সত্যজিৎ রায় এর নয়ন রহস্য (পর্ব-১৭)

নয়ন রহস্য

সেটার সময় এখনাে আসেনি, লালমােহমবাবু। তথ্যটা আমার মস্তিষ্কের কম্পিউটারের মেমারিতে পুরে দিয়েছি। প্রয়ােজনে বােম টিপলেই ফিরে পাব ।। ‘আপনি যে এই হিঙের কচুরির কেসটাও নিলেন—দুদিক সামলাতে পারবেন ত ? ফেলুদা কোনাে উত্তর না দিয়ে ভাসা-ভাসা চোখে চলন্ত গাড়ির জানলা দিয়ে বাইরে চেয়ে থেকে মৃদুস্বরে বলল ‘খটকা… খটকা… বা. সর পরদিন সকালে কাগজ খুলে দেখি তরফদার সম্বন্ধে খবর বেরিয়েছে যে উনি উনিশে ডিসেম্বর দলবল নিয়ে দক্ষিণ ভারত সফরে যাচ্ছেন, পঁচিশে ডিসেম্বর মড্রাসে ওর প্রথম শাে । 

ফেলুদা চুল ছাঁটাতে গিয়েছিল, দশটা নাগাত ফিরল। ওকে খবরটার কথা বলতে ও গভীরভাবে বলল, দেখেছি ।.. আত্মপ্রচারের লােভ খুব কম লােকেই সামলাতে পারে রে, তােপসে! আমি একটু নরম-গরম কথা শােনাবাে বলে ওকে ফোন করেছিলাম,কারণবুঝতেই ত পারছিস—এই খবর বেরােনর ফলে আমার কাজটা অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়ছে। 

‘তরফদার কী বললেন ?” ফেলুদা একটা শুকনাে হাসি হেসে বলল, “বলে কি—আজকের দিনে শােম্যানদের পাবলিসিটি ছাড়া গতি নেই, মিস্টার মিত্তির । ও নিয়ে আপনি কাইন্ডলি আমাকে কিছু বলবেন না ।.. আমি বললাম- যে-তিনজন ব্যক্তি নয়নের দিকে লুব্ধ দৃষ্টি দিচ্ছে, তারা যে তােমার প্রােগ্রামটা জেনে গেল সেটা কি ভালাে হল ?– তাতে ছােরা বলল- আপনি চিন্তা করবেন । আমি যে ভাবে ওদের বলেছি, আমার বিশ্বাস তাতে ওরা নয়নকে পাবার আশা ছেড়েই দিয়েছে।

নয়ন রহস্য (পর্ব-১৭)

এর পর আর কী বলি বল ? সত্যি যদি তাই হয় তাহলে ত আমার আর কোনাে প্রয়ােজনই থাকে না । কিন্তু আমি ত জানি যে নয়নের বিপদ—এবং সেই সঙ্গে আমার দায়িত্ব—এখনাে পুরােমাত্রায় রয়েছে ! অর্থাৎ আমার দিক থেকে কাজে ঢিলে দেবার কোনাে প্রশ্নই আসে না। | বাইরে গাড়ি থামার শব্দ, আর তার পরে পর পর দুবার কলিং বেল টেপার শব্দে বুঝলাম জটায়ু হাজির। এখন সােয়া দশটা ; ভদ্রলােক সাধারণত নটা-সাড়ে নটার মধ্যে চলে আসেন। আজ কোনাে কারণে দেরি হয়েছে। 

দেখে ভালাে লাগল যে ফেলুদার মুখ থেকে মেজাজ খিচড়ােনাে ভাবটা চলে গেল। ‘খবর আছে মশাই, খবর আছে ! ঘরে ঢুকেই চোখ বড় বড় করে বললেন জটায়ু। ‘দাঁড়ান, দেখি আমি কতদূর আন্দাজ করতে পারি, বলল ফেলুদা। ‘আপনি নিউ মার্কেটে গেলেন। ঠিক ? ‘কী করে জানলেন ? ‘আপনার কোটের বুক পকেট থেকে আইডিয়াল স্টোর্সের ক্যাশমেমাের ইঞ্চি খানেক বেরিয়ে আছে।

তাছাড়া আপনার কোটের বাঁ দিকের সাইড পকেট এমনভাবে ঝুলে ফুলে রয়েছে যে বােঝাই যাচ্ছে আপনার প্রিয় টুথপেস্ট ফরহানসের একটি ফ্যামিলি সাইজ টিউবের প্যাকেট রয়েছে ওখানে।। ‘ববাঝাে? -নেক্সট ? ‘আপনি রেস্টোরান্টে গিয়ে স্ট্রবেরি আইসক্রিম খেয়েছিলেন—তার দু’ ফোঁটা আপনার সার্টে পড়েছে। ‘আপনি একা কখনাে রেস্টোরাষ্টে জান না। অর্থাৎ একটি পরিচিত ব্যক্তির আবির্ভাব হয়েছিল, যার সঙ্গে আপনি যান। 

নয়ন রহস্য (পর্ব-১৭)

‘জবাব নেই ! নেক্সট ?  ‘আপনি তাকে নিয়ে যান নি, সেই আপনাকে নিয়ে গেল । কারণ আপনাকে এতকাল চিনে অন্তত এটুকু জানি যে আপনার এমন কোনাে বন্ধু এখন নেই যাকে আপনি রেস্টোরান্টে নিয়ে গিয়ে আইসক্রিম খাওয়াবেন । ‘আমার মাথা ভোঁ ভোঁ করছে ! নেক্সট ? ‘এ ব্যক্তির সঙ্গে সম্প্রতি আলাপ হয়েছে আপনার । পুরােনাে আলাপী বলতে আমরা দুজন ছাড়া আপনার আর কেউ নেই । তরফদার কী ? না । তার এত সময় নেই ; সে এখন সফরের তােড়জোড় করছে । চতুলোভীর কেউ কি ?

হজসন নন, কারণ সে ইনভাইট করলে আপনি রিফিউজ করবেন—একটানা ইংরিজি বলাটা আপনার পারদর্শিতার মধ্যে পড়ে না। তারকনাথ ? উঁহু,তাঁর নিউ মার্কেটে কোনাে প্রয়ােজন থাকতে পারে না ; উত্তর কলকাতায় দোকানের অভাব নেই। আর তাছাড়া আমার ধারণা তাঁর বাজার করার জন্য মাইনে করা লােক আছে। তাহলে বাকি রইল কে? 

‘ব্রিলিয়ান্ট, ব্রিলিয়ান্ট ! আপনি ধরে ফেলেছেন, ফেলুবাবু, ধরে ফেলেছেন ! অনেকদিন পরে আপনার চিন্তাশক্তি আর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার নমুনা পাওয়া গেল। থ্যাঙ্ক ইউ, স্যার! বসাক ত ? ‘বসাক, বসাক নন্দলাল বসাক ! আজ প্রথম পুরাে নামটা জানলুম। ‘আপনার সঙ্গে তাঁর কী কথা ? 

 

Read More

সত্যজিৎ রায় এর নয়ন রহস্য (পর্ব-১৮)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *