সত্যজিৎ রায় এর নয়ন রহস্য (পর্ব-১২)

নয়ন রহস্য

সেটা কবে ? ওর ক্ষমতা প্রকাশ পাবার তিনদিন পরে—দেসরা ডিসেম্বরএই সিদ্ধান্তের কারণটা কী এর একটাই কারণ, মিত্তির মশাইআমার বাড়ি দেখেই বুঝতে পারছেন আমার টানাটানির সংসারআমার চারটি সন্তানবড়টি ছেলে, সে বি কম পড়ছে তার খরচ আমাকে জোগাতে হয়তারপর দুটি মেয়েতাদেরও ইস্কুলের খরচ আছেনয়নকে এখনাে ইস্কুলে দিইনি

আমি এই কালীঘাট পোেস্ট আপিসেই সামান্য চাকরি করিপুঁজি বলতে কিছুই নেই ; যা আনি তা নিমেষেই খরচ হয়ে যায় ; ভবিষ্যতের কথা ভেবে গাটা বারবার শিউরে ওঠেতাই নয়নের মধ্যে যখন হঠাৎ এই ক্ষমতা প্রকাশ পেল তখন মনে হল—একে দিয়ে কি দুপয়সা উপার্জন করানাে যায় না ? কথাটা শুনতে হয়ত খারাপ লাগবে কিন্তু আমার যা। অবস্থা, তাতে এমন ভাবাটা অস্বাভাবিক নয়, মিত্তির মশাই‘ 

সেটা আমি বুঝতে পারছি, বলল ফেলুদাএর পরেই আপনি নয়নকে তরফদারের কাছে নিয়ে যান ? | আজ্ঞে হ্যা । আমার ত টেলিফোন নেই, তাই আর অ্যাপয়েন্টমেন্ট করতে পারিনি, সােজা চলে যাই ছেলেকে সঙ্গে নিয়েভদ্রলােক নয়নের ক্ষমতার দুএকটা নমুনা দেখতে চাইলেনআমি বললুম, ওকে এমন কিছু জিজ্ঞেস করুন যার উত্তর নম্বরে হয় ।

নয়ন রহস্য (পর্ব-১২)

ভদ্রলােক নয়নকে বললেন, “আমার বয়স কত বলতে পার ?” নয়ন তক্ষুনি জবাব দিলতেত্রিবছর তিন মাস দশ দিন। এর পরে আর কোনাে প্রশ্ন করেননি তরফদারআমাকে বললেন—আমি যদি ওকে মঞ্চে ব্যবহার করি তাতে আপনার কোনাে আপত্তি আছে ? আমি অবশ্যই পারিশ্রমিক দেবাে–আমি রাজি হয়ে গেলুমতরফদার জিজ্ঞেস করলেন–আপনি কত আশা করেন ? আমি ভয়ে ভয়ে বললুম–মাসে এক হাজারতরফদার বললেন, ভুল হল আমার মাথায় কী নম্বর আছে বলত,নয়ন ?নয়ন বলল—তিন শূন্য শুন্য ৩৮ 

শূন্য। —সে ভুল বলেনি, মিত্তির মশাইতরফদার মশাইও তাঁর কথা রেখেছেনআগাম তিন হাজার আমি এরই মধ্যে পেয়ে গেছি। আর ভদ্রলােক যখন আমাকে বাঁচবার পথ দেখিয়ে দিলেন, তখন নয়নকে তাঁর বাড়িতে রাখার প্রস্তাবেই বা কি করে না বলি ? কিন্তু নয়ন কি স্বেচ্ছায় গেল ? | ‘সেও এক তাজ্জব ব্যাপার। এক কথায় রাজি হয়ে গেল। এখন ত ও দিব্যি আছে। ‘এইবারে আরেকটা প্রশ্ন করছি, বলল ফেলুদা, তাহলেই আমাদের কাজ শেষ। 

বলুনওর ক্ষমতার প্রথম পরিচয় আপনি কী করে পেলেন ? | ‘খুব সহজ ব্যাপারএকদিন সকালে উঠে নয়ন বলল—“বাবা, আমার চোখের সামনে অনেক কিছু গিজ গিজ করছেতুমি সেরকম দেখছ ?আমি বললাম, কই, না ! কী গিজ গিজ করছে ?নয়ন বলল, “এক দুই তিন চার পাঁচ ছয় সাত আট নয় শূন্য।

নয়ন রহস্য (পর্ব-১২)

সব এদিকে ওদিকে ঘুরছে, ছুটছে, লাফাচ্ছে, ডিগবাজি খাচ্ছেআমার মনে হয় আমাকে যদি, নম্বর নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস কর তাহলে ওদের ছটফটানি থামবেআমার পুরােপুরি বিশ্বাস হচ্ছিল না, তাও ছেলের অনুরােধ রাখতে জিজ্ঞেস করলাম, “আমার একটা খুব মােটা লাল বাঁধানাে বাগুলা বই আছে জান ?নয়ন বলল, মহাভারত ?আমি বললাম, হ্যা

সেই বইয়ে কত পাতা আছে বলতনয়নের মুখে হাসি ফুটলবলল, “ছটফটানি থেমে গেছেসব নম্বর পালিয়ে গেছে খালি তিনটে নম্বর পর পর দাঁড়িয়ে আছেকী নম্বর জিজ্ঞেস করাতে নয়ন বলল, “নয় তিন চারআমি তাক থেকে কালী সিংহের মহাভারত নামিয়ে খুলে দেখি তার পৃষ্ঠা সংখ্যা সত্যি ৯৩৪।‘ 

আমাদের কাজ শেষ, আমরা ভদ্রলােককে বেশ ভালােরকম ধন্যবাদ দিয়ে বাড়িমুখাে রওনা দিলাম। শ্রীনাথ দরজা খুলে দিতে বসবার ঘরে ঢুকেই দেখি দুজন ভদ্রলােক বসে আছেনতার মধ্যে সুনীল তরফদারকে চিনিঅন্যজনকে আগে দেখিনি। 

নয়ন রহস্য (পর্ব-১২)

ফেলুদা ব্যস্ত ভাবে বলল, “সরিতােমরা কি অনেকক্ষণ এসেছ ? ‘পাঁচ মিনিট, বললেন তরফদার । এ হচ্ছে আমার ম্যানেজার ও প্রধান সহকারী—শঙ্কর হুবলিকার। তরফদারের মতাে বয়স, বেশ চালাক চেহারা, উঠে দাঁড়িয়ে আমাদের নমস্কার করলেন। আপনি ত মারাঠি ? প্রশ্ন করল ফেলুদা । ‘ইয়েস স্যার। তবে আমার জন্ম, স্কুলিং, সবই এখানে। 

বসুন, বসুন। আমরা সবাই বসলাম। ‘কী ব্যাপার বলুন’, তরফদারকে উদ্দেশ করে বলল ফেলুদা। ব্যাপার গুরুতর। ‘মানে ? ‘কাল আমাদের বাড়িতে দৈত্যের আগমন হয়েছিল।আমার বুকটা ধড়াস করে উঠল। সেই গাওয়াঙ্গির কথা বলছেন নাকি ভদ্রলােক ? ‘ব্যাপারটা খুলে বল, বলল ফেলুদা।। ‘বলছি।’ বললেন ভদ্রলােক। আজ ঘুম থেকে উঠে বাদশাকে নিয়ে হাঁটতে বেরােব—তখন সাড়ে পাঁচটা-~দোতলা থেকে নেমেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম।‘কেন ?

 

Read More

সত্যজিৎ রায় এর নয়ন রহস্য (পর্ব-১৩)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *