হুমায়ূন আহমেদের লেখা ”তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে ”খন্ড-১২

অনুমান করুন তাে কটা বাজে?‘আটটা‘ 

হয়নিবাজে মাত্র সাতটাএই ব্যাপারটা আমি লক্ষ্য করেছি। গ্রামে এলেই দেখবেন সময় স্লো হয়ে যায়এক ধরনের টাইম ডাইলেশন হয়আপনার কাছে মনে হচ্ছে আটটা বাজেআসলে বাজছে সাতটা

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে 

বুড়াে ভদ্রলােক কে

উনার নাম সুরুজ মিয়াচেয়ারম্যন চেয়ারম্যান শুনলেই খুব খারাপ ধরনের চরিত্রের কথা মনে আসেউনি মােটেই সে রকম নননিতান্তই ভাল মানুষআমার জন্যে মই এনে লাগিয়ে দিয়েছেন।‘ 

কি এনে লাগিয়েছেন?‘ 

মইছাদে উঠার মইআপনি তাড়াতাড়ি মুখ ধুয়ে ফেলুন, আপনার জন্যে চায়ের ব্যবস্থা করে আসিকুয়ার পাশে বসে চা খান, দেখুন কি অদ্ভুত লাগে‘ 

কুয়ার পাড়ে বসে চা খেতে হবে

কিংবা এক কাজ করা যেতে পারেআমরা দুজন চায়ের কাপ নিয়ে ছাদে চলে যেতে পারিআপা ঘুম ভেঙ্গে যখন দেখবে আপনি নেই, তখন তার মাথা খারাপ হয়ে 

যাবে।‘ 

তােমার আপা কি এখনাে ঘুমুচ্ছেমনে হয় ঘুমুচ্ছেডেকে তুলব?দরকার নেইতুমি বরং চা নিয়ে এসাে।’ 

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে ”খন্ড-১২

শ্রাবণী রান্নাঘরে ঢুকলরান্নাঘরে পিঠা বানানাের চেষ্টা হচ্ছেজাহানারা ভাপা পিঠা বানাচ্ছেনঠিকমত হচ্ছে না। ভেঙে যাচ্ছেনবনীর ঘুম ভেঙ্গেছে। সে মুখ ধুয়ে মা’র 

পাশে বসে আম্বে। মা’কে সাহায্য করাই তার ইচ্ছা। কোন উপায় নেই–জাহানারা তাকে কোন কিছুতেই হাত দিতে দিচ্ছেন না। শ্রাবণী বলল, আপা, শাহেদ ভাই কুয়ার পাড়ে দাড়িয়ে আছেন। তােমাকে চা নিয়ে যেতে বলেছেন। 

নবনী লজ্জা পেয়ে গেল। জাহানারা মেয়ের এই লজ্জা উপভােগ করলেন। হাসি চাপতে চাপতে বললেন, চা-টা তুই নিজেই বানিয়ে নিয়ে যা । পিঠার হুঁড়ি নামিয়ে কেলি 

বসিয়ে দে। 

নবনী বলল, সব তুমি করবে, চা-টাই বা শুধু শুধু আমি করব কেন? চা তুমি বানাবে। 

কুয়ার পাড়টা এত সুন্দর রাতে বােঝা যায়নি। কুয়ার চারপাশে চিকন চিকন পাতার অচেনা কিছু গাছ পুরা জায়গাটার উপর ছায়া ফেলে আছে। গাছের নিচ ঝকঝক করছে । একটা পাতাও পড়ে নেই। পরিষ্কার থাকারই কথা। সকাল বিকাল দু’বেলা কাট দেয়া হচ্ছে। মালি শাহেদকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দুটা ফোল্ডিং চেয়ার নিয়ে এল। শাহেদ বলল, আপনাদের ডাকবাংলাে খুব সুন্দর। 

মালি কিছু বলল না। এমনিতে সে প্রচুর কথা বলে । এখন চেয়ারম্যান সাহেব তাকে বলে দিয়েছেন—মুখ বন্ধ রাখৰি। কোন কথা বলবি না। কি বলতে কি বলবি, সর্বনাশ হয়ে যাবে । যে সে লােক আসে নাই। মন্ত্রী। জাতসাপ। 

| ট্রেতে করে চা, টোস্ট বিসকিট নিয়ে নবনী আসছে। এই শীতের মধ্যেও ঘুম থেকে উঠেই সে গােসল করে হালকা গােলাপি রঙের শাড়ি পরেছে। কানে মুক্তার দুল। শাড়ির রঙ তার গায়ের রঙের সঙ্গে মিলেমিশে গেছে। সুন্দর দেখাচ্ছে নবনীকে। তার দিক থেকে চট করে চোখ ফিরিয়ে নেয়া সম্ভব না। শাহেদ বলল, আজ ভােরবেলা আয়নায় তুমি নিজেকে দেখেছ? 

না । কেন?’ 

 

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে ”খন্ড-১২

 

না দেখে থাকলে খবরদার দেখবে না। নজর লেগে যাবে। নিজের নজর সবচেয়ে বেশি লাগে। আজ তােমাকে দেখাচ্ছে স্বর্গের অপ্সরীদের মত।’ 

স্বর্গের অপ্সরীরা কি চা এবং টোস্ট নিয়ে আসে। তারা আনে অমৃত। ‘চা এখন অমৃতের মত লাগবে।’ 

শাহেদ চায়ের কাপ তুলে নিল । নবনী বলল, বিসকিট খাও। নাশতা দিতে দেরি হবে। মা ভাপা পিঠা বানানাের চেষ্টা করছেন। পিঠা জোড়া লাগছে না। লাগবে বলেও মনে হয় না। রাতে ঘুম কেমন হয়েছিল? 

‘খুব ভাল ঘুম হয়েছে। একঘুমে রাত কাবার। 

নবনী শাহেদের সামনে বসেছে। সে তার নিজের চায়ের কাপ হাতে নিতে নিতে বলল, জায়গাটা কি অদ্ভুত সুন্দর, লক্ষ্য করেছ? 

হ্যা, লক্ষ্য করলাম। আর কি রকম নির্জন সেটা দেখেছ? ‘হঁ্যা।’ 

নবনী বলল, ডাকবাংলােটা গ্রামের মূল বসতি থেকে অনেকখানি দূরে। নীলকর সাহেবরা বানিয়েছিল। তারা মানুষদের কাছ থেকে দূরে থাকতে চাইত। 

শাহেদ বলল, এই অঞ্চলে তাে নীলের চাষ হবার কথা না। নীলকর সাহেব তুমি কোথায় পেলে? 

আমি যা শুনেছি, তাই তােমাকে বললাম । সাহেবদের কবরখানাও নাকি আছে । এক সাহেবের স্ত্রী মারা গিয়েছিলেন—তার কবর আছে । কবরে চার লাইনের কবিতা আছে। 

কবরটা কোথায়?’ 

আমি জানি না । শ্রাবণী জানে।’ ‘ওকে বল তাে আমাকে দেখতে। 

বলব।’ 

 

Read More

হুমায়ূন আহমেদের লেখা ”তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে ”খন্ড-১৩

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *