তোমাকে পর্ব – ২ হুমায়ূন আহমেদ

তোমাকে পর্ব – ২

হুঁ।সেতারা মায়ের আদর পায়নি বললেই হয়। তার জন্মের পর পর মা অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেতারা বড় হতে থাকে আকবরের মার কোলে। মার অসুখ যখন সারল তখনো অবস্থার পরিবর্তন হল না। মা মাঝে মাঝেই বিরক্ত স্বরে বলতে লাগলেন, ঘর ভর্তি হয়ে যাচ্ছে মেয়ে দিয়ে, ভাল লাগে না। সেতারা যখন হাঁটতে শিখল, টুকটুক করে হাটত। মায়ের ঘরে গিয়ে দাঁড়াত সুযোগ পেলেই।

মা গভীর গলায় ডাকতেন, আকবরের মা ওকে নিয়ে যাও তো, এখুনি ঘর নোংরা। করবে। তার দুবছর বয়স হতেই মা ওকে পাঠিয়ে দিলেন আমাদের ঘরে। রাতে ঘুমাবে নীলুর সঙ্গে। দুধ খাবার জন্যে কাঁদলে আকবরের মা উঠে দুধ বানিয়ে দেবে। সেতারা তখন কোনো ঝামেলা করেনি। এখনো করে না। নীলুর গলা জড়িয়ে ঘুমায়। নীলু বলে, গল্প শুনবি?

বল।এক দেশে ছিল এক রাজা। তার দুই রানী দুয়ো ও সুয়ো… এ পর্যন্ত আসতেই সেতারার চোখ বুজে আসে। কোনোদিন আর সে গল্প শেষ পর্যন্ত শোনা ।ইদানীং বাবা সেতারাকে সঙ্গে নিয়ে ঘুমাতে চান। সেতারাও বেশ ভাল-মানুষের মত যায়।কিন্তু মাঝরাতে একা একা চুলে আসে আমাদের ঘরে। রোজ এই কাণ্ড। একরাতে অদ্ভুত একটা ব্যাপার ঘটল, সেতারা সবাইকে ডাকতে লাগল, মা এসেছে রিকশা নিয়ে। আমরা ধড়মড় করে উঠে বসলাম, কোথায়?

বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখলাম।বলিস কি? হৈচৈ শুনে বাবা উঠে এলেন। কোথায় কি, খা-খা করছে চারদিক! সেতারা দারুণ অবাক হল। বাবা বললেন, স্বপ্ন দেখেছি মা।উঁহু, স্বপ্ন না। আমি দেখলাম।সেতারা চোখ বড় বড় করে সবার দিকে তাকাতে লাগল। সে ব্যাপারটা কিছুই বুঝতে পারছে না। বাবা সেতারাকে সঙ্গে নিয়ে চলে গেলেন। সে রাতে আমি এবং নীলু এক খাটে ঘুমাতে গেলাম। এবং অনেক রাত পর্যন্ত দুজনেই নিঃশব্দে কাদলাম। অথচ দু’জনই এমন ভাব করতে লাগলাম যেন ঘুমিয়ে পড়েছি।

ধীরে ধীরে অনেকগুলি পরিবর্তন ঘটল বাড়িতে। বাবা অত্যন্ত বুদ্ধিমান ছিলেন। তিনি পরিবর্তনগুলি করলেন খুব সাবধানে। একদিন স্কুল থেকে ফিরে এসে দেখি মার আলনায় কোনো কাপড় নেই। সব বাবা কোথায় সরিয়ে ফেলেন। তার দিন সাতেক পর বারান্দায় মার যে বড় বাধাই করা ছবিটি ছিল সেটিকে আর দেখা গেল না। বাবা-মার শোবার ঘরে তাদের বেশ কয়েকটি ছবি ছিল, সেগুলিও সরানো হল।

আমাদের ঘরে মা-বাবা এবং আমাদের তিন জনের যে ছবিটি ছিল সেটি শুধু বাবা সরালেন না। রান্নাবান্না করবার জন্যে রমজান নামের একজন বুড়ো মানুষ রাখা হল। এই লোকটি এসেই প্রচণ্ড ঝগড়া শুরু করল আকবরের মার সঙ্গে। দুজনেরই কি ঝাঁঝাল কথাবার্তা। কিন্তু রমজান লোকটি ভাল। সে সেতারাকে কোলে নিয়ে ঘুরে ঘুরে ভাত খাওয়াত। আমাদের ওপর তার খবরদারিরও সীমা ছিল না।

এই সইন্ধ্যা রাইতে বাগানো ঘুরাঘুরি করণ ঠিক না।অত তেঁতুল খাওন বালা না, বুদ্ধি নষ্ট হয়।ভাত খাওনের আগে বিসমিল্লা কইরা এট্টু লবণ মুখের মইধ্যে দেওন দরকার।রাতের বেলায় খাওয়া-দাওয়া শেষ হলে সে গম্ভীর হয়ে একটা খবরের কাগজ নিয়ে আমাদের পড়ার ঘরে গিয়ে বসত। খবরের কাগজ পড়তে পড়তে এমন সব কথাবার্তা বলত যে নীলু হেসে উঠত খিলখিল করে।হুঁ খুব সংকটময় অবস্থা। বুঝছি নীলু আপা, অবস্থা সংকটময়।কেন?

নেপালে পাহাড়ি ঢল। হুঁ।এই অবস্থায় ঝগড়া লেগে যেত আকবরের মার সঙ্গে, আকবরের মা কোমরে দুই হাত দিয়ে রণরঙ্গিনী মূর্তিতে এসে দাঁড়াত।বিদ্যার জাহাজ যে বইছেন পাকঘরের বাসনডি কেডা ধুইব? চুপ থাক। অশিক্ষিত মূর্খ মেয়ে মানুষ, এদের নিয়ে চলাফেরা মুশকিল।রমজান ছাড়াও একজন ভয়ংকর রোগা দাঁত নেই ওস্তাদ রাখা হল। এই ওস্তাদটির নাম মুনশী সোভােহান। তিনি আমাদের তিন বোনকে সপ্তাহে তিন দিন গান শেখাবেন।

আমরা তিন জনেই গান শিখতে শুরু করলাম। সকাললো হরমোনিয়াম নিয়ে বসে সারেগা রেগামা গামাপা। খুবই বিরক্তিকর ব্যাপার। ওস্তাদ সোভােহান বেশিক্ষণ গান শেখাতে পারেন না। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার হাঁপানির টান ওঠে। গান থামিয়ে বলেন, ঘরে কোনো টিফিন আছে কিনা দেখ তো খুকি। না থাকলে একটা মুরগির ডিম ভেজে দিতে বল। হাসের ডিম না। হাসের ডিম গন্ধ করে, খেতে পারি না।

গানের ওপর থেকে আমাদের মন উঠে গিয়েছিল, কাজেই আমাকে দিয়ে গান হল না। সেতারা এবং নীলু। শিখতে লাগল। কিছুদিন পর নীলুও কেটে পড়ল। রইল। শুধু সেতারা। মাস ছয়েকের মধ্যে দেখা গেল বেণী দুলিয়ে হারমোনিয়াম বাজিয়ে সেতারা গাইছে, নবীর দুলালী মেয়ে খেলে মদিনায়। ও ও ও খেলে মদিনায়।ওস্তাদ সোভাহান ঘাড়-টান দুলিয়ে বলেছেন, মারহাবা মারহাবা কি টনটনে গলা। এইবার লক্ষ্মী ময়না গিয়ে দেখ তো কোনো টিফিন আছে কিনা।

না থাকলে মধুর দোকান থেকে যেন একটা আমৃত্তি নিয়ে আসে। আর চা দিতে বল।সে বছর শীতের সময় মা আমাদের তিন বোনকে সিরাজগঞ্জ থেকে আলাদা আলাদা চিঠি লিখলেন। বাবা একদিন সন্ধ্যায় পাংশুমুখে তিনটি খামে বন্ধ চিঠি নিয়ে আমাদের ঘরে এসে দাঁড়ালেন। কাঁপা গলায় বললেন, তোমাদের মা চিঠি লিখেছেন। তোমরা কি সেই চিঠি পড়তে চাও?

বাবার গলা কাঁপছিল। আমি পরিষ্কার বুঝতে পারলাম। বাবা চাচ্ছেন আমরা বলি, না। বাবা কপালের ঘাম মুছে নিচু স্বরে বললেন, আমরা সবাই তাকে ভুলতে চেষ্টা করছি। এখন আবার চিঠিপত্র শুরু করলে কষ্ট হবে। নতুন করে কষ্ট হবে।বাবা থামতেই সেতারা বলল, আমার চিঠি দাও। খানিকক্ষণ চুপ থেকে নীলু বলল, আমার চিঠিটাও দাও। শুধু আমি কিছুই বললাম না। বাবা ধরা গলায় বললেন, মামণি রাত্রি, তোমারটা?

আমি চাই না।কি লেখা ছিল নীলু এবং সেতারার চিঠিতে আমি জানি না। নীলু। সমস্ত কথাই আমাকে বলে। শুধু চিঠির ব্যাপারে কিছু বলল না। আর সেতারা তো তার খামই খুলল না। বন্ধ খাম হাতে নিয়েই ঘুরে বেড়াতে লাগল।আমি বললাম, খুলে দেব? না।না খুললে পড়বি কি করে?

আমি পরে পড়ব।যেন পড়লেই চিঠির মজা শেষ হয়ে যাবে। আমি সমস্ত দিন ভাবলাম কি লিখেছেন মা চিঠিতে? ক্লাসে আপারা কি পড়ালেন কিছুই বুঝতে পারলাম না। অংক আপা দুবার ধমক দিলেন, এই বিলু তোমার পড়ায় আজকে মন নেই, কি ব্যাপার? কিছু না আপা।আমি কি বলছি তুমি তো কিছুই শুনিছ না।শুনছি আপা।না শুনিছ না। বল তো আমি কি বলছিলাম?

আমি বলতে পারলাম না। সব মেয়েরা হেসে গড়িয়ে পড়তে লাগল। আমার ক্লাসের মেয়েরা বিচিত্র কারণে আমাকে অপছন্দ করে। সব সময় আমার পেছনে লেগে থাকে। আমাদের বাথরুমের দেয়ালে আমাকে নিয়ে অনেক কথাবার্তা লেখা। একটা নেংটা মেয়ে এবং একটা নেংটা ছেলের ছবি আঁকা আছে। মেয়েটার গায়ে লেখা বিলু ক্লাস নাইন খ শাখা।

অথচ কোথাও নীলুর নামে কিছু লেখা নেই। আমি কখনো বাথরুমে যাই না। যদি যেতেই হয় তাহলে অনেকক্ষণ সেখানে বসে কাদি। ইরেজার দিয়ে লেখাগুলি তুলে ফেলতে চেষ্টা করি–কিছুতেই সেগুলি উঠানো যায় না।বিলু মন দিয়ে পড়াশুনা করবে, বুঝলে। এরকম করলে তো হবে না।ক্লাসের মেয়েগুলি আবার হৈচৈ করে হেসে উঠল। বাড়িতে ফিরে এসে অনেকক্ষণ একা একা বসে রইলাম। রাতে রমজান ভাইকে বলে দিলাম, ক্ষিধে নেই, কিছু খাব না।

অনেক রাতে ঘুমাতে গিয়ে দেখি আমার-বালিশ্রের নিচে মায়ের পাঠানো খামটা রেখে দেয়া। নিশ্চয়ই বাবার কাণ্ড।ঘরে কেউ নেই। নীলু এখনো পড়ছে। সেতারা রান্নাঘরে রমজান ভাইয়ের সঙ্গে কি যেন করছে। আমি দরজা বন্ধ করে খাম খুলে ফেললাম। মা আমাকে বিলু নামে সম্বোধন করেননি, প্রথমবারের মত লিখেছেন রাত্রি।

মামণি রাত্রি, আমি জানি রাগ করেছ তুমি। কিন্তু কি করব মা। উপায় ছিল না। তুমি যখন বড় হবে তখন বুঝবে। মানুষের মন খুব বিচিত্র জিনিস। একবার কোনো কিছুতে মন বসে গেলে তা ফেরানো যায় না। আমি বহু চেষ্টা করেছি। মানুষ হয়ে জন্মানোর মতো কষ্টের কিছু নেই। আমি তোমাদের ছেড়েছুড়ে এসেছি। তবু রাতদিন তোমাদের কথাই ভাবি। রাতদিন প্রার্থনা করি যে কষ্ট আমি পাচ্ছি। তা যেন কখনো আমার মামণিদের না হয়।

–তোমার মা।

থার্ড পিরিয়ডে অংক আপা ক্লাসে ঢুকেই বললেন, বিলু ক্লাস শেষে আজি তুমি আমার সঙ্গে দেখা করবে।আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল। অংক আপা আজেবাজে প্রশ্ন করবেন। কয়েকদিন আগে হাফ টাইমের সময় অংক আপার সঙ্গে দেখা। আপা আমাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বললেন, তোমার মা শুনলাম ঐ লোকটার সঙ্গে ইন্ডিয়া চলে গেছে, সত্যি নাকি?

না সত্যি না।

কোথায় আছে তাহলে?

আমি চুপ করে রইলাম।

আপা গলা নিচু করে বললেন, বলতে পার না, না?

সিরাজগঞ্জে আছেন।

ও বাচ্চাকাঁচা হয়েছে নাকি?

আমি জানি না আপা?

আমাকে কে যেন বলল একটা ছেলে হয়েছে।

আমার নিজের ধারণা মেয়েদের মতো হৃদয়হীন পুরুষরা হতে পারে না। ছেলেরা কেউ এখনো আমাকে আমার মা প্রসঙ্গে কিছু জিজ্ঞেস করেনি। অথচ চেনাজানা মেয়েদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে কিছু জানতে চায়নি।ক্লাসের বন্ধুদের কথা বাদই দিই, বন্ধুদের মা-খালাদের পর্যন্ত কৌতূহলের সীমা নেই।

কোনো না কোনো ভাবে টেনেন্টুনে ঐ প্রসঙ্গ আনবেই।বিলু তোমরা আগে কিছু টের পাওনি? আগেই তো টের পাওয়া উচিত।তোমার মা নাকি যাবার আগে বহু টাকা-পয়সা নিয়ে গেছে? মা গিয়েছেন প্রায় দুবছর আগে। এখনো কেউ সেটা ভুলতে পারে না কেন কে জানে?

অংক ক্লাসটা আমার খুব খারাপভাবে কাটল। ক্লাস শেষ হওয়া মাত্র গেলাম। আপার কাছে। আপার নিজের কোনো ঘর নেই। কমন রুমে একগাদা টিচারের সঙ্গে বসে আছেন। তিনি আমাকে আড়ালে নিয়ে গিয়ে বললেন, তোমাদের বাড়িতে বয়স্ক মহিলা কেউ নেই? কাজের একটি মেয়ে আছে। আকবরের মা।সে ছাড়া কেউ নেই? জি না আপা। কেন?

তোমরা তো বড় হচ্ছে এখন, কিছু কিছু জিনিস তোমাদেব বলা দরকার, কেউ বলছে না। তাই তোমাকে ডাকলাম।আমি আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। আপা খানিকক্ষণ ইতস্তত করে বললেন, বিলু তোমার এবং নীলুর দুজনেরই এখন ব্ৰা পরা উচিত।আমি চোখ-মুখ লাল করে দাঁড়িয়ে রইলাম।তোমার বাবাকে বলবে কিনে দিতে। বাবাকে বলাব মধ্যে লজ্জার কিছু নেই। আর যদি লজ্জা লাগে তাকে আমি একটি চিঠি লিখে দিতে পারি।দিন, একটা চিঠি লিখে দিন।

ঠিক আছে, ক্লাস ছুটির পর চিঠি নিয়ে যেও। আরেকটি কথা, নীলু। মোটেই পড়াশোনা করছে না। তোমার বাবাকে বলবে কোনো প্রাইভেট টিচার রেখে দিতে। অংকে সে খুব কাঁচা। অংক জানে না বললেই হয়।আপা আমি বলব।আছে তুমি যাও এখন। এই সব বললাম দেখে কিছু মনে করনি তো? জি না।মনে হচ্ছে তুমি আমার ওপর রাগ করেছ। রাগ করার কিছু নেই বিলু। তোমাকে আমি খুব পছন্দ করি। এত ঝামেলার মধ্যেও যে মেয়ে প্রতি বিষয়ে সবচে বেশি নাম্বার পায় তার প্রশংসা তো করতেই হয়।অংক আপা একটু হাসলেন।বিলু?

জি।কখনো কোনো অসুবিধা হলে আমাকে বলবে।ঠিক আছে আপা বলব।শোন আরেকটা কথা। ইয়ে কি যেন বলে তোমার বাবা-নাকি আবার বিয়ে করছেন? জি না।তুমি বোধহয় জানো না। বাবার বিয়ের কথা তো মেয়েদের জানার কথা নয়।বাবার বিয়ের কথা কিছুদিন থেকেই শোনা যাচ্ছে। দিনাজপুর থেকে বড় মামা এসেছিলেন। তিনি পর্যন্ত নিলুকে আড়ালে ডেকে জিজ্ঞেস করেছেন, দুলাভাই নাকি বিয়ে করছেন? নিলু তার স্বভাবমত হেসে ভেঙে পড়েছে।হাসছিস কেন? হাসির কথা বললে হাসব না মামা?

আমি কি হাসির কথা বললাম নাকি? বিয়ে করলে তোদের অবস্থাটা কি হবে ভেবেছিস? কি আর হবে। আমার তো মনে হয়। ভালই হবে। কথা বলার একজন লোক পাওয়া যাবে।কথা বলার লোকের তোর অভাব? হ্যাঁ মামা। বিলুর সঙ্গে কি আর কথা সব বলা যায়? মা জাতীয় একজন কেউ লাগে। বাবা বিয়ে করলে ভাল হয় মামা।করছেন নাকি?

জানি না মামা। তবে দোতলার নজমুল চাচা একদিন আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার বাবা এখন একটা বিয়ে করলে মনে হয় সংসার স্বাভাবিক হয়।তুই কি বললি? আমি বললাম, তা তো ঠিকই।মামা গম্ভীর হয়ে পড়লেন। নীলু বলল, তারপর একদিন এক বুড়োমত ভদ্রলোক এসে বাড়িটাড়ি ঘুরেটুরে দেখলেন। মার সঙ্গে বাবার সম্পর্ক কি রকম ছিল জিজ্ঞেস টিজ্ঞেস করলেন।তাই নাকি?

হ্যাঁ মামা, বিয়ে বোধহয় লেগে যাচ্ছে।নীলু খিলখিল করে উঠল। আমি নিজেও অবাক হলাম। এসব কিছুই আমি জানি না। নীলু আজকাল অনেক কথাই আমাকে বলে না। প্রায়ই সে তার বান্ধবীর বাড়ি যাচ্ছে হঠাৎ করে তার সঙ্গে এত খাতির হল কেন–জিজ্ঞেস করাতে সে গা এলিয়ে হোসেছে। এ বাড়ির সবাই বদলে যাচ্ছে। বাবা বদলেছেন সবচেয়ে বেশি। আমাদের জন্মদিন গেল। জুন মাসের দশ তারিখ। বাবা কোনো কবিতা লিখলেন না। কয়েকদিন আগে দেখলাম সেতারাকে কি জন্যে যেন ধমকাচ্ছেন। সেতারা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। বাবার এরকম আচরণ তার কাছে সম্পূর্ণ নতুন। বাড়িও ফিরছেন। আজকাল অনেক রাতে।

গতকাল বাড়ি ফিরলেন সাড়ে এগারোটার দিকে। আমি জেগে বসে ছিলাম। বাবা বিরক্ত হয়ে বললেন, এত রাত পর্যন্ত জেগে বসে আছ কেন? আর থাকবে না। দশটা বাজতেই ঘুমাতে যাবে।আমি শান্ত স্বরে বললাম, তুমি আমার সঙ্গে এত রেগে রেগে কথা বলছ কেন? রেগে রেগে কথা বলছি নাকি? আমি উত্তর না দিয়ে নিজের ঘরে চলে এলাম। বাবা খাওয়া-দাওয়ার পর আমার ঘরে পাশের জানালার ধারে এসে দাঁড়িয়ে ডাকলেন, এই বিলু, বিলু। আমি ঘুমের ভান করে পড়ে রইলাম। বাবা বেশ খানিক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে চলে গেলেন।

বাবা এরকম ছিলেন না, বাবা বদলে যাচ্ছেন। নীলু। তো বদলে গেছে। আমি নিজেও বোধহয় বদলাচ্ছি। একা একা থাকতে ইচ্ছে করে। সেদিন খুব ঝগড়া করলাম নীলুর সঙ্গে। আমি মাঝে মাঝে অচেনা সব মানুষদের মন গড়া চিঠি লিখি, নীলু। সেটা জানে। তবু সে একটা চিঠি হাতে নিয়ে হাসতে হাসতে বলল, প্রেমপত্র নাকি রে? তারপর মুখ বাঁকা করে পড়তে শুরু করল–আপনাকে একটি কথা বলা হয়নি। এখন শ্রাবণ মাস তো, তাই খুব বৃষ্টি হচ্ছে।

রাতদিন ঝমঝম বৃষ্টিশ নীলু। বহু কষ্টে হাসি থামিয়ে বলল, শ্রাবণ মাস কোথায় রে, এটা তো আশ্বিন মাস। তোর মাথাটা খারাপ। হি-হি-হি। আমি চিঠি কেড়ে নিয়ে নীলুর গালে একটা চড় কষিয়ে দিলাম। নীলু দারুণ অবাক হয়ে গেল। আমি এরকম ছিলাম না।বাবা বিয়ে করলে সংসার স্বাভাবিক হলে তো ভালই হয়। নীলু ঠিকই বলেছে, সব বাড়িতে মা জাতীয় একজন কেউ দরকার। সে সময়মত মেয়েদের ব্ৰা কিনে দেবে।কিন্তু আমার বড় মামা সেদিকটা দেখছেন না।

তার ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে খুব খারাপ কিছু-একটা হতে যাচ্ছে। মামা বললেন, খোঁজখবর না রাখায় এটা হচ্ছে। নানান ধান্ধায় থাকি। খোঁজখবর নেই তা ঠিক। মামার বাড়ির সঙ্গে এখন সম্পর্ক নেই বললেই হয়। মামারা অনেকদিন ধরে আসেন না। আগে ঘনঘন আসতেন এবং যতবার আসতেন ততবারই জিদ করতেন। আমাদের দিনাজপুরে নেবার জন্যে। বাবা ব্যবসাপাতির ঝামেলা তুলে এড়িয়ে যেতেন। মা স্পষ্ট বলতেন, তোমাদের বৌদের সঙ্গে আমার বনে না। বাবা মা মারা গেলে বাপের বাড়ি থাকে না। সেখানে যাওয়া যায় না।

বাবা আবার বিয়ে করবেন কি-না এই প্রসঙ্গে বড় মামার এরকম কৌতূহলের কারণ কি আমি ধরতে পারি না। মামাদের সঙ্গে আমার বাবার তেমন আন্তরিকতা নেই। এইসব নিয়েও মার সঙ্গে তার ঝগড়া হত। মা বলতেন, আমার ভাইদের তুমি সহ্য করতে পার না, এর কারণ কি আমাকে বল তো? সহ্য করতে না পারার কি আছে?

কথা বল না, চুপচাপ থাক।একেক জনের একেক রকম স্বভাব। আমার স্বভাবই হচ্ছে কথা কম বলা।দোতলার নজমুল হুঁদা সাহেরের সঙ্গে তো খুব বকবক কর।আমি বকবক করি না। উনি করেন। আমি শুনি।আমার ভাইদের সঙ্গে তো তাও কর না।ওনার বকবকানি শোনা যায়। তোমার ভাইদেরটা শোনা যায় না।ও–তাই বুঝি?

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *