জরী অস্বস্তি বােধ করল। থেমে থেমে বলল, ‘চিকিৎসা করাতে যাচ্ছে। নেরুদণ্ডে গুলী লেগেছিল। সেই থেকে প্রােপ্লেজিয়া হয়েছে। কোমরের নিচে থেকে অবশ’
‘আমাকে তাে কিছু বলিস নি তুই, গুলী লাগল কী করে?’
‘আর্মির লেফটেন্যান্ট ছিলেন। কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে যখন পাক–আর্মির সাথে যুদ্ধ হয়, তখন গুলী লেগেছে।’
লায়লা বলল, ‘জরীর এই ভাইটিকে তাে তুই চিনিস, কনক। মনে নেই—এক বার আমরা সবাই দল বেঁধে আনন্দমােহন কলেজে থিয়েটার দেখতে গিয়েছিলাম? তখন যে একটি ছেলে সন্ন্যাসী সেজেছিল, হঠাৎ নাটকের মাঝখানে তার দাড়ি খুলে পড়ে গেল। ঐ তাে আনিস। যা মুখচোরা ছিল!’
জয়ী একটু হেসে বলল, ‘ছােটবেলায় আনিস ভাই ভীষণ বােকা ছিল। একেক বার এমন হাসির কাণ্ড করত! তাকে নিয়ে কোথাও বেড়াতে গেলেই হয়েছে, হয় সেখানে একটা কাপ ভাবে, নয় চেয়ার নিয়ে হঠাৎ গড়িয়ে পড়বে।’
নির্বাসন-হুমায়ূন আহমেদ
রুনু বলল, ‘বাঘের গল্পটা বল জরী, গুটা ভীষণ মজার। ‘না খাক।’ ‘বল না, শুনি।
এক বার আমরা সবাই “জঙ্গল বয়” ছবি দেখে এসেছি। আনিস ভাই ফিরে এসেই বড়চাচার সােয়েটার গায়ে দিয়ে বাঘ সেজেছে। আর আমরা সেজেছি হরিণ। আনিস ভাই হালুম শব্দ করে আমার ঘাড় কামড়ে ধরল। কিছুতেই ছাড়বে না। রক্তক্ত বেরিয়ে সারা, শেষে বড়চাচা এসে ছাড়িয়ে দিলেন। দেখ, এখনাে দাগ আছে।
জরীর মা দোতলা থেকে ডাকলেন, ‘ও মেয়েরা, চা দেওয়া হয়েছে, এস শিগ্গির। সবাই দেখল, তাঁর মুখ খুব উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। এক জন সুখী চেহারার মা, যার খোঁপায় গোঁজা ফুলটি এখনাে রয়েছে। হয়তাে ফেলে দিতে তাঁর মনে নেই, কিংবা ইচ্ছা করেই ফেলেন নি।
আভা বলল, ‘চা খেয়ে আমরা আনিস ভাইয়ের সঙ্গে একটু গল্প করব, কেমন জরী?
বেশ তাে, কবি। ‘যুদ্ধের গল্প শুনতে আমার খুব ভালাে লাগে।
নির্বাসন-হুমায়ূন আহমেদ
কনক বলল, ‘কই, আর সানাইয়ের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না তাে? সানাই বাজছিল ঠিকই, কিন্তু বিয়েবাড়ির হৈচৈ এত বেড়েছে যে শােনা যাচ্ছে ।
তারা সবাই দোতলায় উঠে এল। সিঁড়িতে জরীর বাবার সঙ্গে দেখা। তিনি দ্রুত নামছিলেন। জরীকে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে উত্তেজিত গলায় বললেন, ‘শুনেছিস কারবার, রশীদ টেলিফোন করেছে—দৈ নাকি পাওয়া যাবে না। জরী, তুই আমার সােয়েটারটা বের করে দে, আমি নিজেই যাই। তাড়াতাড়ি কর। এমন গাবার মতাে দাঁড়িয়ে আছিস কেন—‘ বলে তাঁর খেয়াল হলে বিব্রত ভঙ্গিতে বললেন, “আমি নিজেই খুজ্জে নেব। জরীর বন্ধুরা হাসতে লাগল।
সমস্ত শরীর মনে হচ্ছিল অবশ হয়ে যাচ্ছে। কোমরে কাছে চিনচিনে ব্যথা ক্রমশ
তীব্র ও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে। সে ভােয়ালে দিয়ে মুখ মুছল। বটি। , এই ভীষণ ঘাম হয় ও পানির প্রবল তৃষ্ণা হয়। আজ টেবিলে পানির ৫টি শ। বিয়েবাড়ির ব্যস্ততার জন্যেই হয়তো রাত্রিতে পানি রেখে যেতে কারো মনে নেই। আনিস উল্টোদিকে এক শ থেকে শুনতে শুরু করল। এক শ’, নিরানাই, আটানবৃই–। কোনাে একটা ব্যাপারে নিজেকে ব্যস্ত রাখা, যাতে ব্যথাটা ভুলে থাকা যায়।
ঘড়িতে সাড়ে ছটা বাজে। অন্য দিন এই সময়ে টিংকু এসে পড়ে! আজ আসে নি। বিয়েবাড়ির হৈচৈ ফেলে সে যে আসবে, এরকম মনে হয় না। তবু দরজার পাশে কোনাে একটা শব্দ হতেই আনিস উৎকর্ণ হয়ে ওঠে। না, টিংকু নয়। আবার তােয়ালে দিয়ে মুখের ঘাম মুছে আনিস কারাতে থাকে। আশি, উনআশি, আটাত্তর, সাতাত্তর... সাতটা বেজে গেছে। আজ তাহলে টিংকু আর এলই না।
নির্বাসন-হুমায়ূন আহমেদ
অন্য দিন ভাের ছটার মধ্যে দরজায় ছােট ছােট হাতের থাবা পৃড়ত। চিনচিনে গুল শােনা যেত, আনিস, আনিস।
কী টিংকুমনি?’ ‘আমি এসেছি, দরজা খােল।
আনিসের খাটটি এমনভাবে রাখা, যেন সে শুয়ে শুয়েই দরজার হুক নাগাল পায়। টিংকুর সাড়া পেলেই সে দরজা খুলে দিত। দেখা যেত ঘুম–ঘুম ফোলা মুখে চার বছরের একটি বাচ্চা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার মাথাভর্তি লাল চুল। গায়ে কোনাে ফ্লক নেই বলে শীতে কাঁপছে। দরজা খুলতেই সে গম্ভীর হয়ে বলবে, ‘আনিস, তােমার ব্যথা কমেছে?
‘হ্যা টিংকু। ‘আচ্ছা।
Read More