নির্বাসন-হুমায়ূন আহমেদ (পর্ব-৩)

এখানেই তাে বেশ গল্পগুজব করছিস। 

কনক বলল, ‘ছাদে আমি গান শােনাব।’ সঙ্গে সঙ্গে দলটি চেচিয়ে উঠল। গত দু দিন ধরেই কনককে গাইবার জন্যে সাধাসাধি করা হচ্ছে। লাভ হয় নি। কনক কিছুতেই গাইবে না লায়লা এক বার বলেই ফেলল, একটু নাম হয়েছে, এতেই এত তেল? টাকা না পেলে আজকাল তুই আর গাস না? 

নির্বাসন কনক কিছু বলে নি, শুধু হেসেছে। 

ধুপধাপ শব্দ করে সবাই যখন ছাদে উঠল, তখন নিশীথ রাত। চারদিকে ভীষণ অন্ধকার। জরী বলল, ‘দুর ছাই, জোছনা নেই। আমি ভেবেছিলাম জোছনা আছে। 

আভা বলল, আমার ভয় করছে ভাই, গাছের ওপর ওটা কি?’ ‘ওটা হচ্ছে তার অধ্যাপক প্রেমিকের এঞ্জেল বডি। তােকে দেখতে এসেছে। 

নির্বাসন-হুমায়ূন আহমেদ

সবাই হাে হাে করে হেসে উঠল। এই হাসির মধ্যেই গান শুরু করল কনক, ‘সঘন গহন রাত্রি’। 

গান শুরু হতেই সবাই চুপ করে গেল। আভা চাপা গলায় বলল, ‘কী সুন্দর গায়। বড়াে হিংসা লাগে।’ 

কনকের গলা খুব ভালো। ছােটবেলায় কিন্তু কেউ বুঝতে পারে নি, অল্প সময়ে কনকের এত নামডাক হয়ে যাবে। রেডিওতে প্রথম যখন গায় তখন সে কলেজে পড়ে। তার পরপরই তার গানের প্রথম ডিস্ক বের হয়যার এক পিঠে ‘আমি যখন তাঁর দুয়ারে ভিক্ষা নিতে যাই অন্য পিঠে ‘ওগাে শেয়ালী বনের মনের 

কামনা। 

 কনক পরপর চারটি গান গাইল। গানের মাঝখানে জরীর মা চায়ের পট নিয়ে মুদ অনুযােগের সুরে বললেন, ‘নাও তােমাদের চা। এত রাত্রে ছাদে গান-বাজনা কি ভালাে? চা খেয়ে ঘুমুতে যাও সবাই। 

নির্বাসন-হুমায়ূন আহমেদ

কেউ নড়ল না। রুনু বলল, ‘কনক, আজ সারা রাত তােমাকে গাইতে হবে।’ 

জরীর মা-ও এক পাশে বসে পড়লেন। জরীর বড়ােচাচাও উঠে এলেন ছাদে। আসর যখন ভাঙল তখন রাত দুটো জরীর বড়াচাচা বললেন, ‘বড়াে ভালাে লাগল মা, বড়াে মিঠা গুলা। জরীর গলাও ভালাে ছিল। কিন্তু সে তাে আর শিখল না। 

আভা ‘বলল, ‘এখন শিখবে। সবাই খিলখিল করে হেসে উঠল। কনক বলল, আপনার একটা গান শুনি? 

অন্য দিন, আজ অনেক রাত হয়েছে। তােমরা ঘুমুতে যাও। 

সেরাতে করােরই ভালাে ঘুম হল না। জরীর বডড মন কেমন করতে লাগল। তার ইচ্ছে করল মার কাছে গিয়ে ঘুমােয়। কিন্তু সে মড়ার মতাে পড়ে রইল। আভা একবার ডাকল, জরী, ঘুমিয়েছিস? জরী তার জবাব দিল না। একসময় ঘুমিয়ে পড়ল সবাই। শুধু জরী জেগে রইল। বিয়ের আগের রাতে কোনাে মেয়ে কি আর ঘুমুতে পারে? 

ইনিয়ে বিনিয়ে বৈীর সুরে সানাই বাজছে। যেসুরটি ওঠা-নামা শছে টি যেন একটি শােকাহত রমণীর বিলাপ। অন্য যেসুরটি ক্রমাগত বেয়ে যাচ্ছে সেটি যেন বলছেকেঁদো না মেয়ে, শােন, তােমাকে কী চমৎকার গান শােনাচ্ছি। 

জরীর বন্ধুদের ঘুম ভেঙেছেজরী ঘরে নেই। লায়লা গাঢ় স্বরে ডাকল, ‘ও কনক, কনক।’ 

কি? ‘সানাই শুনছিস? 

শুনছি। ‘ভালাে লাগছে তাের? 

না। খুব মন খারাপ করা সুর। 

তারা সবাই ঘর ছেড়ে বাইরে এসে দাঁড়াল। আভা গলা উঁচিয়ে ডাকল, ‘জরী, জরী। জল্পী ছাদ থেকে আসতেই সবাই দেখল, তার চোখ ঈষৎ রক্তাভ ও ফোলা ফোলা। রুনু বলল, রাতে তােঘুম হয় নি, না রে? 

খুব হয়েছে। ‘এখন তাের কেমন লাগছে জরী? ‘কেমন আর লাগবে। ভালােই। আয়, বাগানে বেড়াতে যাই। 

তারা বাগানে নেমে গেল। এবাড়ির বাগানটি পুরননা। জরীর দাদার খুব ফুলের শখ ছিল। মালী রেখে চমৎকার বাগান করেছিলেন। বসরাই গােলাপের প্রকাণ্ড একটি ঝাড় ছাড়া এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। বাড়ির সর্বদক্ষিণে বেশ কিছু হাসুহেনাগাছ আছে। সেখানে হাঁটু উচু বড়াে বড়াে ঘাস গজিয়েছে। ওদিকটায় কেউ যায় না। 

নির্বাসন-হুমায়ূন আহমেদ

আভা বলল, এত সুন্দর বাগান, কেউ যত্ন করে না কেন রে?’ 

জরী বলল, বাগানের শখ নেই কারাে। এক পরী আপার ছিল, সে তাে আর থাকে না এখানে। 

লায়লা বলল, ‘পরী আপা কি আগের মতো সুন্দর আছে? ‘এলেই দেখবি। ‘কখন আসবেন?’ 

সকাল সাড়ে আটটায়, ময়মনসিংহ এক্সপ্রেসে।’ 

কনক বলল, ‘এত বড়াে গােলাপ হয় নাকি, আশ্চর্য! জরী, গােলাপ তুলবএকটা?’ 

‘তােল না?’ 

 

Read More

নির্বাসন-হুমায়ূন আহমেদ (পর্ব-৪)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *