হুমায়ূন আহমেদের লেখা উপন্যাস দরজার ওপাশে খন্ড-৫

প্রশ্ন করলে জবাব দেয় না, গম্ভীর হয়ে থাকে । মাঝে মাঝে প্রশ্নের উত্তরে ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে । তার কাছে কিছু জানতে হলে এমনভাবে জিজ্ঞেস করতে হয় যেন কখনো প্রশ্ন বলে মনে হয় না ।

দরজার ওপাশে খন্ড -2

‘দাঁড়া আমি ছাড়ি । তারপর চা খেয়ে আসি । তুই কয়েকবার আমার খোঁজ করেছিস । ব্যাপার কি?’

রফিক চুপ করে রইল । চুপ করে থাকবে, জানা কথা । শেষের দিকে প্রশ্ন করা হয়েছে । আমি কাপড় ছাড়লাম । শার্ট- প্যান্ট পরতে পরতে বিরক্ত গলায় বললাম, কাঠের মত দাঁড়িয়ে থাকলে কোন লাভ হবে না । কিছু বলার থাকলে বলে ফেল ।                     ‘তোর কোন মন্ত্রীর সাথে পরিচয় আছে?’                                                  

‘কেন?’                                                                                                

রফিক নিঃশ্বাস ফেলল । কিছু বলল না । আমি হতাশ গলায় বললাম, তুই যা বলার বলে যা আমি নিজ থেকে কিছু জিজ্ঞেস করব না ।                           

‘চাকরি চলে গেছে । সাসপেনশন অর্ডার হয়েছে ।’                                     

‘ও আচ্ছা ।’                                                                                

‘আমি কিছুই করি নি । সুপারিনটেনডেন্ড ইনজিনিয়ার এসেছিলেন । আমাকে প্রশ্ন করলেন আমি জবাব দিলাম না । উনি মনে করলেন আমি ইচ্ছা করে বেয়াদবী করছি’।

দরজার ওপাশে খন্ড-৫                                                                      

‘যারা তোকে চেনে, তোর সঙ্গে কাজ করে, তারা তো তোর স্বভাব-চরিত্র জানে । তারা কিছু বলল না ? তারা জানে তোকে কিছু জিজ্ঞেস করলে তুই চুপ করে থাকিস ।’  রফিক নিঃশ্বাস ফেলে বলল, ‘কেউ আমার পক্ষে কিছু বলে নি । আমার সাসপেনশন অর্ডার হওয়ায় সবাই খুশি । কেউ আমাকে দেখতে পারে না ।’ ‘তোকে দেখতে না পারার তো কোন কারণ নেই ।’                                        

‘আমাকে শো-কজ করেছিল । শো কজের জবাব দিয়েছি । জবাব ওদের পছন্দ হয় নাই । সবাই বলছে আমাকে ডিসমিস করে দেবে ।’                               

‘শো কজে কি লিখেছিলি? কথা বল গাধা । তোকে প্রশ্ন করছি না-এমি জিজ্ঞেস করলাম।’                                                                     

রফিক চুপ করে রইল । আমি বিরক্ত গলায় বললাম, ওদের কোন দোষ দিচ্ছি না । আমি তোর বস হলে অনেক আগেই ডিসমিস করে দিতাম । প্রশ্নের জবাব দে যাতে বুঝতে পারি ব্যাপারটা কি । শেষ প্রশ্ন ।                            

‘কবে শো কজ করেছে? রফিক শুধু ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলল। আমি জবাবের জন্য অপেক্ষা করলাম না । চা খাবার জন্য রওনা হলাম । রফিক ক্ষীণ স্বরে বলল,     ‘অনেক আজেবাজে কথা শো কজে লিখেছে-আমি নাকি কাজ জানি না, কাজের প্রতি আমার আগ্রহ নাই । ইনসাবর্ডিনেশন । মনটা খারাপ হয়েছে । তোর জানাশোনা মন্ত্রী আছে?’’  

দরজার ওপাশে খন্ড-৫                                                             

এবার আমি চুপ করে রইলাম । ‍চুপ করে থাকলে রফিক নিজেই বলবে । রফিক বলল, আমার এক খালাত ভাইয়ের আত্নীয় আছে মন্ত্রী । খালাতো ভাইকে বললে হয়।বলতে ইচ্ছা করে না । খালাতো ভাইটা বিরাট বদ । তুই কোন মন্ত্রী চিনিস না । বদগুলির সঙ্গে থাকে । খালাতো ভাইটা একটা বদ এই জন্যেই…রফিক কথা শেষ করল না । মাঝে মাঝে সে দীর্ঘ বাক্য শুরু করে । যেই মূহুর্তে মনে করে অনেক বেশি কথা বলা হয়ে গেল, সেই মুহুর্তে চুপ করে যায় । বাক্যটা শেষ পর্যন্ত করে না ।                                                   

চায়ের টেবিলে দু’জন মুখোমুখি বসলাম । রফিক নাশতা করে এসেছে কি-না জিজ্ঞেস করা অর্থহীন । জবাব দেবে না । দ’জনের নাশতা দিতে বললেই ভাল । ‘রফিক, এই সপ্তাহেই তোদের বাড়িতে যাব । তোরা তো এখনো নারায়নগঞ্জ ড্রেজার কলোনিতে থাকিস? জবাব দিতে হবে না উপরে নিচে মাথা নাড়, তাহলে বুঝব’। রফিক মাথা নাড়ল । 

‘নদীর কাছে না তোদের বাড়ি?’

রফিক আবার মাথা নাড়ল । 

‘তুই এক কাজ করতে পারবি-নদীর তীরে বালির ভেতর দুটা গর্ত খুঁড়ে রাখতে পারবি ? মানুষসমান গর্ত । যেন গর্তে ঢুকলে শুধু মাথাটা বের হয়ে থাকে । কাজটা করতে পূর্ণিমার আগের দিন’।                                              

রফিক বিরস গলায় বলল, আচ্ছা ।                                                            

গর্ত কেন খুঁড়তে হবে, কি ব্যাপার, কিছুই জিজ্ঞেস করল না । এই স্বভাবই তাঁর না । পূর্ণিমার আগের দিন তার বাড়িতে উপস্থিত হলে দেখা যাবে সে ঠিকই গর্ত খুঁড়ে বসে আছে ।

দরজার ওপাশে খন্ড-৫                                                                 

পরোটা ভাজি দিয়ে গেছে । রফিক খাচ্ছে না । অর্থাৎ সে বাড়ি থেকে নাশতা করে বের হয়েছে । ভোররাতে রওনা না হলে এত সকালে কেউ ঢাকায় পৌঁছতে পারে না । এত ভোরে কে তাকে নাশতা বানিয়ে দিয়েছে? তার বউ? বছর খানিক আগে রফিক বিয়ে করেছে । যতদুর জানি, মেয়েটা চমৎকার । আপন-পর বলে তার মধ্যে কিছু নেই ।সবাই আপন । প্রচন্ড মাথা ব্যথা নিয়ে রফিকের কাছে গিয়েছি । তার স্ত্রীর সঙ্গে সেবারই প্রথম দেখা । সে রাগী গলায় বলল, মাথা ব্যথা করছে আমাকে বলেননি কেন ? আমি মাথা ব্যথার এমন একটা ম্যাসেজ জানি দু’মিনিটে ব্যথা উধাও হবে । দেখি মাথা নিচু করুন তো । বৌ-এর সঙ্গে তার মিল হয়নি । বউ বেশিরভাগ সময়ই বাপের বাড়িতে থাকে । জিজ্ঞেস করলে জবাব দেবে না জানি, তবু জিজ্ঞেস করলাম, তোর বউ তোর সঙ্গে থাকে, না বাপের বাড়ি থাকে ?                                                                                 

‘বাপের বাড়ি।’

‘আসে না তোর এখানে ?’                                                                  

‘আর আসবে না ।’                                                                              

রফিককে খুব চিন্তিত বা বিষাদগ্রস্ত মনে হল না । কখনো মনে হয় না । দুঃখিত বা বিষাদগ্রস্থ হবার ক্ষমতা সম্ভবত তার নেই । আমি সিগারেট ধরালাম । রফিকের দিকে প্যাকেট বাড়িয়ে দিতেই সে ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বলল, সিগারেট খাই না । বউ পছন্দ করে না । তোর চেনা মন্ত্রী নাই ? মন্ত্রী ছাড়া কিছুই হবে না ।  আমি হালকা হলায় বললাম, একজন মন্ত্রীকে আমি খুব সামান্য চিনি । জহিরের বাবা । জহির । আমার সঙ্গে স্কুল পড়ত। দেখি উনাকে বলে কোন ব্যবস্থা করা যায় কি-না । চিন্তা করিস না।                                          

‘আমি চিন্তা করি না।’      

হুমায়ূন আহমেদের লেখা উপন্যাস দরজার ওপাশে খন্ড-৬                                                       

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *