সত্যজিৎ রায় এর নয়ন রহস্য (পর্ব-৮)

নয়ন রহস্য

তার বদলে ডালার এক পাশে একটা চাকতি থাকে যেটাকে ঘােরাননা যায় এই চাকতির গায়ে একটা তীর আঁকা থাকে, আর চাতিটাকে ঘিরে সিন্দুকের গায়ে এক থেকে শূন্য অবধি নম্বর লেখা থাকে। কম্বিনেশন হল সিন্দুক খােলার একটা বিশেষ নম্বর চাকতিটাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পর পর সেই নম্বরের পাশে তীরটাকে আনলে শেষ নম্বরে পৌঁছতেই ঘড়াৎ করে সিন্দুক খুলে যায় বুঝেছ ? বুঝেছি।‘ এখানে জটায়ু দুম করে একটা বেশ লাগসই প্রশ্ন করলেন তেওয়ারিকে.। 

‘আপনার নিজের সিন্দুকের কম্বিনেশন আপনি নিজেই জানেন না ? তেইশ বছর ধরে জেনে এসেছি, আক্ষেপের ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বললেন তেওয়ারি। স্বভাবতই মুখস্থ ছিল। ক’ হাজার বার সে সিন্দুক খুলেছি তার কি হিসাব আছে ? কিন্তু বয়স যেই পঞ্চাশ পেরিয়েছে অমনি স্মৃতিশক্তি দুর্বল হতে শুরু করেছে। আজ চারদিন থেকে নম্বরটা কিছুতেই মনে পড়ছে না। একটা ডায়রিতে লেখা ছিল, বহু পুরোেনাে ডায়রি—সেটা যে কোথায় গেছে জানি না।

আমি হয়রান হয়ে শেষে এই ছেলের খবর পেয়ে মিস্টার তরফদারের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করি । | ‘আপনি কি আর কাউকে কোনােদিন নম্বরটা বলেননি? আবার প্রশ্ন করলেন জটায়ু। ফেলুদার দিকে আড়চোখে চেয়ে তার ঠোঁটের কোণে হাসি দেখে বুঝলাম সে জটায়ুকে তারিফ করছে। তেওয়ারি বললেন, আমার ধারণা আমার পার্টনারকে বলেছিলাম বহুকাল আগে অবশ্য—কিন্তু সে অস্বীকার করছে। হয়ত এও আমার স্মৃতিভ্রম । কম্বিনেশন ত আর পাঁচজনকে বলে বেড়াবার জিনিস নয়, আর এ-সিন্দুক হল আমার পার্সোনাল সিন্দুক।

নয়ন রহস্য (পর্ব-৮)

আমার যে-টাকা ব্যাঙ্কে নেই তা সবই এই সিন্দুকে আছে। অথচ...’ | তেওয়ারির দৃষ্টি সােফার পাশে দাঁড়ানাে নয়নের দিকে ঘুরল। সঙ্গে স নয়ন বলল, “সিক্স ফোঃ থ্রী এইট নাইন সিক্স ওয়ান ।  ‘রাইট ! রাইট ! রাইট ! উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠলেন তেওয়ারি। আর সঙ্গে সঙ্গে পকেট থেকে একটা ছােট্ট নােটবুক বার করে ডটপেন দিয়ে তাতে নম্বরটা লিখে নিলেন। | ‘আপনার সিন্দুকে কত টাকা আছে সেটা আপনি জানেন ? প্রশ্ন করলেন তরফদার। 

‘এগজ্যাক্ট অ্যামাউন্টটা জানি না।’ বললেন তেওয়ারি, ‘তবে যতদূর মনে হয়—লাখ চারেক ত হবেই।‘এ কিন্তু বলে দিতে পারে’, নয়নের দিকে দেখিয়ে বললেন তরফদার। ‘আপনি জানতে চান ? ‘তা কৌতূহল ত হয়ই। তেওয়ারি ঠোঁটের কোণে হাসি আর চোখে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিয়ে নয়নের দিকে চাইলেন।‘টাকা-পয়সা কিছু নেই, বলল নয়ন।‘হােয়াট। 

তেওয়ারি সােফা থেকে প্রায় তিন ইঞ্চি লাফিয়ে উঠলেন। তারপর উত্তেজনা সামলে নিয়ে মুখে একটা বিরক্ত ভাব এনে বললেন, ‘বােঝাই যাচ্ছে এই বালক সব ব্যাপারে রিলায়েন্স নয় । এনিওয়ে, কম্বিনেশনটায় ভুল নেই। এটা জানতে পেরে সত্যিই আমার উপকার হয়েছে।’  তেওয়ারি দাঁড়িয়ে উঠে পকেটে হাত ঢুকিয়ে একটা গােলাপী কাগজে মােড়া সরু লম্বা প্যাকেট বার করে নয়নের হাতে দিয়ে বললাে, “দিস ইজ ফর ইউ, মাই বয়। তেওয়ারিকে দরজা অবধি এগিয়ে দিয়ে তরফদার ফিরে আসতে ফেলুদা নয়নকে বলল, “ওটা খুলে দেখ ত ওতে কী আছে। 

নয়ন রহস্য (পর্ব-৮)

প্যাকেট খুলতে বেরােল একটা ছােটদের রিস্টওয়াচ। ‘বাঃ! বললেন জটায়ু । এটা পরে ফেল নয়ন ভাই, পরে ফেল! নয়ন ঘড়িটা হাতে পরে নিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল। ‘সিন্দুক খুলে তেওয়ারি সাহেবের প্রাণ ওষ্ঠাগত হবে’, বলল ফেলুদা। ‘সিন্দুকে যদি সত্যিই কিছু থেকে না থাকে, বললেন জটায়ু, ‘তাহলে তেওয়ারি নিশ্চয়ই ওঁর পার্টনারকেই সন্দেহ করবেন ? 

ফেলুদা যেন মন থেকে ব্যাপারটাকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে অন্য প্রসঙ্গে চলে গেল। তরফদারের দিকে ফিরে বলল, তােমরা যে দক্ষিণ ভারত সফরে যাচ্ছ, সেটা কিসে যাবে ? ট্রেনে, না প্লেনে ? ‘ট্রেনে অবশ্যই। সঙ্গে এত লটবহর, ট্রেন ছাড়া উপায় কী? ‘নয়নকে সামলাবার কী ব্যবস্থা করছ ? ‘ট্রেনে ত আমিই সঙ্গে থাকৰ কিছু হবে বলে মনে হয় না। ওখানে পেীছে আমি ছাড়াও একজন আছে যে ওকে সব সময়ে চোখে চোখে রাখবে । সে হল আমার মানেজার শঙ্কর। 

কথা হয়ত আরাে চলত, কিন্তু ঠিক এই সময়ে চাকর একটি প্যান্ট-কোট-টাই পরা ভদ্রলােককে এনে হাজির করলেন। বুঝলাম ইনি নাম্বার স্ত্রী। ‘গুড মনিং। আই মেড অ্যান অ্যাপয়েন্টমেন্ট উইথ ‘মী’, বললেন তরফদার। মাই নেম ইজ তরফদার। ‘আই সী। মাই নেম ইজ হজসন। হেনরি হজসন। প্লীজ সিট ডাউন। তরফদারও উঠে দাঁড়িয়েছিলেন ; এবার দুজনেই একসঙ্গে বসলেন।

নয়ন রহস্য (পর্ব-৮)

হজসনের গায়ের যা রং, তাঁকে সাহেব বলা মুশকিল। তাও ইংরিজি ছাড়া গতি নেই। | এরা কারা প্রশ্ন করতে পারি কি? পর পর আমাদের তিনজনের দিকে চেয়ে প্রশ্ন করলেন হজসন । ‘আমার খুব কাছের লােক। আপনি এদের সামনে স্বচ্ছন্দে কথা বলতে পারেন। 

হুম। | ভদ্রলােকের মেজাজ যে তিরিক্ষি, সেটা তাঁর পার্মানেন্টলি কুঁচকে থাকা ভুরু থেকে বেশ বােঝা যাচ্ছিল। ‘আমার এক পরিচিত বাঙালি ভদ্রলােক লাস্ট সানডে তােমার ম্যাজিক দেখেছিল। সে একটি ছেলের আশ্চর্য ক্ষমতার কথা বলে। আমি অবিশ্যি তার কথা বিশ্বাস করিনি। আমি ঈশ্বর মানি না ; তাই অলৌকিক শক্তিতেও আমার বিশ্বাস নেই। ইফ ইউ ব্রিং দ্যাট বয় হিয়ার—আমি ওর সঙ্গে কয়েকটা কথা বলতে চাই।’ 

 

Read More

সত্যজিৎ রায় এর নয়ন রহস্য (পর্ব-৯)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *