জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল হাইস্কুল পর্ব – ৬ হুমায়ূন আহমেদ

জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল হাইস্কুল পর্ব – ৬

জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল হাইস্কুল পর্ব – ৬

আজ বৃহস্পতিবার হাফ স্কুল ফজলুল করিম সাহেব ঠিক করে ফেললেন বাসায় যাবেন না। স্কুলেই সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকবেন। রেশমী মন খারাপ করবে। করুক। দুটার দিকে ডাক আসে। ডাকের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। সরকারি অনুদানের চিঠি পেয়েছেন। চেক আসছে না। মনজুরকে কয়েকটা চিঠি দিয়েছেন। মনজুর চিঠির জবাব দিচ্ছে না। একবার ঢাকা যাওয়া উচিত।গত মাসে শিক্ষকদের বেতন দিতে পারেন নি। সরকারী ডি, এর টাকাটা দিতে পারলেও হত। সেই টাকাও আসেনি। স্কুলের এমন কোন ফান্ড নেই যে সেখান থেকে টাকা ধার করেন। এত দিনের পুরানো একটা স্কুল অনার বোর্ডের দিকে তাকালে মন ভরে যায়।

কত বিখ্যাত মানুষ এই স্কুল তৈরি করেছে।ফজলুল করিম সাহেব ছাত্রদের দিকে তাকালেন। তারা এক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। তিনি বললেন, আজ পড়াতে ভাল লাগছে না। খুব মাথা ধরেছে … বলেই তিনি অস্বস্তি বোধ করতে লাগলেন। তাঁর মাথা ধরেনি। ছাত্রদের মিথ্যা কথা বলা হল। মাথা না ধরলেও শারীরিকভাবে স্বস্তিবোধ করছেন না। গরম লাগছে। কোটের কারণে গরম লাগছে বোধ হয় …।ফজলুল করিম সাহেব ক্লাস শেষ হবার ঘণ্টার জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলেন। সময় কাটছেই না।স্কুল ছুটি হয়ে গেছে। শিক্ষকরা সবাই চলে গেছেন। শুধু মাহবুব সাহেব এবং বিনয় বাবু বসে আছেন। বিনয় বাবু গোপনে কিছু কথা বলতে চান। তিনি টিচার্স কমনরুমে অপেক্ষা করছেন। মাহবুব সাহেব ফজলুল করিম। সাহেবের সঙ্গে কথা বলছেন।

তাঁর কথা শেষ হলেই বিনয় বাবু ঢুকবেন।মাহবুব সাহেব বললেন, স্যার বেতনের কি ব্যবস্থা? ফজলুল করিম হাসিমুখে বললেন, হবে হবে।কি ভাবে হবে? সরকারি ডি এর জন্য আমি নিজেই ঢাকা যাব।কবে যাবেন? দুই একদিনের মধ্যে।সরকারি ভি, এ টা না হয় হল। বাকি বেতনের কি করবেন? বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে সাহায্যের জন্যে যাব। স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র …বাজার সমিতি গত বছরের টাকাটা দেয় নি …ওদের… ওদের কথা ভুলে যান। ওরা কিছু দিবে না।দিবে না কেন?

আর কত দিবে। দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে গেছে। ওদের একটা প্রস্তাব আছে। স্কুলের কিছু জমি তারা কিনে নিতে রাজি আছে, এ থেকে কিছু টাকা পাওয়া যায়।সেটা সম্ভব না। জীবন বাবুর দানপত্র করা জমি বিক্রি করা যাবে না।তাহলে সমস্যার সমাধান কি? আছে সমস্যার সমাধান অবশ্যই আছে।সেটা কি বলুন।স্কুলের ছাত্র বাড়বে, তাদের বেতন থেকে যে আয় হবে… ছাত্র বাড়বে কিভাবে?লোকে যখন জানবে এটা ভাল স্কুল তখন দূর দূর থেকে ছাত্ররা আসবে। হোস্টেলে থাকবে… মাহবুব সাহেব হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, স্যার উঠি। হেডমাস্টার সাহেব তৎক্ষণাৎ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, জ্বি আচ্ছা জ্বি আচ্ছা।দুপুরে কিছু খাওয়া হয়নি, ক্ষিধে জানান দিচ্ছে। বয়স হয়ে গেলে ক্ষিধের কষ্টই প্রবল হয়ে দাড়ায়। হরিপদকে পাঠিয়ে কোন খাবার টাবার আনলে হত। একটা কলা দুটা বিসর্কিট….

বিনয় বাবু বললেন, স্যার আসব? আসুন বিনয় বাবু। আপনি এখনো যাননি? আজ্ঞে না। আপনার সঙ্গে সামান্য কথা ছিল।বলুন।বিনয় বাবু বসতে বসতে বললেন, আমার সংসারের অবস্থার কথা তো স্যার আপনি জানেন, অভাবে অনটনে পর্যন্ত হয়েছি। ঘরে বিবাহযোগ্যা কন্যা। বিবাহ দিতে পারছি না। পণ ছাড়া হিন্দু মেয়ের বিয়ে হয় না। এক লাখ দুলাখ টাকা পণ চায়। কোথায় পাব এত টাকা? জ্বি তা তো ঠিকই। বড়ই দুঃসময়। সবার জন্যই দুঃসময়। তবে পৃথিবীর সব দুঃসময়ই সাময়িক। শীতের পরে বসন্ত আসে এটা জাগতিক নিয়ম।জাগতিক নিয়ম সবার জন্য না স্যার। আমার বেলায় শীতের পর শীত আসে, তার পর আসে আরো শীত। স্যার আমি জানি আপনি মনে কষ্ট পাবেন কিন্তু না বলে পারছি না …

বলুন কি ব্যাপার? বিনয় বাবু কিছু বললেন না। পাঞ্জাবীর কোণায় চোখ মুছতে লাগলেন। ফজলুল করিম সাহেব বললেন, আপনি কি নীলগঞ্জ স্কুলে যোগ দিয়েছেন? বিনয় বাবু হা সূচক মাথা নাড়লেন। ফজলুল করিম সাহেব বললেন, আপনাকে ছাড়া আমি স্কুল চালাব কিভাবে? আপনার মত অংকের শিক্ষক আমি কোথায় পাব? নতুন শিক্ষক যিনি এসেছেন, মামুন সাহেব তিনি ভাল অংক জানেন। শুধু ভাল না। খুব ভাল। আমি ক্লাশ টেনের ছাত্রদের কাছ থেকে খোঁজ নিয়েছি।ও আচ্ছা।

কারো জনোই কিছু আটকে থাকে না স্যার। আমি যা করেছি না পেরে করেছি। এই অপরাধের জন্যে নরকে আমার স্থান হবে। তা হোক, শুধু আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন। আমি ঈশ্বরের ক্ষমা চাই না। আপনার ক্ষমা চাই।আপনি চলে গেলে আরো অনেকেই যাবে।তা যাবে।স্কুলটা কি উঠে যাবে? না উঠবে না। আপনার মত মানুষ থাকলে স্কুল উঠবে না। স্যার উঠি।বিনয় বাবু হঠাৎ নিচু হয়ে ফজলুল করিম সাহেবকে প্রণাম করতে গেলেন। ফজলুল করিম সাহেব আঁৎকে উঠে বললেন, করেন কি, করেন কি, বয়সে আপনি আমার বড়ই হবেন।

বিনয় বাবু ধরা গলায় বললেন, আমি তো স্যার আপনাকে প্রণাম করছি। আপনার ভেতর যিনি বাস করছেন আঁকে প্রণাম করছি। তিনি নমস্য।সরকারি চিঠি আজকের ডাকেও আসেনি। ফজলুল করিম সাহেব তাঁর বড় মেয়ের একটি চিঠি পেলেন। মেয়ের চিঠিটা একটু যেন রহস্যময়। মেয়ে লিখেছে–

বাবা,

আমি প্রচণ্ড ব্যস্ত থাকি বলে তোমাকে নিয়মিত চিঠি লিখতে পারি না। তবে তোমার খোঁজ খবর সব সময় রাখি। সম্প্রতি তোমার বিষয়ে কিছু অস্বস্তিকর খবর পেয়ে অত্যন্ত বিব্রত আছি। আশা করি আমি কি বলছি তুমি বুঝতে পারছ। তোমার সামাজিক মান মর্যাদার দিকে তুমি লক্ষ্য রাখবে এটা আশা করা অন্যায় না। নিঃসঙ্গ মানুষ নিজের নিঃসঙ্গতা কাটানোর জন্যে মাঝে মাঝে উদ্ভট সব কান্ড করে। তোমার এই বয়সে, তুমি এমন কিছু করবে না–এটুক আশা তোমার মেয়ে হিসেবে আমি অবশ্যই করতে পারি।

ফজলুল করিম সাহেব মেয়ের চিঠি কয়েকবার পড়লেন কিন্তু চিঠির মূল বিষয় ধরতে পারলেন না।সন্ধ্যা হয়ে গেছে। মওলানা ইরতাজউদ্দিন বারান্দায় আজান দিয়ে নামাজ পড়ছেন। হেড মাস্টার সাহেব তার ঘরে একা একা বসে আছেন। মওলানার নামাজ শেষ হলে এক সঙ্গে বেরুবেন।দপ্তরী এসে ঢুকল। করিম সাহেব বললেন, কিছু বলবি? হরিপদ মাথা চুলকে বলল, নতুন মাস্টার সাব লাইব্রেরি ঘরের বেবাক বই নামাইয়া একটা বিষয় করতাছে।

কি করছেন? এই ঘাটাঘাটি।করুক। বই সাজিয়ে রাখার জন্যে না। পড়ার জন্য। ঘাটাঘাটি করার জন্য। বুঝলি? জ্বি স্যার।এর মধ্যেই খবর হয়ে গেছে। মামুন সাহেব অতি ভাল শিক্ষক। একজন ভাল শিক্ষক ১০০ হাতীর সমান।ফজলুল করিম সাহেবের বিষণ্ণ ভাবটা কেটে যাচ্ছে। নতুন শিক্ষক স্কুলের লাইব্রেরীর বই ঘাটাঘাটি করছেন। খুবই ভাল লক্ষণ। স্কুল লাইব্রেরীর দায়িত্ব তাকে দিয়ে দেয়া যায়।বিনয় বাবুর জন্য মনটা খারাপ লাগছে। অতি সজ্জন। অংকের জাহাজ। যে কোন অংক মুখে মুখে করে ফেলতে পারেন। এ রকম শিক্ষক যে কোন স্কুলের জন্যে স্তম্ভের মত।

মাহবুব সাহেবের বাড়িতে আজ মামুনের রাতের খাবার দাওয়াত। মাহবুব সাহেব বলে দিয়েছেন, সন্ধ্যায় সন্ধ্যায় চলে আসবেন গল্পগুজব করব। বাড়িতে টিভি আছে ব্যাটারীতে চলে। আজ আবার নাটক আছে। মজা করে নাটক দেখবেন।মামুন বলল, আমি যথাসময়ে উপস্থিত হব। তবে নাটক দেখব না।টিভির নাটকগুলিতো অতি উত্তম। দেখবেন না কেন? ভাল লাগে না।ভাল না লাগলে দেখবেন না। আমরা বারান্দায় বসে গল্প করব। একবার সাপের হাতে জীবন যেতে বসেছিল গল্পটা আপনাকে বলা হয় নাই। বিষধর সর্প।জ্বি আচ্ছা আপনার বিষধর সর্পের গল্পও শুনব। দাওয়াত কি আমি একা যায়? ইরতাজউদ্দিন সাহেব যাবেন না? দুজন এক সঙ্গে থাকি এর মধ্যে আমি একা দাওয়াত খেতে যাওয়া ব্যাপারটা খারাপ দেখায় না?

আসুন উনাকেও নিয়ে আসুন। অসুবিধা কিছু নাই। খাওয়া দাওয়াতো কোন ব্যাপার না–গল্প গুজব করা।ইরতাজউদ্দিন সাহেব আসতে রাজি হলেন না। মামুন একাই উপস্থিত হল। মাহবুব সাহেবের বাড়িটা সুন্দর। অনেকখানি জায়গা নিয়ে হাফ বিল্ডিং। উপরে টিনের ছুদি। বাড়ির সামনে দেশী গাছ গাছড়ার বাগান। মামুন মুগ্ধ হয়ে বলল, এটা দেখি ইন্দ্রপুরীর বাগান।মাহবুব সাহেব নির্বিকার ভঙ্গিতে বললেন, কোন মতে বেঁচে থাকা। বাড়ির পেছনে পুকুর আছে। পুকুরটা সুন্দর। গত বছর ঘাট বাধিয়ে দিয়েছি। দেখাব আপনাকে। বর্শি বাওয়ার অভ্যাস আছে?

জ্বি-না? অভ্যাস থাকলে বর্শি বাইতে বলতাম। দুবছর আগে রুই মাছের পোনা ছেড়ে ছিলাম বড় হয়েছে।আপনিতো রাজার হালে আছেন মনে হয়।আর রাজার হাল। পল্লীগ্রামে পড়ে আছি। নানা সমস্যা।কি সমস্যা? পল্লীগ্রামের সমস্যা একটা থাকে না। পল্লীগ্রামের সমস্যা থাকে এক হাজার একটা। স্কুল উঠে যাচ্ছে–এতদিনের পুরনো স্কুল। দীর্ঘদিন থেকে যুক্ত স্কুলের সঙ্গে এটাওতো বড় সমস্যা।স্কুল উঠে যাচ্ছে না-কি? জি। আপনি নতুন জয়েন করেছেন। আপনাকে বলা ঠিক না। তবে এইসবতো গোপন রাখার জিনিস না। আজ হোক, কাল হোক আপনি জানবেন।স্কুল উঠে যাচ্ছে কেন?

নানান কারণ আছে। হেড মাস্টার সাহেবও একটা কারণ। স্কুলের হেড মাস্টার হল নৌকার কান্ডারীর মত। নৌকার কান্ডারি যদি ঠিক না থাকে তাহলে নৌকাতো ভুববেই।হেড মাস্টার সাহেবের সমস্যাটা কি? হুজুগে লোক আর কি? হুজুগে কি আর স্কুল টিকে? তাছাড়া বয়স হয়েছে। বয়স হলে ভীমরতি হয় বলে প্রবাদ আছে, উনারও তাই হয়েছে।ভীমরতি হয়েছে বলতে চাচ্ছেন? অনেকটা সে রকমই। উনার সম্পর্কে অনেক কেলেংকারী ধরণের কথা চালু আছে–সে সব কথা ঠিক হবে না। বাড়ির দাসির সঙ্গে সম্পর্ক।বুঝলাম না কি বলতে চাচ্ছেন শারীরিক সম্পর্ক?

লোকে তো তাই বলে। একজন স্কুলের হেড মাস্টারের সম্পর্কে যদি এই জাতীয় গুজব চালু থাকে তাহলে কি আর স্কুল টিকে? আপনারা উনাকে সরিয়ে নতুন কাউকে নিয়ে আসেন না কেন? আপনি নিজেওতো হেড মাস্টারের দায়িত্ব নিতে পারেন। আপনার সম্পর্কে নিশ্চয়ইএই জাতীয় কোন জব নেই? আরে ছিঃ ছিঃ কি বলেন?স্কুল টিকিয়ে রাখতো অনেক জরুরী।নতুন একটা স্কুল চালু হয়েছে। এইটাই আশার কথা। ভাল স্কুল। ষ্টাফ ভাল। আমাদের স্কুলের কিছু একসেলেন্ট ষ্টাফ ঐ স্কুলে চলে গেছেন। ভাল বেতন।

ষ্টাফ কোয়ার্টার! কেন যাবে না বলুন।আপনি যাচ্ছেন না? আমাকে হেড মাষ্টারের দায়িত্ব নিতে বলছে।নিচ্ছেন না কেন? এতদিনের পুরনো একটা স্কুল। বললেইতো ছাড়া যায় না।মায়ার কারণে এখনো লেগে আছেন? তা বলতে পারেন। আপনার ক্ষিধে হলে বলবেন, খাওয়া গরম করতে বলব। আমি আবার ঠাণ্ডা কিছু খেতে পারি না।আমি ঠাণ্ডা গরম সবই খেতে পারি। আপনার যখন ক্ষিধে হবে খাবার দিতে বলবেন।

মাছ ভাতের ব্যবস্থা করেছি। শহুরে মানুষ। মাছ ভাতটাই বেশী পছন্দ করে। গো মাংসের সন্ধান করেছিলাম। পাইনি। আমার স্ত্রী আবার গো মাংসের খুব ভাল পাক করেন। একদিন খাওয়াব আপনাকে। ছোট ছেলের এখনো আকীকা হয়নি। ভাবছি তার আকীকায় একটা গরু কোরবানী দেব।বাংলাদেশে আপনিই সম্ভবত সবচে ধনবান এসিসটেন্ট হেডমাস্টার।এই কথায় মাহবুব সাহেব আনন্দিত হলেন। আনন্দ তার চোখে মুখে ফুটে উঠল। মামুন বলল, আপনার মত এমন ক্ষমতাবান লোক থাকতে স্কুলটা জলে ভেসে যাবে এটা কেমন কথা-…..

হেড মাস্টার সাহেবের সন্যেই কিছু করা গেল না।উনাকে বিদেয় করে দিন। স্কুল ইম্পর্টেন্ট। হেড মাস্টারতো ইম্পর্টেন্ট না।বিদায় করে দিতে বললেইতো করা যায় না।যায় না কেন? চরিত্রহীন একজন মানুষ……।আসুন খেতে আসুন। খেতে খেতে গল্প করি। সাপের গল্পটা আপনাকে বলা হয় নাই…..। খাবার আয়োজন প্রচুর। রুই মাছের ভাজা, বড় বড় পাবদা মাছের ঝোল, টাকি মাছের ভর্তা, সরপুটি। মাছ ভাতের কথা বলা হলেও বড় জামবাটি ভর্তি মুরগীর মাংসও দেখা যাচ্ছে। মামুন বিস্মিত হয়ে বলল, করেছেন কি আপনি?

সামান্য আয়োজন। পোলাও করার ইচ্ছা ছিল, পরে ভাবলাম মাছ দিয়ে পোলাও ভাল লাগবে না। রান্না কেমন হয়েছে কে জানে আমার স্ত্রীর অবশ্যি রান্নার সুনাম আছে।রান্না অসাধারণ হয়েছে। আমি কোনদিন এত পদ নিয়ে খেতে বসেছি বলে মনে পড়ে না।খান আরাম করে খান। কেউ তৃপ্তি করে খাচ্ছে দেখতেও ভাল লাগে। ঘরে পাতা টক দৈ আছে। খাওয়ার শেষে এক বাটি টক দৈ খাবেন দেখবেন সব হজম।খাওয়ার সময় মাহবুব সাহেব অনবরত কথা বলে গেলেন। সাপের গল্প হল, জীনের গল্প হল। তাহাজ্জুদের নামাজ একা পড়তে গিয়েছেন নামাজ শেষ করে সালাম ফিরাতে গিয়ে দেখেন ডান দিকে লম্বা একজন নামাজ পড়ছে। মাথা দে ঠেকে গেছে পরনে সফেদ ড্রেস……..

খাবার পরও অনেকক্ষণ গল্প হল। সব গল্পই স্কুল নিয়ে! হেডমাস্টার সাহেব স্কুলের কি কি ক্ষতি করেছেন মাহবুব সাহেব তার বিষদ বর্ণনা দিলেন। উঠতে উঠতে রাত দশটা বেজে গেল। মামুন বলল, আজ উঠি? যাবার সময় হেড মাস্টার সাহেব সম্পর্কে একটা ভাল কিছু বলুনতো শুনে যাই। একটা কিছু ভাল গুণতো মানুষটার আছে। আছে না? তা আছে, নীতিবান। তবে নীতিতে স্কুলের ক্ষতিই হয়েছে। লাভ কিছু হয়নি।সেটা কি রকম।ফুড ফর ওয়ার্ক প্রোগ্রাম স্কুল একবার ১০০ বস্তা গম পেল। এটাই শুধু সমস্যা দুশ বস্তা গম পেয়েছি লিখে দিয়ে একশ বস্তা গম নিতে হবে। হেড সাহেব নিলেন না। তাঁর একটা কথা স্কুল নীতি শিক্ষার জায়গা। দুর্নীতি দিয়ে স্কুলের উন্নতির দরকার নেই। নীতি নীতি করে উনার স্কুলের লাভটা কি হল? তাতো বটেই।যে যুগের সে বাতাস, সেই বাতাসে নৌকা চালাতে হবে না?

মামুন বলল ইঞ্জিনের নৌকা হলে অবশ্যি বাতাসের ধার ধারতে হয় না। নীতিবান মানুষ হল ইঞ্জিনের নৌকা।ইঞ্জিন ঠিকই আছে। তেল নেই, ইঞ্জিন চলে না। আপনি যুবক মানুষ। মনে উৎসাহ আছে, চার মাস যখন বেতন পাবেন না তখন আর উৎসাহ থাকবে না।না থাকারই কথা।যাই হোক, আছেন যখন নিজের চোখে সব দেখবেন। সরকারী ডি এ আছে বলে কিছু শিক্ষক এখনো আছেন। ডি এ যখন থাকবে না তখন কি হবে? ডি এ থাকবে না? থাকবে কি জন্যে ছাত্র নেই স্কুলের আবার ডি এ কি?

ছাত্র কিছুতো আছে।এও থাকবে না। দেখবেন ফাঁকা স্কুল ঘরে হেড মাস্টার সাহেব বসে থাকবেন। মাছি টাছি মারবেন।কিছু করার উপায় নেই? ধ্বস নামলে কিছু করার থাকে না। ধ্বস নেমে গেছে। আপনি বাইরে থেকে এসেছেন। কিছু বুঝতে পারছেন না। গত মাসের বেতন পেয়েছেন? জি-না। কোত্থেকে পাবেন? একটা ফুটা পয়সা স্কুলের নাই। হা হা হা।মামুন বিস্মিত হয়ে বলল, আপনি এত আনন্দিত কেন? আপনিওতো স্কুলের একজন।মাহবুব সাহেব শুকনো গলায় বললেন, হেসে ফেলেছি দেখে ভেবেছেন আনন্দিত। আসলে তা না, মনের দুঃখে হেসেছি। এক সময় এই স্কুলের কি রমরমা ছিল আর আজ কি অবস্থা। আফসোস। বিরাট আফসোস।

 

Read more

জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল হাইস্কুল পর্ব – ৭ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *