হুমায়ূন আহমেদের লেখা ”তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে ”খন্ড-১৯

তারা পাশাপাশি বসল। নবনী হালকা গলায় বলল, তুমি হঠাৎ চলে আসায় আমি যে কি পরিমাণ খুশি হয়েছি তা কোন দিন তােমাকে বুঝিয়ে বলতে পারব না। আমার ছুটিটাই অন্য রকম হয়ে গেছে।

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণেতােমার ভাবভঙ্গি দেখে আমি অবশ্যি কিছু বুঝতে পারিনি। শ্রাবণী বরং অনেক হৈ চৈ করেছে।’ 

আমি শ্রাবণীর মত না। আনন্দিত হলেও চুপ করে থাকি। কষ্ট পেলেও চুপ করে থাকি। 

‘গাছের মত?’ 

হ্যা, গাছের মত । নিজের আনন্দ বা দুঃখের কোন কথাই কাউকে জানাতে ইচ্ছা করে না।’ 

শাহেদ সিগারেটের প্যাকেট বের করতে করতে বলল, একজন কেউ বােধহয় থাকা দরকার যাকে সব কথা বলা যায়। 

হয়ত দরকার। আমি ঠিক করেছি কি জান? আমি সারা জীবনে শুধু একজন মানুষ বাখব যাকে সবকিছু বলব। কখনাে দ্বিতীয় কেউ থাকবে না।’ 

‘সেই ভাগ্যবান একজনটি কি আমি?’ নবনী ছােট করে নিঃশ্বাস ফেলে বলল, এখনাে ঠিক জানি না। 

এখনাে জানি না মানে!’ সত্যি জানি না।’ ‘যে ছেলেটিকে তুমি দু’দিন পর বিয়ে করতে যাচ্ছ তাকে তুমি সব কথা বলতে পারবে না?’ 

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-১৯

হয়ত পারব । কিন্তু আমি এখনাে জানি না। স্বামী হলেই তাকে সব কথা বলা যায় তা তাে না। বেশির ভাগ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কিন্তু অনেক দূরত্ব থাকে। আমার বাবা-মা’কে দিয়েই দেখি–তারা দীর্ঘদিন পাশাপাশি বাস করছেন। রাতের পর রাত একই খাটে ঘুমুচ্ছেন। বাবার অসুখ হলে মা রাত জেগে সেবা করছেন। কিন্তু কী ভয়ঙ্কর দূরত্ব তাদের মধ্যে। আমার ধারণা, মা সারা জীবন এমন কাউকে পাননি যাকে সব কথা বলতে পারেন, আবার বাবাও হয়ত কাউকে পাননি যাকে সব বলতে পারেন।’ 

তাদের হয়ত দরকার নেই। 

হ্যা, তাও হতে পারে। তাদের হয়ত প্রয়ােজন নেই কিন্তু আমার আছে। আমি একজন কাউকে আমার সব কথা বলতে চাই । 

শাহেদ সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে বলল, আমাকে বিবেচনার মধ্যে রাখতে পার। তােমার সব গােপন কথা শুনতে হলে কিসব গুণাগুণ থাকতে হবে তা অবশ্যি জানি না। 

তুমি আমার কথাগুলি খুব হালকাভাবে নিচ্ছ‘ 

হালকাভাবে নিলি না নবনীআমি খুব সিরিয়াসলি নিচ্ছিতােমাকে আমি ঠি বুঝতে পারি না। 

বুঝতে না পারার মত কি করলাম?অনেক কিছুই তুমি করতুমি আমাকে কনফিউজ করতে চাওএকটা উদাহরণ দাওথাক, উদাহরণ দিতে চাচ্ছি না‘ 

নবনী বলল, তােমার কিছু মনে পড়ছে না বলে উদাহরণ দিতে পারছ নামনে পড় নিশ্চয়ই দিতে ।। 

শাহেদ বলল, মনে পড়লেও দিতাম নাউদাহরণ দেয়া মানে ঝগড়া করা। এখানে আমি ঝগড়া করতে চাই নাআমি অন্য কিছু চাই । 

নবনী ক্ষীণ গলায় বলল, কি চাও। ‘তােমার মনে আছে নিশ্চয়ই তুমি বলেছিলে, আমি যা চাব তাই পাব।’ নবনী বলল, চল ওঠা যাকআমাদের নিতে আসছে ‘কে নিতে আসছে রহমত ভাই আসছে—দেখ?‘ 

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-১৯

নবনী উঠে দাঁড়ালরহমত লম্বা লম্বা পা ফেলে এদিকেই আসছে। শাহেদ বলল, ওকে চলে যেতে বলআমার বসে থাকতে ভাল লাগছে। বসি আরাে কিছুক্ষণ। 

নবনী বলল, আমার বসে থাকতে ভাল লাগছে নাশীত লাগছে। 

শাহেদ বলল, মনে হচ্ছে হঠাৎ তুমি আমার ওপর রেগে গেছতােমাকে রাগানাের মত কিছু কি করেছি‘ 

নবনী জবাব দিল নাডাকবাংলাের দিকে হাঁটতে শুরু করলপেছনে পেছনে শাহেদ আসছেচাঁদের আলাে এখন আরাে পরিষ্কার হয়েছে। অস্পষ্ট ছায়াছায়া ভাব দূর হয়েছে। 

 ঘরে ঢুকে নবনী দেখল জাহানারা শােবার ঘর অন্ধকার করে শুয়ে আছেনতাঁর মাথার চুলে বিলি করে দিচ্ছে মিলু বুয়া। নবনী বলল, কি হয়েছে? জাহানারা বললেন, মাথা কেমন জানি করছেতােরা খেয়ে নেআমি উঠতে পারব না। 

বেশি খারাপ লাগছে, মা?জাহানারা জবাব দিলেন না। নবনী বলল, ডাক্তারকে খবর দিতে বলব? জাহানারা বিরক্ত গলায় বললেন, কাউকে খবর দিতে হবে নাতুই যা। 

নবনী বের হয়ে এলজাহানারা মিলুকে দরজা বন্ধ করে দিতে বললদরজা ভেতর থেকে বন্ধ হয়ে গেল। 

রাতে শ্রাবণীও কিছু খেল না। তার নাকি গলা ব্যথা করছেখাবার টেবিলে জামিল সাহেবও গম্ভীর হয়ে বসে রইলেননবনী বলল, তােমারও কি শরীর খারাপ লাগছে বাবা

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-১৯

 না, আমার শরীর ঠিকই আছে। তাের মাকে নিয়ে সমস্যা। রাতে ঘুমায় নাজেগে বসে থাকেকাল রাত তিনটার সময় উঠে দেখি সে ডাইনিং হলে বসে আছেউলের কি যেন বানাচ্ছে। আমি বললাম, কি বানাচ্ছ? সে বলল, কিছু না‘ 

নবনী বলল, নতুন জায়গায় মার ঘুম আসে না‘ 

জামিল সাহেব তিক্ত গলায় বললেন, নতুন জায়গা পূরাতন জায়গা কিছু নাকোন জায়গাতেই তার ঘুম আসে নাবাড়িতেও তাে ঘুমায় না ।

 

Read More

হুমায়ূন আহমেদের লেখা ”তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে ”খন্ড-২০ 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *