দ্বৈরথ পর্ব:৪
বাতি নিবিয়ে দিই আপাং বাতি নেবালে ঘর একটু ঠাণ্ডা হবে।ঊর্মি বাতি নিবিয়ে দিল। ঘর অবশ্যি পুরোপুরি অন্ধকার হল না। বিজুর পড়া শেষ হয়েছে। সে একনাগাড়ে বেশিক্ষণ পড়তে পারে না। ঘুম ধরে যায়। তখন পানির ঝাপটা দিতে হয়। একটা সিগারেট ধরিয়ে চা খেতে হয়। তার জন্যে ফ্লাস্কে চা বানানো থাকে। বিজু ফ্লাস্ক থেকে চা ঢেলে বাইরের বারান্দায় চলে গেল।
একটা সিগারেট ধরিয়ে চা খাবে। সিগারেট ধরানোর প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই সোমা এল বারান্দায়। বিজু সিগারেট নিয়ে খানিকক্ষণ ইতস্তত করল। ফেলে দেবে না রাখবে? শেষ পর্যন্ত রেখে দেওয়াই ঠিক করল। এতটুকু একটা বাড়ি এর মধ্যে যদি তিন জনের সামনে সিগারেট খাওয়া বন্ধ রাখতে হয় তা হলে তো বিরাট যন্ত্ৰণা।
বিজু বলল, এখন ঘুমাও নি, শুয়ে পড় আপা।তুই কখন শুবি? আমার দেরি আছে। দেড়টা-দুটার আগে ঘুমাতে যাই না।এতক্ষণ কি করিস? পড়াশোনা? হু।ভালোই তো। আগের মতো রেজাল্ট করতে পারলে তো খুবই আনন্দের ব্যাপার হবে।ঐ সব হবে না। কিছু মনে থাকে না। যা পড়ি সব ভুলে যাই। আপা তুমি শুয়ে। পড়। এক কাজ কর, আমার বিছানায় শোও। দু জন একখাটে ঘুমুতে পারবে না। আমি বারান্দায় পার্টি পেতে শোব। একস্ট্রা মশারি আছে, অসুবিধা হবে না।রাতে বৃষ্টিটিষ্টি হয় যদি?
কোনো অসুবিধা নেই। দু-এক ফোঁটা বৃষ্টিতে বিজুর কিছু হয় না।সোমা দাঁড়িয়েই রইল। তার ঘুম পাচ্ছে, কিন্তু ঐ অসহ্য গরমে ঘরের ভেতর শুতে ইচ্ছা হচ্ছে না। সে বারান্দায় চেয়ারে এসে বসল। মৃদু সুরে ডাকল, বিজু
কি আপা? তুই কি ওর সঙ্গে ঝগড়া করেছিলি না-কি?
কার সাথে? সোমা কিছুক্ষণ ইতস্তত করে বলল, তোর দুলাভাইয়ের কথা বলছি। ঝগড়া করেছিলি? বিজু তিক্ত গলায় বলল, কি আশ্চর্য। দুলাভাই শব্দটা তুমি ব্যবহার করলে কেন? ঐ লোকের কথা যদি ওঠে এখন থেকে তুমি সোজাসুজি বলবেকামাল। নো দুলাভাই বিজনেস।তুই আমার কথার জবাব দিস নি। ঝগড়া করেছিলি?
হ্যাঁ। লোকজন ছিল নয়তো চড় দিয়ে শালার দাঁত খুলে ফেলতাম।এইসব তুই কি বলছিস? তুমিই-বা উল্টা কথা বলছ কেন? ঐ শালাকে আমি কোলে নিয়ে চুমু খাব না-কি? সাপের যেভাবে খোলস ছাড়ায় ঐ ব্যাটার চামড়া আমি ঐভাবে খুলে নেব।তোর এত রাগ কেন? তোর সঙ্গে তো কিছু হয় নি। রাগ যদি কারো হবার হয়।
সেটা হবে আমার।তোমার হবে না। তোমার মধ্যে রাগ বলে কিছু নেই। থাকলে এত দিন লোকটার সঙ্গে থাকতে পারতে না।সোমা বলল, তোর কাছে আমার অনুরোধ বুঝলি বিজু, রাস্তায় যদি কোনোদিন ওর সঙ্গে দেখা হয় তা হলে হৈ চৈ করব না।বিজু চুপ করে রইল। তার খুব রাগ লাগছে। এসব আপা কী বলছে? সোমা বলল, সব তো চুকেবুকেই গেছে আর হৈ চৈ কেন? ঠিক না?
আচ্ছা ঠিক আছে। যাও হৈ চৈ করব না। এখন ঘুমুতে যাও। আমার বিছানায় ঘুমিও আপা। দু-একদিনের মধ্যে ফ্যানের ব্যবস্থা করব। তখন আরাম হবে।সোমা আবার তার ঘরে ঢুকল। কিচ্ছু ভালো লাগছে না। অস্থির অস্থির লাগছে।ঊর্মি বলল, আপা ঘুমুবে না? সোমা জবাব দিল না। তার খুব ইচ্ছা করছে প্রফেসর সাহেবের কথা জিজ্ঞেস করতে। ঊর্মি তাতে কিছু মনে করবে কি না কে জানে। মনে করার অবশ্যি কিছুই নেই। আর যদি মনে করে তাতেই বা কি। আপা।কি? এ বাড়িতে এসে তোমার কি খারাপ লাগছে?
না।আমার নিজের খুবই ভালো লাগছে। এ বাড়িতে আমার গল্প করার কেউ নেই। তোমার সঙ্গে গল্প করতে পারব।দোতলায় যাঁরা থাকেন তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ নেই? না। বুডোমতো এক ভদ্রলোক থাকেন। আর তাঁর এক খালা না কি কে যেন থাকেন। আমি ও বাড়িতে যাই না। চাচাঁদের বাসাতেও যাই না। আমার জীবন এই ঘরটার মধ্যে কেটে যাচ্ছে আপা।সোমা চুপ করে রইল। পাশের ঘর থেকে চাপা অথচ রাগী গলা শোনা যাচ্ছে। সোমা বলল, এরকম করে কথা বলছে কে রে? বড় চাচা। মাঝেমাঝে চাচা এরকম করে। মাথা গরম হয়ে যায় তখন এই সব শুরু করে।তাই নাকি?
হুঁ। আমার মনে হয় বড়ো চাচা পাগলটাগল হয়ে যাচ্ছে।সোমা চুপ করে বড়ো চাচার কথাগুলো শুনতে চেষ্টা করল। তেমন কিছু বোঝা যায় না তবে কেটে ফেলব পুতে ফেলব—এইসব শব্দ কানে আসছে।ঊর্মির ঘরে নতুন ফ্যান লাগানো হচ্ছে। কড়ই গাছ বিক্রির টাকায় কেনা ফ্যান। বিজুর উৎসাহের সীমা নেই। যদিও নীল গেঞ্জি গায়ে এক জন ইলেকট্রিশিয়ান আনা হয়েছে তবু পুরো কাজটা করল বিজু। কানেকশন দিয়ে সুইচ টিপল। ফ্যান ঘুরল না। ইলেকট্রিশিয়ান টেস্টার দিয়ে দেখে বলল, লাইন তো ভাইজান ঠিক আছে।
ঊর্মি বলল, ফ্যান ঠিক আছে তো? দোকানে চালিয়ে দেখেছ? বিজু বিরক্ত গলায় বলল, না চালিয়ে ফ্যান কিনব না-কি?ঊর্মি বলল, লোক-ঠকানো টাকায় কেনা তো, তাই ঘুরছে না।বিজু চোখ লাল করে বলল, লোক-ঠকানো টাকা মানে? কি বলছিস তুই? গাছটা কার, আমাদের না অন্যদের?আচ্ছা বাবা যাও—আমাদের। চিৎকার করছ কেন?এমন চড় দেব না—জন্মের শিক্ষা হয়ে যাবে।ঊর্মি বলল, চেঁচামেচি না করে চড় দিয়ে ফেল। তাও ভালো।
বিজু সত্যি-সত্যি চড় বসিয়ে দিল। ঊর্মি হতভম্ব হয়ে গেল। বিজ যে বাইরের একটা মানুষের সামনে চড় মারতে পারে তা তার কল্পনাতেও আসে নি। কেমন করে এটা সম্ভব হল? হচ্ছে কি এসব? নীল গেঞ্জি পরা ইলেকট্রিশিয়ান ব্যাপারটায় খুব মজা পাচ্ছে। দাঁত বের করে আসছে। ঊর্মির ইচ্ছা করছে বিজুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে। ছোটবেলায় এই জিনিসই করত। ছোটবেলায় যা করা যায় এখন তা করা সম্ভব না। সে নিঃশব্দে ঘর ছেড়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল।
বারান্দায় জাহানারা কেলি থেকে কাপে চা ঢালছেন। তাঁর মুখ গম্ভীর। কাজের ছেলেটা সকালে বাজারের টাকা নিয়ে পালিয়েছে, আর ফেরে নি। সত্তর টাকা নিয়ে ভেঙ্গে গেছে। অথচ তার বেতন পাওনা ছিল দেড় শ টাকার ওপরে।জাহানারা বললেন, সোমা কোথায় গেছে তুই জানিস? ঊর্মি জবাব দিল না। সে কান্না থামাবার প্রাণপণ চেষ্টা করছে। জাহানারা বললেন, কথা বলছি না কেন? সোমা কোথায় গেছে জানিস?
না।চাটা বিজুকে দিয়ে আয়।আমি পারব না মা।
জাহানারা কঠিন চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর ফর্সা গাল রাগে লাল হয়ে উঠতে শুরু করেছে। তিনি তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, কি বললি? কিছু বলি নি, দাওচা দাও দিয়ে আসছি।ঊর্মি চায়ের কাপ বিজুর সামনে রেখে সহজ গলায় বলল, বিজু ভাইয়া চায়ে চিনি হয়েছে কি-না দেখ।বিজু বলল, যা রহমানের জন্যে চা নিয়ে আয়—দেখ তাকিয়ে, প্রবলেম সলন্ড। ফ্যান বন-বন করছে। হা-হা।ঊর্মি তাকাল। নীল-রঙা ফ্যান ঘুরছে। ঘরে প্রচুর বাতাস। অথচ তার নিজের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। সে বারান্দার দিকে রওনা হল রহমানের জন্যে চা আনতে হবে। যে একটু আগে তাকে চড় খেতে দেখেছে। দেখে দাঁত বের করে হেসেছে।
ঊর্মি চা ঢালছে।জাহানারা পাশের চেয়ারে ক্লান্ত ভঙ্গিতে বসে আছেন। তিনি বিরস মুখে বললেন, কার চা? রহমানের।রহমানটা কে? ইলেকট্রিশিয়ান।ইলেকট্রিশিয়ানকে আবার চা-বিসকিট খাওয়াতে হচ্ছে? সোমা কোথায় গেছে। তুই জানিস না? না, জানি না।কাউকে কিছু না বলে গেল কোথায়?
ঊর্মি চা নিয়ে চলে গেল। বিজু এসে বলল, ফ্যান কেমন ঘুরছে দেখে যাও মা। বন- বন-ফন-ফন। ঘরে বাতাসের ফ্লাড হয়ে যাচ্ছে।জাহানারা বললেন, সোমা কোথায় গেছে জানিস? না।কাউকে কিছু না বলে কোথায় গেল? বিজু চিন্তিত গলায় বলল, কখন গেছে?দুপুর থেকে তো দেখছি না।মাই গড।
দুজনের মনেই যে চিন্তা একসঙ্গে কাজ করল তা হচ্ছে—আগের জায়গায় ফিরে যায় নি তো? কাউকে কিছু না বলে যাওয়ার অর্থ তো একটাই। বিজু বলল, এক বার চট করে দেখে আসব প্রফেসরের বাসাটায় আছে কি না?
সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা কর। সন্ধ্যার মধ্যে যদি না ফেরে তখন না হয়……. যদি দেখি ঐখানে আছে তখন কি করব?জাহানারা কোনো জবাব দিলেন না।
সোমা দূরে কোথাও যায় নি। গিয়েছে তার চাচার বাসায়। একসময় বড় চাচা ছদরুদ্দিন তাকে খুব স্নেহ করতেন। ঈদে নিজের মেয়েদের জামার সঙ্গে বাড়তি একটি জামা কেনা হত সোমার জন্যে। এক রাতের কথা সোমার পরিষ্কার মনে আছে, সে তখন ক্লাস সেভেনে পড়ে। বড় চাচা থাকেন সোবহানবাগে। রাত তিনটার দিকে হেঁটে হেঁটে সোবহানবাগ থেকে এখানে এসে উপস্থিত। তিনি সোমাকে নিয়ে একটা দুঃস্বপ্ন দেখেছেন। দুঃস্বপ্ন দেখে মনটা অস্থির হয়েছে কাজেই খোঁজ নিতে এসেছেন।
সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে মানুষ বদলায়, সোমার ধারণা, বড় চাচা অনেকখানি। বদলেছেন, তবু কিছুটা টান এখনো নিশ্চয়ই অবশিষ্ট আছে। তা বোঝা যায়। কড়ই গাছ। নিয়ে বিরাট একটা হৈ চৈ হত। সোমা এ-বাড়িতে উপস্থিত বলেই হয় নি। বড় চাচা চুপ করে গেছেন।ছদরুদ্দিন সাহেব দুপুরে ঘুমের আয়োজন করছিলেন। সোমাকে ঢুকতে দেখে উঠে বসলেন। কোমল গলায় বললেন, আয় মা, আয়।সোমা বলল, বাসা খালি কেন বড় চাচা চাচি কোথায়?
ও তার ভাইয়ের বাড়িতে গেছে। ঘোট মেয়েটাও গেছে। বাকি সব আছে ঐ ঘরে, কি যেন করছে। আসবে। তুই এখানে বোস খানিকক্ষণ।আপনি ঘুমুচ্ছেন ঘুমুন। আমি ওদের সঙ্গে গল্প করি। ঘুমটুম কিছু না, শুয়ে থাকি। বিরাট যন্ত্রণার মধ্যে আছি। এর মধ্যে ঘুম হয় না। কীসের যন্ত্রণা?
আসছিস যখন সবই শুনবি। সরচেয়ে বড় যন্ত্রণা কি শুনবি? সংসার অচল। একটা পয়সা রোজগার নাই। তোর চাচি যায়—ভাইদের কাছ থেকে চেয়েচিন্তে কিছু আনে, ঐ দিয়ে সংসার চলে।সোমা তাকিয়ে রইল। ছদরুদ্দিন ক্লান্ত গলায় বললেন, মেয়েগুলো বড় হয়েছে–বিয়ে দেওয়া দরকার। একটা সম্বন্ধ আসে না। হাড় জিরজিরে শরীর। সম্বন্ধ আসবেই বা কেন? কোনো ছেলে চায় একটা কঙ্কাল বিয়ে করে বাড়িতে নিতে?সোমা চুপ করে রইল। ছদরুদ্দিন বললেন, এমনিতে কঙ্কাল কিন্তু তেজ আবার সোল আনার ওপর দুই আনা-আঠারো আনা। মান-অপমানের যন্ত্রণায় কাছে যাওয়া যায় না।মান-অপমান থাকা কি খারাপ চাচা?
অবশ্যই খারাপ। ভিক্ষুকের আবার মান-অপমান কি? ভিক্ষুক হচ্ছে ভিক্ষুক।কী-যে বলেন চাচা।কি বুলি মানে? আমার অবস্থা তুই জানিস? তোর চাচিরা টাকা-পয়সা দেওয়া বন্ধ করলে রাস্তায় ভিক্ষা করতে বের হব। সত্যি বের হব। তুই নিজের চোখে দেখবি।চুপ করুন তো চাচা।ছদরুদ্দিন খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তাঁর ভাবভঙ্গি সোমার ভালো লাগল না। কেমন যেন অপ্রকৃতিস্থ চাউনি। চোখ দুটো বড় বেশি জ্বল-জ্বল করছে।ছদরুদ্দিন বললেন, তোর খবর কিছু কিছু শুনলাম। তোর চাচি বলছিল। এইসব কি সত্যি?
কোন সব? চলে এসেছিস না-কি? হুঁ।কেন? সে অনেক কথা চাচা, বাদ দিন।বাদ দেব কেন? বল সবকথা।বলার মতো কিছু না।মারধর করত না-কি?
সে-সব কিছু না। স্বভাব খুব খারাপ। আজেবাজে কাজ করে বেড়ায়। জেলে পর্যন্ত গেছে। কিছু কিছু তো নিশ্চয়ই জানেন।আগে একটা বিয়েও না-কি করেছিল? বাদ দিন চাচা।এইরকম একটা লোকের সঙ্গে তোর বিয়ে হল কি করে? এইসব নিয়ে কথা বলতে ভালো লাগছে না চাচা।শয়তান শয়তান-চারদিকে শয়তান।
মানুষের মুখোশপরা শয়তান। বুঝলি শয়তান……..। চাচা আমি ঐ ঘরে যাই, দেখি তিথিমিথিরা কি করছে।কিছুই করছে না। তুই বোস এখানে–চা খাবি? হ্যাঁ।দেখি চায়ের ব্যবস্থা আছে কিনা, দেখা যাবে চায়ের পাতা নাই, চিনি নাই, দুধ নাই। এই সংসারে আর থাকা যাবে না। সংসার আমার জন্য না। ও তিথি, তিথি…. কানে শোনে না না-কি? তিথি।
তিথি এসে দাঁড়াল। কিছু বলল না।তোর সোমা অপাকে চা দে। খুটখাট শব্দ হচ্ছে কীসের? ক্যারাম খেলছি।এর মধ্যে ক্যারাম খেলাও চলছে? বা ভালো-খুব ভালো। খেল, আরাম করে ক্যারাম খেল। সব গুটি গর্তে নিয়ে ফেলে দে।তিথি মুখ কালো করে চলে গেল। সোমা ছাড়া পেল সন্ধ্যার আগে-আগে। সারাক্ষণ তাকে বড় চাচার পাশে বসে থাকতে হল। বড় চাচা ক্ৰমাগত কথা বলে গেলেন যার বেশিরভাগই হচ্ছে হা-হুতাশ।
বুঝলি সোমা, আমি এখন হয়েছি কীটস্য কীট, গরুর ঘাড়ে ঘা হয় দেখেছিস? ঐ ঘায়ে একরকম সাদা-সাদা কৃমি হয়। আমি হচ্ছি ঐ কৃমি। তিথির মামারা কেউ আমার সঙ্গে কথা বলে না। এমনভাবে তাকিয়ে থাকে যেন আমি একজন খানসামা। এক দিন কি হয়েছে শোন, তিথির বড় মামার বাড়িতে গিয়েছি। গিয়ে দেখি বিরাট মচ্ছব রাজ্যের লোকজন এসেছে। তিথির মামা আমাকে কী বলল জানিস? বলল দুলাভাই আপনি গাড়িটা নিয়ে যান ভালো দেখে কিছু দৈ-মিষ্টি নিয়ে আসুন।
অবস্থা চিন্তা কর। আমি এখন হয়েছি বাসার চাকর। ঐদিকে এখন ভুলেও যাই না। ভয়েই যাই না। এখন যদি যাই তা হলে বলবে—দুলাভাই আপনি এসেছেন ভালো হয়েছে, এক বালতি পানি নিয়ে বাইরে যান তো, ড্রাইভার গাড়ি ধুচ্ছে ওকে একটু সাহায্য করুন। বিচিত্র কিছু না বলবেই। না বলে পারে না—ঐ গুষ্ঠিরে আমি চিনি….।সোমা যখন উঠে এল তখন তার রীতিমতো মাথা ধরে গেছে।বাসায় পা দেওয়ামাত্র সবাই এক বার করে বলল, কোথায় ছিলে?
বড় চাচার বাসায় ছিল শুনে জাহানারা বললেন, ঐখানে যাওয়ার দরকার কি? সোমা বলল, তোমাদের সঙ্গে ঝগড়া চলছে—তোমরা যাচ্ছ না। ভালো কথা। আমি কেন যাব না? বানিয়ে বানিয়ে যখন এক শ কথা বলবে তখন বুঝবি।বলুক।কিছু তো জানি না, তাই বলছিস বলুক। জানলে বলতিস না।আমার জানার দরকার নেই মা। তোর বড় চাচা এখন কি বলে বেড়াচ্ছে শুনবি?
থাক–বড় চাচা প্রসঙ্গ থাক। রাতে খাবার সময় সোমা নিজেই আবার বড় চাচার প্রসঙ্গ তুলল। নিচু গলায় বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, বড় চাচার অবস্থা যে কত খারাপ সেটা তুমি জান? সাইফুদ্দিন সাহেব বললেন, এইসব তোকে বলল—আর তুই বিশ্বাস করে চলে এলি? বিশ্বাস করব না কেন?
বিজু বলল, ওঁর একটা কথাও তুমি বিশ্বাস করবে না। বিগ লায়ার। সপ্তাহে এক দিন ঐ বাড়িতে পোলাও হয়। তুমি তো এইখানেই আছ—প্রতি শুক্রবারে পোলাওয়ের গন্ধ পাবে। বড় চাচির ভাইরা বিরাট পয়সা করেছে। বোনের নামে ব্যাংকে টাকা-পয়সা জমা করে রেখেছে। মাসে মাসে যেন হাতে টাকা আসে এই জন্যে রেস্টুরেন্টের শেয়ার কিনে দিয়েছে।তুই এত খবর পেলি কোথায়?
চোখ-কান খোলা রাখি এই জন্যে সব জানি। কোনো কথা যদি ভুল বলি গালে একটা চড় দিও। কিছু বলব না। দিব্যি বাড়ি দখল করে বসে আছে। মতলব খুব খারাপ। তবে আমি ছাড়ার লোক না। তিন মাসের মধ্যে গেট আউট করে দেব। যদি না করি তো আমার নাম বিজু না।সোমা ভাত ছেড়ে উঠে পড়ল। বিজুর কথাবার্তা অসহ্য লাগছে। অল্প বয়সের একটা ছেলে কেমন ভুরু কুঁচকে বুড়োদের মতো কথা বলছে। এসব কি? বিজু বলল, মা, দেখলে আপা কেমন আমাদের ওপর রাগ করে উঠে গেল?
না জেনে, না শুনে, শুধু শুধু রাগ করলে হয়? বড় চাচার সম্বন্ধে লেটেস্ট ইনফরমেশন কী পেয়েছি শুনবে? জাহানারা বললেন, থাক এইসব।আহ্ শোন না মা। ভেরি ইন্টারেস্টিং। এত দিন আমরা জানতাম বড় চাচা তাঁর দোতলাটা বিক্রি করে দিয়েছেন। ব্যাপারটা সত্যি না। বিক্রির কথা বলে টাকা নিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু কাগজপত্রে সই করেন নি, সবই মুখে মুখে।
সাইফুদ্দিন বললেন, বলিস কি তুই?বিজু বলল, পাকা খবর বাবা। কোনো ভুলে নাই। এখন বড় চাচি বলছেনবাড়ি তো বিক্রি হয় নাই। বাড়ি ভাড়া অ্যাডভান্স নিয়েছি।সাইফুদ্দিন খাওয়া বন্ধ করে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। বিজু বলল, এখন বাবা অবস্থাটা দেখ, নিজের অংশ তাঁর নিজেরই আছে, প্লাস আমাদের অর্ধেকটা তাঁর দখলে।জাহানারা বললেন, এই খবর পেলি কবে?
অনেক আগেই পেয়েছি। তোমাদের কিছু বলি নি কারণ সিওর ছিলাম না। এখন সিওর হয়েছি।আজ রাতটা এমনিতে ঠাণ্ডা। তার ওপর মাথার ওপর ফ্যান ঘুরছে। অসহ্য গরমে জেগে থাকার কথা নয়, কিন্তু সোমা জেগে আছে। তার অনিদ্রা রোগ আজকের নয়, অনেক দিনের। বিয়ের পরপরই অসুখটা হল—সে জেগে আছে, পাশেই কামাল মরার মতো ঘুমুচ্ছে। মাঝে-মাঝে ঘুমের মধ্যে বিড় বিড় করছে এবং কথা বলছে। খুব উত্তেজিত ভঙ্গির কথা। যেন ভয়াবহ কোনো স্বপ্ন দেখছে। প্রথম দিকে ভয় পেয়ে সোমা কামালের গায়ে ধাক্কা দিত।
এই, এরকম করছ কেন? কী হয়েছে—এই।কামাল সঙ্গে-সঙ্গে জেগে যেত তবে কিছুই বলত না, চোখ বড়বড় করে তাকিয়ে থাকত। সোমা বলত, এরকম করছিলে কেন? কি স্বপ্ন দেখছিলে? মনে নাই।পানি খাবে? পানি এনে দেব?দাও।
সোমা পানি এনে দেখত কামাল আবার ঘুমিয়ে পড়েছে। গভীর ঘুম। কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার ঘুমের মধ্যে বিড় বিড় কথা। উত্তেজিত ভঙ্গি। হো হো শব্দ। ভয়ে সোমা কাঠ। লোকটা এরকম করে কেন? আবার ডেকে তুলবে? পানি খেতে বলবে? এই মানুষটাকে তার গোড়া থেকেই পছন্দ হয় নি। বিয়ের রাতেই তার মনে হয়েছে এই মানুষটা অন্যরকম। আশেপাশে সে যাদের দেখে এ তাদের মতো নয়। আলাদা। কি রকম আলাদা? সোমা ঠিক বুঝতে পারে নি। গোড়াতে অবশ্যি বোঝার চেষ্টাও করে নি। এই মানুষটাকে বোঝর জন্যে সারা জীবনই তো সামনে পড়ে আছে। এত তাড়া কীসের?
অবশ্যি বাসর রাতে লোকটির প্রতি সে যথেষ্ট কৃতজ্ঞতা বোধ করছিল। তাকে বিয়ে করবার জন্যে কৃতজ্ঞ। এই বাড়ি থেকে সরিয়ে নিয়ে যাবার জন্যে কৃতজ্ঞ। সোমার কৃতজ্ঞ হবার কারণ ছিল। এই বাড়িতে কিংবা এই পাড়ায় সে আর থাকতে পারছিল না। তার সারাক্ষণ ইচ্ছা করত ছুটে পালিয়ে যেতে। এমন কোথাও যেতে, যেখানে একটি মানুষও তাকে খুঁজে পাবে না। কেউ আঙুল দিয়ে তাকে দেখিয়ে বলবে না—ঐ দেখ সোমা যাচ্ছে। কোন সোমা বুঝতে পারছে তো?
হুঁ হুঁ—ঐ সোমা।দেখতে তো বেশ শান্তশিষ্ট বলে মনে হচ্ছে।শান্ত? তা শান্ত তো বটেই। হা-হা-হা। নিজে শান্ত চারদিকে অশান্ত।
আঠার বছর বয়স পর্যন্ত সোমাকে সবাই শান্ত মেয়ে, ভদ্র মেয়ে এবং খুবই লাজুক ধরনের মেয়ে বলেই জানত। পাড়ার অতি বখা ছেলেও তাকে দেখে কোনোদিন শিস দেয় নি, বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি করে নি। কিংবা করলেও সোমা শোনে নি। সোমা রাস্তায় বেরুত মাথা নিচু করে। এমনভাবে হাঁটত মনে হত আশেপাশে কেউ নেই, সে যেন একা জনশূন্য পথে হেঁটে চলে যাচ্ছে।
একটা ক্ষুদ্র এবং প্রায় তুচ্ছ ঘটনায় সব বদলে গেল। সোমাদের বাড়ির তিনটা বাড়ির পর নারকেল গাছওয়ালা বাড়ির দোতলায় নতুন ভাড়াটে এল। এক প্রফেসর তাঁর সাত বছরের ফুটফুটে মেয়ে এবং অসুস্থ স্ত্রী। ভদ্রলোক প্রথম দিনেই সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন, কারণ ভদ্রলোকের সঙ্গে এল ট্রাক ভরতি বই। এত বই কারোর থাকে? বাড়িটাকে কি সে লাইব্রেরি বানাবে?
মানুষগুলো থাকবে কোথায়? ভদ্রলোকের স্ত্রী এলেন এম্বুলেন্সে করে। এ-ও এক রহস্য। এম্বুলেন্স করে রুগীরা হাসপাতালে যায় এটাই জানা। এম্বুলেন্সে করে ভাড়া বাড়িতে থাকতে আসে এটা কারোর জানা ছিল না।এক দুপুরে সোমা ভদ্রমহিলাকে দেখতে গেল।মিষ্টি চেহারার একটা মেয়ে। প্যারালাইসিস হয়ে পড়ে আছে। সমস্ত শরীর শুকিয়ে। কাঠি অথচ মুখটা ভরাট। চোখ জ্বল-জ্বল করছে। তার নাম অরুণা।
তার স্বামী তাকে ডাকে অরু নামে এবং ডাকে খুব মিষ্টি করে।ভদ্রমহিলা সোমার সঙ্গে তেমন কোন কথা বললেন না। কি নাম? কি পড়? বাসা কোথায়? এইটুকু জিজ্ঞেস করেই খুব সম্ভব ক্লান্ত হয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললেন। ভদ্রমহিলার স্বামী অনেক কথা বললেন। তাঁর নাম আশরাফ হোসেন। ফিলসফির অধ্যাপক। ভদ্রলোকের গলার স্বর মোটা। কথা বলার সময় চারদিক গম-গম করে, তবে কথা বলার মাঝখানে মাঝখানে হঠাৎ করে তিনি থেমে যান এবং কেমন যেন বিষণ্ণ হয়ে পড়েন।
আশরাফ সাহেব বললেন, তোমার কি নাম খুকি? সোমা লজ্জিত গলায় বলল, সোমা।সুন্দর নাম তো। বলতে লজ্জা পাচ্ছ কেন? সোমবারে জন্ম নিশ্চয়ই? সোমবারে জন্ম হলে বাবা-মারা নাম রাখে সোমা। তোমার কি সোমবারে জন্ম?
জি।কী পড়? আই এস সি।বাহ্, আমি আরো কম ভেবেছিলাম। বাচ্চা মেয়েরা আজকাল উঁচু-উঁচু ক্লাসে পড়ে।সোমা কিছু বলল না। কেন জানি তার লজ্জা কিছুতেই কাটছে না।তুমি কি গল্পের বই পড় সোমা?অল্প-অল্প পড়ি।
অল্প অল্প পড়বে কেন? অনেক বেশি-বেশি পড়বে। বই যে মানুষের কত ভালো বন্ধু এটা বই পড়ার অভ্যাস না হলে বুঝতে পারবে না। আমার কাছে অসংখ্য বই আছে। গল্প-উপন্যাসই বেশি। এস তোমাকে দেখাই।বইয়ের সংখ্যা, আলমারীতে সাজিয়ে রাখার কায়দা, ঘরের মাঝখানে পড়ার টেবিল সব দেখে সোমা মুগ্ধ হয়ে গেল। সে অবাক হয়ে বলল, সব বই আপনি পড়েছেন?
না, অনেক বই-ই আছে পড়তে ভালো লাগে নি, দু এক পাতা পড়ে রেখে দিয়েছি। এখন আগের মতো পড়ার সময়ও পাই না। শুধু কিনে যাচ্ছি। তোমার যদি কোনো বই পড়তে ইচ্ছা করে এখান থেকে নিয়ে যাবে। টেবিলের ওপর যে লাল খাতাটা দেখছ ওখানে নাম লিখবে। কি বই নিতে চাও তার নাম লিখবে। তারিখ দেবে। যেদিন ফেরত দেবে মনে করে ফেরত দেওয়ার তারিখও লিখে রাখবে। কি—নেবে কোনো বই? সোমার বই নিতে ইচ্ছা করছিল না, তবু ভদ্রলোকের আগ্রহ দেখে মাথা নাড়ল।নিজে পছন্দ করে নেবে, না আমি পছন্দ করে দেব? আপনিই দিন।
Read more
