হুমায়ূন আহমেদের লেখা ”তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে ”খন্ড-১৩

শাহেদ হাসতে হাসতে বলল, কোথাও বেড়াতে এসে অবশ্যি কবর দেখে বেড়ানাে কোন কাজের কথা না। 

নবনী উঠে দাঁড়াল। শাহেদ বলল, যাচ্ছ কোথায়? বােস না। 

নাশতার ব্যবস্থা দেখি! মা যা শুরু করেছে—আজ কেউ নাশতা খেতে পারব বলে। মনে হয় না।’

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে 

নাশতা নিয়ে আমার কোন মাথা ব্যথা নেই, তুমি বস । 

নবনী বসল। শাহেদ বলল, সুন্দর কোন প্রেমের কবিতা আমার মুখস্ত নেই— থাকলে এখন তােমার দিকে তাকিয়ে আবৃত্তি করতাম। তুমি এত সুন্দর কেন? 

নবনী চট করে মাথা ঘুরিয়ে নিল। তার চোখে পানি এসে যাচ্ছে। যে চোখের পানি শাহেদকে দেখাতে চায় না। 

শাহেদ বলল, আমার দিকে তাকাও অন্য দিকে তাকিয়ে আছ কেন? 

ননী বলল, কাল রাতে আমি তােমাকে রাগিয়ে দিয়েছি। এরকম আর হবে না। শাহেদ হাসতে হাসতে বলল, তার মানে কি এই যে আমি যা চাইব তাই পাব? নবনী জবাব দিল না । 

কিছুদিন মন্ত্রিত্ব করলে বিস্মিত হবার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। মন্ত্রীরা কোন কিছুতেই বিস্মিত হন না। জামিল সাহেবের ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। তিনি সুরুজ মিয়ার কর্মক্ষমতায় বিস্মিত হয়েছেন এবং বিস্ময় চাপা দেবার চেষ্টা করছেন না। সুরুজ মিয়া যা করেছেন তা হল ময়মনসিংহ থেকে একটা ফ্রিজ নিয়ে এসেছেন। ফ্রিজের সঙ্গে মেকানিক । মেকানিক এখন খুটখাট করে থ্রি-পয়েন্ট প্লগ বসাচ্ছে। সুরুজ মিয়া একটু দূরে দাঁড়িয়ে হাত কচলাচ্ছেন। 

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-১৩

জামিল সাহেব বললেন, এই ফ্রিজ আপনি নিজে কিনে এনেছেন? জি স্যার।’ ‘কেন?’ 

‘ঐদিন শুনলাম বেগম সাহেবের ঠাণ্ডা পানি খাওয়ার অভ্যাস। উনার কষ্ট হইতেছে। শােনার পর মনটা খারাপ হয়ে গেল । 

আমরা তাে দুদিন পর চলে যাব, তখন ফ্রিজ কি করবেন?’ 

‘অসুবিধা কিছু নাই, স্যার । রেখে দিব। আপনারা হইলেন মেহমান । আমি থাকতে মেহমানের কষ্ট—এটা তাে স্যার অচিন্তনীয়।’ 

এরকম সেবা-যত্ন সব মেহমানদেরই করেন। 

করার চেষ্টা করি, স্যার। তবে কেউ তাে এদিকে আসেন না। রাস্তাঘাট ভাল না। তবু যাঁরা আসেন, যত্ন করার চেষ্টা করি। আমার ক্ষমতাও স্যার সামান্য। নাদান মানুষ। 

আপনার ক্ষমতা মােটেই সামান্য নয়। আমি বিঘিত হয়েন্ধি। আপনি কি কি চান আমার কাছে আপনার কোন তদবির আছে?” 

জি না স্যার, আমার কোন তদবির নাই। সত্যি বলছেন তাে? জি স্যার, সত্যি। ফ্রিজ লাগানাে হয়েছে। হালকা শাে শাে শব্দ আসছে। পানির বােতল ভর্তি করে রাখা হয়েছে। জাহানারা স্বস্তি বােধ করছেন। অনেকদিন পর আরাম করে পানি খাওয়া যাবে। তবে ফ্রিজের রঙ তার পছন্দ হয়নি কটকটে হলুদ রঙ। তাকালেই মাথা ধরে যায়। 

জাহানারা বাইরের লােকদের সঙ্গে কথাবার্তা বিশেষ বলেন না। সুরুজ মিয়ার সঙ্গে বললেন । 

এত যন্ত্রণা করার কোনই প্রয়ােজন ছিল না। ঠাণ্ডা পানি আমাকে খেতেই হবে এমন কোন কথা নেই। যাই হােক, আপনাকে ধন্যবাদ। 

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-১৩

সুরুজ মিয়া বিনয়ে নিচু হয়ে বললেন, যা দরকার হবে আমাকে বলবেন বেগম সাহেব। কোন সংকোচ করবেন না। 

শাহেদ পাখি শিকারের কথা বলেছিল । শীতের পাখি। সদ্য হবে?’ 

অবশ্যই সম্ভব হবে। এটা পাখি শিকারেরই জায়ণা। গত বৎসর কমিশনার সাহেব আর তাঁর স্ত্রী এসেছিলেন। পাখি শিকারের জন্যেই এসেছিলেন।’ 

জাহানারা বললেন, ব্যবস্থা করতে হবে নবনীর বাবাকে না জানিয়ে । উনি শুনলে রাগ করবেন। অতিথি পাখি মারা আইনে নিষেধ। 

সব কথা স্যারকে জানানাের দরকার নাই। উনি কিছুই জানাবেন না। আমি নৌকা, বন্দুক সব ব্যবস্থাই করে রাখব। ভাের-রাত্রে যাওয়া লাগবে। দুই আম্মাও কি সাথে যাবেন?’ 

হ্যা, ওরাও নিশ্চয়ই যেতে চাইবে। ‘কোন অসুবিধা নাই বেগম সাব। আমি ব্যবস্থা করে খবর দিব।’ 

আপনি হুট করে চলে যাবেন না। নাশতা খেয়ে যাবেন। ‘জি আচ্ছা।’ 

সুরুজ মিয়া নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে দু-একটা কাজ করলেন। বিকেলের মধ্যে খুঁটি বসিয়ে ব্যাডমিন্টন খেলার ব্যবস্থা করলেন। ব্যাডমিন্টন খেলার সাজ-সরঞ্জাম ঘরেই ছিল। গত বৎসর কমিশনার সাহেব ব্যাডমিন্টন খেলতে চেয়েছিলেন।

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-১৩

সব জিনিসপত্র যখন জোগাড় হল তখন তারা চলে গেলেন। সুরুজ মিয়া যত্ন করে তুলে রেখেছিলেন। এখন কাজে লেগেছে। এ জগতে কিছুই নষ্ট হয় না। এক সময় না এক সময় কাজে লাগে। মিনিস্টার সাহেবের পেছনে তার শ্রমও বৃথা যাবে না। এক সময় কাজে লাগবে। 

বিকেল। রােদ পড়ে এসেছে। 

শাহেদ খুব আগ্রহ নিয়ে ব্যাডমিন্টন খেলছে। একদিকে শাহেদ, অন্যদিকে শ্রাবণী । নবনীকে খেলার ব্যাপারে রাজি করানাে যায়নি। সে নাকি জীবনে ব্যাডমিন্টন খেলেনি। শাহেদ বলল, এটা এমন কোন খেলা না যে শিখতে হয়। র্যাকেট হাতে নিলেই খেলা যায়। সাহস করে র্যাকেটটা হাতে নাও। | নবনী বলল, আমার এত সাহস নেই । আমি বরং দেখি । দেখতেই আমার ভাল সাগছে।

 

Read More

হুমায়ূন আহমেদের লেখা ”তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে ”খন্ড-১৪

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *