দুপুরে খাবার পর ফেলুদা দু’ঘণ্টা ধরে জটায়ুকে স্ক্র্যাবল খেলা শেখালাে। ভদ্রলােক কোনােদিন ক্রসওয়ার্ডই করেননি। তাই ওকে—সিন্ধি নামের ঢং-এই বলি—বেশ নাকানি-চোবানি খেতে হল। ফেলুদা শব্দের খেলাতে একেবারে মাস্টার,যেমন হেঁয়ালির জট ছাড়াতেও মাস্টার—যার অনেক উদাহরণ এর আগে দিয়েছি।আলিপুর পার্ক রােড অবশ্যই হরিপদবাবুর চেনা।
পাঁচটা বাজতে পাচ মিনিটে আমাদের গাড়ি সাঁইত্রিশ নম্বরের গেট দিয়ে ঢুকে পােটিকোর নীচে এসে থামল । সামনেই ডাইনে গ্যারেজ তার বাইরে একটা লম্বা সাদা গাডি দাঁড়িয়ে আছে । বিদেশী বলে মনে হচ্ছে ? লালমােহনবাবু মন্তব্য করলেন । ফেলুদা সদর দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল, না। ওটার নাম কনটেসা। এখানেই তৈরি।
সদর দরজায় দারােয়ান দাঁড়িয়ে, ফেলুদা তাকে বলল, “আমাদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। | ইতিমধ্যে বােধহয় গাড়ির শব্দ পেয়েই একটি বেয়ারা এসে হাজির হয়েছে ; সে লালমােহনবাবুর দিকে চেয়ে বলল, “মিত্তর সাব ? ‘হাম নেহী—ইনি’, ফেলুদার দিকে দেখিয়ে বললেন জটায়ু। ‘আইয়ে আপ লােগ। বেয়ারার পিছন পিছন আমরা একটা ড্রইং রুমে গিয়ে হাজির হলাম । “বৈঠিয়ে।’
আমি আর জটায়ু একটা সােফায় বসলাম । ফেলুদা তৎক্ষণাৎ না বসে। একটু এদিক ওদিক ঘুরে দেখে একটা বুক সেলফের সামনে গিয়ে দাঁড়াল । দেয়ালে আর টেবিলে শােভা পাচ্ছে এমন খুঁটিনাটির মধ্যে অনেক নেপালী জিনিস রয়েছে । লালমােহনবাবুও দেখেছেন, কারণ বিড়বিড় করে বলতে শুনলাম, ‘দার্জিলিং ।
নয়ন রহস্য (পর্ব-১৫)
‘কেন, দার্জিলিং কেন ? ফিরে এসে আরেকটা সােফায় বসে বলল ফেলুদা। নেপালি জিনিস কি নেপালে পাওয়া যায় না ? ‘আরে সে তাে নিউ মার্কেটেই পাওয়া যায়। | বাইরে ল্যান্ডিং-এ দাঁড়ানাে গ্র্যান্ডফাদার ক্লক দেখেছি, এবার তাতে গম্ভীর অথচ মােলায়েম শব্দে ঢং ঢং করে পাঁচটা বাজতে শুনলাম। আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে খয়েরি রঙের সুট পরা একজন রােগা, ফরসা, প্রৌঢ় ভদ্রলােক ঘরে এসে ঢুকলেন ।
কেন জানি মনে হল ভদ্রলােকের স্বাস্থ্যটা খুব ভালাে যাচ্ছে না-~-বােধহয় চোখের তলায় কালির জন্য।আমরা তিনজনেই নমস্কার করতে উঠে দাঁড়িয়েছিলাম। ভদ্রলােক ব্যস্ত হয়ে বললেন, ‘বসুন বসুন—প্লীজ সিট ডাউন। | ভদ্রলােকের ঘড়ির ব্যান্ডটা বােধহয় ঢিলে হয়ে গেছে, কারণ নমস্কার করে হাত নামাবার সঙ্গে সঙ্গে ঘড়িটা সড়াৎ করে নীচে নেমে এল। ডান হাত দিয়ে ঠেলে সেটাকে যথাস্থানে এনে ভদ্রলােক ফেলুদার উল্টোদিকের সােফায় বসলেন। বাংলা ইংরিজি হিন্দি মিশিয়ে কথা বললেন হিঙ্গেয়ানি ।
ফেলুদা নিজের এবং আমাদের দুজনের পরিচয় করিয়ে দেবার পর ভদ্রলােক বললেন, “আমার আপিসের যে খবর কাগজে বেরিয়েছে সে কি আপনি পড়েছেন ? ‘পড়েছি’, বলল ফেলুদা। ‘আমি গ্রহ-নক্ষত্রের প্রভাবে বিশ্বাস করি। আমাকে যে ভারে হারাস করা হচ্ছে তাকে গ্রহের ফের ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না । আমার পার্টনারের ভীমরতি ধরেছে ; কোনো সুস্থ মস্তিষ্ক লোেক কখনাে এমন করতে পারে না।
নয়ন রহস্য (পর্ব-১৫)
‘আমরা কিন্তু আপনার পার্টনারকে চিনি। ‘হাউ ?’ অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন হিঙ্গোরানি। ফেলুদা সংক্ষেপে তরফদার আর জ্যোতিঙ্কের ব্যাপারটা বলে বলল, ‘এই ছেলের ব্যাপারেই তেওয়ারি ফোনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে তরফদারের বাড়ি এসেছিলেন। আমরা তখন সেখানে উপস্থিত ছিলাম। ভদ্রলােক বললেন তাঁর সিন্দুকের কম্বিনেশনটা ভুলে গেছেন।
ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করাতে সে বলে দেয়, আর সেই সঙ্গে এটাও বলে যে সিন্দুকে আর একটি পাই-পয়সাও নেই। ‘আই সী– ‘আপনি ফোনে বললেন আপনাকে খুব বিব্রত হতে হচ্ছে ? ‘তা বটেই। প্রথমত, বছর খানেক থেকেই আমাদের মধ্যে বনিবনা হচ্ছে না, যদিও এককালে আমরা বন্ধু ছিলাম। আমরা একসঙ্গে এক ক্লাসে সেন্ট জেভিয়ার্সে পড়তাম।
কলেজ ছাড়ার বছর খানেকের মধ্যেই আমরা আলাদা আলাদা ভাবে ব্যবসা শুরু করি। তারপর ১৯৭৩-এ আমরা এক জোটে টি. এইচ. সিন্ডিকেটের পত্তন করি। বেশ ভালাে চলছিল কিন্তু ওই যে বললাম—কিছুদিন থেকে দুজনের সম্পর্কে চিড় ধরেছিল। ‘সেটার কারণ কী ? ‘প্রধান কারণ হচ্ছে–তেওয়ারির স্মরণশক্তি প্রায় লােপ পেতে বসেছিল । সামান্য জিনিসও মনে রাখতে পারে না।
Read More
