ইলাকে অনেক জায়গায় যেতে হবে। প্রথমে যাবে মোহাম্মদপুর থানা, তারপর যাবে মার কাছে। মার সঙ্গে সে ঐদিন খুব খারাপ ব্যবহার করেছিল। আজ মাকে জড়িয়ে ধরে সে খানিকক্ষণ কাঁদবে। সেখান থেকে যাবে বি. করিম সাহেবের কাছে। সবশেষে যাবে লালবাগ থানায়। অনেক কাজ।রিকশা এগুচ্ছে। নীল শার্ট পরা চমৎকার চেহারার একটা ছেলে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।বি. করিম সাহেব খুশি খুশি গলায় বললেন, আরে এস এস। তোমার নাম তো পরী তাই না? ইলী, বিকরিম সাহেবকে বিস্মিত করে, তাঁর পা ছুঁয়ে সালাম করে ফেলল। নিচু গলায় বলল, আমার নাম ইলা। শুধু বাবা আমাকে পরী ডাকতেন।
তোমাকে আমি মনে মনে খুঁজছিলাম। ঠিকানা রেখে যাও নি। ঠিকানা রেখে গেলে নিজেই যোগাযোগ করতাম। তোমার জন্যে সুসংবাদ আছে। মজিদ নতুন নায়িকা ট্রাই করতে রাজি হয়েছে। তার কাছে তোমাকে একদিন নিয়ে যাব। তবে তারও আগে তোমার একগাদা দুবি দরকার। ভাল ফটোগ্রাফার দিয়ে কিছু ছবি তোলাবে। আমি একজন ফটোগ্রাফারের নাম-ঠিকানা দিয়ে দেব। ওকে দিয়ে ছবি তোলাবে। ব্যটা কাজ ভাল করে। তবে স্বভাব-চরিত্র খারাপ। ছবি তোলা শেষ হলেই ঘাড় ধরে বিদেয় করে দেবে।
নায়িকা হবার জন্যে আমি কিন্তু আপনার কাছে আসি নি। আমি আগেও অপিনাকে বলেছি। আপনি বোধহয় আমার কথা মন দিয়ে শুনেন নি।তাহলে আস কেন আমার কাছে? এম্নি আসি।কোন কারণ ছাড়াই আমার কাছে আস? কারণ একটা আছে। তবে সেই কারণ আপনার কাছে বিশ্বাসযোগ্য হবে না।বি. করিম খানিকক্ষণ গম্ভীর ভঙ্গিতে বসে থেকে বললেন, আমি বাংলাদেশের ছবির স্ক্রিপ্ট লিখি। আমার কাছে সব কারণই বিশ্বাসযোগ্য। ব্যাপারটা কি বল।ভুতুরে এসে বলি? এস ভরে এস।
ইলা ঘরে ঢুকল। আজকে ঘরদোয়ার অন্য দিনের মত অগোছালো নয়। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। ঘর ঝাঁট দেয়া হয়েছে। বইপত্র ছুড়ানোছিটানো নয়। সাজানো। তবে মেঝেতে খবরের কাগজ বিছানো। একটা টিফিন ক্যারিয়ার, খালা গ্লাস। ভদ্রলোক বোধহয় খেতে বসবেন।শোন পরী, আমি এখনো ভাত খাই নি। ভাত নিয়ে বসব। তোমার যা বলার তুমি চট করে বলে চলে যাও।ইলা হ্যান্ডব্যাগ খুলে একটা বি-টু সাইজের ছবি বের করে এগিয়ে দিল। নিচু গলায় বলল, ছবিটা দেখুন।করিম সাহেব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে অনেকক্ষণ ছবির দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, দেখলাম।আপনার সঙ্গে কি এই ছবিটার মিল আছে না? খানিকটা আছে। তবে এই ভদ্রলোকের চোখ বড় বড়। আমার চোখ ছোট। কার ছবি?
আমার বাবার ছবি।ও।বাবা যখন মারা যান তখন আমরা সবাই খুব ছোট। আমার ছোট বোনটার বয়স এক বছর, আমার চার বছর, আর আমার বড় ভাইয়ের বয়স সাত। আমার অবশ্যি বাবার চেহারা মনে আছে।চার বছর বয়স হলে মনে থাকারই কথা।ইলা শান্ত গলায় বলল, মানুষের সঙ্গে মানুষে চেহারায় মিল থাকতেই পারে। এটা এমন কিছু না। এটাকে কোন রকম গুরুত্ব দেয়া ঠিক না। তারপরেও আপনার কাছে আসতে আমার ভাল লাগে। আপনি বিরক্ত হন। ভাবেন কোন উদ্দেশ্য নিয়ে আসছি।আর ভাবব না। তুমি বোস। তোমার মুখটা শুকনা লাগছে। তুমি কি দুপুরে কিছু খেয়েছ? জ্বি-না।আমার সঙ্গে চারটা খাবে?
ইলা কিছু বলল না। চুপ করে রইল। বি. করিম সাহেব বললেন, এস পরী হাত ধুয়ে আসি। হোটেলের খাবার। ভাল হবে না। তবু খাও।ইলা হতি ধুয়ে খেতে বসল। করিম সাহেব খেতে খেতে কৌতূহলী হয়ে মেয়েটিকে দেখছেন। তাঁর নিজেরই খানিকটা অস্বস্তি বোধ হচ্ছে।পরী! জ্বি।তোমার যদি কখনো কোন সমস্যা হয় আমাকে বলে। আমার ক্ষমতা এবং সামর্থ্য দুইই সীমিত। তবু আমার সাধ্যমত আমি চেষ্টা করব।জ্বি আচ্ছা।তোমার কি কোন সমস্যা আছে?
আছে। আমার খুব আপন একজন মানুষ লালবাগ থানা হাজতে আটকা আছেন। আপনি তাঁকে ছাড়িয়ে আনতে পারবেন? কোন অপরাধে তাকে ধরা হয়েছে সেটা না জানলে বলতে পারব না। টাকা পয়সাও লাগবে। এদেশের পুলিশ টাকা ছাড়া কথা বলে না।আমি টাকা নিয়ে এসেছি।ইলা করিম সাহেবকে একটা খাম বাড়িয়ে দিল। তিনি বিস্মিত হয়ে বললেন, এ তো অনেক টাকা।জ্বি, অনেক টাকা।কত আছে এখানে? ছাপ্পান্ন হাজার ছিল। আমি কিছু খরচ করেছি–এখন কত আছে জানি না।করিম সাহেব সিগারেট ধরাতে ধারাতে বললেন, তুমি চাচ্ছ ওকে বের করে আনতে যে টাকা লাগে তুই এখান থেকে দেব আর বাকি টাকাটা ওর হাতে দেব?
জ্বি।তুমি চাচ্ছ না যে ব্যাপারটা কেউ জানুক? আপনি ঠিকই ধরেছেন।বেশ। করা হবে। ছেলের নাম দিয়ে যাও। ঠিকানা দাও।খামের ভেতর একটা কাগজে লেখা আছে।তুমি কি ওকে কোন চিঠি দেবে? জ্বি-না।তুমি নিজের পরিচয় গোপন রাখতে চাও? জ্বি।ইলা বলল, আমি এখন উঠব। সে কদমবুসি করবার জন্যে নিচু হল। বি. করিম সাহেব হাসিমুখে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। ভদ্রলোক চিরকুমার। সারাজ্জীবন একা কাটিয়েছেন। তার জন্যে কোন রকম অতৃপ্তি তিনি বোধ করেন নি। আজ করলেন। আজ হঠাৎ করে মনে হল–বিরটি ভুল হয়েছে। সংসার করলে হত। এই মেয়ের মত একটা মেয়ে তাহলে তাঁর থাকত।চাচা যাই?
করিম সাহেবের খুব ইচ্ছা করল বলেন–আবার এস মা। বলতে পারলেন না। দীর্ঘদিন মা ডাকেন না। আজ হঠাৎ করে কাউকে মা ডাকা সম্ভব না। তিনি কোমল গলায় বললেন, আবার এস। ইলা বলল, আমি আর আপনাকে বিরক্ত করব না।নাসিম কম্বলের উপর শুয়ে ছিল। হজ্জতে আরো কিছু কয়েদি আছে, তারা মেঝেতে গাদাগাদি করে বসা। কম্বলের বিশেষ ব্যবস্থা নাসিমের জন্যে। তাকে চেনার কোন উপায় নেই–পুলিশী মারের কারণে মুখ ফুলে বিভৎস দেখাচ্ছে। সবচে বেশি ফুলেছে না। মনে হচ্ছে নাকের হাড় ভেঙেছে। বাঁ চোখ বন্ধ হয়ে আছে। ডান চোখ অক্ষত তবে লাল হয়ে আছে। পুলিশী মারের ধরন এমন হয় যে বাইরে থেকে কিছু বোঝা যায় না। নাসিমের বেলায় ব্যতিক্রম হয়েছে। মায়ের কারণেই অন্য হাতীরা নাসিমের প্রতি মমত্রী দেখাচ্ছে। কম্বল হচ্ছে মমতার প্রকাশ।
হাজতখানার একমাত্র কলটি ভাঁজ করে নাসিমকে দেয়া হয়েছে, যাতে সে শুয়ে থাকতে পারে।ইলা হাজতের দরজার কাছে এসে দাঁড়াল সন্ধ্যার ঠিক আগে আগে। প্রথম দর্শনে সে চিনতে পারল না। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। নাসিম হাসিমুখে বলল, আরে তুই, তুই কোত্থেকে? তোকে কে খবর দিল? আমি বাবুকে এত করে বললাম, তোকে যেন খবর নী দেয়া হয়। শুধু শুধু দুশ্চিন্তা করবি।তুমি করেছ কি? মিস আল্ডারস্টেনডিং হয়ে গেছে। যাকে বলে ভুল বোঝাবুঝি। তোমাকে এ রকম করে মেরেছে কেন? পুলিশ ধরেছে–মরিবে না। তাও তো আমাকে কম মেরেছে।এর নাম কম মারা?
বাদ দে বাদ দে। মেয়েছেলের এইসব জায়গায় আসাই ঠিক না। তোরা অল্পতে নাভাস হয়ে যাস। বাবুকে এত করে বলেছি যেন কাউকে কিছু না জানায়। সে মনে হয় মাইক নিয়ে ঢাকা শহরে বের হয়ে পড়েছে। দুপুরে টিফিন ক্যারিয়ারে খাবার নিয়ে রুবা এসে উপস্থিত। তারপর বিশ্রী কাণ্ড। টিফিন ক্যারিয়ার ফেলে দিয়ে চিৎকার করে কান্না। হাজতখানা কি কান্নাকাটির জায়গা। দুনিয়াসুদ্ধ মানুষ তাকিয়ে দেখছে। কাঁদতে হয় বাড়িতে বসে। দরজা বন্ধ করে কাঁদবি। হাটের মধ্যে কাঁদার দরকার কি। বাবুর সঙ্গে দেখা হচ্ছে না–দেখা হলে কঠিন কিছু কথা শুনিয়ে দিতাম।ভাইয়া কোথায়?
আমাকে বের করার জন্যে–খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে নানান জায়গায় ছোটাছুটি করছে। ভাবটা এরকম যেন আমাকে ফাঁসিতে ঝুলাচ্ছে। এক্ষুণি এখান থেকে বের করতে হবে। দুএকদিন পরে বের হলে ক্ষতি তো কিছু নেই। এত অস্থির হবার দরকার কি। আর শোন, সন্ধ্যা হয়ে গেছে তুই খামোকা এখানে দাঁড়িয়ে থাকিস। বাসায় চলে যা। তোর কি শরীর খারাপ নাকি তোকে এরকম দেখাচ্ছে কেন? আমার শরীর ভালই আছে। নাসিম ভাই তুমি শুয়ে আছ শুয়ে থাক, তোমাকে উঠে দাঁড়াতে হবে না।নাসিম উঠে দাঁড়াল। ইলা বলল, তোমার বাঁ চোখ এমন ফুলে আছে। চোখে কিছু হয় নি তো? চোখ ঠিক আছে। সকালের দিকে ঝাপসা দেখছিলাম–এখন পরিষ্কার দেখতে পারছি।তুমি একদিনও আমাকে দেখতে যাও নি নাসিম ভাই।ছোটাছুটি করেই সময় পাই না। দেখি এইবার যাব। জামান সাহেব ভাল আছেন?
হ্যাঁ।তাঁকে আমার সালাম দিবি। অতি ভদ্রলোক। কিছুদিন আগে রাস্তায় একবার দেখী হয়েছিল। আমাকে রেস্টুরেন্টে নিয়ে চ-সিঙাড়া খাওয়ালেন। জয়দেবপুরে একটা বাড়ি কিনেছেন বলে বললেন, ঠিকঠাক করছেন। বাড়ির পেছনে পুকুর আছে। আমি জামান সাহেবকে বললাম, আপনি ভাই ঐ পুকুরে কিছু জলপদ্ম লাগাবেন। আমাদের ইলার খুব শখ। লাগিয়েছেন জলপদ্ম? জানি না। লাগাবে নিশ্চয়ই।অবশ্যই লাগবে। আমি চারা জোগাড় করে দেব। কোথাও পাওয়া না গেলে বলধা গার্ডেন থেকে জোগাড় করব। কেয়ারটেকারকে ভুজং ভাজং দিয়ে ব্যবস্থা করতে হবে। এম্নিতে রাজি না হলে পা চেপে ধরব।ইলা হেসে ফেলল। খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার হাসতে হাসতে তার চোখে পানি এসে গেল। অন্যের কাছ থেকে গোপন করার মত পানি নয়। ফেঁটায় ফোঁটায় পানি আসছে।নাসিম বিস্মিত হয়ে বলল, কি যন্ত্রণা কাঁদছিস কেন?
চোখ মোছ।ইলা শাড়ির আঁচলে চোখ ঢেকে শব্দ করে কেঁদে উঠল। থানার সেকেন্ড অফিসার কান্নার শব্দে এগিয়ে এলেন। নাসিম অসহায় চোখে তাকিয়ে আছে। কি করবে বা বলবে ভেবে পাচ্ছে না। ইলা বলল, নাসিম ভাই আমি যাই।আচ্ছা যা। তোর অবস্থা দেখে তো আমি ঘাবড়ে যাচ্ছি। শরীর মনে হয় বেশি খারাপ। এত অল্পতে কান্নাকাটির মেয়েতো তুই না। তোর সমস্যাটা কি? বল তো? সমস্যা কিছু না। আমার বাচ্চা হবে নাসিম ভাই। তিন মাস যাচ্ছে। কাউকে বলি নি। তোমাকে প্রথম বললাম।নাসিমের মুখ হা হয়ে গেল। মেয়েটার কি সত্যি সত্যি মাথা খারাপ হয়ে গেল? বচ্চিা হবার খবর কি হাটের মধ্যে বলার জিনিস। হাজতীরা কান পেতে শুনছে। কথাবার্তা আরেকটু সাবধানে বলা উচিত না?
নাসিম ইলাকে ধমক দিতে গিয়েও দিল না। নিজেকে সামলে নিল। একটা খুশির কথা বলেছে–এই সময় ধমাধমকি করা ঠিক হবে না। পরে এক সময় বুঝিয়ে বলতে হবে।যাই নাসিম ভাই।অনেকক্ষণ ধরেই তো যাই যাই করছিস। যাচ্ছিস তো না।এইবার যাব। একটা কথা শুধু জিজ্ঞেস করে যাই। আমার বিয়ের দিন আমি তোমাকে সালাম করলাম। তখন তুমি আমার জন্যে কি দোয়া করেছিলে? মনে নেই।মনে করার চেষ্টা কর।তুই বড় বিরক্ত করছিস ফুল, যা বাসায় যা।নাসিম সেকেন্ড অফিসারের দিকে তাকিয়ে বলল, স্যার মেয়েটাকে একটা রিকশা করে দিন। ওর শরীরটা খারাপ। রিকশাওয়ালাকে বলে দেবেন। যেন খুব সাবধানে নিয়ে যায় ঝাঁকুনি না দেয়। মেয়েটা খুবই অসুস্থ।আশ্চর্যের ব্যাপার, এই সাধারণ কথাগুলি বলতে বলতে নাসিমের গলা ধরে এল। বন্ধ হয়ে যাওয়া ফুলে ওঠা চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগল।
ইলা খুব সুন্দর করে সেজেছে। বিয়ের লাল বেনারসীটা পরেছে। ঠোঁটে কড়া করে লিপিস্টিক দিয়েছে। বিয়ের সময় জামান তাকে অনেক গয়না দিয়েছিল আজ সে সবই পরেছে। বিছানায় নীল চাদর বিছিয়ে সে বসেছে মাঝখানে। সদর দরজা খোলা। অন্যদিন দরজা খোলা রাখলে সে ভয়েই মরে যেত। আজ এতটুকু ভয় করছে না। সে পা গুটিয়ে খাটে বসে আছে। অপেক্ষা করছে জামানের জন্যে। তার এগারটায় ফেরার কথা। এগারটা বাজতে খুব বাকি নেই। নীল বিছানায় লাল বেনারসী পরা ইলাকে দেখাচ্ছে জলপদ্মের মত।
