নির্বাসন-হুমায়ূন আহমেদ (পর্ব-১২)

খুব ভালাে। ‘তবে যে শুনলাম খুব পেইন হয়। মাঝে মাঝে পেথিড্রিন দিতে হয়। ‘প্ত হয়। কিন্তু এখন ভালাে।’ 

হােসেন সাহেব কোট খুলে হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে দিলেন। চেয়ারে বসতে বসতে বললেন, ‘তােমার জন্যে গল্পের বই পাঠিয়েছিলাম, পেয়েছ? 

‘ক্সি, পেয়েছি।’ 

 

নির্বাসনপড়েছ নাকি সব? কিছু কিছু পড়েছি।’ 

‘কী-যে রস পাও গল্পের বইয়ে, তােমরাই জান। তােমার পরী আপার তো বই পেলে আর কথা নেই। এক বার কীএকটা বই পড়ে ফিচফিচ করে এমন কান্নাদুপুরে ভাত খেল না, রাতেও না।’ 

কী বই সেটি? 

কি জানি কী বই। জিজ্ঞেস করাে ওকে। যেলেখক লিখেছে, সে নিশ্চয়ই লিখবার সময় খাওয়াদাওয়া ঠিকঠাক কৱেছে। | হােসেন সাহেব হাসতে লাগলেন। আনিসও হাসল। হােসেন সাহেব বললেন, 

এক কাপ চা খেলে হ’ত।’ 

আমার এখানে চায়ের সরঞ্জাম আছে। কাউকে ডেকে আনেন। ডাকতে হবে না, আমিই পারব।’ 

নির্বাসন-হুমায়ূন আহমেদ

হােসেন সাহেব নিঃশব্দে উঠে গিয়ে হিটার জ্বালালেন। চা, চিনির পট খুঁজে বের করলেন। দু’টি কাপ ধুয়ে টেবিলে এনে রাখলেন। আনিস দেখল, তিনি মৃদু মৃদু হাসছেন। এই লােকটির বেশ কিছু বিচিত্র অভ্যেস আছে। আপন মনে হাসা, আপন মনে কথাবলা তার মধ্যে পড়ে। এছাড়াও আরাে অদ্ভুত অভ্যেস আছে। যেগুলি পরী জানে। কিন্তু পরী সেসব নিয়ে কারাে সঙ্গে গল্প করতে পারে না। তার স্বামী সম্পর্কে সে খুব সজাগ। কেউ তার কোনাে দোষ ধরুক, তাকে নিয়ে হাসিতামাশা করুক, এসব সহা করতে পারে না। বড়চাচা একবার পরীকে বলেছিলেন, “তাের ভদ্রলােকটি এমন মিনমিনে কেন রে?’ এতেই পরী কেঁদেকেটে অস্থির হয়েছিল। বড়ােচাচা অপ্রস্তুতের একশেষ। আবার এও ঠিক, হােসেন সাহেবের সঙ্গে পরীর বনিবনা হয় নি। কুমারী অবস্থায় স্ত্রী যেসব কথা ভেবে একা একা লাল হত তার কোনােটিই বাস্তবের সঙ্গে মেলে নি। এ নিয়ে তার গােপন ব্যথা আছে। আনিস তা জানে সে হঠাৎ বলল, ‘রী তার বাচ্চা দু’টিকে কেমন আদর করে দুলাভাই?  

খুব, যাকে বলে এনিমেল লাভ! 

অার অাপনাকে?” ‘আমাকে ভয় করে। নাও তােমার চা। মিষ্টি লাগবে কিনা বল। 

আনিস চায়ে চুমুক দিল। পেটের মধ্যে মােচড় দিয়ে উঠছে। সফল মা | যা নি, এখন বেলা হয়েছে বারটা। খিদে জানান দিচ্ছে। হােসেন সাহেব ললেন, রকম করছ কেন? ব্যথা শুরু হল নাকি?’ 

না, ও কিছু নয়। 

হোসেন সাহেব সিগারেট ধরালেন। আনিস খানিকক্ষণ ইতস্তত করে বলল, আপনি কি সুখী ? | ‘সামটাইমস। একটি মানুষ সারাক্ষণ সুখী থাকতে পারে না। মাঝে মাঝে সুখী হয়। এখন আমি সুখী। 

কেন? কি জানি কেন। হঠাৎ এসব কথা জিজ্ঞেস করছ যে? 

নির্বাসন-হুমায়ূন আহমেদ

‘দুলাভাই, মাঝে মাঝে আমি এসব নিয়ে ভাবি। কিচ্ছু করবার নেই তাে, এই জন্যে। মাঝে মাঝে আমার মনে হয় আসলে হ্যাপিনেস বলে আলাদা কিছু নেই।’

আনিসের কথা শেষ হবার আগেই দারুণ হৈচৈ ও চেচামেচি শােনা যেতে লাগল। একটি তীক্ষ্ণ মেয়েলী গলায় কে যেন কেঁদে উঠল। ছাদের উপর থেকে হুড়মুড় শব্দ করে একসঙ্গে অনেক লােক নিচে নেমে এল। হােসেন সাহেব আধ খাওয়া চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। 

গােলমালটা যেমন হঠাৎ শুরু হয়েছিল, তেমনি হঠাৎ থেমে গেল। একটি বিয়েবাড়ির হৈচৈ হঠাৎ থেমে গেলে বুকে ধক করে ধাক্কা লাগে। আনিস নিদারুণ অস্বস্তি নিয়ে অপেক্ষা করছিল। হােসেন সাহেবের ফিরে আসতে দেরি হল না। তিনি আবার তাঁর ঠাণ্ডা চায়ের কাপে চুমুক দিলেন। আনিসের দিকে তাকিয়ে অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে হাসলেন। আনিস বলল, ‘কী হয়েছিল দুলাভাই?” 

‘আমার মেয়ে পান্না ডুবে গিয়েছিল পুকুরে।’ 

বলেন কী! ‘সঙ্গে সঙ্গে তুলে ফেলেছে। 

পুকুরে গেল কী করে? ‘মেয়েরা সবাই রঙ খেলে গিয়েছিল গা ধুতে, পারাও গিয়েছে। 

হােসেন সাহেব আরেকটি সিগারেট ধরালেন। আনিস দেখল আগুন জ্বালাতে গিয়ে তাঁর হাত কাঁপছে, দেশলাইয়ের কাঠি বারবার নিভে যাচ্ছে। আনিস বলল, ‘আপনি পরীর কাছে যান। 

 

Read More

নির্বাসন-হুমায়ূন আহমেদ (পর্ব-১৩)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *