হুমায়ূন আহমেদের লেখা ”তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে ”খন্ড-৮

‘কেন, আমার ঘরে থাকতে কি তােমার ভাল লাগছে না? 

লাগছে। তবে আরাে ভাল লাগতাে যদি তুমিও থাকতে।’ 

নবনী অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। শাহেদ এত সহজ ভাবে এমন সব কথা বলে যে দারুণ অস্বস্তি লাগে।

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণেযদিও অস্বস্তি লাগার হয়ত কিছু নেই। এ ধরনের কথা বলার 

অধিকার শাহেদের আছে। 

নবনী! ‘কি?’ 

‘গম্ভীর হয়ে আছ কেন? একটু আগে যা বললাম তা শুনে মেজাজ খারপ হয়ে গেল নাকি মনে হচ্ছে মেজাজ কিছুটা খারাপ হয়েছে । আমি তােমার সঙ্গে খুব ভয়ে ভয়ে চলি । এমন সুপার সেনসেটিভ মেয়ে। তােমার উচিত ছিল ভেক্টোরিয়ান যুগে জন্মাননা। তুমি ভুল সময়ে জন্মেছ।’ 

‘চা ঠাণ্ডা হচ্ছে—চা খাও।’ 

‘খাচ্ছি। চা খেতে খেতে কঠিন সুরে তােমাকে কিছু কথা বলব। রাগ কর আর যাই কর।’ 

রাগ করব না। বল কি বলবে। সত্যি রাগ করবে না?’ 

তােমার মধ্যে একধরনের অদ্ভুত শুচিবায়ু আছে। এই শুচিবায়ু থাকাটা কি উচিত? ‘আমার এমন কিছু নেই।’ 

শাহেদ হাসতে হাসতে বলল, আছে । খুব ভালভাবেই আছে। তুমি নিজেও তা জান । এই কারণে তুমি নিজেও নিজের কাছে ছােট হয়ে থাক। সংকুচিত হয়ে থাক। গতবার আমার সঙ্গে যে ঝগড়াটা করলে—কেন করলে ‘আমিতাে বলেছি আমি লজ্জিত, দুঃখিত।’

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-৮

যত লজ্জিত বা যত দুঃখিতই হও এরকম পরিস্থিতি হলে তুমি আবারাে ঝগড়া করবে। কান্নাকাটি করবে। অথচ কত সামান্যে ব্যাপার।’ 

‘আমি স্বীকার করছি সামান্য ব্যাপার।’ | ‘তুমি মুখে বলছ স্বীকার করছি সামান্য ব্যাপার। আসলে স্বীকার করছ না। আমি কি করেছি— রিডার্স ডাইজেস্টের একটা মজার রসিকতা তােমাকে বলেছি।’ 

নবনী কঠিন স্বরে বলল, রসিকতাটা মােটেই মজার নয়। 

‘এটা তােমার অভিমত, কিন্তু রিভার্স ডাইজেস্ট মনে করে রসিকতাটা মজার। যে কারণে তারা এটা ছেপেছে রসিকতাটা হল….। 

একবারতাে বলেছ। আবার কেন?’ 

‘আবারাে শােন এবং আমাকে বলে এটা শুনে হৈ চৈ করার এবং কান্নাকাটি করার মানেটা কি। আমি গল্পের প্রতিটি স্টেপ তেঙ্গে ভেঙ্গে বলব-একজন রূপবতী তরুণী মেয়ে পার্টিতে গিয়েছে। সেখানে তার হঠাৎ বাথরূম পেল। সে… 

নবনী কঠিন মুখে বলল, প্লিজ স্টপ ইট। 

শাহেদ চুপ করে গেল। নিঃশব্দে চা শেষ করল। খানিকক্ষণ দুজনই চুপচাপ বসে থাকার পর আবার স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কথাবার্তা শুরু হল । শাহেদ বলল, তােমাদের ছুটি কেমন কাটছে?’ 

‘খুব ভাল কাটছে। একেকজন একেকজনের মত ছুটি কাটাচ্ছে। শ্রাবণী এই দু’দিন তার নিজের ঘর থেকে বের হয়নি। গল্পের বই পড়ে যাচ্ছে। মা এই দু’দিন রান্নাঘরে কাটিয়েছেন। বাবা বারান্দায় বসে বিভিন্ন লােকজনের সঙ্গে আলাপ করেছেন।’ 

আর তুমি? তুমি কি করছ? 

আমি একা একা ঘুরে বেড়ালি। একেক দিন, একেক জায়গায় যাচ্ছি।’ আর কােথায় গিলে ।’ আজ একটা প্রাচীন বটগাহ দেখে এসেছি। তােমাকে নিয়ে একদিন যাব। পরেং বটলা।’ 

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-৮

ইন্টারেসি কোন অর্থে বিশাল অর্থে। তাছাড়া বটগাছের গুড়ি বাঁধানাে। ঝুড়ি নেমে অদ্ভুত দেখাচ্ছে।’ বটগাছড়া আর কি দেখলে টিয়াপাখি দেলাম। ঝাকে ঝাকে টিয়া পাখি।’ টিয়া পাখি গুলিকেও কি ইন্টারেস্টিং মনে হয়েছে।” 

না। ওদের দেখে একটু ভয় ভয় লেগেছে।’ সরের কি আছে। ‘একসঙ্গে এত পাখি । তাছাড়া এরা খুব নিচু হয়ে উড়ছিল।’ 

শাহেদ শার্টের পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করল। নবনী বিস্মিত হয়ে বলল, তুমি সিগারেট ধরেছ নাকি? 

কয়েক দিন হল সিগারেট টানছি। মনে হচ্ছে নেশা ধরে গেছে। দিনে কটা খাও?’ দিনে বেশি খাই না। রাতে বাই। তুমি কি কোন কিছু নিয়ে চিন্তিত? 

কি নিয়ে চিন্তিত। ‘সেটাই তাে বুঝতে পারছি না।’ “তােমার কারখানায় কি কোন সমস্যা আছে সমস্যা তাে আছেই। ভয়ংকর লস খেয়েছি।’ যত ভয়ংকর লস হােক, সেই লস সামলে নেবার ক্ষমতা তাে তােমার আছে। আছে নীস্থা আছে। সিগারেট শেষ করে ঘুমুতে যাও। কাল কথা হবে। আচ্ছ।’ ‘নবনী উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, চা শেষ করে তুমি সব সময় পানি খাও। কই, আজ তাে খেলে না। 

শাহেদ পানির গ্লাস হাতে নিল।’ নবনী ইসস্তত করে বলল, তুমি আমার উপর রাগ করে আছ, তাই না? 

তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-৮

 মুখ দেখে বুঝতে পারছি রাগ করেছ। 

খানিকটা করেছি। তবে সব রাগ জলে ভেসে যাবে যদি তুমি যাবার আগে আমাকে জড়িয়ে ধরে একটা চুমু খাও। 

 নবনীর চোখ মুখ শক্ত হয়ে গেল। সে অন্যদিকে তাকাল। শাহেদ বলল, তুমি দেখি পাথরের মত শক্ত হয়ে গেছ। আমি কি ভয়ংকর অন্যায় কিছু বলেছি।’ 

নবনী কিছু বলল না। দরজা ধরে দাঁড়িয়ে রইল। শাহেদ বলল, আচ্ছা যাও—গুড নাইট। নবনী। 

নবনী যন্ত্রের মত চলল, গুড নাইট 

 

Read More

হুমায়ূন আহমেদের লেখা ”তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে ”খন্ড-৯

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *