা আফনেরে চইল্যা যাইতে বলছে।আচ্ছা চলে যাব। আপনি এই ছবিটা ম্যাডামকে দেবেন?
রহিমা বুয়া ছবি হাতে নিয়ে রনির দিকে তাকিয়ে বলল, ভাইজান, আপনেরে চইল্যা আসতে বলছে।রনির ইচ্ছা করছে লোকটার সঙ্গে গল্প করতে। সব মানুষের সঙ্গে গল্প করতে তার ভালো লাগে না। এই মানুষটার সঙ্গে গল্প করতে ভালো লাগবে তা বোঝাই যাচ্ছে।মুহাব্বত আলি কফির কাপে শব্দ করে চুমুক দিল। মা থাকলে ভুরু কুঁচকে তাকাতেন। শব্দ করে যে-কোনো জিনিস খাওয়াই অভদ্রতা।
রনি মানুষটার দিকে তাকিয়ে আছে। মুহাব্বত আলি এবার তাকালেন রহিমার মার দিকে। গম্ভীর গলায় বললেন, রহিমার মা শোনো। তোমার ম্যাডাম বলেছিল একশ টাকা দেবেন। দোতলায় উঠে মনে হয় ভুলে গেছেন। দোতলার মানুষ একতলার মানুষকে সহজে ভুলে যায়। তুমি উনার কাছ থেকে টাকাটা নিয়ে এসো। আমি চলে যাব।
রহিমা বুয়া বিরক্ত মুখে চলে যাচ্ছে। বিড়বিড় করে আবার কী যেন বলল। রনি বুঝতে পারছে না রহিমা বুয়া এত বিরক্ত হচ্ছে কেন? এত বিরক্ত হবার মতো কিছু তো এই মানুষটা বলে নি।রনির মনে ছোট্ট একটা খটকাও লাগছে–মানুষটা রহিমা বুয়ার নাম জানল কীভাবে? এত সহজভাবে বলেছে যেন রহিমা বুয়াকে সে অনেকদিন থেকে চেনে।
রনি মুহাব্বত আলির দিকে তাকিয়ে বলল, আপনাকে আমি কী ডাকব? কিছু ডাকতে হবে না। আমি যদি তোমার আর্ট টিচার হতাম, তাহলে স্যার ডাকতে বলতাম।রনি বলল, আপনি রহিমা বুয়ার নাম জানলেন কীভাবে? মুহাব্বত আলি হেসে ফেলে বললেন, তুমি নিশ্চয়ই ভাবছ আমার সুপারম্যানদের মতো ক্ষমতা-টমতা আছে। এসবের কোনো কারবারই আমার নেই। আমি তোমাদের গেটের দারোয়ানের কাছে সবার নাম জেনে নিয়েছি। কেন?
বলা তো যায় না কখন কোন কাজে লাগে। কাজে তো লাগল। রহিমা বুয়াকে ডাকতে পারলাম। ভালো কথা, তোমার মা টাকা পাঠাতে দেরি করছে কেন? দেবে না নাকি?
একবার যখন বলেছে তখন দেবে।
তাহলে অপেক্ষা করি, কী বলো?
অপেক্ষা করুন।
টিভিটা ছাড়া তো, বসে বসে টিভি দেখি।
এখন টিভি ছাড়লে মা রাগ করবে।
রাগ করলে থাক।
বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না, রহিমা বুয়া টাকা নিয়ে দোতলা থেকে নামল। মুহাব্বত আলি টাকাটা ব্যাগে রেখে উঠে দাঁড়ালেন। রনির দিকে তাকিয়ে বললেন, আসি? রনির খুব ইচ্ছা করছে বলে, আবার আসবেন। শেষ পর্যন্ত বলল না। মানুষটাকে আবার দেখলে মা অবশ্যই রাগ করবেন। মা রাগ করলে বাবা রাগ করবেন। সে কাউকেই রাগাতে চায় না।
রনির স্কুল দুপুর দুইটায় ছুটি হয়। আজ ছুটি হয়ে গেল এগারোটায়। স্কুলের একজন টিচার মিস নাজমা মারা গেছেন, এইজন্যেই ছুটি। মিস নাজমা রনিদের জিওগ্রাফি ম্যাডাম ছিলেন। ক্লাসে সবসময় গম্ভীর হয়ে থাকতেন। ছাত্রদের কেউ কোনো শব্দ করলেই ভুরু কুঁচকে বলতেন, Thear some noise. এতেই সবাই চুপ। মিস নাজমা কাউকে কোনো বকা দিতেন না, কারো সঙ্গে উঁচু গলায় কথা বলতেন না, তারপরেও সবাই তার ভয়ে অস্থির হয়ে থাকত। ক্লাসের কারো সঙ্গে যখন কথা বলতেন, তখন গম্ভীর গলায় একটা মজা করতেন। নামের সঙ্গে মিল দিয়ে চার-পাঁচটা শব্দ বলতেন। যেমন রনিকে বলতেন
রনি
কনি
মনি
লানি
আবার পুতুলকে বলতেন—
পুতুল
তুতুল
লুতুল
তুতুল
লতুল
রনি একবার সাহস করে নাজমা ম্যাডামকে বলেছিল, মিস আপনি আমাদের এইভাবে ডাকেন কেন? নাজমা ম্যাডাম বললেন, এইভাবে ডাকার পেছনে আমার সুন্দর একটা কারণ আছে। যেদিন তোমরা এই ক্লাস থেকে পাশ করে ওপরের ক্লাসে যাবে সেদিন কারণটা বলব। তোমাদের মজা লাগবে।কারণটা না জানিয়ে ম্যাডাম মারা গেলেন। কোনোদিনই আর কারণটা জানা যাবে না।
রনিদের ক্লাস টিচার (মিস দিলশাদ) করুণ করুণ মুখ করে বললেন, তোমরা ক্লাসে চুপচাপ বসে থাকো। হৈচৈ করবে না। প্লে গ্রাউন্ডেও যেতে পার তবে খেলাধুলা করবে না। তোমাদের একজন টিচার মারা গেছেন, এইসময় কি আনন্দ করা উচিত? তোমাদের সবার বাড়িতে ফোন করা হবে, যাতে তোমাদের গার্জিয়ানরা এসে তোমাদের নিয়ে যায়। ঠিক আছে লিটিল এনজেলস?
মিস দিলশাদ সবার সঙ্গে খুব মিষ্টি করে কথা বলেন। তিনি সবার গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। তবু কেউ তাকে পছন্দ করে না।রনিদের ক্লাসের একটি মেয়ে (লুতপা, খুব ভালো ম্যাথ জানে। ম্যাথে সে সবসময় একশতে একশ পায়। তাকে সবাই ডাকে লুতপাইন। আইনস্টাইনের নামের সঙ্গে মিল করে লুতপাইন)। লুতপাইন বলল, নাজমা ম্যাডাম কীভাবে মারা গেছেন?
দিলশাদ মিস বললেন, কীভাবে মারা গেছেন সেটা বড়দের ব্যাপার। তোমরা ছোটরা এইসব নিয়ে মোটেও মাথা ঘামাবে না। ঠিক আছে মেয়ে? লুতপাইন বলল, আমার জানতে ইচ্ছা করছে।লিটল এনজেল, একবার তো বলেছি কিছু ব্যাপার বড়রা জানবে। কিছু জানবে ছোটরা। এই নিয়ে আর কোনো প্রশ্ন না।
নাজমা ম্যাডাম কীভাবে মারা গেছেন কিছুক্ষণের মধ্যেই সেটা সবাই জেনে গেল। স্কুলের দারোয়ান-আয়া সবাই বলাবলি করছে। উনি মারা গেছেন রোড এক্সিডেন্টে। রিকশা করে যাচ্ছিলেন, পেছন থেকে একটা প্রাইভেট গাড়ি তাকে ধাক্কা দিয়ে চলে যায়।
রনির অসম্ভব মন খারাপ হলো। কান্না পেতে লাগল। ক্লাসের এতগুলি ছেলেমেয়ের সামনে কেঁদে ফেলা খুব খারাপ। সে চেষ্টা করতে লাগল যেন কাঁদে। সে ঠোঁট কামড়ে ধরে ক্লাসঘরের সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে রইল। চোখের পাতা ফেলল না। এতে চোখে যে পানি জমে আছে তা শুকিয়ে যাবার কথা। রনির পাশেই বসেছে লুতপাইন। লুতপাইন অবাক হয়ে বলল, কী দেখ?
রনি বলল, ফ্যান দেখি।
ফ্যান দেখ কেন?
এমনি দেখি।
লুতপাইনও রনির মতো ফ্যানের দিকে তাকিয়ে রইল। লুতপাইন খুব ভালো মেয়ে কিন্তু তার কিছু খারাপ অভ্যাস আছে। রনি যা করবে সেও তাই করবে। এখন যদি রনি চোখ নামিয়ে জানালা দিয়ে তাকায়, লুতপাইনও জানালা দিয়ে তাকাবে।রনিদের ক্লাসে কে কোথায় বসবে সব ঠিক করা। যদি ঠিক করা না থাকত তাহলে অবশ্যই রনি অন্য কোথাও বসত। লুতপাইনের পাশে বসত না।
লুতপাইন বলল, তুমি কাঁদছ কেন?
রনি বলল, কাঁদছি না তো।
তোমার চোখে পানি। তোমার কি মিস নাজমা ম্যাডামের জন্য খারাপ লাগছে?
রনি বলল, হুঁ।
খারাপ লাগছে কেন?
জানি না।
লুতপাইন বলল, আমি জানি। ম্যাডাম আমাদের সবার নাম দিয়ে ছড়া বানাতেন। কেন বানাতেন সেটা তিনি বলবেন বলেছিলেন–এইজন্য তোমার খারাপ লাগছে। কারণ তিনি তো আর বলতে পারবেন না।রনি বলল, আমার সঙ্গে এত কথা বলবে না। আমার ভালো লাগে না।লুতপাইন বলল, আচ্ছা আর কথা বলব না।রনি বলল, আমার দিকে এইভাবে তাকিয়েও থাকবে না। কেউ আমার দিকে তাকিয়ে থাকলে আমার ভালো লাগে না।আচ্ছা।
গার্জিয়ানরা আসতে শুরু করেছেন। একে একে ছেলেমেয়েরা সব চলে যাচ্ছে। ক্লাসরুম ফাঁকা। এখন ক্লাসে আছে শুধু রনি আর লুতপাইন। বাকিরা প্লে গ্রাউন্ডে খেলছে। ধরাধরি খেলা। একজন বলবে ধর আমাকে ধর, ওমনি বাকি সবাই তাকে ধরার জন্য তার পেছনে পেছনে ছুটতে থাকবে। ক্লাস টিচার আজকে খেলতে নিষেধ করেছেন তারপরও সবাই খেলছে।
রনি উঠে দাঁড়াল। সঙ্গে সঙ্গে লুতপাইনও উঠে দাঁড়াল। রনি জানে এখন সে যদি প্লে গ্রাউন্ডে যায়, লুতপাইনও তার সঙ্গে সঙ্গে যাবে। আবার সে যদি গেটের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, লুতপাইনও তাই করবে। মেয়েটার এমন নকল করা অভ্যাস। সবসময় রনিকে নকল করবে।
বারোটা বাজার আগেই স্কুল খালি। রনি শুধু একা বসে আছে। তাকে কেউ নিতে আসে নি। রনিকে কেউ নিতে আসে নি বলে তাদের ক্লাস টিচারও বাসায় যেতে পারছেন না। তার মুখ দেখে মনে হচ্ছে তিনি খুব বিরক্ত। যদিও তিনি মুখ হাসি হাসি করে রেখেছেন। রনি প্লে গ্রাউন্ডে একটা কাঠ-গোলাপ গাছের নিচে বসে ছিল। দিলশাদ মিস তার কাছে এসে মিষ্টি গলায় বললেন, ব্যাপার কী বলো তো? তোমাদের বাসায় কেউ টেলিফোন ধরছে না কেন?
রনি বলল, ম্যাডাম আমি তো জানি না।
তোমার বাবার অফিসের নাম্বার জানো?
জি না।
জানো না কেন? গুরুত্বপুর্ণ নাম্বার মনে রাখবে না? তোমার একার জন্যে আমাকে দুটা পর্যন্ত বসে থাকতে হবে এটা কেমন কথা? এখন দিলশাদ ম্যাডামের রাগ টের পাওয়া যাচ্ছে। মনে হচ্ছে তিনি এখন রনিকে ধমক দেবেন। রনির ভয় ভয় করছে। কান্না কান্নাও পাচ্ছে।রনি বলল, ম্যাডাম আপনি চলে যান।আমি কী করব না করব সেটা আমার ব্যাপার, তোমাকে জ্ঞান দিতে হবে না। ফাজিল ছেলে।
রনি বুঝতে পারছে না ম্যাডাম তাকে কেন ধমকাচ্ছেন। তাদের বাসার কেউ টেলিফোন ধরছে না, সেটা তো বাসার সমস্যা।ম্যাডাম যেভাবে হনহন করে এসেছিলেন ঠিক সেইভাবে হন হন করে চলে গেলেন। পনের মিনিট পর আবার উপস্থিত হলেন। আগের মতোই রাগী রাগী গলায় বললেন, তোমার কোনো আত্মীয়স্বজনের টেলিফোন নাম্বার জানা আছে, জানা থাকলো বলো–তাদের কাউকে টেলিফোন করে বলি তোমাকে নিয়ে যেতে।
জানা নেই ম্যাডাম।তুমি তো দেখি গাধা ছেলে। গাছতলায় বসে থাকবে না। যাও ক্লাসে গিয়ে বসে।রনি ক্লাসে গিয়ে বসল। সে কতক্ষণ বসে থাকল নিজেই জানে না। মনে হয় অনেকক্ষণ। একা বসে থাকতে কী খারাপ যে লাগে! এর মধ্যে কয়েকবার দিলশাদ ম্যাডাম জানালা দিয়ে তাকে দেখে গেলেন। প্রতিবারই এমন করে তার দিকে তাকালেন যেন রনি খুব খারাপ একটা ছেলে। দুষ্টামি করেছে বলে তাকে ডিটেনশন দেয়া হয়েছে। অথচ সে তো কোনো দোষই করেনি।
রনি ঠিক করে ফেলল ক্লাস থেকে পালিয়ে যাবে। প্রথমে যাবে প্লে গ্রাউন্ডে। সেখানে কাঠগোলাপ গাছটায় উঠবে। এই গাছ থেকে স্কুলের ছাদে যাওয়া যায়। বড় ক্লাসের কোনো কোনো ছেলে এই কাজটা করে। ছাদে গিয়ে সে যদি বসে থাকে, তাহলে ম্যাডাম তাকে খুঁজে পাবেন না। রনি যখন সব ঠিক করে ক্লাস থেকে বের হতে যাবে তখনি দিলশাদ ম্যাডাম ক্লাসে ঢুকে হাসি হাসি মুখে বললেন, যাও তোমাকে নিতে এসেছে।
রনি বলল, কে এসেছে?
তোমার এক রিলেটিভ, হাব্বত আলি নাম।
রনি একবার ভাবল বলে, হাব্বত আলি নামে আমার কোনো আত্মীয় নেই। হাব্বত আলির সাথে মাত্র একদিন আমার কথা হয়েছে। স্কুলের নিয়ম-অপরিচিত কারো সঙ্গে ছাত্র-ছাত্রীদের যেতে দেয়া হয় না। রনি এসব কিছুই বলল না। কিছু বললেও ম্যাডাম রেগে যাবেন। তাকে রাগিয়ে দেবার কোনো অর্থ হয় না।রনি বলল, ম্যাডাম যাই। ম্যাডাম মধুর গলায় বললেন, গুড বাই লিটিল এনজেল।
এই ম্যাডাম কথায় কথায় ছেলেমেয়েদের লিটিল এনজেল বলেন, কিন্তু কাউকেই দেখতে পারেন না। রনির ইচ্ছা করছে ম্যাডামের দিকে তাকিয়ে বলে, গুড বাই আগলি উইচ, তা সে বলল না। ম্যাডামদের সঙ্গে বেয়াদবি করা যায় না। তাছাড়া দিলশাদ ম্যাডাম মোটেই আগলি না। তিনি খুবই রূপবতী।
হাব্বত আলি হুড খোলা রিকশার সিটে পা তুলে আয়েশ করে বসে ছিলেন। এখন বৈশাখ মাস। বেশ গরম। এই গরমে তার গায়ে কালো রঙের কম্বল জাতীয় চাদর। চাদর তিনি যে শুধু গায়ে দিয়ে রেখেছেন তাই না। মাথাও ঢেকে রেখেছেন। চাদরের ভেতর থেকে তার উজ্জ্বল চোখ দেখা যাচ্ছে। তিনি রনিকে দেখতে পেয়ে আনন্দিত গলায় ডাকলেন, হ্যালো, হ্যালো!
রনি তার দিকে এগিয়ে গেল।
রিকশায় কখনো চড়েছ রনি?
রনি হ্যাঁ বা না কিছু বলল না। সে বুঝতে পারছে না অপরিচিত এই মানুষটার সঙ্গে রিকশায় উঠা ঠিক হবে কি-না। মনে হয় ঠিক হবে না।হাব্বত আলি হাত বাড়িয়ে তাকে টেনে তুললেন। রনির দিকে তাকিয়ে বললেন, মন খারাপ নাকি? রনি বলল, হুঁ।বেশি?
হুঁ।মন খারাপ থাকলে মন ভালো করার একটা প্রেসক্রিপশন আমার কাছে আছে। প্রেসক্রিপশন দেব? রনি বলল, আগে বলুন আপনি আমাকে নিতে এসেছেন কেন? কীভাবে বুঝলেন যে আমাকে কেউ নিতে আসে নি?
হাব্বত আলি বললেন, তোমার কাছে কি মনে হচ্ছে আমি সুপারম্যান টাইপের কেউ? আমার অনেক পাওয়ার। সেই পাওয়ার থেকে বুঝে ফেলেছি রনি নামের বাচ্চা একটা ছেলেকে কেউ নিতে আসছে না। বেচারা একা একা মন খারাপ করে বসে আছে। তার মিস অকারণে তাকে ধমকাচ্ছে। বেচারাকে উদ্ধার করতে হবে। এরকম মনে হচ্ছে?
হুঁ।সেরকম কিছুই না।তাহলে কী? আমি খুবই সাধারণ। আমার কোনো ক্ষমতা নেই। ঘটনা হচ্ছে কী, আমি তোমাদের স্কুলের অফিসঘরে ছিলাম। সেখান থেকেই শুনলাম তোমাদের স্কুলের এক ম্যাডাম কিছুক্ষণ পরপর কোনো এক বাসায় টেলিফোন করছে, কেউ টেলিফোন ধরছে না বলে তিনি খুবই রাগারাগি করছেন।
একবার বললেন, চাবকে রনি ছেলেটার পিঠের চামড়া তুলে দেয়া দরকার। তখন রনি ছেলেটার জন্যে আমার মন খারাপ হলো। ভাবলাম ছেলেটাকে একটু সাহায্য করি। যদিও তখন জানতাম না রনি তুমি। তোমার সঙ্গে আমার পরিচয় আছে।আপনি আমাদের স্কুলে এসেছিলেন কেন?
তোমাদের একজন আর্ট টিচার দরকার। আমি আর্ট টিচারের ইন্টারভু দিতে গিয়েছিলাম। তোমাদের হেড মিসট্রেস ইন্টার নিলেন।আপনার চাকরি কি হয়েছে? হুঁ। আগামী সপ্তাহে জয়েন করব। তোমাদের আর্ট ক্লাস আছে না?
আছে। বুধবারে আর্ট ক্লাস।
তাহলে বুধবারে তোমার সঙ্গে আবার দেখা হবে।
হুঁ।
তোমার মন খারাপ ভাব কি কমেছে, না এখনো আছে?
এখনো আছে, তবে আগের চেয়ে একটু কম।
মন ভালো করার কৌশলটা শিখিয়ে দেব?
দিন।
Read more
